ঢাকা ০৮:৪৬ অপরাহ্ন, বুধবার, ০২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৮ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
পাঁচ মাস পর দেশের পথে মির্জা আব্বাস ১৫ দিনের মধ্যে বুড়িগঙ্গার তীর থেকে প্লাস্টিক বর্জ্য সরানোর নির্দেশ হাইকোর্টের ভোলায় তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী আন্দালিভ রহমানকে জেলা পুলিশের ফুলেল শুভেচ্ছা ও গার্ড অব অনার ধামইরহাটে ৫৩তম গ্রীষ্মকালীন ক্রীড়া প্রতিযোগিতার সমাপনী ও পুরস্কার বিতরণ বিটিভির লোগো পরিবর্তন নয়; দরকার দায়িত্বশীল গণমাধ্যমে রূপান্তর হাতকড়া পরেই মায়ের জানাজায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ স্বেচ্ছাসেবক লীগের নেতা আজ বিশ্ব নারিকেল দিবস তোর চৌদ্দ গোষ্ঠীকে জেল-হাজতের ভাত খাওয়াব’: কাকে হুমকি দিলেন পলি? ছেলেকে নিয়ে আবেগঘন বার্তা মেসির মায়ের জেন-জিদের মন জয়ে মোদির নতুন কৌশল
মেগা প্রকল্পের নিচে চাপা পড়ছে মহেশখালীর গ্রাম-জীবন!

উন্নয়নের জোয়ারে হারাচ্ছে কৃষিজমি-জলাশয়, অনিশ্চিত জীবিকা

একসময় যেখানে ভোর হতো জেলেদের নৌকার বৈঠার শব্দে, কৃষকের ঘামে সোনালি ধানের মাঠে আর খাল-বিলে ছিল মাছ ধরার ব্যস্ততা-সেই মহেশখালী এখন বদলে যাচ্ছে মেগা প্রকল্পের মহাযজ্ঞে। একের পর এক শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পের বিস্তারে বদলে যাচ্ছে ভূমির ব্যবহার, সংকুচিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। উন্নয়নের নতুন মানচিত্রে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি, কোথাও জলাশয়, কোথাও আবার প্রজন্মের পর প্রজন্মের বসতভিটা ও জীবিকার ঠিকানা।

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীকে ঘিরে সরকারের বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থান, বাড়তে পারে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য দিতে হচ্ছে কাদের? যে জেলে সমুদ্র ও জলাশয়কে জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে ধরে রেখেছেন, যে কৃষক হারাচ্ছেন চাষের জমি, কিংবা যে পরিবারকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে পূর্বপুরুষের বসতভিটা—তাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘড়িভাঙ্গা জেলে পল্লী যেন সেই প্রশ্নেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপন করা মানুষের কাছে জমি বা বসতভিটার বিনিময়ে পাওয়া অর্থ হয়তো সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু অর্থ শেষ হয়ে গেলে জীবিকা চলবে কীভাবে—তার নিশ্চয়তা কতটা? একটি পেশা হারানোর ক্ষতি কি কেবল টাকার অঙ্কে মাপা যায়?

মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশও। পাহাড়, জলাশয়, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ওপর চাপ বাড়ছে। পাহাড় ও বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বন্যপ্রাণীর আবাস ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয় স্থানীয় মানুষ। স্থানীয়দের দাবি—উন্নয়ন হোক, শিল্পায়ন হোক, কর্মসংস্থান হোক। কিন্তু সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে স্থানীয় মানুষকেও। শুধু জমির মূল্য বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা।

নইলে উন্নয়নের নতুন শহর দাঁড়িয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সেই শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকতে হতে পারে ভূমিহীন, পেশাহীন ও শিকড়হীন এক নতুন প্রজন্মকে।

তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মহেশখালী কি শুধু প্রকল্পের জন্য বদলাবে, নাকি এই পরিবর্তনের সুফল পাবে মহেশখালীর মানুষও? উন্নয়নের মানচিত্রে শিল্প ও অবকাঠামোর জায়গা থাকলে সেখানে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার জায়গা কতটুকু?

কারণ একটি দ্বীপকে কংক্রিটের শহরে পরিণত করাই উন্নয়ন নয়। মানুষ, প্রকৃতি ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করে যে উন্নয়ন—সেটিই হতে পারে মহেশখালীর সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

পাঁচ মাস পর দেশের পথে মির্জা আব্বাস

মেগা প্রকল্পের নিচে চাপা পড়ছে মহেশখালীর গ্রাম-জীবন!

উন্নয়নের জোয়ারে হারাচ্ছে কৃষিজমি-জলাশয়, অনিশ্চিত জীবিকা

আপডেট সময় ০৫:৪৯:৪৯ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬

একসময় যেখানে ভোর হতো জেলেদের নৌকার বৈঠার শব্দে, কৃষকের ঘামে সোনালি ধানের মাঠে আর খাল-বিলে ছিল মাছ ধরার ব্যস্ততা-সেই মহেশখালী এখন বদলে যাচ্ছে মেগা প্রকল্পের মহাযজ্ঞে। একের পর এক শিল্প ও অবকাঠামো প্রকল্পের বিস্তারে বদলে যাচ্ছে ভূমির ব্যবহার, সংকুচিত হচ্ছে গ্রামীণ জনপদ। উন্নয়নের নতুন মানচিত্রে কোথাও হারিয়ে যাচ্ছে কৃষিজমি, কোথাও জলাশয়, কোথাও আবার প্রজন্মের পর প্রজন্মের বসতভিটা ও জীবিকার ঠিকানা।

কক্সবাজারের দ্বীপ উপজেলা মহেশখালীকে ঘিরে সরকারের বড় বড় উন্নয়ন পরিকল্পনা অর্থনৈতিক সম্ভাবনার নতুন দুয়ার খুলছে—এমন প্রত্যাশা রয়েছে। তৈরি হতে পারে কর্মসংস্থান, বাড়তে পারে বিনিয়োগ ও ব্যবসা-বাণিজ্য। কিন্তু সেই উন্নয়নের মূল্য দিতে হচ্ছে কাদের? যে জেলে সমুদ্র ও জলাশয়কে জীবিকার প্রধান অবলম্বন হিসেবে ধরে রেখেছেন, যে কৃষক হারাচ্ছেন চাষের জমি, কিংবা যে পরিবারকে ছেড়ে যেতে হচ্ছে পূর্বপুরুষের বসতভিটা—তাদের ভবিষ্যৎ কোথায়?

কুতুবজোম ইউনিয়নের ঘড়িভাঙ্গা জেলে পল্লী যেন সেই প্রশ্নেরই জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। প্রজন্মের পর প্রজন্ম সমুদ্রনির্ভর জীবনযাপন করা মানুষের কাছে জমি বা বসতভিটার বিনিময়ে পাওয়া অর্থ হয়তো সাময়িক স্বস্তি এনে দিতে পারে। কিন্তু অর্থ শেষ হয়ে গেলে জীবিকা চলবে কীভাবে—তার নিশ্চয়তা কতটা? একটি পেশা হারানোর ক্ষতি কি কেবল টাকার অঙ্কে মাপা যায়?

মহেশখালীর বিভিন্ন এলাকায় উন্নয়ন প্রকল্পের বিস্তারের সঙ্গে সঙ্গে বদলে যাচ্ছে প্রাকৃতিক পরিবেশও। পাহাড়, জলাশয়, কৃষিজমি ও প্রাকৃতিক আবাসস্থলের ওপর চাপ বাড়ছে। পাহাড় ও বনভূমির স্বাভাবিক পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হলে বন্যপ্রাণীর আবাস ও চলাচলের পথ সংকুচিত হওয়ার পাশাপাশি পরিবেশের ভারসাম্যেও দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।

উন্নয়নের বিরুদ্ধে নয় স্থানীয় মানুষ। স্থানীয়দের দাবি—উন্নয়ন হোক, শিল্পায়ন হোক, কর্মসংস্থান হোক। কিন্তু সেই উন্নয়নের কেন্দ্রে থাকতে হবে স্থানীয় মানুষকেও। শুধু জমির মূল্য বা ক্ষতিপূরণ দিয়ে দায়িত্ব শেষ করলে হবে না; প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পুনর্বাসন, বিকল্প কর্মসংস্থান, দক্ষতা উন্নয়ন এবং পরিবেশ সুরক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা।

নইলে উন্নয়নের নতুন শহর দাঁড়িয়ে যাবে ঠিকই, কিন্তু সেই শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকতে হতে পারে ভূমিহীন, পেশাহীন ও শিকড়হীন এক নতুন প্রজন্মকে।

তাই এখন সবচেয়ে বড় প্রশ্ন—মহেশখালী কি শুধু প্রকল্পের জন্য বদলাবে, নাকি এই পরিবর্তনের সুফল পাবে মহেশখালীর মানুষও? উন্নয়নের মানচিত্রে শিল্প ও অবকাঠামোর জায়গা থাকলে সেখানে স্থানীয় মানুষের জীবন-জীবিকার জায়গা কতটুকু?

কারণ একটি দ্বীপকে কংক্রিটের শহরে পরিণত করাই উন্নয়ন নয়। মানুষ, প্রকৃতি ও জীবিকার অধিকার নিশ্চিত করে যে উন্নয়ন—সেটিই হতে পারে মহেশখালীর সত্যিকারের টেকসই উন্নয়ন।