এনআরবি ব্যাংক পিএলসির স্বতন্ত্র পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরীর নিয়োগ এবং ব্যাংকটির অভ্যন্তরীণ সুশাসন নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছেন একদল কর্মকর্তা-কর্মচারী। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) চেয়ারম্যানের কাছে পৃথক আবেদন করেছেন তারা। একই সঙ্গে ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের কাছেও চিঠি দিয়ে করপোরেট সুশাসন, স্বতন্ত্র পরিচালকের ভূমিকা এবং ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন সিদ্ধান্ত পর্যালোচনার দাবি জানানো হয়েছে।
গত ৩ আগস্ট ব্যাংকের কর্মকর্তারা বিভিন্ন অভিযোগ ও উদ্বেগ তুলে ধরেন। তাদের দাবি, ব্যাংকের বর্তমান পরিচালনা ও ব্যবস্থাপনায় কিছু সিদ্ধান্ত এবং ব্যক্তির ভূমিকা করপোরেট সুশাসন ও স্বচ্ছতার প্রশ্ন তৈরি করছে।
চিঠিতে মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরীর বিরুদ্ধে দুদকের করা একটি মামলার বিষয়ও উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, গত ৮ জানুয়ারি মার্কেন্টাইল ব্যাংক পিএলসি-সংশ্লিষ্ট প্রায় ৫০৭ কোটি ৫১ লাখ টাকার ঋণ জালিয়াতির অভিযোগে দুদক ১৩ জনের বিরুদ্ধে মামলা করে। মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী।
দুদকের এজাহারে যে সময়ের ঘটনা উল্লেখ করা হয়েছে, তখন কামরুল ইসলাম চৌধুরী মার্কেন্টাইল ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। পরবর্তী সময়ে গত বছরের মার্চে বাংলাদেশ ব্যাংকের এক আদেশে তিনি এনআরবি ব্যাংকে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে যোগ দেন।
দুদকের মামলাটি দণ্ডবিধির ৪০৯/৪২০/১০৯ ধারা, দুর্নীতি প্রতিরোধ আইন, ১৯৪৭-এর ৫(২) ধারা এবং মানি লন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ধারায় করা হয়েছে।
মামলার প্রধান আসামিদের মধ্যে রয়েছেন ওরিয়ন গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ ওবায়দুল করিম, গ্রুপটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও সালমান ওবায়দুল করিম, মার্কেন্টাইল ব্যাংকের সাবেক ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিইও মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী, ব্যাংকের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক মতিউল হাসান, সাবেক উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) ও শাখা ব্যবস্থাপক গাউস-উল-ওয়ারা মোর্তজা, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ঋণ প্রদান দায়িত্বপ্রাপ্ত প্রতাপ কুমার দেশমুখ, সাবেক ভাইস প্রেসিডেন্ট ও ম্যানেজার (অপারেশনস) মো. আলীউল্লাহ, সাবেক ও বর্তমান ঋণ দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. আব্দুল কাদের, মো. বাবর আলী মোল্লা, মো. ইকরামুল ইসলাম খান, মো. আব্দুল হালিম এবং মো. আতিকুর রহমান।
মামলার অভিযোগ অনুযায়ী, পরস্পরের যোগসাজশে আসামিরা পর্যাপ্ত জামানত ছাড়াই ঋণ অনুমোদন ও ঋণ জালিয়াতি করেছেন। দুদকের তদন্তে আরও বলা হয়, ব্যাংকিং আইন লঙ্ঘন করে ব্যাংকের অফশোর ব্যাংকিং ইউনিট থেকে নেওয়া দুটি বৈদেশিক মুদ্রার মেয়াদি ঋণ দেশীয় ব্যাংকিং ইউনিটের আওতায় এনে স্থানীয় মুদ্রায় দুটি নতুন মেয়াদি ঋণে রূপান্তর করা হয়। পরে একটি শ্রেণিকৃত ঋণের দায় নিষ্পত্তির অজুহাতে নতুন একটি ঋণ সৃষ্টি করা হয় এবং ঋণের মেয়াদ আরও সাত বছর বাড়ানো হয়। দুদকের অভিযোগে এটিকে গ্রাহককে অন্যায্য সুবিধা দেওয়ার সুযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মকর্তাদের ভাষ্য, স্বতন্ত্র পরিচালক পদটি ব্যাংকের সবচেয়ে আস্থাভিত্তিক দায়িত্বগুলোর একটি। তাই ব্যাংকিং জালিয়াতি, ক্ষমতার অপব্যবহার, অর্থ পাচার ও বড় ধরনের আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ খতিয়ে দেখে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নরের কাছে দেওয়া আবেদনে কামরুল ইসলাম চৌধুরীর এনআরবি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে নিয়োগ অবিলম্বে পর্যালোচনার অনুরোধ করা হয়েছে। একই সঙ্গে তাঁর নিয়োগ তফসিলি ব্যাংকের পরিচালকদের জন্য নির্ধারিত মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না, তা যাচাই এবং পর্যালোচনা শেষ না হওয়া পর্যন্ত ব্যাংকের সুশাসন ও সুনাম রক্ষায় প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকের পরিচালনা, নিয়োগ ও নির্বাহী সিদ্ধান্তে হস্তক্ষেপের অভিযোগ স্বাধীনভাবে তদন্ত এবং করপোরেট সুশাসন বা নিয়ন্ত্রক নির্দেশিকা লঙ্ঘিত হয়েছে কি না, তা পরীক্ষা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে এনআরবি ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক কামরুল ইসলাম চৌধুরীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন।
দুদক চেয়ারম্যানের কাছে দেওয়া আবেদনে বিচারাধীন মামলার তদন্ত সম্পূর্ণ স্বাধীনতা, নিরপেক্ষতা ও স্বচ্ছতার সঙ্গে চালিয়ে যাওয়ার অনুরোধ জানানো হয়েছে। কোনো ধরনের বাহ্যিক প্রভাব বা অনৈতিক হস্তক্ষেপ যাতে তদন্তকে প্রভাবিত করতে না পারে, সে বিষয়েও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার কথা বলা হয়েছে।
চিঠিতে এনআরবি ব্যাংকের আরেক সাবেক স্বতন্ত্র পরিচালক এ কে এম মিজানুর রহমান, এফসিএর প্রসঙ্গও তুলে ধরা হয়েছে। আবেদনকারীরা দাবি করেছেন, গণমাধ্যমে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী তিনি ইনস্টিটিউট অব চার্টার্ড অ্যাকাউন্ট্যান্টস অব বাংলাদেশ (আইসিএবি)-এর শৃঙ্খলামূলক ব্যবস্থার মুখোমুখি হয়েছিলেন। অনৈতিক আচরণ ও ব্যাংকের কার্যক্রমে হস্তক্ষেপের অভিযোগের পর তিনি পদত্যাগ করেন বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
আবেদনকারীদের মতে, এ ধরনের ঘটনা পুনরাবৃত্তি হলে নিয়ন্ত্রক তত্ত্বাবধানে পুনর্গঠিত ব্যাংকগুলোতে স্বতন্ত্র পরিচালক নিয়োগের প্রক্রিয়া নিয়ে অংশীজনদের মধ্যে উদ্বেগ আরও বাড়তে পারে।
এনআরবি ব্যাংকের চেয়ারম্যান ও পরিচালনা পর্ষদের কাছে দেওয়া চিঠিতে জুলাই বিপ্লব-পরবর্তী পর্ষদ পুনর্গঠনের পর কর্মীদের মধ্যে তৈরি হওয়া জবাবদিহিতা, স্বচ্ছতা ও মেধাভিত্তিক মূল্যায়নের প্রত্যাশা পূরণ হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বরং পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনা কাঠামোর সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত কিছু ব্যক্তি আরও প্রভাবশালী হয়ে উঠেছেন বলে দাবি করেছেন আবেদনকারীরা।
চিঠিতে বিশেষভাবে দুজনের ভূমিকা নিয়ে উদ্বেগ জানানো হয়েছে। তারা হলেন—ব্যাংকের স্বতন্ত্র পরিচালক মো. কামরুল ইসলাম চৌধুরী এবং অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চিফ অপারেটিং অফিসার (সিওও) আনোয়ার উদ্দিন।
কামরুল ইসলাম চৌধুরীকে নিয়ে চিঠিতে বলা হয়েছে, দুদকের মামলায় তাঁর নাম থাকার পরও স্বতন্ত্র পরিচালক পদে বহাল থাকা উপযুক্ততার মানদণ্ড পূরণ করে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। একই সঙ্গে ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ, সাংগঠনিক সংস্কৃতি ও মানবসম্পদ ব্যবস্থাপনায় তাঁর ভূমিকা নিয়েও অভিযোগ তোলা হয়েছে।
কর্মীদের অভিযোগ, নিয়োগ, পদোন্নতি, কর্মীদের পদায়ন, বদলি এবং অন্যান্য নির্বাহী ও প্রশাসনিক বিষয়ে কামরুল ইসলাম চৌধুরীর সম্পৃক্ততা বা প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ রয়েছে, যা একজন স্বতন্ত্র পরিচালকের দায়িত্বের সীমারেখা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করছে।
অন্যদিকে, অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সিওও আনোয়ার উদ্দিনের বিরুদ্ধেও একাধিক অভিযোগ আনা হয়েছে। চিঠিতে বলা হয়, তাঁকে এর আগে স্বতন্ত্র পরিচালক হিসেবে বিবেচনা করা হলেও নিয়ন্ত্রক অনুমোদন না পাওয়ায় উপব্যবস্থাপনা পরিচালক (ডিএমডি) হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। আগামী মার্চ ২০২৭ সালে তাঁর অবসরের সময় নির্ধারিত থাকা সত্ত্বেও সম্প্রতি তাঁকে অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে বলে চিঠিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
কর্মীদের অভিযোগ, এই পদোন্নতির ক্ষেত্রে কামরুল ইসলাম সরাসরি প্রভাব বিস্তার করেছেন এবং পরিচালনা পর্ষদ ও ব্যবস্থাপনার ওপর চাপ প্রয়োগ করেছেন।
চিঠিতে আরও বলা হয়েছে, ২০২৬ সালের শুরুতে আনোয়ার উদ্দিন ডিএমডি থাকাকালে তাঁর মাসিক বেতন ১ লাখ টাকা বাড়ানো হয়। ওই বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রেও কামরুল ইসলামের সরাসরি হস্তক্ষেপ বা প্রভাব ছিল বলে অভিযোগ করেছেন কর্মকর্তারা।
আবেদনকারীদের আরও অভিযোগ, আনোয়ার উদ্দিন ব্যাংকের বিভিন্ন বিভাগ ও কর্মীগোষ্ঠীর মধ্যে অভ্যন্তরীণ করপোরেট রাজনীতি, দ্বন্দ্ব ও বিভাজন বাড়াতে ভূমিকা রেখেছেন। এতে ব্যাংকের পেশাগত সংস্কৃতি ও সুশাসনের পরিবেশ দুর্বল হচ্ছে বলে দাবি তাদের।
চিঠিতে আরও অভিযোগ করা হয়েছে, কামরুল ইসলাম চৌধুরী ব্যাংকে যোগদানের পর প্রধান কার্যালয় থেকে ৭৫ জনের বেশি কর্মীকে বিভিন্ন শাখায় বদলি করা হয়েছে। এসব বদলির পেছনে আনোয়ার উদ্দিনের প্রভাব ছিল বলে দাবি করা হয়েছে।
এ ছাড়া ব্যাংকের ডিএমডি ও প্রধান অর্থ কর্মকর্তা (সিএফও) শাহীন মওলাদারের পদত্যাগের পেছনেও কামরুল ইসলাম ও আনোয়ার উদ্দিনের প্রভাব ও ষড়যন্ত্র ছিল বলে চিঠিতে অভিযোগ করা হয়েছে।
জানতে চাওয়া হলে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্বাহী পরিচালক ও মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, এসব বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক যাচাই-বাছাই করে ব্যবস্থা গ্রহণ করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















