সংযুক্ত আরব আমিরাতের দুবাইয়ে গড়ে তুলেছেন বিশাল সাম্রাজ্য। সেখানে তাঁর অন্তত সাতটি বিলাসবহুল ভিলা ও ফ্ল্যাটের সন্ধান পেয়েছে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর)। তিনি প্রিমিয়ার ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান এবং বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের সাবেক সংসদ সদস্য এইচবিএম ইকবাল।
আভিজাত্য, নান্দনিকতা আর আধুনিক স্থাপত্যশৈলীর জন্য বিশ্বজুড়ে ধনকুবেরদের এক কাঙ্ক্ষিত ঠিকানা দুবাইয়ের পাম জুমেইরাহ। সমুদ্রের কৃত্রিম উপকূলে গড়ে ওঠা এই এলাকায় রয়েছে রাজকীয় নানা সুবিধাসম্পন্ন মাল্টি-মিলিয়ন ডলারের বহু স্থাপনা। সেখানে প্রায় পৌনে সাত হাজার বর্গফুটের একটি ভিলার মালিক এইচবিএম ইকবাল। বিশালাকার এই ভিলায় রয়েছে পাঁচটি বিলাসবহুল বেডরুম।
পাম জুমেইরাহর পাশাপাশি দুবাইয়ে অভিজাত শ্রেণির বসবাসের জন্য আরেক পরিচিত এলাকা ‘দামাক হিলস কুইন্স মেডো’। সেখানকার ১১৯টি ভিলার একটির মালিক ইকবাল পরিবার। ৬৩১ নম্বর প্লটে অবস্থিত ভিলাটির আয়তন সাত হাজার বর্গফুটেরও বেশি।
দুবাইয়ের বাণিজ্যিক কেন্দ্রগুলোতেও বিনিয়োগ রয়েছে ইকবালের। এনবিআরের গোয়েন্দা তথ্য বলছে, প্রতিটি সম্পদ কেনা হয়েছে মূলত বাংলাদেশ থেকে পাচার করা টাকায়।
বিশ্বের সর্বোচ্চ স্থাপনা বুর্জ খলিফার পাশেই ৩৪ তলাবিশিষ্ট ‘দ্য রেসিডেন্স টাওয়ার ই-টু’। বিলাসবহুল এই ভবনের ৩৪ তলায় তিন বেডরুমের একটি ফ্ল্যাট এইচবিএম ইকবাল ও তাঁর ছেলে মঈন ইকবালের যৌথ নামে নিবন্ধিত। ফ্ল্যাটটির মোট আয়তন দুই হাজার ৬৬৫ বর্গফুট।
জুমেইরাহ ভিলেজ এলাকার একটি আধুনিক স্থাপনা ‘টাস্কন রেসিডেন্স আরেজো’। এই ভবনে এক হাজার ২০০ বর্গফুটের বেশি আয়তনের একটি সুসজ্জিত স্টুডিও অ্যাপার্টমেন্ট কিনেছেন ইকবাল। বুর্জ খলিফা-সংলগ্ন আরেক বহুতল ভবন ‘উইন্ডসর ম্যানর টাওয়ার’-এর ২৬ তলায় রয়েছে দেড় হাজার বর্গফুটের আরেকটি ফ্ল্যাট।
বুর্জ খলিফা এলাকা দুবাইয়ের সবচেয়ে অভিজাত এলাকাগুলোর একটি। ফলে সেখানে ইকবালের একাধিক ফ্ল্যাটের মালিকানা তাঁর পরিবারের সম্পদের ব্যাপ্তি সম্পর্কে একটি ধারণা দেয়। এনবিআরের গোয়েন্দা তথ্য বলছে, বাংলাদেশ থেকে অবৈধভাবে পাচার করা অর্থে কেনা হয়েছে এসব স্থাপনা।
হাতে আসা দুবাই ভূমি বিভাগ থেকে ইস্যু করা ইউটিলিটি বিলের কপিগুলোতে এইচবিএম ইকবালের সম্পদের আরও সুনির্দিষ্ট বিবরণ উঠে এসেছে। আবাসিক ফ্ল্যাট ও ভিলার বাইরেও তাঁর বাণিজ্যিক বিনিয়োগের প্রমাণ মিলেছে।
‘স্ট্যান্ডপয়েন্ট রেসিডেন্স’-এর ২১ তলায় ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর। ‘এক্স এল টাওয়ার’-এর ১৩ তলায় রয়েছে এক হাজার ২০০ বর্গফুটের বাণিজ্যিক স্পেস।
এসব সম্পত্তির বিপরীতে দুবাই কর্তৃপক্ষের ইস্যু করা ইউটিলিটি বিলের কাগজপত্রে কোথাও সংক্ষিপ্ত আকারে, আবার কোথাও পূর্ণ নামে এইচবিএম ইকবালের পরিচয় স্পষ্ট করা হয়েছে। নথিপত্র বিশ্লেষণে দেখা যায়, ফ্ল্যাট ও ভিলার রক্ষণাবেক্ষণ বাবদ প্রতি বছর কয়েক লাখ টাকার শুধু ইউটিলিটি বিলই পরিশোধ করতে হয় ইকবাল পরিবারকে। এই অর্থ পরিশোধ করা হয় দুবাইয়ের একাধিক স্থানীয় ব্যাংক অ্যাকাউন্ট থেকে।
ইকবাল ও তাঁর পরিবারের বিদেশে গড়ে তোলা অবৈধ সম্পদ নিয়ে কাজ করছে এনবিআরের কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইসি। এর অংশ হিসেবে ২০২৫ সালের গোড়ার দিকে দুবাইয়ে যান সংস্থাটির সদস্যরা। এর পাশাপাশি যুক্তরাষ্ট্র ও কানাডাতেও ইকবাল পরিবারের সম্পত্তির খোঁজে অনুসন্ধান চালিয়ে যাচ্ছে সরকারের বিভিন্ন সংস্থা।
সংযুক্ত আরব আমিরাত সফরে দুবাই কর্তৃপক্ষের নথিপত্র যাচাইয়ে গোয়েন্দারা দেশটিতে ইকবাল পরিবারের বিভিন্ন সম্পত্তির মালিকানার বিষয়ে নিশ্চিত হন। পরে অপ্রদর্শিত এই সম্পত্তির বিপরীতে প্রায় ১৩০ কোটি টাকা আয়কর পরিশোধের জন্য এইচবিএম ইকবাল এবং তাঁর ছেলে মঈন ইকবালকে আনুষ্ঠানিক নোটিশ পাঠানো হয়। তবে তাঁদের পক্ষ থেকে কোনো জবাব পাওয়া যায়নি।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ‘এখানে এনবিআর যার বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছে, তিনি রাজনৈতিকভাবে প্রভাবশালী এবং ব্যাংকের মালিক ছিলেন। বিভিন্ন বেনামি কোম্পানি খুলে ঋণ নিয়ে সেগুলো পাচার করা হয়েছে। প্রতিনিয়ত যে টাকা পাচার হচ্ছে, এটি আমাদের সামগ্রিক অর্থনৈতিক অবস্থা দুর্বল করে দিচ্ছে।’
তিনি বলেন, ‘দেশের বিদ্যমান আইনে কিছু সংস্কার ও আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমে পাচার হওয়া অর্থ ফেরানো সম্ভব হলেও এটা দীর্ঘমেয়াদি। আমাদের প্রচেষ্টা বাড়াতে হবে। বিশেষ করে বাংলাদেশ ব্যাংককে মুখ্য ভূমিকা পালন করতে হবে। কিন্তু অনেক সময় তারা এটা নিয়ে গাফিলতি করে।
পাচার হওয়া অর্থ ফেরানোর চেষ্টার পাশাপাশি পাচার প্রতিরোধে জোর দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন ড. ইফতেখারুজ্জামান।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















