ঢাকা ১০:৩০ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬, ২৯ আষাঢ় ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
সাংবাদিকরা সমাজের দর্পন -ভিসি ড.এস.এম হেমায়েত জাহান যে কারণে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে অ্যাওয়ে জার্সি পরতে বাধ্য হচ্ছে আর্জেন্টিনা চট্টগ্রাম ছাড়া অন্য সব বোর্ডে চলবে এইচএসসি পরীক্ষা : আন্তঃশিক্ষা বোর্ড ব্রুনাই শ্রমবাজারে হাইকমিশনার নওরিন আহসানকে ঘিরে বিতর্ক জুলাইয়ের ১২ দিনে রেমিট্যান্স এলো ১৩২ কোটি ডলার শাড়ি নিয়ে প্রতারণার মামলায় তানজিন তিশাকে আদালতে হাজিরের নির্দেশ বিয়েবাড়িতে খাসির বদলে মুরগির মাংস দেওয়ায় তুমুল মারামারি নেপালে আবার কেন জেন-জি বিক্ষোভ, নেপথ্যে কী? আর্জেন্টিনার প্রতিপক্ষ ইংল্যান্ডকে সমর্থন ট্রাম্প প্রশাসনের! রাতারাতি বড় কোন পরিবর্তন করা সম্ভব নয়: আইএমএফকে অর্থমন্ত্রী
৫ম পর্বের প্রথম পর্ব

ব্রুনাই শ্রমবাজারে হাইকমিশনার নওরিন আহসানকে ঘিরে বিতর্ক

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ব্রুনাই দারুসসালাম। জনসংখ্যায় ছোট হলেও দেশটির নির্মাণ, অবকাঠামো, সেবা ও বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি শ্রমবাজারও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে। ব্রুনাইয়ে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি হাজারো পরিবারের জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ব্রুনাইয়ে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। দেশটিতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন কয়েকশ নির্মাণ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও পরিচালিত হচ্ছে। একসময় প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি কর্মী ব্রুনাইয়ে গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পাঠানো কর্মীর সংখ্যা মাত্র দুই হাজার ৫৯৭ জন। শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পতনের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেমন রয়েছে, তেমনি প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নও উঠে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ হাইকমিশনার নওরিন আহসানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগগুলোতে বলা হয়, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় বৈধভাবে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট একটি এজেন্সিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া, আবেদন দীর্ঘদিন আটকে রাখা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্যের মতো ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্রুনাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নওরিন আহসান।

প্রথমে একটি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে “দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি” পত্রিকায় প্রকাশিত অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, বৈধ রিক্রুটিং কোম্পানিগুলোর কিছু আবেদন দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন না পেলেও একটি নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়া আবেদন তুলনামূলক দ্রুত অনুমোদন পাচ্ছে। প্রতিবেদনে অভিযোগকারীদের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়, এর ফলে সময়মতো শ্রমিক পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় কিছু নিয়োগ অন্য দেশের শ্রমিকদের কাছে চলে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ সম্ভাব্য রেমিট্যান্স আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

ওই প্রতিবেদনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল ব্রুনাইয়ের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান UNITY LAND SDN BHD-এর একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে সরাসরি বাংলাদেশ হাইকমিশনে শ্রমিক নিয়োগের জন্য আবেদন করলেও সেটি অনুমোদন পায়নি। পরে একই প্রতিষ্ঠানের আবেদন একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পুনরায় জমা দেওয়ার পর তা দ্রুত অনুমোদন পায়। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, এই দুই আবেদনের ভিন্ন পরিণতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই আরেকটি সংবাদমাধ্যম “দৈনিক ভোরের কণ্ঠস্বর“ পত্রিকায় প্রতিবাদধর্মী একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে দাবি করা হয়, প্রথম প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের পর্যবেক্ষণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীন যাচাই ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবাদধর্মী প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ একটি নির্ধারিত প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। নিয়োগকর্তার নথি যাচাই, অভিবাসনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হওয়া স্বাভাবিক। সেই বিলম্বকে ব্যক্তিগত দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয় বলেও প্রতিবেদনে মত প্রকাশ করা হয়।

তবে প্রতিবাদধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশের পরও বিতর্ক থামেনি। কারণ, অভিযোগকারীদের উত্থাপিত কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি ব্যাখ্যা সেখানে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে, একই কোম্পানির একটি আবেদন দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা এবং পরে একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি আবেদন ভিন্ন চ্যানেলে এসে অনুমোদন পাওয়ার প্রশাসনিক কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

পরবর্তীতে বিষয়টি ইংরেজি ভাষার একটি জাতীয় দৈনিক The Country Tody (dailycountrytodaybd.com) আলোচনায় আসে। সেখানে হাইকমিশনার নওরিন আহসানের নিয়োগ, দায়িত্ব গ্রহণ এবং কূটনৈতিক পটভূমি তুলে ধরা হয়। যদিও ওই সংবাদে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি, তবে বিষয়টি যে দেশের শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে বিতর্কটি আর কেবল একটি বাংলা অনলাইন প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি আলোচিত হতে শুরু করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশেষ করে ব্রুনাই-প্রবাসী বাংলাদেশিদের কয়েকটি গ্রুপ, ফেসবুক পোস্ট এবং অনলাইন আলোচনায় কেউ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান, আবার কেউ পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া একজন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের সমালোচনা করেন।

অনলাইন আলোচনায় অনেক প্রবাসী শ্রমিক তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। কেউ কেউ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা এবং দালালচক্রের প্রভাবের অভিযোগ করেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত; অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

তবে অভিযোগকারীদের মতে, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কয়েকটি প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন রয়ে গেছে। তাদের ভাষ্য, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জি-টু-জি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সম্ভাবনাময় একটি শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

অভিযোগকারীদের অন্যতম প্রশ্ন হলো, ব্রুনাইয়ের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান যদি সরাসরি বাংলাদেশ হাইকমিশনে আবেদন করে, তাহলে সেই আবেদন অনিষ্পন্ন থেকে যাওয়ার কারণ কী ছিল? একই প্রতিষ্ঠানের আবেদন পরবর্তীতে অন্য একটি এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়ার পর দ্রুত অনুমোদন পাওয়ার পেছনে প্রশাসনিক ভিত্তি কী?

আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে শ্রমিক সংখ্যার পরিবর্তন নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রথম আবেদনে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২৩০ জন, কিন্তু পরবর্তী আবেদনে তা ৩০০ জনে উন্নীত হয়। এই অতিরিক্ত শ্রমিক চাহিদার যৌক্তিকতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।

শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, প্রকৃত জনবল চাহিদা এবং কর্মসংস্থানের সক্ষমতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভাষ্য, যদি এ ধরনের যাচাই যথাযথভাবে না করা হয়, তাহলে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মসংকটে পড়তে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগকারীরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, একটি নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়া আবেদনগুলো তুলনামূলক দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অভ্যন্তরীণ কোনো পর্যালোচনা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে তারা জানতে চেয়েছেন, আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতিমালা, যাচাই প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের লিখিত ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি না।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য জানার জন্য হাইকমিশনার নওরিন আহসান এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। এ প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন—শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়, সেই সিদ্ধান্তের নথিভিত্তিক ভিত্তি কী, আবেদন অনুমোদন বা অননুমোদনের কারণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং এসব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

(চলবে — পর্ব–২: UNITY LAND SDN BHD-এর দুইটি ডিমান্ড লেটার, ২৩০ বনাম ৩০০ শ্রমিক, Mariah Munawwarah Employment Agency-এর ভূমিকা, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সাইট ভিজিট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন।)

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

সাংবাদিকরা সমাজের দর্পন -ভিসি ড.এস.এম হেমায়েত জাহান

৫ম পর্বের প্রথম পর্ব

ব্রুনাই শ্রমবাজারে হাইকমিশনার নওরিন আহসানকে ঘিরে বিতর্ক

আপডেট সময় ০৯:২৮:৪৫ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৩ জুলাই ২০২৬

বাংলাদেশের বৈদেশিক কর্মসংস্থানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ গন্তব্য ব্রুনাই দারুসসালাম। জনসংখ্যায় ছোট হলেও দেশটির নির্মাণ, অবকাঠামো, সেবা ও বিভিন্ন খাতে দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশি শ্রমিকদের উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি রয়েছে। স্বাধীনতার পর থেকে দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি শ্রমবাজারও ধীরে ধীরে সম্প্রসারিত হয়েছে। ব্রুনাইয়ে কর্মরত বাংলাদেশি শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখার পাশাপাশি হাজারো পরিবারের জীবিকা, শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সামাজিক নিরাপত্তার প্রধান ভরসা হয়ে উঠেছে।

বাংলাদেশ সরকারের তথ্য অনুযায়ী, ব্রুনাইয়ে প্রায় ১৫ হাজারের বেশি বাংলাদেশি কর্মরত রয়েছেন। দেশটিতে বাংলাদেশি মালিকানাধীন কয়েকশ নির্মাণ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠানও পরিচালিত হচ্ছে। একসময় প্রতিবছর গড়ে প্রায় পাঁচ হাজার বাংলাদেশি কর্মী ব্রুনাইয়ে গেলেও সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সেই প্রবাহ উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে। জনশক্তি কর্মসংস্থান ও প্রশিক্ষণ ব্যুরোর (বিএমইটি) তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ ও ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মোট পাঠানো কর্মীর সংখ্যা মাত্র দুই হাজার ৫৯৭ জন। শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টদের মতে, এই পতনের পেছনে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বাস্তবতা যেমন রয়েছে, তেমনি প্রশাসনিক জটিলতা, নিয়োগ প্রক্রিয়ার ধীরগতি এবং স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্নও উঠে এসেছে।

এই প্রেক্ষাপটেই সম্প্রতি ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগকে কেন্দ্র করে বাংলাদেশ হাইকমিশনার নওরিন আহসানের বিরুদ্ধে একাধিক গুরুতর অভিযোগ প্রকাশ্যে আসে। অভিযোগগুলোতে বলা হয়, সরকার-টু-সরকার (জি-টু-জি) ব্যবস্থায় বৈধভাবে শ্রমিক পাঠানোর সুযোগ থাকা সত্ত্বেও কিছু নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অস্বচ্ছতা, নির্দিষ্ট একটি এজেন্সিকে বিশেষ সুবিধা দেওয়া, আবেদন দীর্ঘদিন আটকে রাখা এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্তে বৈষম্যের মতো ঘটনা ঘটেছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ব্রুনাইয়ে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার নওরিন আহসান।

প্রথমে একটি বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমে “দৈনিক আমাদের মাতৃভূমি” পত্রিকায় প্রকাশিত অনুসন্ধানধর্মী প্রতিবেদনে অভিযোগ করা হয়, বৈধ রিক্রুটিং কোম্পানিগুলোর কিছু আবেদন দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদন না পেলেও একটি নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়া আবেদন তুলনামূলক দ্রুত অনুমোদন পাচ্ছে। প্রতিবেদনে অভিযোগকারীদের বরাত দিয়ে আরও বলা হয়, এর ফলে সময়মতো শ্রমিক পাঠানো সম্ভব না হওয়ায় কিছু নিয়োগ অন্য দেশের শ্রমিকদের কাছে চলে যাচ্ছে এবং বাংলাদেশ সম্ভাব্য রেমিট্যান্স আয় থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে।

ওই প্রতিবেদনে সবচেয়ে আলোচিত বিষয় ছিল ব্রুনাইয়ের নির্মাণ প্রতিষ্ঠান UNITY LAND SDN BHD-এর একটি নিয়োগ প্রক্রিয়া। অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতিষ্ঠানটি প্রথমে সরাসরি বাংলাদেশ হাইকমিশনে শ্রমিক নিয়োগের জন্য আবেদন করলেও সেটি অনুমোদন পায়নি। পরে একই প্রতিষ্ঠানের আবেদন একটি তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে পুনরায় জমা দেওয়ার পর তা দ্রুত অনুমোদন পায়। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, এই দুই আবেদনের ভিন্ন পরিণতি প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করেছে।

প্রতিবেদন প্রকাশের পর বিষয়টি প্রবাসী বাংলাদেশিদের মধ্যে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। কিছুদিনের মধ্যেই আরেকটি সংবাদমাধ্যম “দৈনিক ভোরের কণ্ঠস্বর“ পত্রিকায় প্রতিবাদধর্মী একটি প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। সেখানে দাবি করা হয়, প্রথম প্রতিবেদনে উত্থাপিত অভিযোগগুলোর পক্ষে চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন, আদালতের পর্যবেক্ষণ কিংবা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত উপস্থাপন করা হয়নি। প্রতিবেদনটিতে বলা হয়, দুর্নীতি, ক্ষমতার অপব্যবহার কিংবা আর্থিক অনিয়মের মতো গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের ক্ষেত্রে স্বাধীন যাচাই ও নির্ভরযোগ্য প্রমাণ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

প্রতিবাদধর্মী প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ব্রুনাইয়ে বাংলাদেশি শ্রমিক নিয়োগ একটি নির্ধারিত প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে সম্পন্ন হয়। নিয়োগকর্তার নথি যাচাই, অভিবাসনসংক্রান্ত আনুষ্ঠানিকতা, বিভিন্ন সংস্থার সমন্বয় এবং প্রশাসনিক প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সময় আবেদন নিষ্পত্তিতে বিলম্ব হওয়া স্বাভাবিক। সেই বিলম্বকে ব্যক্তিগত দুর্নীতি বা অনিয়মের প্রমাণ হিসেবে উপস্থাপন করা সমীচীন নয় বলেও প্রতিবেদনে মত প্রকাশ করা হয়।

তবে প্রতিবাদধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশের পরও বিতর্ক থামেনি। কারণ, অভিযোগকারীদের উত্থাপিত কয়েকটি নির্দিষ্ট প্রশ্নের সরাসরি ব্যাখ্যা সেখানে পাওয়া যায়নি বলে দাবি করেন শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে, একই কোম্পানির একটি আবেদন দীর্ঘদিন অনিষ্পন্ন থাকা এবং পরে একই প্রতিষ্ঠানের আরেকটি আবেদন ভিন্ন চ্যানেলে এসে অনুমোদন পাওয়ার প্রশাসনিক কারণ সম্পর্কে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি বলে তাদের অভিযোগ।

পরবর্তীতে বিষয়টি ইংরেজি ভাষার একটি জাতীয় দৈনিক The Country Tody (dailycountrytodaybd.com) আলোচনায় আসে। সেখানে হাইকমিশনার নওরিন আহসানের নিয়োগ, দায়িত্ব গ্রহণ এবং কূটনৈতিক পটভূমি তুলে ধরা হয়। যদিও ওই সংবাদে অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে কোনো সিদ্ধান্ত দেওয়া হয়নি, তবে বিষয়টি যে দেশের শ্রমবাজার সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার জন্ম দিয়েছে, সেটি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ফলে বিতর্কটি আর কেবল একটি বাংলা অনলাইন প্রতিবেদনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকেনি; বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বিষয়টি আলোচিত হতে শুরু করে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও ঘটনাটি নিয়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া দেখা যায়। বিশেষ করে ব্রুনাই-প্রবাসী বাংলাদেশিদের কয়েকটি গ্রুপ, ফেসবুক পোস্ট এবং অনলাইন আলোচনায় কেউ অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানান, আবার কেউ পর্যাপ্ত প্রমাণ ছাড়া একজন কূটনীতিকের বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ প্রকাশের সমালোচনা করেন।

অনলাইন আলোচনায় অনেক প্রবাসী শ্রমিক তাঁদের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতাও তুলে ধরেন। কেউ কেউ নিয়োগ প্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা, বিভিন্ন প্রশাসনিক জটিলতা এবং দালালচক্রের প্রভাবের অভিযোগ করেন। অন্যদিকে, কেউ কেউ মনে করেন, কোনো অভিযোগ থাকলে তা অবশ্যই স্বাধীন তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া উচিত; অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কাউকে দোষী হিসেবে উপস্থাপন করা উচিত নয়।

তবে অভিযোগকারীদের মতে, বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকা কয়েকটি প্রশ্ন এখনো উত্তরহীন রয়ে গেছে। তাদের ভাষ্য, বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত অভিযোগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং এটি জি-টু-জি শ্রমিক নিয়োগ ব্যবস্থার স্বচ্ছতা, প্রশাসনিক জবাবদিহি এবং সম্ভাবনাময় একটি শ্রমবাজারে বাংলাদেশের অবস্থান সম্পর্কেও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উত্থাপন করেছে।

অভিযোগকারীদের অন্যতম প্রশ্ন হলো, ব্রুনাইয়ের একটি নির্মাণ প্রতিষ্ঠান যদি সরাসরি বাংলাদেশ হাইকমিশনে আবেদন করে, তাহলে সেই আবেদন অনিষ্পন্ন থেকে যাওয়ার কারণ কী ছিল? একই প্রতিষ্ঠানের আবেদন পরবর্তীতে অন্য একটি এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়ার পর দ্রুত অনুমোদন পাওয়ার পেছনে প্রশাসনিক ভিত্তি কী?

আরেকটি প্রশ্ন উঠেছে শ্রমিক সংখ্যার পরিবর্তন নিয়ে। অভিযোগকারীদের দাবি, প্রথম আবেদনে শ্রমিকের সংখ্যা ছিল ২৩০ জন, কিন্তু পরবর্তী আবেদনে তা ৩০০ জনে উন্নীত হয়। এই অতিরিক্ত শ্রমিক চাহিদার যৌক্তিকতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছিল—এ প্রশ্নও সামনে এসেছে।

শ্রমবাজার সংশ্লিষ্টদের একটি অংশের মতে, নিয়োগ প্রক্রিয়ায় কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়ার আগে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, প্রকৃত জনবল চাহিদা এবং কর্মসংস্থানের সক্ষমতা যাচাই করা গুরুত্বপূর্ণ। তাদের ভাষ্য, যদি এ ধরনের যাচাই যথাযথভাবে না করা হয়, তাহলে বিদেশে যাওয়া শ্রমিকদের একটি অংশ কর্মসংকটে পড়তে পারেন। যদিও এ বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়নি।

অভিযোগকারীরা আরও প্রশ্ন তুলেছেন, একটি নির্দিষ্ট এজেন্সির মাধ্যমে জমা দেওয়া আবেদনগুলো তুলনামূলক দ্রুত নিষ্পত্তি হওয়ার অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে বাংলাদেশ হাইকমিশনের অভ্যন্তরীণ কোনো পর্যালোচনা হয়েছে কি না। একই সঙ্গে তারা জানতে চেয়েছেন, আবেদন নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে অনুসৃত নীতিমালা, যাচাই প্রক্রিয়া এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণের লিখিত ভিত্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করা হবে কি না।

এদিকে অভিযোগের বিষয়ে লিখিত বক্তব্য জানার জন্য হাইকমিশনার নওরিন আহসান এবং বাংলাদেশ হাইকমিশনের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়েছে। এ প্রতিবেদন প্রস্তুতের সময় পর্যন্ত কোনো লিখিত প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।

এই বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন—শ্রমিক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত কীভাবে নেওয়া হয়, সেই সিদ্ধান্তের নথিভিত্তিক ভিত্তি কী, আবেদন অনুমোদন বা অননুমোদনের কারণ কীভাবে নির্ধারণ করা হয় এবং এসব প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি কতটা নিশ্চিত করা হচ্ছে।

(চলবে — পর্ব–২: UNITY LAND SDN BHD-এর দুইটি ডিমান্ড লেটার, ২৩০ বনাম ৩০০ শ্রমিক, Mariah Munawwarah Employment Agency-এর ভূমিকা, প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি, সাইট ভিজিট এবং প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে উত্থাপিত প্রশ্ন।)