অবসরপ্রাপ্ত সাবরেজিস্ট্রার খন্দকার নুরুল আমিনের বিরুদ্ধে নামে-বেনামে প্রায় ১০০ কোটি টাকার অবৈধ সম্পদ অর্জনের চাঞ্চল্যকর তথ্য পাওয়া গেছে। টাঙ্গাইল ও রাজধানী ঢাকাসহ বিভিন্ন এলাকায় একাধিক বহুতল বাড়ি, ফ্ল্যাট, বাণিজ্যিক দোকান এবং পূর্বাচলে কোটি টাকার প্লট গড়ে তুলেছেন তিনি। স্ত্রী ও বিভিন্ন আত্মীয়স্বজনের নামে এসব সম্পদ গড়ে তোলা হলেও চাকরিজীবনের আয়ের সঙ্গে এর কোনো সামঞ্জস্য মেলেনি এবং তিনি এর কোনো সদুত্তরও দিতে পারেননি। বর্তমানে তার এই বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদের উৎস ও অর্জনের পেছনের রহস্য খতিয়ে দেখছে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
অনুসন্ধানে জানা যায়, টাঙ্গাইল শহরের বিশ্বাস বেতকা এলাকায় খাদ্যগুদাম-সংলগ্ন এলাকায় স্ত্রীর নামে গড়ে তোলা হয়েছে পাঁচতলা বিশিষ্ট দুই ইউনিটের একটি বিশাল বাড়ি। আনুমানিক দুই কোটি টাকা মূল্যের জমির ওপর প্রায় তিন কোটি টাকা ব্যয়ে নির্মিত এই ভবনটি বর্তমানে ভাড়ায় চালিত। একই এলাকায় খাদ্যগুদামের সীমানাপ্রাচীর-সংলগ্ন প্রায় এক কোটি টাকা বাজারমূল্যের ৫ শতাংশ জমিও রয়েছে তার দখলে। এছাড়া, টাঙ্গাইলের পুরোনো বাসস্ট্যান্ড-সংলগ্ন ‘প্যারাডাইস শাহজাহান সিরাজ নিবাস’ ভবনের নিচতলায় ‘স্বপ্ন’ সুপারশপকে একটি ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং একই ভবনে প্রায় এক কোটি ৬০ লাখ টাকা মূল্যের আরেকটি ফ্ল্যাট রয়েছে তার। পাশাপাশি শহরের ভিক্টোরিয়া রোডের দত্ত টাওয়ারে প্রায় ৭০ লাখ টাকা মূল্যের একটি বাণিজ্যিক দোকান এবং বাসাইলের বিয়ালা গ্রামে নিজ বাড়িতে প্রায় ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত বিলাসবহুল ভবন রয়েছে।
টাঙ্গাইলের গণ্ডি পেরিয়ে রাজধানী ঢাকা এবং এর আশেপাশের এলাকায়ও রয়েছে নুরুল আমিনের বিশাল সাম্রাজ্য। রাজধানীর পূর্বাচলে প্রায় সাত কোটি টাকা মূল্যের একটি প্লট ছাড়াও মিরপুর ১০ নম্বরের শাহ আলী মার্কেটে তার দোকান ও অফিস রয়েছে। নিজের ও স্ত্রীর পাশাপাশি বড় ভাই, বোন, ভাগনে, শাশুড়ি এবং শ্যালকদের নামেও নামে-বেনামে বিপুল পরিমাণ জমি ও স্থাবর সম্পত্তি কিনেছেন তিনি। প্রাথমিক অনুসন্ধানে এসব সম্পদের সত্যতার ইঙ্গিত মিললেও গণমাধ্যমের মুখোমুখি হয়ে তিনি প্রথমে তা স্বীকার করলেও পরবর্তীতে কয়েকটি সম্পদের বিষয়ে অস্বীকৃতি জানান। সব মিলিয়ে তার বিভিন্ন স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তির বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১০০ কোটি টাকা হতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অভিযোগ রয়েছে, কর্মজীবনে ঢাকার মিরপুর এলাকায় সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট পরিচালনা করে প্রতি মাসে অবৈধভাবে ৭০ থেকে ৮০ লাখ টাকা হাতিয়ে নিতেন নুরুল আমিন। ওই সময় তার বিরুদ্ধে ক্ষমতার অপব্যবহার ও দুর্নীতির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে এবং তাকে শাস্তিমূলক বদলিও করা হয়। নানা বিতর্কিত কর্মকাণ্ড ও অভিযোগের মধ্য দিয়েই তিনি পরবর্তীতে টাঙ্গাইলের কালিহাতী উপজেলায় সাবরেজিস্ট্রার হিসেবে তার দীর্ঘ চাকরিজীবন শেষ করেন।
নিজের অর্জিত সম্পদ ও আয়ের উৎস সম্পর্কে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে খন্দকার নুরুল আমিন জানান, তিনি ২০০৯ সালে সাবরেজিস্ট্রার পদে যোগদান করে ২০২৪ সালে অবসরে গেছেন এবং টাঙ্গাইলের বাড়িটি ভাড়ায় দেওয়া রয়েছে। তবে এসব সম্পত্তি কোন সময়ে কেনা হয়েছে, এর বিপরীতে অর্থের উৎস কী এবং বেতনের আয়ের সঙ্গে সম্পদের পাহাড় গড়ার এই ব্যবধানের বিষয়ে তিনি কোনো সুনির্দিষ্ট বা গ্রহণযোগ্য ব্যাখ্যা দিতে পারেননি। একপর্যায়ে তার আশপাশে লোকজন রয়েছে দাবি করে পরে বিস্তারিত জানানোর কথা বলে ফোন কেটে দেন এবং পরবর্তীতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন রিসিভ করেননি।
এদিকে দুদকের একটি দায়িত্বশীল সূত্র জানিয়েছে, সাবেক এই সাবরেজিস্ট্রারের অবৈধ সম্পদ অর্জনের বিষয়টি বর্তমানে নিবিড়ভাবে যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। প্রাথমিক যাচাই-বাছাই শেষে খুব দ্রুতই অনুসন্ধান প্রতিবেদন কমিশনে উপস্থাপন করা হবে। দুদক কর্মকর্তারা মনে করছেন, নুরুল আমিনের প্রকৃত সম্পদের পরিমাণ ও আয়ের উৎস সঠিকভাবে নির্ধারণে তার জমির মূল দলিল, ভবন নির্মাণের সঠিক ব্যয় প্রাক্কলন, বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের লেনদেন, আয়কর রিটার্ন এবং দীর্ঘ চাকরিজীবনের বৈধ আয়-ব্যয়ের হিসাব পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করা অত্যন্ত জরুরি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















