ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেনের পরিবারের অবৈধ সম্পদ অর্জনের অনুসন্ধান দুদক শুরু করলেও দীর্ঘ দেড় বছরেও এ তদন্তকাজ শেষ হয়নি। ফলে এ নিয়ে সংশ্লিষ্ট মহলে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জানা যায়, প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ক্ষমতার অপব্যবহার ও বিভিন্ন অনিয়ম-দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে দুদকের প্রাথমিক তদন্তে প্রতীয়মান হয়। এ বিষয়ে অনুসন্ধান করে প্রতিবেদন দাখিলের জন্য দুদকের সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমানকে অনুসন্ধান কর্মকর্তা নিয়োগ করা হয়েছিল।
দায়িত্ব পাওয়ার পরে সহকারী পরিচালক হাফিজুর রহমান অভিযোগটি অনুসন্ধানের প্রয়োজনে অভিযোগসংশ্লিষ্ট রেকর্ডপত্র চেয়ে ব্যাংক, বীমা, জাতীয় রাজস্ব বোর্ড, সিটি করপোরেশন, ভূমি অফিস, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) ৭০টির বেশি সরকারি-বেসরকারি দপ্তরে চিঠি দেন। ২০২৪ সালের ১ ডিসেম্বর তিনি এ চিঠি দেন। চিঠিতে বলা হয়, ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির (ডিপিডিসি) সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও তার গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহার অনিয়ম ও দুর্নীতির মাধ্যমে বিপুল পরিমাণ অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন। অনুসন্ধানের প্রয়োজনে উল্লেখিত দপ্তরে থাকা রেকর্ডপত্র ১০ ডিসেম্বর ২০২৪ ইং তারিখের মধ্যে দুদকে পাঠানোর জন্য অনুরোধ করা হয়।
বেলায়েত হোসেন ও তার গৃহিণী শামসুন নাহারের পাশাপাশি এই দম্পত্তির তিন সন্তান নাভিল হোসেন তামীম, ফারিহা হোসেন মুমু, তাজফিকুর হোসেন তানজিফের নামে কোনো সম্পত্তি আছে কি না- সেটাও জানাতে বলা হয়েছিল ওই চিঠিতে। রহস্যজনক বিষয় হলো, চিঠি ইস্যুর পর ১ বছর ৮মাস পেরিয়ে গেলেও অনুসন্ধানকারী কর্মকর্তা হাফিজুর রহমান এখন পর্যন্ত কমিশনে অনুসন্ধান প্রতিবেদন দাখিল করেননি।
অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, অবৈধ সম্পদের পাহাড় গড়েছেন ডিপিডিসি’র সাবেক প্রধান প্রকৌশলী বেলায়েত হোসেন ও তার গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহার। পিরোজপুর জেলার ভান্ডারিয়া উপজেলার লক্ষ্মীপুর গ্রামে তার বাড়ি।
চট্টগ্রাম ইঞ্জিনিয়ারিং ইউনিভার্সিটি থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেলায়েত হোসেন বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ডে চাকরিতে প্রবেশ করেই আলাদিনের চেরাগ হাতে পেয়ে যান। শত শত কোটি টাকা কামিয়ে সর্বশেষ ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি-ডিপিডিসি’র প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে অবসর নেন। সম্পদের তথ্য গোপন করে রাজস্ব ফাঁকি দেয়াসহ জালিয়াতির আশ্রয় নিয়েছেন স্বামী-স্ত্রী আয়কর রিটার্ন দাখিলে। পরবর্তীতে অনুসন্ধানে যা ফাঁস হয়ে যায়।
বেলায়েত হোসেনের অবৈধ সম্পদের আংশিক বিবরণ
বেলায়েত হোসেনের নামে ঢাকার অভিজাত এলাকা ধানমন্ডিতে একই ভবনের শা শা বাড়ি রোড নম্বর ৩/এ বাড়ি নম্বর-৫৬ পাশাপাশি রয়েছে ১৮০০ বর্গ ফুটের দুটি বিলাস বহুল ফ্ল্যাট (৩/এ/২ ও ৩/বি) আয়কর রিটার্নে যার মূল্য দেখিয়েছেন চুরানব্বই লক্ষ আঠারো হাজার ষাট টাকা। প্রকৃতপক্ষে ফ্ল্যাট দুটির বাজার মূল্য কমপক্ষে সাড়ে চার কোটি টাকা। অনুরূপভাবে খিলগাঁও থানা উলন মৌজার ০৮২৫ অযুতাংশের অর্ধেক ৪১২.৫ অযুতাংশ যার মূল্য দেখিয়েছেন দুই লক্ষ ত্রিশ হাজার টাকা। অথচ এর বাজার মূল্য প্রায় কোটি টাকা। মৌজা উলন, থানা খিলগাঁও, ঢাকা ঠিকানায় ২.৮ কাঠা নাল জমির মূল্য দেখিয়েছেন ছয় লক্ষ বাহাত্তর হাজার টাকা। প্রকৃতপক্ষে যার বাজার মূল্য এক কোটি পঁচিশ লাখ টাকা। আয়কর রিটার্নে উল্লেখ করেননি এমন অনেক সম্পদও রয়েছে। ঢাকাসহ আফতাব নগরে রয়েছে ৫ কাঠা ও ১০ কাঠার দুটি প্লট। ঢাকার ডেমরা, আশুলিয়া, কেরানীগঞ্জ এবং গাজীপুরে রয়েছে নিকট আত্মীয়-স্বজনের নামে কেনা কয়েক বিঘা জমি, ব্যাংকে গচ্ছিত রয়েছে কোটি কোটি টাকা, তার মধ্যে সঞ্চয়পত্রই রয়েছে কোটি টাকার। ঢাকা মেট্রো গ ২৬-৫৪৮৩ এক্স করোলা একটি দামি গাড়ি। নিকট স্বজনদেরকে দিয়ে করাচ্ছেন বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য। শত শত কোটি টাকার মালিক হওয়া সত্ত্বেও আয়কর রিটার্নে বেলায়েত হোসেন দেখিয়েছেন মাত্র ১,৯১,৪৩,৮০৪ (এক কোটি একানব্বই লাখ তেতাল্লিশ হাজার আটশত চার) টাকা।
বেলায়েত হোসেনের গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের সম্পদের আংশিক বিবরণ
গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামে কিনেছেন একাধিক জমি, স্ত্রীর নামে বিভিন্ন ব্যাংকে রেখেছেন কয়েক লক্ষ টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র। সাধারণ চিকিৎসার জন্যও বেলায়েত হোসেন সিঙ্গাপুর ও ভারতের ব্যয়বহুল হাসপাতালে যান। একমাত্র কন্যা ফারিয়া হোসেন মুমু এবং স্ত্রীর নামে রয়েছে তিনশ’ ভরি স্বর্ণালঙ্কার। তিনি ও তার পরিবার ব্যবহার করেন দুটি গাড়ি। একটি তার নিজের নামে ঢাকা মেট্রো গ ২৬-৫৪৮৩ এক্স করোলা বিআরটিএ রেজিস্ট্রেশন করা থাকলেও, অন্য গাড়িটি ঢাকা গ ১৯-৪৮৩৮ এক্স করোলা গৃহিণী স্ত্রী শামসুন নাহারের নামে ক্রয় করে বিআরটিএ-তে রেজিস্ট্রেশন করে পরবর্তীতে আমেরিকা প্রবাসী আপন চাচা শ্বশুর মো. ইয়াকুব আলী শরিফ এর ছেলে বেলায়েত হোসেনের চাচাতো শ্যালক রুবায়েত শরিফের নামে রেজিস্ট্রেশন করিয়ে বেলায়েত হোসেন ও তার পরিবারের সদস্যরা গাড়িটি ব্যবহার করেন। সুযোগ সন্ধানী অর্থ লোভী দুর্নীতিবাজ বেলায়েত হোসেন চাকরি জীবনে যখন যে সরকার ক্ষমতায় ছিলেন তার একনিষ্ঠ সমর্থক হয়ে বাগিয়ে নিয়েছেন লোভনীয় পদ, দু’হাতে কামিয়েছেন টাকা, গড়েছেন সম্পদের পাহাড়। আয়কর রিটার্ন দাখিলে বেলায়েত হোসেন তার সম্পদ ও অর্থের যে পরিমাণ দেখিয়েছেন প্রকৃতপক্ষে তার রয়েছে কয়েকশত গুণ বেশি। বেলায়েত হোসেনের গৃহিণী স্ত্রী এবং স্বামীর আয়ের উপর নির্ভরশীল শামসুন নাহারের দৃশ্যমান কোনো আয় না থাকলেও তার রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ। তিনিও স্বামীর মতো আয়কর রিটার্নে নিয়েছেন জালিয়াতির আশ্রয়। আয়কর রিটার্নে তার সম্পদ ও অর্থের পরিমাণ দেখানো হয়েছে প্রায় ঊনষাট লক্ষ টাকা মাত্র, যদিও প্রকৃতপক্ষে তার নামে রয়েছে কয়েক কোটি টাকার সম্পদ, অথচ তিনি গৃহিণী। শামসুন নাহারের নামে ৪৪/এ হাজি পাড়ায় এবং হাজি লেন রামপুরায় রয়েছে ২ কোটি টাকার জমি। বিভিন্ন ব্যাংকে নিজের নামে, পুত্রের নামে ও নিকট আত্মীয়দের নামে রেখেছেন প্রায় পাঁচ কোটি টাকার এফডিআর ও সঞ্চয়পত্র। বেলায়েত হোসেন ও শামসুন নাহার দম্পতির বিরুদ্ধে রয়েছে মানি লন্ডারিংয়ের অভিযোগও।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























