ঢাকা ০২:০২ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ডিপিডিসি’র প্রকৌশলী হেলালের সিন্ডিকেটে মাতুয়াইলে ঘুষ, অনিয়ম

রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকায় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর একটি কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিপিডিসির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীন। স্থানীয় গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, তার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র বিদ্যুৎ সংযোগ, লোড অনুমোদন, মিটার পরিবর্তন, বিল সংশোধন এবং নানা প্রশাসনিক কাজকে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার ও মো. মঞ্জুরুল কাদের। তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন লাইনম্যান মেট মো. ওবাইদুর রহমান টিপু এবং ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়া। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই পাঁচজনকে ঘিরেই গড়ে ওঠে এমন একটি বলয়, যেখানে নিয়মের চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেন। অফিসে কোনো ফাইলের গতি কত হবে, কার সংযোগ আগে হবে, কার বিল সংশোধন হবে, কার আবেদন ঝুলে থাকবে—সবকিছুই নির্ধারিত হতো সিন্ডিকেটের ইচ্ছায়।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া একটি লিখিত অভিযোগে এসব অনিয়মের বিস্তারিত উঠে আসে। অভিযোগকারী হিসেবে তুষারধারা এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানি করে অবৈধ সুবিধা আদায় করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে গেলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, কিন্তু নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলেই দ্রুত সমাধান মিলত।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, হেলাল উদ্দীন তার আগের কর্মস্থল থেকে ঘনিষ্ঠ লোকজনকে নিজের প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। যাদের মধ্যে আবুল বাশার তালুকদার ও মঞ্জুরুল কাদেরের বিরুদ্ধে আগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সে সময় তাদের অন্যত্র বদলি করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে আবার একই এলাকায় ফিরে আসেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ফিরে এসেই তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং আগের চেয়ে সংগঠিতভাবে ঘুষ বাণিজ্য শুরু করেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের প্রধান আয়ের উৎস ছিল নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ। বিশেষ করে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হতো। একটি বহুতল ভবনে প্রায় ৯৮ কিলোওয়াট লোড থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ক্ষমতার এইচটি সংযোগ না দিয়ে ১৪ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এলটি সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত শুধু নিয়মবহির্ভূতই নয়, এটি বিপজ্জনকও। উচ্চ লোডের ভবনে নিম্ন ক্ষমতার সংযোগ দিলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যার ফলে শর্ট সার্কিট, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়া কিংবা অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
একই ধরনের আরেক অভিযোগ রয়েছে তুষারধারা এলাকার একটি ভবনকে ঘিরে। সেখানে প্রায় ১০ লাখ টাকা নিয়ে এইচটি গ্রাহককে এলটি গ্রাহকে রূপান্তর করা হয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত আটটি মিটারও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের মতে, এসব সুবিধা শুধু টাকার বিনিময়েই মিলত।
পলাশপুর এলাকার একটি ১০ তলা ভবনেও নিয়ম অনুযায়ী এইচটি সংযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে এলটি সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। একইভাবে আরেকটি বহুতল ভবনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের কথা উঠে এসেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব ক্ষেত্রে কারিগরি নিয়ম বা নিরাপত্তা নয়, মূল বিবেচ্য ছিল কত টাকা দেওয়া হচ্ছে।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ডুপ্লিকেট মিটার ব্যবহার ও বিল জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। রায়েরবাগ এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে মিটার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ডুপ্লিকেট মিটার দিয়ে কার্যক্রম চালানো হয় বলে অভিযোগ। পরে বিল সমন্বয়ের নামে পুরো বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। আরেকটি ঘটনায় পুরনো মিটার সরিয়ে নতুন মিটার বসিয়ে আগের ব্যবহার গোপন করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিল কমানো, অতিরিক্ত বিল ঠিক করা বা বকেয়া মওকুফের ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। কেউ বেশি বিল পেলে নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ জানালে দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে হতো। কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যেত। এতে সাধারণ গ্রাহক বাধ্য হয়ে অনৈতিক পথে যেতে বাধ্য হন।
শিল্প সংযোগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। ডগাইর এলাকার একটি কারখানায় ব্যাংক ডিপোজিট ছাড়াই বিদ্যুতের পোল স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আরেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে সাবস্টেশন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রকৌশলীদের মতে, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করলে তা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিস সময়ে সিন্ডিকেট সদস্যদের কেউ কেউ প্রকৌশলীদের কক্ষে বসে থাকতেন এবং কে কত টাকা দেবে, কার কাজ হবে—এসব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। সাধারণ গ্রাহকরা সরাসরি গেলে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। কখনও বলা হতো কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, কখনও বলা হতো সার্ভার সমস্যা, আবার কখনও কর্মকর্তা নেই। কিন্তু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে একই কাজ কয়েক দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যেত।
তুষারধারা এলাকার বাসিন্দা আকাশ হাওলাদার অভিযোগ করেন, নিজের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে তাকে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “টাকা না দিলে কোনো কাজ হতো না। শুধু আমি নই, আরও অনেকেই একইভাবে টাকা দিয়ে সংযোগ নিয়েছে।” তার দাবি, পুরো এলাকায় এই সিন্ডিকেটের ভয় ছিল। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইত না।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের উচ্চপর্যায়ের পরিচিতির কথা বলে ভয় দেখাতেন। কেউ অভিযোগ করতে চাইলে তাকে বলা হতো, “উপর পর্যন্ত যোগাযোগ আছে, কিছুই হবে না।” এ ধরনের কথাবার্তায় সাধারণ মানুষ আরও নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তেন।
এমন অভিযোগও রয়েছে যে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বদলি হওয়ার পরও তাদের প্রভাব অটুট ছিল। স্থানীয়দের ধারণা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের কারণেই এই সিন্ডিকেট এতদিন টিকে থাকতে পেরেছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না, সেবার মানও ধসে পড়ে। নিয়মবহির্ভূত সংযোগের কারণে লোড ম্যানেজমেন্টে সমস্যা হয়, ট্রান্সফরমারের ওপর চাপ বাড়ে, সিস্টেম লস বৃদ্ধি পায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের আস্থার।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ফাইল, মিটার রেকর্ড, সংযোগ অনুমোদনের নথি, আর্থিক লেনদেন এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত এবং আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তারা আরও বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ, বিল সংশোধন, লোড অনুমোদনসহ সব সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। আবেদনকারীরা যেন অনলাইনে দেখতে পারেন তাদের ফাইল কোথায় আছে, কত দিনে কাজ শেষ হবে এবং বিলম্বের কারণ কী। এতে দালালচক্র ও ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ কমবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের মতে, বিদ্যুৎ সেবা কোনো ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের ব্যবসা হতে পারে না। এটি জনগণের অধিকার। সেই অধিকার ফিরিয়ে আনতেই প্রয়োজন জবাবদিহি, শুদ্ধি অভিযান এবং কঠোর শাস্তি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতির মামলায় টিউলিপসহ ২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন পেছাল

ডিপিডিসি’র প্রকৌশলী হেলালের সিন্ডিকেটে মাতুয়াইলে ঘুষ, অনিয়ম

আপডেট সময় ১২:৩৩:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

রাজধানীর মাতুয়াইল এলাকায় ঢাকা পাওয়ার ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেড (ডিপিডিসি)-এর একটি কার্যালয়কে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা কথিত একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষোভ ও আতঙ্ক বিরাজ করছে। অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছেন ডিপিডিসির তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীন। স্থানীয় গ্রাহক, ব্যবসায়ী ও ভুক্তভোগীদের দাবি, তার নেতৃত্বে একটি প্রভাবশালী চক্র বিদ্যুৎ সংযোগ, লোড অনুমোদন, মিটার পরিবর্তন, বিল সংশোধন এবং নানা প্রশাসনিক কাজকে ঘিরে ঘুষ বাণিজ্যের সাম্রাজ্য গড়ে তোলে। সাধারণ মানুষকে জিম্মি করে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, নির্বাহী প্রকৌশলী হেলাল উদ্দীনের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করেছেন দুই উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. আবুল বাশার তালুকদার ও মো. মঞ্জুরুল কাদের। তাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ে সক্রিয় ছিলেন লাইনম্যান মেট মো. ওবাইদুর রহমান টিপু এবং ড্রাইভার মো. উজ্জ্বল মিয়া। স্থানীয়দের ভাষ্য, এই পাঁচজনকে ঘিরেই গড়ে ওঠে এমন একটি বলয়, যেখানে নিয়মের চেয়ে বেশি কার্যকর ছিল ব্যক্তিগত যোগাযোগ ও অর্থ লেনদেন। অফিসে কোনো ফাইলের গতি কত হবে, কার সংযোগ আগে হবে, কার বিল সংশোধন হবে, কার আবেদন ঝুলে থাকবে—সবকিছুই নির্ধারিত হতো সিন্ডিকেটের ইচ্ছায়।
সম্প্রতি বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ে জমা পড়া একটি লিখিত অভিযোগে এসব অনিয়মের বিস্তারিত উঠে আসে। অভিযোগকারী হিসেবে তুষারধারা এলাকার বাসিন্দা মো. শরিফের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। তিনি দাবি করেন, দীর্ঘদিন ধরে সাধারণ গ্রাহকদের হয়রানি করে অবৈধ সুবিধা আদায় করা হচ্ছে। নিয়ম অনুযায়ী কাজ করতে গেলে মাসের পর মাস ঘুরতে হয়, কিন্তু নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা দিলেই দ্রুত সমাধান মিলত।
অভিযোগপত্রে বলা হয়, হেলাল উদ্দীন তার আগের কর্মস্থল থেকে ঘনিষ্ঠ লোকজনকে নিজের প্রভাব খাটিয়ে বর্তমান কার্যালয়ে নিয়ে আসেন। যাদের মধ্যে আবুল বাশার তালুকদার ও মঞ্জুরুল কাদেরের বিরুদ্ধে আগেও নানা অনিয়মের অভিযোগ ছিল। সে সময় তাদের অন্যত্র বদলি করা হলেও পরে রহস্যজনকভাবে আবার একই এলাকায় ফিরে আসেন। স্থানীয়দের ভাষ্য, ফিরে এসেই তারা আরও বেপরোয়া হয়ে ওঠেন এবং আগের চেয়ে সংগঠিতভাবে ঘুষ বাণিজ্য শুরু করেন।
গ্রাহকদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের প্রধান আয়ের উৎস ছিল নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ। বিশেষ করে বহুতল ভবন, বাণিজ্যিক স্থাপনা ও শিল্পপ্রতিষ্ঠানের সংযোগের ক্ষেত্রে বড় অঙ্কের অর্থ দাবি করা হতো। একটি বহুতল ভবনে প্রায় ৯৮ কিলোওয়াট লোড থাকা সত্ত্বেও উচ্চ ক্ষমতার এইচটি সংযোগ না দিয়ে ১৪ লাখ টাকা ঘুষের বিনিময়ে এলটি সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। বিদ্যুৎ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এমন সিদ্ধান্ত শুধু নিয়মবহির্ভূতই নয়, এটি বিপজ্জনকও। উচ্চ লোডের ভবনে নিম্ন ক্ষমতার সংযোগ দিলে অতিরিক্ত চাপ তৈরি হয়, যার ফলে শর্ট সার্কিট, ট্রান্সফরমার বিকল হওয়া কিংবা অগ্নিকাণ্ডের মতো ঘটনা ঘটতে পারে।
একই ধরনের আরেক অভিযোগ রয়েছে তুষারধারা এলাকার একটি ভবনকে ঘিরে। সেখানে প্রায় ১০ লাখ টাকা নিয়ে এইচটি গ্রাহককে এলটি গ্রাহকে রূপান্তর করা হয় বলে অভিযোগ। শুধু তাই নয়, অনুমোদিত নকশার বাইরে অতিরিক্ত আটটি মিটারও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের মতে, এসব সুবিধা শুধু টাকার বিনিময়েই মিলত।
পলাশপুর এলাকার একটি ১০ তলা ভবনেও নিয়ম অনুযায়ী এইচটি সংযোগ দেওয়ার কথা থাকলেও সেখানে এলটি সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। একইভাবে আরেকটি বহুতল ভবনের ক্ষেত্রেও একই ধরনের অনিয়মের কথা উঠে এসেছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, এসব ক্ষেত্রে কারিগরি নিয়ম বা নিরাপত্তা নয়, মূল বিবেচ্য ছিল কত টাকা দেওয়া হচ্ছে।
সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে ডুপ্লিকেট মিটার ব্যবহার ও বিল জালিয়াতির অভিযোগও রয়েছে। রায়েরবাগ এলাকার একটি প্রতিষ্ঠানে মিটার পরিবর্তনের পর দীর্ঘ সময় ডুপ্লিকেট মিটার দিয়ে কার্যক্রম চালানো হয় বলে অভিযোগ। পরে বিল সমন্বয়ের নামে পুরো বিষয়টি আড়াল করার চেষ্টা করা হয়। আরেকটি ঘটনায় পুরনো মিটার সরিয়ে নতুন মিটার বসিয়ে আগের ব্যবহার গোপন করার অভিযোগ উঠেছে।
স্থানীয় ব্যবসায়ীদের অভিযোগ, বিল কমানো, অতিরিক্ত বিল ঠিক করা বা বকেয়া মওকুফের ক্ষেত্রেও সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। কেউ বেশি বিল পেলে নিয়ম অনুযায়ী অভিযোগ জানালে দীর্ঘসূত্রতায় পড়তে হতো। কিন্তু দালালের মাধ্যমে গেলে দ্রুত সমাধান পাওয়া যেত। এতে সাধারণ গ্রাহক বাধ্য হয়ে অনৈতিক পথে যেতে বাধ্য হন।
শিল্প সংযোগের ক্ষেত্রেও অনিয়মের অভিযোগ কম নয়। ডগাইর এলাকার একটি কারখানায় ব্যাংক ডিপোজিট ছাড়াই বিদ্যুতের পোল স্থানান্তর করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আরেকটি শিল্পপ্রতিষ্ঠানে মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে নিম্নমানের যন্ত্রপাতি দিয়ে সাবস্টেশন নির্মাণ এবং প্রয়োজনীয় শর্ত পূরণ না করেই সংযোগ দেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। বিদ্যুৎ প্রকৌশলীদের মতে, নিম্নমানের সরঞ্জাম ব্যবহার করলে তা বড় দুর্ঘটনার কারণ হতে পারে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, অফিস সময়ে সিন্ডিকেট সদস্যদের কেউ কেউ প্রকৌশলীদের কক্ষে বসে থাকতেন এবং কে কত টাকা দেবে, কার কাজ হবে—এসব নিয়ে সিদ্ধান্ত নিতেন। সাধারণ গ্রাহকরা সরাসরি গেলে নানা অজুহাতে ফিরিয়ে দেওয়া হতো। কখনও বলা হতো কাগজপত্র অসম্পূর্ণ, কখনও বলা হতো সার্ভার সমস্যা, আবার কখনও কর্মকর্তা নেই। কিন্তু সিন্ডিকেটের মাধ্যমে যোগাযোগ করলে একই কাজ কয়েক দিনের মধ্যে সম্পন্ন হয়ে যেত।
তুষারধারা এলাকার বাসিন্দা আকাশ হাওলাদার অভিযোগ করেন, নিজের বাড়িতে বিদ্যুৎ সংযোগ নিতে তাকে ৫ লাখ টাকা দিতে হয়েছে। তিনি বলেন, “টাকা না দিলে কোনো কাজ হতো না। শুধু আমি নই, আরও অনেকেই একইভাবে টাকা দিয়ে সংযোগ নিয়েছে।” তার দাবি, পুরো এলাকায় এই সিন্ডিকেটের ভয় ছিল। কেউ প্রকাশ্যে কথা বলতে চাইত না।
অভিযুক্তদের বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত প্রভাব খাটানোর অভিযোগও রয়েছে। স্থানীয়রা বলেন, সিন্ডিকেটের সদস্যরা নিজেদের উচ্চপর্যায়ের পরিচিতির কথা বলে ভয় দেখাতেন। কেউ অভিযোগ করতে চাইলে তাকে বলা হতো, “উপর পর্যন্ত যোগাযোগ আছে, কিছুই হবে না।” এ ধরনের কথাবার্তায় সাধারণ মানুষ আরও নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তেন।
এমন অভিযোগও রয়েছে যে, সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আগেও অভিযোগ উঠেছিল, কিন্তু কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বদলি হওয়ার পরও তাদের প্রভাব অটুট ছিল। স্থানীয়দের ধারণা, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও অভ্যন্তরীণ যোগসাজশের কারণেই এই সিন্ডিকেট এতদিন টিকে থাকতে পেরেছে।
বিদ্যুৎ খাত সংশ্লিষ্টরা বলছেন, একটি সেবামূলক প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের সিন্ডিকেট গড়ে ওঠা অত্যন্ত উদ্বেগজনক। কারণ এতে শুধু আর্থিক ক্ষতিই হয় না, সেবার মানও ধসে পড়ে। নিয়মবহির্ভূত সংযোগের কারণে লোড ম্যানেজমেন্টে সমস্যা হয়, ট্রান্সফরমারের ওপর চাপ বাড়ে, সিস্টেম লস বৃদ্ধি পায় এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ে। সবচেয়ে বড় ক্ষতি হয় জনগণের আস্থার।
সুশাসন বিশ্লেষকদের মতে, অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন। সংশ্লিষ্ট ফাইল, মিটার রেকর্ড, সংযোগ অনুমোদনের নথি, আর্থিক লেনদেন এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবতা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে জড়িতদের বিরুদ্ধে বিভাগীয় ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশনের তদন্ত এবং আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া উচিত।
তারা আরও বলেন, বিদ্যুৎ সংযোগ, বিল সংশোধন, লোড অনুমোদনসহ সব সেবা পুরোপুরি ডিজিটাল ও স্বচ্ছ করতে হবে। আবেদনকারীরা যেন অনলাইনে দেখতে পারেন তাদের ফাইল কোথায় আছে, কত দিনে কাজ শেষ হবে এবং বিলম্বের কারণ কী। এতে দালালচক্র ও ঘুষ বাণিজ্যের সুযোগ কমবে।
এ বিষয়ে অভিযুক্তদের বক্তব্য নেওয়ার চেষ্টা করা হলে আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। তবে এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, অভিযোগগুলো গুরুত্বসহকারে তদন্ত করা হবে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তাদের মতে, বিদ্যুৎ সেবা কোনো ব্যক্তি বা সিন্ডিকেটের ব্যবসা হতে পারে না। এটি জনগণের অধিকার। সেই অধিকার ফিরিয়ে আনতেই প্রয়োজন জবাবদিহি, শুদ্ধি অভিযান এবং কঠোর শাস্তি।