চাকরির মেয়াদ শেষ পর্যায়ে, আগামী ডিসেম্বর মাসেই অবসরোত্তর ছুটিতে (পিআরএল) যাবেন তিনি। কিন্তু শেষ সময়ে এসে সাধারণ সেবাগ্রহীতাদের পকেট কাটতে দুর্নীতির চরম স্টিম রোলার চালাচ্ছেন বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) গাজীপুর কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক (এডি) নুরুল হোসেন ওরফে নুর হোসেন। পতিত স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের দোসর ও বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের বিপক্ষের শত্রু হিসেবে পরিচিত এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে দালালনির্ভর সেবা, অবাধ ঘুষ বাণিজ্য, গ্রাহক হয়রানি এবং গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাজে বহিরাগত দালালদের সরাসরি সম্পৃক্ত করার মারাত্মক অভিযোগ উঠেছে। কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক নুরুল হোসেন ছাড়াও আরও তিন কর্মকর্তা-কর্মচারীকে ঘিরে গড়ে ওঠা এই সিন্ডিকেটের হাত থেকে রেহাই পাচ্ছে না সড়ক দুর্ঘটনায় নিহতদের ভুক্তভোগী পরিবারও।
বিশেষ করে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় তাঁর বিতর্কিত ভূমিকার বিষয়টি নতুন করে সামনে এসেছে। ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানে কোটা সংস্কার আন্দোলন চলাকালে ২৩ ও ২৪ জুলাই ২০২৪ মাদারীপুরে ছাত্রলীগ, পুলিশ ও আন্দোলনকারীদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষের ঘটনা ঘটে। সেখানে আন্দোলনকারীদের ওপর ছাত্রলীগ ও পুলিশের যৌথ হামলায় রোমান বেপারী ও তাওহীদ সন্নামাৎ নামে দুজন নিহত হন এবং নাম না জানা আরেক শিক্ষার্থী লেকের পানিতে ডুবে মারা যান। ওই মর্মান্তিক ঘটনার পর সাবেক নৌপরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খানের ঘনিষ্ঠ সহচর হিসেবে পরিচিত মাদারীপুর বিআরটিএর তৎকালীন সহকারী পরিচালক (ইঞ্জি.) নুর হোসেন, গণপূর্তের নির্বাহী প্রকৌশলী শাহরিয়ার রহমান এবং এলজিইডির নির্বাহী প্রকৌশলী বাদল চন্দ্র কীর্তিনিয়াকে নিয়ে তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন।
অভিযোগ রয়েছে, ২৬ জুলাই ২০২৪ সাবেক মন্ত্রী শাজাহান খানের প্রত্যক্ষ প্ররোচনা ও পরামর্শে বিআরটিএর এডি নুর হোসেনের নির্দেশে তদন্ত কমিটি আন্দোলনের সত্যতা ধামাচাপা দিয়ে বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনকারীদের ‘নাশকতাকারী’ হিসেবে চিহ্নিত করে একপেশে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। তৎকালীন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক নাজমুল হাসান গণমাধ্যমের সামনে উক্ত প্রতিবেদন উপস্থাপন করে দাবি করেন, মাদারীপুরে দুদিনের সহিংসতায় জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, ট্রাফিক পুলিশ বক্স ও সরকারি স্থাপনায় হামলা চালিয়ে প্রায় ৪০ কোটি টাকার ক্ষতি করেছে ‘নাশকতাকারীরা’। ছাত্র আন্দোলন দমনে তৎকালীন স্বৈরাচারী সরকারের এজেন্ডা বাস্তবায়নে অগ্রণী ভূমিকা রাখা এই কর্মকর্তা বর্তমানে গাজীপুরে বদলি হয়ে পিআরএলে যাওয়ার শেষ মুহূর্তেও দুর্নীতির রাজত্ব বজায় রেখেছেন।
প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, আগামী ডিসেম্বরে অবসরে যাওয়ার আগে মোটা অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নিতে বেপরোয়া হয়ে উঠেছেন এডি নুরুল হোসেন। কার্যালয়ে তাঁর বিশেষ আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত আফজাল, রুহুল ও কমল নামের কয়েকজন বহিরাগত দালালের মাধ্যমে সেবাগ্রহীতাদের জিম্মি করে বিপুল পরিমাণ অতিরিক্ত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। ফিটনেস পরীক্ষার বিশেষ অ্যাপয়েন্টমেন্ট দেওয়া এবং ড্রাইভিং লাইসেন্স-সংক্রান্ত নানা দাপ্তরিক কাজে ফাইলপ্রতি ৫০০ থেকে ১,০০০ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। অনিয়মের অতীতের রেকর্ড বিশ্লেষণ করে জানা যায়, নুরুল হোসেন পূর্বে সাভার বিআরটিএতে কর্মরত থাকাকালেও দালালদের প্রশ্রয় দিয়ে সরকারি কার্যালয়ে রীতিমতো চেয়ার-টেবিলে বসিয়ে মোটরযান পরিদর্শক হাসানের মাধ্যমে ব্যাপক দুর্নীতি চালিয়েছিলেন। পরবর্তীতে ইকুরিয়া বিআরটিএর লাইসেন্স শাখার এডি থাকাকালীন মোটরযান পরিদর্শক আবু জামালের সঙ্গে সিন্ডিকেট গড়ে একই ধরনের ঘুষ বাণিজ্য পরিচালনা করার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
কেবল সহকারী পরিচালকই নন, তাঁর ছায়াতলে কার্যালয়ের আরও তিন কর্মচারী চরম দুর্নীতির আখড়া গড়ে তুলেছেন। উচ্চমান সহকারী মারনুজ রহমানের বিরুদ্ধে নিয়মিত অফিসে অনুপস্থিত থেকে বহিরাগতদের দিয়ে স্পর্শকাতর দাপ্তরিক কাজ পরিচালনা করার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও হৃদয়বিদারক অভিযোগ উঠেছে অফিস সহকারী স্বপন হোসেনের বিরুদ্ধে। তিনি সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তিদের স্বজনদের পাওনা সরকারি ক্ষতিপূরণের ফাইল সচল করতে মোটা অঙ্কের ঘুষ দাবি করেন। অন্যদিকে, এডি নুরুল হোসেনের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ অফিস সহকারী কাম কম্পিউটার মুদ্রাক্ষরিক মাহফুজুর রহমান প্রতিটি সেবার বিপরীতে প্রকাশ্যে ঘুষ লেনদেন করছেন বলে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন সেবাগ্রহীতারা। ঘুষ লেনদেনের প্রমাণ কিংবা সংবাদ প্রকাশ হলেও মাহফুজুর রহমান তা বরাবরই ‘কুচক্রী মহলের ষড়যন্ত্র’ দাবি করে পার পেয়ে যান বলে জানান ভুক্তভোগীরা।
এক মর্মান্তিক অভিজ্ঞতার কথা তুলে ধরে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দুর্ঘটনায় নিহত এক ব্যক্তির স্বজন জানান, সরকারি অনুদান ও ক্ষতিপূরণের ফাইল এগিয়ে নেওয়ার বিষয়ে সাহায্য চাইতে গেলে স্বপন হোসেন তাঁদের কাছে সরাসরি ৩০ হাজার টাকা ঘুষ দাবি করেন। পরবর্তীতে বাধ্য হয়ে তাঁরা গাজীপুর ছেড়ে ঢাকার বিআরটিএ প্রধান কার্যালয় থেকে যোগাযোগ করে চেক সংগ্রহ করেন। তবে স্বপন ও মাহফুজুর রহমান নিজেদের বিরুদ্ধে আনীত সব অভিযোগ অস্বীকার করে ঘটনাটিকে ষড়যন্ত্র বলে দাবি করেছেন।
গাজীপুর বিআরটিএর এমন বিশৃঙ্খল অবস্থায় চরম ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করেছেন স্থানীয় পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতারা। বাসের মালিক মো. মিরাজ মিয়া ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গাজীপুর বিআরটিএ অফিসে নিয়ম মেনে কাজ করাতে গেলেও নানামুখী ভোগান্তিতে পড়তে হয়। টাকা না দিলে ফাইল নড়ে না। এটি এখন ঘুষ ও অনিয়মের ঘাঁটিতে পরিণত হয়েছে।” একই সুর মিলিয়ে গাজীপুর সিএনজি মালিক সমিতির নেতা মো. মিলন মিয়া বলেন, “পরিস্থিতি এমন দাঁড়িয়েছে যে সেবা নিতে গেলে মনে হয় নিঃশ্বাস ফেললেও টাকা দিতে হবে। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ঘুষ না দিলে কাজ আটকে থাকে। আমরা এসব দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে নিরপেক্ষ তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি চাই।”
ইতোমধ্যে পিআরএলে যেতে যাওয়া বিতর্কিত সহকারী পরিচালক নুরুল হোসেন ও তাঁর সহযোগীদের অনিয়ম-দুর্নীতি বন্ধে এবং দালালমুক্ত সেবাব্যবস্থা নিশ্চিত করতে সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিব বরাবর মো. আবুল হোসেন নামে এক সচেতন নাগরিক লিখিত অভিযোগ দায়ের করেছেন। চাকরিজীবনের শেষ সময়ে দুর্নীতির স্টিম রোলার চালানো এবং জুলাই বিপ্লবের আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়া এসব বিতর্কিত ও দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত তদন্তপূর্বক কঠোর প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জোরালো দাবি জানিয়েছেন গাজীপুরের সচেতন নাগরিক সমাজ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 
























