ঢাকা ০২:৩১ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ০৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৯ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
আহমেদ বাওয়ানী একাডেমিতে অনিয়মের অভিযোগ পরিচালক আল ফাত্তাহকে ঘিরে ৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ পূর্তে প্যারাডাইমের ফের দাপট, গুরুত্বপূর্ণ কাজ যাচ্ছে একই প্রতিষ্ঠানের ঝুড়িতে আয়কর নথি জালিয়াতির অভিযোগে সহকারী কর কমিশনার মিতুর পদোন্নতি ৮ বছর স্থগিত গাইবান্ধায় ৭ লাখ টাকার প্রকল্পে পুকুরচুরি: চার মাসেই নদীতে বিলীন জেলা পরিষদের কাঠের সেতু ২ লাখ ৬০ হাজার টাকা নিয়ে নিখোঁজ ভুট্টু ৭ দিনেও মেলেনি সন্ধান সৈয়দপুরে ভ্যান হারানো কিশোর রেজওয়ানকে নতুন ভ্যান উপহার দিল উপজেলা প্রশাসন ভিসা-টিকিট ঠিক থাকলেও বিমানের কাউন্টারে ‘টাকার খেলা’ মনোহরগঞ্জে মাছের পোনা অবমুক্ত করলেন চেয়ারম্যান প্রার্থী জসিম উদ্দিন দেশ অস্থিতিশীল করতে কেউ কেউ গুজব রটাচ্ছে : প্রধানমন্ত্রী
রেলের মেগা প্রকল্পে অনিয়মের পাহাড়

পরিচালক আল ফাত্তাহকে ঘিরে ৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ

  • নিজস্ব প্রতিবেদক
  • আপডেট সময় ০২:১১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬
  • ৫০৩ বার পড়া হয়েছে

বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং সিডিআরপি (CDRP)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, চুক্তি বাস্তবায়ন ও অর্থ পরিশোধে অনিয়মের পাশাপাশি রেলওয়ের সরকারি জমি দখলেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের কারণে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও অডিট আপত্তিতে উঠে এসেছে।

অভিযোগের তীর রেলওয়ের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দিকে। বিশেষ করে যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

যমুনা রেলসেতুতে ৩৪ অডিট আপত্তি

যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পে অডিট বিভাগের বিশেষ নিরীক্ষায় মোট ৩৪টি গুরুতর আপত্তি তোলা হয়েছে। এসব আপত্তিতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, চুক্তির শর্ত ভেঙে কাজের পরিমাণ কমিয়ে এবং ইউনিট রেট বাড়িয়ে ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা বলে অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চহারে চুক্তি করে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত না করেই ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ড্রয়িং, ডিজাইন ও বিওকিউ (BOQ) ছাড়াই ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় এবং ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামে অস্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে আরও ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রকল্প এলাকায় ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল গাড়িগুলোর (Luxury Vehicles) কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের এসব অনিয়মের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ বর্তমানে দুদক অনুসন্ধান করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কালুরঘাটে যোগ্যতা না মেনেই দরপত্র মূল্যায়নের অভিযোগ

চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য দরপত্রে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে ‘বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘স্যামবো-জেভি’ (SAMBO-led JV) নামের প্রতিষ্ঠানটি এমন একজন ব্যক্তির সিভি জমা দেয়, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘বিএসসি ইন এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’।

অভিযোগকারীদের দাবি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) এবং দাতা সংস্থা ইডিসিএফের (EDCF) নীতিমালা অনুযায়ী দরপত্র জমা দেওয়ার পর কোনো দরদাতার মৌলিক যোগ্যতার (Material Qualification) ঘাটতি সংশোধনের সুযোগ নেই।

তবে নথিপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট একটি গোপনীয় চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দরদাতার কাছে জানতে চান, কৃষি প্রকৌশলের ওই ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না।

এ ঘটনায় একজন দরদাতা সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, কৃষি প্রকৌশল ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এক নয় এবং দরপত্রে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক যোগ্যতার পরিবর্তে অন্য একটি ডিগ্রিকে সমমান হিসেবে গ্রহণের চেষ্টা নিয়মবহির্ভূত।

সিডিআরপিতে ‘দ্বৈত নীতি’র অভিযোগ

সিডিআরপি (CDRP) প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও দ্বৈত নীতির অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ম্যাক্স (MAX) নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের আর্থিক সক্ষমতায় ঘাটতি থাকার পরও তাদের কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের ITB, BDS এবং Section 3 অনুযায়ী একাধিক কন্ট্রাক্ট মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ‘least-cost combination’ পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা। অর্থাৎ, কোনো দরদাতা একাধিক কন্ট্রাক্টের জন্য দর দিলে এবং একসঙ্গে একাধিক কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড়ের প্রস্তাব দিলে, কোন কন্ট্রাক্ট বা কন্ট্রাক্টের সমন্বয়ে সরকারের সামগ্রিক ব্যয় সবচেয়ে কম হবে তা বিবেচনা করার কথা কর্তৃপক্ষের।

তবে একাধিক কন্ট্রাক্টে কোনো প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন বা সফল দরদাতা হলেই তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ দেওয়া যায় না। একাধিক কাজ একসঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটির পর্যাপ্ত আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করার নিয়ম রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বিডারের গড় বার্ষিক নির্মাণ টার্নওভার, আর্থিক সক্ষমতা বা তহবিল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং জনবলের সম্মিলিত সক্ষমতা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

প্রকল্পের ITB 37.4 অনুযায়ী, WD-1 ও WD-2—এই দুটি কন্ট্রাক্ট একসঙ্গে পেতে হলে দরদাতার সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার (AACT) ২২০ মিলিয়ন ডলার থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, ম্যাক্সের টার্নওভার ২০৮.১৭ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে টার্নওভার কম থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে দুটি কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদের সামান্য ঘাটতিতে বাদ, ম্যাক্সের ক্ষেত্রে ছাড়?

সংশ্লিষ্ট নথিতে আরও দেখা যায়, অন্যান্য দরদাতার ক্ষেত্রে Completion Certificate, SIL-4/User Certificate অথবা Test Report-এর মতো বিষয়ে তুলনামূলক ছোটখাটো ঘাটতির কারণে তাদের টেকনিক্যালি ‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ম্যাক্সের ক্ষেত্রে মৌলিক ও বাধ্যতামূলক যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তাদের যোগ্য বিবেচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খসড়া নথিতে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে ম্যাক্সকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা না থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানকে একাধিক বড় প্রকল্পের কাজ দেওয়া হলে প্রকল্পের নির্মাণমান, বাস্তবায়নকাল এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রেলের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান

মেগা প্রকল্পের বাইরে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রেলওয়ের জমির সীমানা রক্ষা ও দখল প্রতিরোধে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের (DEN) গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা একজন জেলা প্রশাসকের (DC) সমপর্যায়ের বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় রেলওয়ের শতকোটি টাকা মূল্যের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান নির্মাণ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রকৌশলী/১-এর ওপর রেলওয়ের ভূমি ও সীমানা রক্ষা এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধের দায়িত্ব থাকলেও তিনি তা যথাযথভাবে পালন করেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলওয়ের বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা দীর্ঘদিনেও এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং রেল কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে রেলের জমিতে এই বিশাল অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এডিজি আই আল ফাত্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এসব অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের এডিজি-১ আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের সঙ্গে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার বক্তব্য জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য বা বক্তব্য দেননি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

প্রতিমন্ত্রী: সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান হাবিবের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়।

তিনি বলেন, রেলওয়ের দুর্নীতির বিষয়টি সরকারও জানে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে এলে তা যাচাই করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি

রেলওয়ের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে একই প্রকল্পে অডিট আপত্তি, দরপত্রের যোগ্যতা, ঠিকাদারের আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারি অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিই নয়, প্রকল্পের গুণগত মান ও সময়মতো বাস্তবায়নও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই অডিট আপত্তিগুলোর নিষ্পত্তি, দরপত্র মূল্যায়নের নথি যাচাই, ঠিকাদারদের সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন এবং রেলওয়ের জমি দখলের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

রেলওয়ের মেগা প্রকল্প ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

আহমেদ বাওয়ানী একাডেমিতে অনিয়মের অভিযোগ

রেলের মেগা প্রকল্পে অনিয়মের পাহাড়

পরিচালক আল ফাত্তাহকে ঘিরে ৩ হাজার কোটি টাকার অভিযোগ

আপডেট সময় ০২:১১:৩৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশ রেলওয়ের অবকাঠামো উন্নয়ন ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় গুরুতর অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। যমুনা রেলসেতু, কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু এবং সিডিআরপি (CDRP)-এর মতো গুরুত্বপূর্ণ মেগা প্রকল্পে দরপত্র মূল্যায়ন, চুক্তি বাস্তবায়ন ও অর্থ পরিশোধে অনিয়মের পাশাপাশি রেলওয়ের সরকারি জমি দখলেরও অভিযোগ পাওয়া গেছে। এসব অনিয়মের কারণে সরকারের কয়েক হাজার কোটি টাকা আর্থিক ক্ষতির আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বলে সংশ্লিষ্ট নথি ও অডিট আপত্তিতে উঠে এসেছে।

অভিযোগের তীর রেলওয়ের কয়েকজন প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং সংশ্লিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দিকে। বিশেষ করে যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের প্রকল্প পরিচালক (পিডি) আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের অভিযোগ বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) অনুসন্ধানের আওতায় রয়েছে বলে জানা গেছে।

যমুনা রেলসেতুতে ৩৪ অডিট আপত্তি

যমুনা রেলসেতু নির্মাণ প্রকল্পে অডিট বিভাগের বিশেষ নিরীক্ষায় মোট ৩৪টি গুরুতর আপত্তি তোলা হয়েছে। এসব আপত্তিতে প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকার অনিয়মের চিত্র উঠে এসেছে।

নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, চুক্তির শর্ত ভেঙে কাজের পরিমাণ কমিয়ে এবং ইউনিট রেট বাড়িয়ে ঠিকাদারকে অনৈতিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে রাষ্ট্রের আর্থিক ক্ষতির পরিমাণ ১ হাজার ৭২৬ কোটি ৫২ লাখ টাকা বলে অডিট আপত্তিতে উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া উচ্চহারে চুক্তি করে ঠিকাদারকে অতিরিক্ত ১ হাজার ২২১ কোটি ৬ লাখ টাকা পরিশোধের অভিযোগও রয়েছে।

এ ছাড়া ব্যবহৃত যন্ত্রপাতির ‘কান্ট্রি অব অরিজিন’ নিশ্চিত না করেই ৪০৫ কোটি ৬৮ লাখ টাকা বিল পরিশোধের অভিযোগ পাওয়া গেছে। ড্রয়িং, ডিজাইন ও বিওকিউ (BOQ) ছাড়াই ১২৭ কোটি ৪৫ লাখ টাকা ব্যয় এবং ক্যাফেটেরিয়া নির্মাণের নামে অস্বাভাবিক ব্যয়ের মাধ্যমে আরও ১১৩ কোটি ৩১ লাখ টাকা ক্ষতির অভিযোগ রয়েছে।

অডিট প্রতিবেদনের আরেকটি উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, প্রকল্প এলাকায় ব্যবহারের জন্য জাপান থেকে আনা বিলাসবহুল গাড়িগুলোর (Luxury Vehicles) কোনো হদিস পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।

যমুনা রেলসেতু প্রকল্পের এসব অনিয়মের বিষয়ে প্রকল্প পরিচালক আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের বিরুদ্ধে ওঠা প্রায় ৩ হাজার কোটি টাকা লুটপাটের অভিযোগ বর্তমানে দুদক অনুসন্ধান করছে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

কালুরঘাটে যোগ্যতা না মেনেই দরপত্র মূল্যায়নের অভিযোগ

চট্টগ্রামের কালুরঘাট রেল-কাম-রোড সেতু প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে।

প্রকল্পের আন্তর্জাতিক ‘টিম লিডার’ পদের জন্য দরপত্রে বাধ্যতামূলক যোগ্যতা হিসেবে ‘বিএসসি ইন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং’ ডিগ্রি নির্ধারণ করা হয়েছিল। কিন্তু ‘স্যামবো-জেভি’ (SAMBO-led JV) নামের প্রতিষ্ঠানটি এমন একজন ব্যক্তির সিভি জমা দেয়, যার শিক্ষাগত যোগ্যতা ‘বিএসসি ইন এগ্রিকালচারাল ইঞ্জিনিয়ারিং’।

অভিযোগকারীদের দাবি, পাবলিক প্রকিউরমেন্ট রুলস (PPR) এবং দাতা সংস্থা ইডিসিএফের (EDCF) নীতিমালা অনুযায়ী দরপত্র জমা দেওয়ার পর কোনো দরদাতার মৌলিক যোগ্যতার (Material Qualification) ঘাটতি সংশোধনের সুযোগ নেই।

তবে নথিপত্র অনুযায়ী, প্রস্তাব মূল্যায়ন কমিটির চেয়ারম্যান আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমান ২০২৬ সালের ৩ আগস্ট একটি গোপনীয় চিঠির মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট দরদাতার কাছে জানতে চান, কৃষি প্রকৌশলের ওই ডিগ্রিকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের সমমান হিসেবে বিবেচনা করা যায় কি না।

এ ঘটনায় একজন দরদাতা সচিবের কাছে লিখিত অভিযোগ করেছেন। অভিযোগে বলা হয়েছে, কৃষি প্রকৌশল ও সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং এক নয় এবং দরপত্রে নির্ধারিত বাধ্যতামূলক যোগ্যতার পরিবর্তে অন্য একটি ডিগ্রিকে সমমান হিসেবে গ্রহণের চেষ্টা নিয়মবহির্ভূত।

সিডিআরপিতে ‘দ্বৈত নীতি’র অভিযোগ

সিডিআরপি (CDRP) প্রকল্পের দরপত্র মূল্যায়নেও দ্বৈত নীতির অভিযোগ উঠেছে। নথিপত্র অনুযায়ী, ম্যাক্স (MAX) নেতৃত্বাধীন কনসোর্টিয়ামের আর্থিক সক্ষমতায় ঘাটতি থাকার পরও তাদের কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

প্রকল্পের ITB, BDS এবং Section 3 অনুযায়ী একাধিক কন্ট্রাক্ট মূল্যায়নের ক্ষেত্রে ‘least-cost combination’ পদ্ধতি অনুসরণ করার কথা। অর্থাৎ, কোনো দরদাতা একাধিক কন্ট্রাক্টের জন্য দর দিলে এবং একসঙ্গে একাধিক কাজ দেওয়ার ক্ষেত্রে ছাড়ের প্রস্তাব দিলে, কোন কন্ট্রাক্ট বা কন্ট্রাক্টের সমন্বয়ে সরকারের সামগ্রিক ব্যয় সবচেয়ে কম হবে তা বিবেচনা করার কথা কর্তৃপক্ষের।

তবে একাধিক কন্ট্রাক্টে কোনো প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন বা সফল দরদাতা হলেই তাকে স্বয়ংক্রিয়ভাবে সব কাজ দেওয়া যায় না। একাধিক কাজ একসঙ্গে বাস্তবায়নের জন্য প্রতিষ্ঠানটির পর্যাপ্ত আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা রয়েছে কি না, সেটিও যাচাই করার নিয়ম রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে বিডারের গড় বার্ষিক নির্মাণ টার্নওভার, আর্থিক সক্ষমতা বা তহবিল, প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং জনবলের সম্মিলিত সক্ষমতা বিবেচনার কথা বলা হয়েছে।

প্রকল্পের ITB 37.4 অনুযায়ী, WD-1 ও WD-2—এই দুটি কন্ট্রাক্ট একসঙ্গে পেতে হলে দরদাতার সম্মিলিত বার্ষিক টার্নওভার (AACT) ২২০ মিলিয়ন ডলার থাকা বাধ্যতামূলক। কিন্তু অভিযোগ অনুযায়ী, ম্যাক্সের টার্নওভার ২০৮.১৭ মিলিয়ন ডলার।

অর্থাৎ নির্ধারিত সক্ষমতার চেয়ে টার্নওভার কম থাকার পরও প্রতিষ্ঠানটিকে দুটি কাজ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

অন্যদের সামান্য ঘাটতিতে বাদ, ম্যাক্সের ক্ষেত্রে ছাড়?

সংশ্লিষ্ট নথিতে আরও দেখা যায়, অন্যান্য দরদাতার ক্ষেত্রে Completion Certificate, SIL-4/User Certificate অথবা Test Report-এর মতো বিষয়ে তুলনামূলক ছোটখাটো ঘাটতির কারণে তাদের টেকনিক্যালি ‘নন-রেসপন্সিভ’ ঘোষণা করা হয়েছে।

অন্যদিকে, ম্যাক্সের ক্ষেত্রে মৌলিক ও বাধ্যতামূলক যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও তাদের যোগ্য বিবেচনা করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

খসড়া নথিতে প্রায় ১৪৬ কোটি টাকা সাশ্রয়ের যুক্তি দেখিয়ে ম্যাক্সকে কাজ দেওয়ার বিষয়ে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংকের (ADB) সম্মতি চাওয়ার প্রস্তাবও অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

সংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, প্রয়োজনীয় আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা না থাকা কোনো প্রতিষ্ঠানকে একাধিক বড় প্রকল্পের কাজ দেওয়া হলে প্রকল্পের নির্মাণমান, বাস্তবায়নকাল এবং ভবিষ্যৎ রক্ষণাবেক্ষণ—সব ক্ষেত্রেই ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

রেলের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান

মেগা প্রকল্পের বাইরে রেলওয়ের ভূমি ব্যবস্থাপনাতেও অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের ‘ওয়ে অ্যান্ড ওয়ার্কস ম্যানুয়াল’-এর ২০৫ নম্বর অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, রেলওয়ের জমির সীমানা রক্ষা ও দখল প্রতিরোধে বিভাগীয় প্রকৌশলীদের (DEN) গুরুত্বপূর্ণ ক্ষমতা ও দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। এ ক্ষেত্রে তাদের ক্ষমতা একজন জেলা প্রশাসকের (DC) সমপর্যায়ের বলেও উল্লেখ করা হয়েছে।

কিন্তু রাজধানীর খিলগাঁও এলাকায় রেলওয়ের শতকোটি টাকা মূল্যের জমিতে ৫৬০টির বেশি স্থায়ী দোকান নির্মাণ করে বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগ অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট বিভাগীয় প্রকৌশলী/১-এর ওপর রেলওয়ের ভূমি ও সীমানা রক্ষা এবং অবৈধ দখল প্রতিরোধের দায়িত্ব থাকলেও তিনি তা যথাযথভাবে পালন করেননি।

স্থানীয়দের অভিযোগ, রেলওয়ের বিপুল ক্ষমতাসম্পন্ন প্রকৌশলী ও কর্মকর্তারা দীর্ঘদিনেও এসব অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদে কার্যকর পদক্ষেপ নেননি। প্রভাবশালী মহলের ছত্রচ্ছায়ায় এবং রেল কর্মকর্তাদের নিয়মিত মাসোহারার বিনিময়ে রেলের জমিতে এই বিশাল অবৈধ বাণিজ্যিক স্থাপনা গড়ে উঠেছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয়রা। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

এডিজি আই আল ফাত্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি

এসব অভিযোগের বিষয়ে রেলওয়ের এডিজি-১ আল ফাত্তাহ মো. মাসুদুর রহমানের সঙ্গে প্রতিবেদকের পক্ষ থেকে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তার বক্তব্য জানতে ফোনে যোগাযোগ করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। পরবর্তীতেও এ বিষয়ে কোনো তথ্য বা বক্তব্য দেননি। ফলে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগের বিষয়ে তার বক্তব্য এই প্রতিবেদনে পাওয়া যায়নি।

প্রতিমন্ত্রী: সুনির্দিষ্ট তথ্য পেলে ব্যবস্থা

সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে রেলপথ মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী হাবিবুর রহমান হাবিবের সঙ্গে প্রতিবেদকের কথা হয়।

তিনি বলেন, রেলওয়ের দুর্নীতির বিষয়টি সরকারও জানে। তবে কোনো নির্দিষ্ট অভিযোগ বা সুনির্দিষ্ট তথ্য আমাদের কাছে এলে তা যাচাই করে অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

প্রতিমন্ত্রী আরও জানান, অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

জবাবদিহি নিশ্চিত করার দাবি

রেলওয়ের মতো রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানের বড় অবকাঠামো প্রকল্পে হাজার কোটি টাকার আর্থিক অনিয়মের অভিযোগ ওঠায় বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে একই প্রকল্পে অডিট আপত্তি, দরপত্রের যোগ্যতা, ঠিকাদারের আর্থিক সক্ষমতা এবং সরকারি অর্থ পরিশোধের ক্ষেত্রে একাধিক প্রশ্ন সামনে আসায় স্বচ্ছ তদন্তের দাবি উঠেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, অভিযোগগুলো সত্য হলে শুধু আর্থিক ক্ষতির বিষয়টিই নয়, প্রকল্পের গুণগত মান ও সময়মতো বাস্তবায়নও হুমকির মুখে পড়তে পারে। তাই অডিট আপত্তিগুলোর নিষ্পত্তি, দরপত্র মূল্যায়নের নথি যাচাই, ঠিকাদারদের সক্ষমতা পুনর্মূল্যায়ন এবং রেলওয়ের জমি দখলের বিষয়ে স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে দায়ীদের চিহ্নিত করা প্রয়োজন।

রেলওয়ের মেগা প্রকল্প ও ভূমি ব্যবস্থাপনায় অনিয়মের অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা।