রাত হলেই বদলে যায় গাজীপুর, বদলে যায় অনেক কিছু। শিল্পনগরী গাজীপুরে দেশের বিভিন্ন স্থান থেকে কর্মের জন্য ছুটে আসা মানুষের সংখ্যা অনেক। এ এলাকায় রয়েছে সবুজ প্রকৃতির বিশাল সমাহার, গড়ে উঠেছে হোটেল, রিসোর্টসহ বিভিন্ন বিনোদন কেন্দ্র। অথচ প্রশাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এ সবুজ প্রকৃতির বুকে রাত হলেই সংঘটিত হয় দেহ ব্যবসা, মাদক ব্যবসা, চুরি-ডাকাতিসহ নানা অপরাধ।
তথ্য বলছে, গাজীপুরে গড়ে উঠা বিভিন্ন আবাসিক হোটেল, রিসোর্টসহ অনেক বিনোদন কেন্দ্রে রাত হলেই চলে দেহ ব্যবসা, এমনকি মাদক কেনা-বেচা। আর এসব নিয়ন্ত্রণ করছে, কিছু নামধারী রাজনৈতিক দলের নেতা, স্থানীয় প্রশাসন ও প্রভাবশালী কিছু ব্যক্তি। যার ফলে কতৃপক্ষের ইচ্ছে থাকলেও নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না এসব অপরাধ। অনেক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্রের মালিকদের রয়েছে চুক্তিবদ্ধ ভাসমান যৌনকর্মী। এসব ভাসমান পতিতাদের মাধ্যমে স্থানীয় মাদক কারবারিরা গোপনে গড়ে তুলেছে সিণ্ডিকেট। সিণ্ডিকেটের মাধ্যমে অবাধে মাদক পাচার হচ্ছে বিভিন্ন স্থানে। এছাড়াও এসব ভাসমান যৌনকর্মীদের সাথে অপরাধীদের রয়েছে গভীর সখ্য।
সরেজমিনে ঘুরে দেখা যায়, সন্ধ্যার পর থেকে গাজীপুর চৌরাস্তা, টঙ্গী, কাপাসিয়া বাসস্ট্যান্ড, শ্রীপুর, কালীগঞ্জ, ভোগড়া বাইপাস, রেলস্টেশন, বিভিন্ন শিল্প-কারখানার আশেপাশে, ভাওয়াল জাতীয় উদ্যান সংলগ্ন এলাকায়, জঙ্গলের ভেতর, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কালিয়াকৈর বাইপাস থেকে শ্রীফলতলী বাইপাস, কালিয়াকৈর পল্লীবিদ্যুৎ ট্রাক স্টেশন, খাড়াজোড়া রজনী সিনেমা হল, চন্দ্রা ত্রীমোড় বাসস্টেশন, চন্দ্রা ফ্লাইওভারের দুইপাশে, চন্দ্রা সোহাগ পল্লী সড়কের প্রবেশ মুখের আশপাশ, চন্দ্রা কাজলী সিএনজি পাম্প ও মৌচাক ইউনিয়নের তেলিরচালা নামক স্থানে মোহনা সিনেমা হলের আশপাশ এলাকায় ভাসমান পতিতাদের রয়েছে অবাধ বিচরণ।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে গাজীপুর চৌরাস্তার এক বাসিন্দা জানান, আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে আসলে যদি ঘুমানোর জায়গার অভাব হয় তাহলে আবাসিক হোটেলে যেতে হয়। কিন্তু আবাসিক হোটেলে গেলে উল্টো আরো লজ্জায় পড়তে হয়। তিনি বলেন, বেশিরভাগ হোটেলে রাত্রিতে মানুষ রাখা যায় না, পরিবেশ নেই। শুধু বানানো স্ত্রী নিয়ে এখানে এসে (৪০-৫০) মিনিট আনন্দ ফুর্তি করা জায়গা। এসব জায়গায় বেশিরভাগ আসে স্কুল-কলেজ পড়ুয়া শিক্ষার্থী, চাকরিজীবী, দূর-দূরান্ত থেকে বিভিন্ন কাজে আসা নানা বয়সের ব্যক্তিসহ অনেক পেশার মানুষে। শুধু দেহ ব্যবসাই নয়, এসব জায়গা অবাধে মাদক ব্যবসাও চলে।
স্থানীয় অভিভাবকরা জানান, সন্তানদের মাদক থেকে মুক্ত করতে অনেকেই নিরাময় কেন্দ্রে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসা করার পর সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে আসে। কিন্তু মাদক সহজলভ্য হওয়ায় কিছু দিন পর পুনরায় নেশার জগতে ফিরে যায়। হাতে টাকা পেলেই ছুটে যায় আবাসিক হোটেলে। টাকা না দিলে জড়িয়ে পড়ে নানা অপরাধে। এসব আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্রগুলোতে বর্তমানে বহিরাগত সন্ত্রাসীদের নিরাপদ আস্তানায় পরিণত হয়েছে। এমন কোনো কু-কর্ম নেই যা এসব স্থানে হচ্ছে না। এসব স্থান থেকে বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কিছু অসাধু সদস্যও মাসিক টাকা নেন। ফলে এসব কমছে না বরং দিন দিন বাড়ছে। গাজীপুরের অনেক বাসাবাড়িতেও গোপনে বা প্রকাশ্যে চলে দেহ ব্যবসা। এসব বাসাবাড়িতে রাতের বেলায় কোনো কাষ্টমার যায় না। কারণ প্রতিবেশী ভাড়াটিয়ারা বুঝে ফেলতে পারে নারী ব্যবসার রহস্য। এ কারণে দিনের বেলায় আত্মীয়-স্বজন পরিচয়ে কাষ্টমাররা অবস্থান করে। প্রতিদিন প্রতিটি বাসায় ৮-১০জন কাষ্টমার যাতায়াত করে। আমরা দেখলেও বা জানলেও কিছু বলতে পারি না।
কাষ্টমার সেজে গাজীপুর চৌরাস্তায় এক যৌনকর্মীর সাথে আলাপকালে জানা যায়, এ এলাকায় অনেক যৌনকর্মী রয়েছে। কেউ বিভিন্ন শিল্প-কারখানায় চাকুরী করে, কেউ বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে লেখাপড়া করে, কেউ পরিবারের প্রয়োজনে আবার কেউবা শখের বশে এ পেশায় যুক্ত হয়েছে। এখানে বয়স ও শারীরিক সৌন্দর্যের উপর ভিত্তি করে একজন যৌনকর্মীর দরদাম নির্ধারণ করা হয়। অনেক যৌনকর্মী সরাসরি মাদক ব্যবসার সাথে জড়িত। অনেক আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্রের মালিকপক্ষের সাথে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর অনেক সদস্যদের যোগসাজশ রয়েছে। যার ফলে তারা অবাধে এসব ব্যবসা চালিয়ে যাচ্ছেন। আর যৌনকর্মীরাও তাদের কাজের বিনিময়ে প্রাপ্ত টাকা থেকে প্রায় অর্ধেক টাকা নানা খাতে বিভিন্ন মহলে ভাগ দিয়ে চলতে হয়।
কথা হয় এক দালালের সাথে, যিনি দীর্ঘদিন ধরে দেহ ব্যবসার সাথে জড়িত। তিনি বলেন, আমাদের কাছে অনেক যৌনকর্মীর নাম্বার রয়েছে। আমরা কাষ্টমার এনে দেই। কাজ হলে আমরা কমিশন পাই। শুধু আমরাই কমিশন খাইনা পুলিশ, নেতা থেকে শুরু করে অনেকেই এ কমিশন বাণিজ্যের সাথে জড়িত।
গাজীপুরের বিভিন্ন এলাকার সচেতন নাগরিকরা বলছেন, এসব আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্রে অসামাজিক কার্যকলাপের ফলে সমাজ নষ্ট হচ্ছে। দিনে ও রাতে এসব জায়গায় পুলিশের অভিযান চালানো উচিত। দেহ ব্যবসা বন্ধ করতে তারা গাজীপুর জেলা প্রশাসন, উপজেলা প্রশাসনসহ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীদের প্রতি অনুরোধ জানান। তারা আরো বলেন, বাংলাদেশে সবচেয়ে বড় সমস্যা কোনো একটি ঘটনা বড় আকারে না ঘটলে বা ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ খুব বেশি না হলে এবং সেই ঘটনা গণমাধ্যমে ঠিকভাবে প্রচার না হলে প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী নড়েচড়ে বসে না। দেহ ব্যবসাটা বর্তমানে সামাজিক বা যৌন অসুখ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যম হিসেবে কাজ করছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিভিন্ন ইউনিট রয়েছে, তারা কি এগুলো দেখছে না? তাছাড়া দেহ ব্যবসা করে যারা টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন, সেই টাকার ভাগ-বাটোয়ারা কতদূর পর্যন্ত যায় সেটাও একটা বিবেচনার বিষয়।
এসব বিষয়ে কথা বলার জন্য গাজীপুর জেলার পুলিশ সুপারের সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। তবে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়, তারা এসব বিষয়ে কঠোর অবস্থানে রয়েছেন। খুব তাড়াতাড়ি তারা অভিযান পরিচালনা করবেন। যেসব আবাসিক হোটেল, রিসোর্ট ও বিনোদন কেন্দ্রের মালিক-কর্মকর্তারা এসবের সাথে জড়িত তাদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
এম এ হোসেন, গাজীপুর 
























