সরকারি সম্পদ লুটপাট, গাড়ির টায়ার ও ব্যাটারি গোপনে বিক্রি, ক্যান্টিনের ভাড়া আত্মসাৎ, বদলি-নিয়োগে অবৈধ প্রভাব বিস্তার এবং কর্মচারীদের ওপর ভয়ভীতি ও দমন-পীড়নএমন একের পর এক ভয়ংকর অভিযোগে এখন তোলপাড় মৎস্য অধিদপ্তর। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন গাড়িচালক মোসলেম উদ্দিন। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ভুক্তভোগী এমন অনেকে জানান, দপ্তরের একটি প্রভাবশালী কর্মকর্তাদের ছত্রছায়ায় দীর্ঘদিন ধরে এসব অনিয়ম চালিয়ে আসছেন তিনি। কেউ প্রশ্ন তুললেই নেমে আসে বদলি, মানসিক নির্যাতন ও ভয়ভীতির খড়্গ এমন অভিযোগে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়েছে মৎস্য অধিদপ্তরে। অভিযোগ আরও গুরুতর হয় যখন তার বিরুদ্ধে রাজনৈতিক প্রভাব ব্যবহারের অভিযোগ সামনে আসে। স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার পরিচয় দিয়ে এলাকায় প্রভাব বিস্তার, সাধারণ মানুষকে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সরকারি চাকরির পরিচয়ের বাইরে রাজনৈতিক ক্ষমতার প্রভাব দেখানোর অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। গাড়িচালক মোসলেম উদ্দিন নিজ এলাকায় নিজেকে সহকারী পরিচালক হিসেবে পরিচয় দেন।এসব কর্মকাণ্ডে অতিষ্ঠ হয়ে মৎস্য অধিদপ্তরের গাড়িচালকদের মধ্যে অসন্তোষ ছড়িয়ে পড়ে। এক পর্যায়ে মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে অনাস্থা জানিয়ে মৎস অধিদপ্তরের সকল র্কমচারীর গণস্বাক্ষর সংগ্রহ করা হয়। পরবর্তীতে তার নেতৃত্বে অবৈধভাবে গঠিত কমিটির সকল সদস্য পদত্যাগ করতে বাধ্য হয়।
সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলেও মৎস্য অধিদপ্তরের সরকারি গাড়িচালক সমিতির নেতৃত্বকে ঘিরে রাজনৈতিক প্রভাবের অভিযোগ ছিল। ২০১৪-২০২২ মেয়াদে মোহাম্মদ আলী হাওলাদারের নেতৃত্বে সমিতির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ওই সময়ে নিজেকে বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।অভিযোগকারীর দাবি, দীর্ঘ সময় ধরে সরকারি কর্মচারী সংগঠনের নেতৃত্বে রাজনৈতিক পরিচয়ের ব্যবহার সংগঠনের স্বাভাবিক কার্যক্রমকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর মৎস্য অধিদপ্তরে বদলি হয়ে আসেন গাড়িচালক মো. মোসলেম উদ্দিন। অভিযোগ রয়েছে, দপ্তরে যোগদানের পর কোনো নির্বাচন ছাড়াই গাড়িচালক সমিতির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব নেন তিনি। নির্বাচনী প্রক্রিয়া ছাড়া কীভাবে তিনি সংগঠনের নেতৃত্বে এলেন, কে তাকে সভাপতির দায়িত্ব দিলেন তা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।তার অপকর্মের বিরুদ্ধে কোন গাড়ি চালক কথা বললেই বদলি, মানসিক নির্যাতন ও ভয়ভীতি এমন কি প্রাননাশের হুমকি দিয়ে থামিয়ে দেওয়া হয়। বছরের পর বছর মোসলেউদ্দিনের দ্বারা প্রশাসনিক দমন, মানসিক চাপ এবং পেশাগত নির্যাতনে যখন সবাই অতিষ্ঠ তখন অধিদপ্তরের ৩৯ জন ড্রাইভার মোসলেম উদ্দিনের বিরুদ্ধে গণস্বাক্ষর দিয়ে তার পদত্যাগ চেয়ে র্নিবাচনের দাবি তোলেন। গণস্বাক্ষরের পর পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ হয়ে উঠে। গণস্বাক্ষর প্রদানকারী ড্রাইভারদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, তারা প্রত্যেকেই কোনো না কোনোভাবে হয়রানির শিকার হয়েছেন।অভিযোগকারীদের দাবি, গণস্বাক্ষর দেওয়ার পর থেকেই তাদের বিরুদ্ধে বদলির হুমকি, প্রশাসনিক চাপ, চাকরি হারানোর ভয় এবং সরাসরি ভয়ভীতি প্রদর্শন শুরু হয়েছে।এতে তাদের পেশাগত নিরাপত্তা এখন চরম ঝুঁকির মুখে।তারা আরও বলেন, দপ্তরের ভেতরে দীর্ঘদিন ধরে চলা এই অন্ধকার চক্র ভাঙতে তারা নির্বাচন বা প্রতিনিধিত্বমূলক ব্যবস্থা চান। তথ্যে উঠে আসে, মৎস্য অধিদপ্তরের ভেতরে মোসলেম উদ্দিনকে ঘিরে একটি শক্তিশালী লুটপাট চক্র গড়ে উঠেছে। এই চক্রের মাধ্যমে সরকারি গাড়ির টায়ার ও ব্যাটারি গোপনে বিক্রির টাকা আত্মস্যাতের অভিযোগ আছে। এখানেই শেষ নয় আরো চাঞ্চল্যকর বিষয় হলো দপ্তরের গাড়িচালকদের ক্যান্টিনের মাসিক ভাড়া। প্রতি মাসে প্রায় ৫ হাজার টাকা ভাড়া আদায় করা হলেও সেই অর্থের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই। এই টাকা কোথায় যাচ্ছে, কার হাতে যাচ্ছে এবং সরকারি কোষাগারে জমা হচ্ছে কিনা তা জানতে চাইলেই সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার হুমকি দেওয়া হয়। ফলে এই সামান্য ভাড়ার বিষয়টিও এখন দপ্তরের ভেতরে এক ভয়ংকর স্পর্শকাতর ইস্যুতে পরিণত হয়েছে।দপ্তরের যেকোনো আর্থিক অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তুললেই তাকে টার্গেট করে শুরু হয় নিপীরন যা পরিস্থিতিকে আরও ভয়াবহ করে তুলেছে। একই ব্যক্তিকে বারবার বিভিন্ন স্থানে বদলি করার ঘটনা যেন অভিযোগ দমনের এক সুক্ষ কৌশল? ভুক্তভোগীরা বলছেন, ক্যান্টিন ভাড়ার প্রকৃত সত্য উদঘাটনে গত কয়েক বছরের রশিদ, আদায় রেজিস্টার, ব্যাংক জমার তথ্য ও অনুমোদন নথি খতিয়ে দেখা জরুরি।সরকারি গাড়ির টায়ার ও ব্যাটারি গোপনে বিক্রির অভিযোগ এখন সবচেয়ে আলোচিত বিষয়। এসব মালামালের কোনো স্বচ্ছ হিসাব নেই।নিলামের মাধ্যমে বিক্রি হলে নথিপত্র, অনুমোদন, বিক্রয়মূল্য ও সরকারি কোষাগারে জমার প্রমাণ প্রকাশের দাবি করেন তারা। আর যদি নিলাম ছাড়া বিক্রি হয়ে থাকে তা সরাসরি সরকারি সম্পদ লুটপাট হিসেবে বিবেচিত হবে বলে মনে করেূন সংশ্লিষ্টরা।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন,উপরস্থ কর্মকর্তারা জড়িত না থাকলে এত অনিয়ম আর দুর্নীতি একজন সাধারণ ড্রাইভার এর পক্ষে আদৌ করা সম্ভব নয়।এই ভয়াবহ দুর্নীতি আর সাধারণ কর্মচারীদের নির্যাতনের পুরো চিত্র উন্মোচন করতে হলে ক্যান্টিন ভাড়ার হিসাব, টায়ার-ব্যাটারি ক্রয়-বিক্রয়ের নথি, গাড়ির লগবুক, স্টক রেজিস্টার, মেরামত বিল-ভাউচার, বদলি-নিয়োগের ফাইল এবং টেন্ডার সংক্রান্ত সব কাগজপত্র একসঙ্গে খতিয়ে দেখা জরুরি।
তবে এ সকল অভিযোগ নিয়ে মোসলেম উদ্দিনের সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, আমার বিরুদ্ধে আনা সকল অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট এবং ভিত্তিহীন। আমাকে ও আমার পরিবারের সম্মানহানি করার জন্যই কিছু কুচক্রি মহল এই অভিযোগ দায়ের করেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























