রংপুর কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজে একের পর এক অনিয়ম, ভুয়া নিয়োগ এবং ক্ষমতার দ্বন্দ্বকে কেন্দ্র করে নতুন করে বিতর্কের ঝড় উঠেছে।
অভিযোগ উঠেছে—প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক আলিউল করিম প্রামাণিক, শিক্ষক রাশেদ অর্থ ও উস্কানি দিয়ে কতিপয় শিক্ষকের সহযোগিতায় প্রাক্তন ছাত্র সংসদের একটি অংশকে ব্যবহার করে গত ২১ আগস্ট ২৪ এ ক্যাম্পাসে মব সৃষ্টি করেছেন।
অভিযোগকারীরা বলছেন, ওইদিন সৃষ্ট মবের জের ধরেই তৎকালীন প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিনকে অপসারণ করা হয় এবং একই সঙ্গে রহস্যজনকভাবে তিনি ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল হিসেবে যোগদান করেন। এদিকে সেপ্টেম্বর ২০২৪ থেকে আগস্ট ২০২৫ পর্যন্ত স্থগিত প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিনের বেতন বন্ধ রাখা হয়।
অভিযোগকারীদের দাবি,
রাশেদ-উল-ইসলাম রাজনৈতিক পরিচয় আড়াল করে ব্যক্তিস্বার্থ হাসিলের জন্য সচেষ্ট। তাদের নেতৃত্বে প্রাক্তন ছাত্র সংসদের একাংশ অর্থের বিনিময়ে উস্কানিমূলক কার্যকলাপে জড়িয়ে পড়েন। বিভিন্ন ভিডিও ফুটেজ ও মাঠপর্যায়ের তথ্য অনুসন্ধানেও এই ঘটনার প্রত্যক্ষ সম্পৃক্ততা পাওয়া গেছে। এছাড়াও আ.লীগের বিভিন্ন অনুষ্ঠানে তাদের ছবি পাওয়া যায় এবং তাদের নিজস্ব আইডিতে জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধুর স্লোগান দেওয়া পোস্টও দেখা গেছে।
অভিভাবক ও জনমত:
ঘটনার জেরে শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তারা দ্রুত সঠিক তদন্ত ও সমাধানের দাবি তুলেছেন।
শিক্ষক প্রতিনিধি এম কে মনিরুজ্জামান বলেন,
“আলতাফের নিয়োগ নিয়ে যে অনিয়মের কথা শোনা যাচ্ছে সেটা অবগত নন তিনি। প্রতিষ্ঠানের সব সিদ্ধান্ত সভাপতির অনুমতিক্রমেই হয়। তাই আলতাফ হোসেনের বিষয়টি সভাপতি ভালো জানবেন। এর বাইরে আমি কোনো মন্তব্য করতে চাই না।”
অভিভাবক সদস্য কানিজ লায়লা বলেন,
“আলতাফ হোসেনের নিয়োগ অবৈধ। তাকে শর্তসাপেক্ষে পাঁচ বছর সময় দিয়ে কৃষি ডিপ্লোমা সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়ার বিষয়টি আমার অজানা। সর্বশেষ মিটিংয়েও এ নিয়ে কোনো আলোচনা হয়নি। সাসপেন্ড প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিনকে যতদিন দেখেছি, ভালোই পেয়েছি। তিনি সবার সঙ্গে মিশুক ছিলেন, তবে শৃঙ্খলাপরায়ণও ছিলেন। আমার জানা মতে তিনি সৎ ছিলেন। তবে কলেজে সভাপতির অনুমতি ছাড়া কিছু করা সম্ভব নয়।”
তিনি আরও জানান, আলিউল করিম অতীতে বহুবার সাময়িক বরখাস্ত হয়েছিলেন। অভিযোগ ছিল অর্থ কেলেঙ্কারি ও ছাত্র-ছাত্রীদের প্রাইভেট পড়াতে বাধ্য করার মতো ঘটনার সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে।
জেলা শিক্ষা কর্মকর্তার অবস্থান:
রংপুর জেলা শিক্ষা অফিসার এনায়েত হোসেন বলেন, কালেক্টরেট স্কুল অ্যান্ড কলেজের সভাপতি ডিসি মহোদয়। ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপাল এডিসি শিক্ষা রমিজ আলম। তারাই ভালো জানেন এই বিষয়গুলো। এর বাইরে আমি কিছু বলতে চাই না। কথা থাকলে অফিসে আসুন।”
এডিসি শিক্ষা রমিজ আলম বলেন,
এ বিষয়ে এখন কোনো মন্তব্য করতে পারবো না। অফিসে আসুন। অন্যদিকে, গভর্ণিং বডির সভাপতি রবিউল ফয়সালকে একাধিকবার ফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ না করায় যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।
শিক্ষকদের প্রতিক্রিয়া:
কলেজের অনেক শিক্ষকই দাবি করছেন, প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিনকে অন্যায়ভাবে মব সৃষ্টি করে অপসারণ করা হয়েছে। তারা তার কাছে ক্ষমা চেয়ে সপ্তাহে অন্তত একবার হলেও প্রতিষ্ঠানে প্রবেশ করার আহ্বান জানিয়েছেন। শিক্ষকদের দাবি—তার অপসারণের পেছনে প্রতিষ্ঠানের ভেতরের একটি কালো হাত কাজ করেছে।
আর্থিক অনিয়ম প্রসঙ্গ:
আলিউল করিমের পক্ষ থেকে অভিযোগ করা হয়—প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিন ডাচ্-বাংলা রকেট অ্যাকাউন্ট নিজ উদ্যোগে খুলে ব্যক্তিগত প্রয়োজনে ব্যবহার করেছেন এবং নিজ নামে প্রায় ১২টি চেক ইস্যু করে টাকা উত্তোলন করেছেন।
তবে অফিসিয়াল স্টেটমেন্ট ও লিখিত ডকুমেন্টস অনুযায়ী, রকেট অ্যাকাউন্ট থেকে উত্তোলিত অর্থের সবকিছুই প্রতিষ্ঠানের মূল অ্যাকাউন্টে ট্রান্সফার হয়েছে এবং শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন, পরীক্ষা বাবদ বিল ও প্রতিষ্ঠানের খরচে ব্যবহৃত হয়েছে।
লিখিত ডকুমেন্টস অনুযায়ী
উদাহরণস্বরূপ—
১৯/০৬/২০১২: গণেশ চন্দ্র মহন্ত ৪,০৮,১৫০ টাকা (শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন)।
০৩/০৭/২০১২: গণেশ চন্দ্র মহন্ত ৪,০২০,২৩৪ টাকা (জুন মাসের বেতন ও নবম রেজি খরচ)।
২২/০৭/২০১২: শেফালী বেগম ৩৪,৫০০ টাকা (প্রাথমিক জুনিয়র ও বোর্ড বৃত্তি)।
১৪/০৮/২০১২: আলতাফ, নাসিরুল প্রমুখ—৭টি পরীক্ষার বিল।
০৯/০৮/২০১৫: শেফালী বেগম ৪৪,৭০০ টাকা (বৃত্তি বিল)।
২৩/০৪/২০১৭: সোহরাব হোসেন ৩,০৮,৭৬৫ টাকা (এসএসসি ও বার্ষিক পরীক্ষার খরচ)।
০৯/০৪/২০২০: শেফালী বেগম ২৫,০৭,৮৩২ টাকা (শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন বিল)।
এই সকল নথি প্রমাণ করে যে মন্জুয়ারা পারভিনের বিরুদ্ধে আর্থিক জালিয়াতির অভিযোগ ভিত্তিহীন।
চুক্তিপত্রে সাক্ষর ও দায়বদ্ধতা:
চুক্তিনামায় দেখা যায়—
রকেট একাউন্ট চুক্তিতে: প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিন, সহকারী অধ্যাপক (ব্যবস্থাপনা) কলেজ কো-অর্ডিনেটর নাহেদ ফরিদের সাক্ষর রয়েছে।
বিকাশ চুক্তিনামায়: প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিন, সহকারী অধ্যাপক (ব্যবস্থাপনা) নাহেদ ফরিদ এবং সহকারী অধ্যাপক (গণিত) আতিয়ার রহমানের সাক্ষর রয়েছে।
অর্থাৎ, আর্থিক লেনদেন এককভাবে নয় বরং একাধিক দায়িত্বশীলের যৌথ অনুমোদনে সম্পন্ন হয়েছে।
দুর্নীতি দমন কমিশনের অবস্থান:
গভর্ণিং বডির সভাপতি রবিউল ফয়সাল জানান, দুর্নীতি দমন কমিশনে অভিযোগ দেওয়া হয়েছে এবং তদন্ত চলমান।
দুদক রংপুরের উপপরিচালক মোঃ শাওন বলেন,
“যদিও প্রাইভেট প্রতিষ্ঠানের ব্যাপারে দুদকের সরাসরি ভূমিকা নেই, তবে প্রিন্সিপাল মন্জুয়ারা পারভিনের নামে সঠিক জালিয়াতির প্রমাণ পাওয়া গেলে অবশ্যই বিষয়টি দুর্নীতি দমন কমিশন দেখবে”
তিনি আরও জানান, দুদক প্রধান কার্যালয়, ঢাকা-তে অভিযোগ করা হলে তার পরিপ্রেক্ষিতে
সূত্রোক্ত ২ নং স্মারকে জেলা প্রশাসকের কার্যালয়, হতে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক), রংপুরকে সরেজমিনে তদন্ত করে প্রতিবেদন প্রেরণের জন্য তদন্তকারি কর্মকর্তা হিসেবে দ্বায়িত্ব প্রদান করা হয়।
সে প্রেক্ষিতে সূত্রোক্ত ৩ নং স্মারকে অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক(সার্বিক) রংপুর তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন দাখিল করেছেন।
তবে রংপুর দুদক এই তদন্ত প্রতিবেদনের কোনো সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা দিতে পারেনি। তারা জানায়, “এই প্রতিবেদনের ওপর সরাসরি সিদ্ধান্ত না নিয়ে দুদক নিজস্ব তদন্ত প্রক্রিয়ায় সত্যতা যাচাই করবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















