রংপুরের বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে যৌন হয়রানির অভিযোগ করেছেন এক নারী স্বাস্থ্য সহকর্মী। এই ঘটনার পর পরিদর্শক আব্দুস সালাম বিভিন্ন ভাবে আপস করার চেষ্টা করছে। এ ঘটনায় নারী স্বাস্থ্য কর্মী বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককের লিখিত অভিযোগ দায়ের করেন। অভিযোগের ২৭ দিন পেরিয়ে গেলেও নেওয়া হয়নি কোনো ব্যবস্থা। এতে করে মানসিকভাবে ভেঙে পড়েছেন ওই নারী স্বাস্থ্য কর্মী।
ভুক্তভোগী স্বাস্থ্য কর্মী তানজিলা ফারহানা উপজেলার রাধানগর ইউনিয়ন পাঠানপাড়া কমিউনিটি ক্লিনিকে কমিউনিটি হেলথ প্রোভাইডার (সিএইচসিপি) হিসেবে কর্মরত আছেন। গত ৪ জানুয়ারি তিনি যৌন হয়রানির শিকার হয়েছেন বলে অভিযোগ করেন। পরে ১৩ জানুয়ারি বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালককে লিখিত অভিযোগ দেন। লিখিত অভিযোগে তিনি জানান, ঘটনার দিন তার কর্মস্থল ওই কমিউনিটি ক্লিনিকে যান স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালাম। এ সময় ক্লিনিকে রোগী না থাকায় তাকে কুপ্রস্তাব দেন স্বাস্থ্য পরিদর্শক। এতে রাজি না হওয়ায় তিনি ঔদ্ধত্যপূর্ণ আচরণ করেন।
অভিযোগ প্রসঙ্গে জানতে চাওয়া হলে রংপুর বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালক ডা. মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, বিষয়টি জানা নেই। খোঁজ নিয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
অভিযোগকারী ওই নারী বলেন, স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালাম মাঠ পর্যায়ের স্বাস্থ্য কর্মীগণের সাথে প্রতি নিয়ত বাক-বিতন্ডা ও অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করার অভিযোগ আছে তার বিরুদ্ধে। গত ৪ জানুয়ারি আব্দুস সালাম স্যার রাধানগর পাঠানপাড়া ক্লিনিকে পরিদর্শনে আসেন, সেখানে কর্মরত আছি হাজিরা খাতা দেখতে চাইলে আমি বলি স্যার ভিতরে কোউ নাই বারান্দায় আসেন হাজিরা খাতা ওখানে আছে তার পরেও স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালাম স্যার সু-কৌশলে আমাকে রুমে আটকে আমার সাথে রাগান্বিত হয়ে অশালীন ভাষায় কথা বার্তা বলেন। ওই সময় ক্লিনিকে এইচ.এ ও এফডাব্লিউএ রোগী না থাকায় আমাকে একা পেয়ে অশ্লীল কথা বারতার এক পর্যায় আব্দুস সালাম আমাকে কু-প্রস্তাব দিলে তার কু- প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তিনি আমার সাথে ঐদ্ধ্যওপূর্ণ আচরণ করেন ও দম্ভের সাথে আব্দুস সালাম বলেন,সিভিল সার্জন আমার বন্ধু টিএইচও ঘনিষ্ট কলিগ আমি যা বলবো তাই হবে আমার বিষয় কারো কাছে বলে কোন লাভ হবে না। ভুক্তভোগী ওই নারী আরোও বলেন, শারীরিক অসুস্থ থাকায় সেদিন আমার হাজব্যান্ড আমাকে নিতে আসেন। তখন আব্দুস সালাম বলেন,ভাই চলে এসেছে। তোমার সঙ্গে আমার অনেক কথা বলার ছিল কিন্তু তোমার স্বামী আশায় সে কথা গুলো বলা হলোনা। তুমি আমার সাথে একা দেখা করবা।
অভিযোগ সূত্রে জানাযায়, স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালাম এর আগের তারাগঞ্জ স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে কর্মরত থাকা অবস্থায় তারাগঞ্জ উপজেলার বিভিন্ন কমিউনিটি ক্লিনিকের নারী স্বাস্থ্য কর্মীদের সঙ্গে খারাপ আচরণ ও কু-রুচিপূর্ন কথা বার্তসহ বাজে মন্তব্য করে। আর যদি নারী কর্মীরা তার কথায় রাজিনা হলে তখন স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালাম ফ্যাসিস্ট আ.লীগ সরকারের আমলে আওয়ামীলীগের বিভিন্ন নেতার কথা বলে ওই সব নারী স্বাস্থ্য কর্মীদের চাকরিচ্যুতির ভয় দেখাতেন। এক পর্যায় তারাগঞ্জের নারী স্বাস্থ্য কর্মীরা অতিষ্ঠ হয়ে পরিদর্শক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তদে সে সময় নারী স্বাস্থ্য কর্মীরা অভিযোগ করন। তার এই নারী কর্মীদের যৌন হয়রারিন বিষয়টি ৩১/০৮/২০২১ ইং সালের বিভিন্ন দৈনিক জাতীয় পত্রিকায় প্রকাশ হয়।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অভিযুক্ত স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালাম বলেন, আমি সেদিন সরকারি দায়িত্ব পালন করেছিলাম। আমার বিরুদ্ধে কেন অভিযোগ দিয়েছেন সেটা উনি ভালো জানেন। সরকারি চাকরি করতে গেলে অনেক অভিযোগ আসে। তবে সিভিল সার্জনকে কেন বন্ধু পরিচয় দেন এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, সিভিল সার্জন আমার বন্ধু এটা কখনও বলিনি। উনি আমার কর্তৃপক্ষ।
ওই নারীর অভিযোগ, ঘটনার পর তার আরেক সহকর্মী জামুবাড়ি কমিউনিটি ক্লিনিকের সিএইচসিপি মশিউর রহমান তাকে বদরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে তুলে নিয়ে যান। পরে তাকে উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তার কক্ষে নিয়ে যাওয়া হয়। এ সময় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশিকুল আরেফিন অভিযোগটি তুলে নেওয়ার জন্য চাপ দেন। এতে ভুল স্বীকার করে, কারও প্ররোচনা এই অভিযোগ করা হয়েছে উল্লেখ করে অভিযোগ তুলে নিতে চাপ দেওয়া হয়। সেখানে উপস্থিত থাকা কয়েকজন সিএইচসিপিও অভিযোগ প্রত্যাহার করতে চাপ দেন।
তবে অভিযোগ অস্বীকার করেন উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. আশিকুল আরেফিন। তিনি বলেন, আমি অভিযোগ প্রত্যাহার করতে কেন বলব। উনি অভিযোগ করেছেন, তদন্তসাপেক্ষে দোষী যেই হোক তার বিরুদ্ধে কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবেন। আমি তাকে অভিযোগ প্রত্যাহার করতে বলিনি, এটা মিথ্যা কথা।
১৯৮৯ সালের ৭ মার্চ তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এ যোগদান করে টানা ৩২ বছর কর্মরত ছিলেন এই হাসপাতালে। নারী সহকর্মীদের যৌন হয়রানি, মাঠকর্মীদের সম্মানী ভাতা আত্মসাৎ, স্টাফদের হয়রানি, ঘুষ গ্রহণ, কোভিড টিকা ক্যাম্পেইনে গুজব রটানো এবং বিভিন্ন ট্রেনিংয়ের অর্থ আত্মসাৎসহ নানা অনিয়মের অভিযোগ ওঠে। গত ২০২১ সালের ২৪ আগস্ট তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তার কাছে একজন ভুক্তভোগী নারী স্বাস্থ্যকর্মী লিখিত অভিযোগ করেন। অভিযোগে তিনি জানান, ৫ দিনের এমএইচভি ট্রেইনিং শেষ করে কর্মস্থলে যোগদান করার সময় স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালাম মোবাইল ফোনে ওই নারীকে হাসপাতালে ডেকে আনেন। আব্দুস সালাম ওই নারীকে ন্যাশনাল সার্ভিসে চাকরি করার অভিযোগ তুলে ২০ হাজার টাকা ঘুষ চান। পরে তাকে আবারও ডেকে নিয়ে কুপ্রস্তাব দেন এবং একইসঙ্গে গায়ে হাত দেন। পরে ওই নারী সেখান থেকে পালিয়ে যান। পরে ঘুষের টাকা না দেওয়ায় তাসলিমা বেগম নামে একজন এমএইচভিকে সরিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার অভিযোগ ওঠে স্বাস্থ্য পরিদর্শক আব্দুস সালামের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় তিনি সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ দেন।
এ ছাড়া রংপুর সদর উপজেলায় স্বাস্থ্য পরিদর্শক (ইনচার্জ) পদে কর্মরত থাকাকালীন সময়ে ২০২৩ সালের জানুয়ারিতে ৭ জন স্বাস্থ্য পরিদর্শক তার বিরুদ্ধে অনাস্থা প্রস্তাব আনেন। সহকর্মীদেরকে গালাগাল, হয়রানি ও সিএইচসিপিদের নানাভাবে ব্ল্যাকমেইল করার অভিযোগ এনে তারা উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তাকে লিখিত অভিযোগ দেন।
নুরুন্নবী,স্টাফ রিপোর্টারঃ 
























