ঢাকা ০২:০৫ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬, ৩ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::

ড্রেজিং প্রকল্পে রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং কার্যক্রম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম। দেশের নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সচল রাখা এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে ড্রেজিং কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও বাস্তব মাঠপর্যায়ে নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা, তদারকির ঘাটতি এবং আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মহলে বাড়ছে উদ্বেগ। আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের নাম। বিআইডব্লিউটিএ’র অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র, নৌপথ ব্যবহারকারী, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বহু নৌপথে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। যাত্রীবাহী লঞ্চ, কার্গো জাহাজ ও ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রতি বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয় ড্রেজিং কার্যক্রমে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় কাগজে-কলমে কাজের পরিমাণ বেশি দেখানো হয়। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেজিংয়ের মতো কারিগরি খাতে পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহিতা দুর্বল হলে ব্যয় বাড়ে, ফল কমে যায়। আর এই পুরো ব্যবস্থার কারিগরি নেতৃত্বে থাকায় প্রশ্নের মুখে পড়েছেন প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আরিচা-কাজীরহাট, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, ভৈরব-আশুগঞ্জ, মোংলা-ঘষিয়াখালীসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে ড্রেজিং কাজ নিয়মিত চলার কথা থাকলেও অনেক সময় নির্ধারিত সক্ষমতায় কাজ হয় না। কোথাও কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও উৎপাদন কম, কোথাও নির্ধারিত গভীরতা অর্জিত হয়নি, আবার কোথাও খননকৃত মাটি অপসারণে নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নদীর পাড় থেকে নিরাপদ দূরত্বে অপসারণকৃত বালু ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে কাছাকাছি স্থানে ফেলায় তা আবার নদীতে ফিরে আসে—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা। এতে একই স্থানে বারবার ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন পড়ে এবং ব্যয় বাড়ে।
বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড্রেজিং কার্যক্রমের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর মনিটরিং। প্রতিটি ড্রেজার কত ঘণ্টা চলল, কত ঘনমিটার মাটি তুলল, কোথায় ফেলল—এসব তথ্য ডিজিটালভাবে যাচাইয়ের আধুনিক ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টের ওপর নির্ভরতা বেশি। এ সুযোগে অনেক সময় অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় চাইলে আরও কঠোর তদারকি চালু করতে পারত, কিন্তু সে ধরনের দৃশ্যমান উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয়।
ড্রেজিং কার্যক্রমে জ্বালানি ব্যয় সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ড্রেজার পূর্ণ সক্ষমতায় না চললেও জ্বালানি ব্যয় বেশি দেখানো হয়। আবার কোনো কোনো স্থানে যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকা অবস্থায়ও ব্যয়ের হিসাব তোলা হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনও হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি ড্রেজারে জিপিএস, সেন্সরভিত্তিক ফুয়েল মনিটরিং এবং লাইভ অপারেশন ড্যাশবোর্ড চালু থাকলে এ ধরনের অভিযোগের অবকাশ কমে যেত।
আরেকটি বড় অভিযোগ বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া নিয়ে। বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রেজার ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, নিজস্ব যন্ত্রপাতি মেরামত ও সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে কেন ভাড়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে? কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা এবং কমিশনভিত্তিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবু বিষয়টি নৌ-পরিবহন খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ড্রেজার মেরামত ও যন্ত্রাংশ ক্রয় নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যয় দেখানো, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ, পুরনো যন্ত্রাংশ সংস্কার করে নতুন হিসেবে বিল দেওয়া এবং একই যন্ত্রাংশ বারবার ক্রয়ের মতো অনিয়ম ঘটছে। ফলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অনেক ড্রেজার দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকে। প্রকৌশল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা, সময়মতো ওভারহলিং এবং মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহার নিশ্চিত হলে বহরের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করছে। পদায়ন, প্রকল্প বণ্টন, কাজের অনুমোদন এবং ঠিকাদারি সুবিধা—এসব ক্ষেত্রেও অদৃশ্য চাপ কাজ করে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কেউ কেউ বলছেন, ভিন্নমত পোষণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূরবর্তী স্থানে বদলি, পদোন্নতিতে বঞ্চনা বা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নৌপথ ব্যবহারকারীরা বলছেন, বাস্তব ফলাফলই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যদি ড্রেজিং কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হতো, তবে প্রতি মৌসুমে একই নৌপথে ফের নাব্যতা সংকট তৈরি হতো না। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও তাদের শাখা নদীগুলোর বহু স্থানে এখনও নৌযান আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। শুষ্ক মৌসুমে ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়ে। এতে জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেজিং শুধু মাটি কাটার কাজ নয়; এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। কোথায় কত গভীরতা দরকার, নদীর প্রবাহ কোন দিকে, কোথায় পলি জমছে, অপসারণকৃত বালু কোথায় ফেললে পুনরায় ভরাট হবে না—এসব বিশ্লেষণ ছাড়া টেকসই ফল পাওয়া যায় না। তাদের মতে, কেবল প্রকল্প ব্যয় বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি। এ জায়গায় নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে স্বচ্ছতা কম। কোন নৌপথ অগ্রাধিকার পাবে, কোথায় কত দিন ড্রেজার থাকবে, কেন হঠাৎ স্থান পরিবর্তন করা হলো—এসব বিষয়ে অনেক সময় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও পরিষ্কার ধারণা পান না। এতে পরিকল্পনা বিঘ্নিত হয় এবং কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, কারিগরি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের সম্ভাব্য পদোন্নতি বা আরও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনেও আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এমন কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা ভুল বার্তা দেবে। এতে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল কমে যেতে পারে। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না; তবে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি।
দুর্নীতি দমন, সুশাসন ও জনস্বার্থ নিয়ে কাজ করা মহলগুলোর মতে, ড্রেজিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যয়ের খাত হিসেবে বিবেচিত। এখানে বাস্তব কাজ যাচাই কঠিন হওয়ায় অস্বচ্ছতার সুযোগ থাকে। তাই স্বাধীন অডিট, তৃতীয় পক্ষের মনিটরিং, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ, রিয়েল-টাইম ডাটা প্রকাশ এবং নাগরিক নজরদারি চালু করা উচিত। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি জনগণের সামনে থাকবে এবং অনিয়ম কমবে।
নৌ-পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নাব্যতা সংকটে তাদের বাড়তি জ্বালানি খরচ, সময় ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। একটি কার্গো জাহাজ যদি কম গভীরতার কারণে পূর্ণ মালামাল নিতে না পারে, তবে একই পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ট্রিপ দিতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে বাজারদরে। তাই ড্রেজিং খাতে দুর্বলতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রয়োজন ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কার। তবে নেতৃত্বের জবাবদিহিতা ছাড়া সেই সংস্কার সম্ভব নয়। প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে রাকিবুল ইসলামের সময়কালে গৃহীত প্রকল্প, ব্যয়, ফলাফল, যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং পদায়ন সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগ সত্য না হলে তিনিও দায়মুক্ত হবেন, আর সত্য হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে আস্থা ফিরিয়ে আনতে অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে গুজব বাড়ে, কর্মপরিবেশ নষ্ট হয় এবং সেবার মান কমে যায়। তাই বিআইডব্লিউটিএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যে কোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
এদিকে নদী ও নৌপথ রক্ষায় কাজ করা পরিবেশবাদীরা মনে করেন, ড্রেজিংকে শুধু ব্যয় প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় সম্পদ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদী বাঁচলে কৃষি, বাণিজ্য, পরিবহন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। তাই এই খাতে দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা চলতে দেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলা।
সব মিলিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু ব্যক্তি-সমালোচনার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা, নৌপথ সচল রাখা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, স্বচ্ছ তদন্ত, কার্যকর সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ছাড়া এই বিতর্কের অবসান হবে না। দেশের নৌপথ রক্ষার স্বার্থে এখন সবার নজর বিআইডব্লিউটিএ’র পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

দুর্নীতির মামলায় টিউলিপসহ ২ জনের বিরুদ্ধে অভিযোগ গঠন পেছাল

ড্রেজিং প্রকল্পে রাকিবুল ইসলামের বিরুদ্ধে অনিয়মের অভিযোগ

আপডেট সময় ১২:৩৮:১৩ অপরাহ্ন, বৃহস্পতিবার, ১৬ এপ্রিল ২০২৬

বাংলাদেশ অভ্যন্তরীণ নৌ-পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআইডব্লিউটিএ)-এর ড্রেজিং কার্যক্রম ও প্রকল্প বাস্তবায়ন নিয়ে নতুন করে আলোচনায় উঠে এসেছেন প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম। দেশের নদ-নদীর নাব্যতা রক্ষা, গুরুত্বপূর্ণ নৌপথ সচল রাখা এবং নদীভাঙন প্রতিরোধে ড্রেজিং কার্যক্রমের গুরুত্ব অপরিসীম হলেও বাস্তব মাঠপর্যায়ে নানা অনিয়ম, প্রশাসনিক দুর্বলতা, তদারকির ঘাটতি এবং আর্থিক অস্বচ্ছতার অভিযোগে সংশ্লিষ্ট মহলে বাড়ছে উদ্বেগ। আর এসব অভিযোগের কেন্দ্রবিন্দুতে বারবার উচ্চারিত হচ্ছে প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের নাম। বিআইডব্লিউটিএ’র অভ্যন্তরীণ একাধিক সূত্র, নৌপথ ব্যবহারকারী, সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলী ও ঠিকাদারদের সঙ্গে কথা বলে এমন চিত্র পাওয়া গেছে।
দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চল, উত্তরাঞ্চল ও মধ্যাঞ্চলের বহু নৌপথে প্রতি বছর শুষ্ক মৌসুমে নাব্যতা সংকট দেখা দেয়। যাত্রীবাহী লঞ্চ, কার্গো জাহাজ ও ফেরি চলাচলে বিঘ্ন ঘটে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় সরকার প্রতি বছর বিপুল অর্থ বরাদ্দ দেয় ড্রেজিং কার্যক্রমে। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, বাস্তব অগ্রগতির তুলনায় কাগজে-কলমে কাজের পরিমাণ বেশি দেখানো হয়। ফলে কোটি কোটি টাকা ব্যয় হলেও প্রত্যাশিত সুফল মিলছে না। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেজিংয়ের মতো কারিগরি খাতে পরিকল্পনা, তদারকি ও জবাবদিহিতা দুর্বল হলে ব্যয় বাড়ে, ফল কমে যায়। আর এই পুরো ব্যবস্থার কারিগরি নেতৃত্বে থাকায় প্রশ্নের মুখে পড়েছেন প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলাম।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, আরিচা-কাজীরহাট, দৌলতদিয়া-পাটুরিয়া, ভৈরব-আশুগঞ্জ, মোংলা-ঘষিয়াখালীসহ গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথে ড্রেজিং কাজ নিয়মিত চলার কথা থাকলেও অনেক সময় নির্ধারিত সক্ষমতায় কাজ হয় না। কোথাও কোথাও যন্ত্রপাতি থাকলেও উৎপাদন কম, কোথাও নির্ধারিত গভীরতা অর্জিত হয়নি, আবার কোথাও খননকৃত মাটি অপসারণে নিয়ম মানা হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে। নদীর পাড় থেকে নিরাপদ দূরত্বে অপসারণকৃত বালু ফেলার কথা থাকলেও বাস্তবে কাছাকাছি স্থানে ফেলায় তা আবার নদীতে ফিরে আসে—এমন অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নৌযান মালিক ও শ্রমিকরা। এতে একই স্থানে বারবার ড্রেজিংয়ের প্রয়োজন পড়ে এবং ব্যয় বাড়ে।
বিআইডব্লিউটিএ’র একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, ড্রেজিং কার্যক্রমের বড় একটি চ্যালেঞ্জ হলো কার্যকর মনিটরিং। প্রতিটি ড্রেজার কত ঘণ্টা চলল, কত ঘনমিটার মাটি তুলল, কোথায় ফেলল—এসব তথ্য ডিজিটালভাবে যাচাইয়ের আধুনিক ব্যবস্থা এখনও পুরোপুরি কার্যকর হয়নি। ফলে মাঠপর্যায়ের রিপোর্টের ওপর নির্ভরতা বেশি। এ সুযোগে অনেক সময় অতিরঞ্জিত তথ্য দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মকর্তাদের ভাষ্য, প্রধান প্রকৌশলীর কার্যালয় চাইলে আরও কঠোর তদারকি চালু করতে পারত, কিন্তু সে ধরনের দৃশ্যমান উদ্যোগ পর্যাপ্ত নয়।
ড্রেজিং কার্যক্রমে জ্বালানি ব্যয় সবচেয়ে বড় খাতগুলোর একটি। অভিযোগ রয়েছে, কিছু ক্ষেত্রে ড্রেজার পূর্ণ সক্ষমতায় না চললেও জ্বালানি ব্যয় বেশি দেখানো হয়। আবার কোনো কোনো স্থানে যন্ত্রপাতি বন্ধ থাকা অবস্থায়ও ব্যয়ের হিসাব তোলা হয়েছে—এমন অভিযোগও রয়েছে। যদিও এসব অভিযোগের স্বাধীন যাচাই এখনও হয়নি, তবে বিষয়টি নিয়ে প্রতিষ্ঠানের ভেতরে অসন্তোষ বাড়ছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, প্রতিটি ড্রেজারে জিপিএস, সেন্সরভিত্তিক ফুয়েল মনিটরিং এবং লাইভ অপারেশন ড্যাশবোর্ড চালু থাকলে এ ধরনের অভিযোগের অবকাশ কমে যেত।
আরেকটি বড় অভিযোগ বেসরকারি ড্রেজার ভাড়া নিয়ে। বিআইডব্লিউটিএ’র নিজস্ব ড্রেজার বহর থাকা সত্ত্বেও বিভিন্ন সময়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠান থেকে ড্রেজার ভাড়া নেওয়া হয়েছে। সংশ্লিষ্টদের প্রশ্ন, নিজস্ব যন্ত্রপাতি মেরামত ও সক্ষমতা বাড়ানোর বদলে কেন ভাড়ার ওপর নির্ভরতা বাড়ছে? কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে প্রভাবশালী মহলের ঘনিষ্ঠতা এবং কমিশনভিত্তিক সুবিধা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে আনুষ্ঠানিক তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি, তবু বিষয়টি নৌ-পরিবহন খাতে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে।
ড্রেজার মেরামত ও যন্ত্রাংশ ক্রয় নিয়েও রয়েছে নানা প্রশ্ন। অভিযোগ রয়েছে, প্রয়োজনের তুলনায় বেশি ব্যয় দেখানো, নিম্নমানের যন্ত্রাংশ সরবরাহ, পুরনো যন্ত্রাংশ সংস্কার করে নতুন হিসেবে বিল দেওয়া এবং একই যন্ত্রাংশ বারবার ক্রয়ের মতো অনিয়ম ঘটছে। ফলে কোটি কোটি টাকার সম্পদ থাকা সত্ত্বেও অনেক ড্রেজার দীর্ঘদিন অচল পড়ে থাকে। প্রকৌশল সংশ্লিষ্টরা বলছেন, সঠিক রক্ষণাবেক্ষণ পরিকল্পনা, সময়মতো ওভারহলিং এবং মানসম্মত যন্ত্রাংশ ব্যবহার নিশ্চিত হলে বহরের সক্ষমতা বহুগুণ বাড়ানো সম্ভব।
অভিযোগ রয়েছে, প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে একটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করছে। পদায়ন, প্রকল্প বণ্টন, কাজের অনুমোদন এবং ঠিকাদারি সুবিধা—এসব ক্ষেত্রেও অদৃশ্য চাপ কাজ করে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। কেউ কেউ বলছেন, ভিন্নমত পোষণকারী কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দূরবর্তী স্থানে বদলি, পদোন্নতিতে বঞ্চনা বা প্রশাসনিক চাপের মুখে পড়তে হয়। যদিও এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
নৌপথ ব্যবহারকারীরা বলছেন, বাস্তব ফলাফলই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। যদি ড্রেজিং কার্যক্রম সঠিকভাবে পরিচালিত হতো, তবে প্রতি মৌসুমে একই নৌপথে ফের নাব্যতা সংকট তৈরি হতো না। পদ্মা, যমুনা, মেঘনা ও তাদের শাখা নদীগুলোর বহু স্থানে এখনও নৌযান আটকে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। শুষ্ক মৌসুমে ফেরি চলাচল ব্যাহত হয়, যাত্রী ও পণ্য পরিবহনে সময় ও ব্যয় বাড়ে। এতে জাতীয় অর্থনীতিতেও নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
নদী বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ড্রেজিং শুধু মাটি কাটার কাজ নয়; এটি একটি বিজ্ঞানভিত্তিক ব্যবস্থাপনা। কোথায় কত গভীরতা দরকার, নদীর প্রবাহ কোন দিকে, কোথায় পলি জমছে, অপসারণকৃত বালু কোথায় ফেললে পুনরায় ভরাট হবে না—এসব বিশ্লেষণ ছাড়া টেকসই ফল পাওয়া যায় না। তাদের মতে, কেবল প্রকল্প ব্যয় বাড়ালেই হবে না; প্রয়োজন দক্ষ নেতৃত্ব ও প্রযুক্তিনির্ভর তদারকি। এ জায়গায় নেতৃত্বের দায়িত্বে থাকা প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক।
বিআইডব্লিউটিএ’র ভেতরের কয়েকজন কর্মকর্তা জানান, প্রতিষ্ঠানে দক্ষ জনবল থাকলেও সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্তরে স্বচ্ছতা কম। কোন নৌপথ অগ্রাধিকার পাবে, কোথায় কত দিন ড্রেজার থাকবে, কেন হঠাৎ স্থান পরিবর্তন করা হলো—এসব বিষয়ে অনেক সময় মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তারাও পরিষ্কার ধারণা পান না। এতে পরিকল্পনা বিঘ্নিত হয় এবং কাজের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয়। সংশ্লিষ্টদের মতে, কারিগরি সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত প্রভাব কমিয়ে পেশাদারিত্ব নিশ্চিত করতে হবে।
প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামের সম্ভাব্য পদোন্নতি বা আরও গুরুত্বপূর্ণ পদায়ন নিয়ে প্রশাসনিক অঙ্গনেও আলোচনা রয়েছে। অভিযোগকারীরা বলছেন, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত ছাড়া এমন কোনো সিদ্ধান্ত হলে তা ভুল বার্তা দেবে। এতে সৎ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মনোবল কমে যেতে পারে। অন্যদিকে কেউ কেউ মনে করেন, অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া পর্যন্ত কাউকে দোষী বলা যায় না; তবে স্বচ্ছ তদন্ত জরুরি।
দুর্নীতি দমন, সুশাসন ও জনস্বার্থ নিয়ে কাজ করা মহলগুলোর মতে, ড্রেজিং খাত দীর্ঘদিন ধরেই ঝুঁকিপূর্ণ ব্যয়ের খাত হিসেবে বিবেচিত। এখানে বাস্তব কাজ যাচাই কঠিন হওয়ায় অস্বচ্ছতার সুযোগ থাকে। তাই স্বাধীন অডিট, তৃতীয় পক্ষের মনিটরিং, স্যাটেলাইট ইমেজ বিশ্লেষণ, রিয়েল-টাইম ডাটা প্রকাশ এবং নাগরিক নজরদারি চালু করা উচিত। এতে প্রকল্পের অগ্রগতি জনগণের সামনে থাকবে এবং অনিয়ম কমবে।
নৌ-পরিবহন খাতের ব্যবসায়ীরা বলছেন, নাব্যতা সংকটে তাদের বাড়তি জ্বালানি খরচ, সময় ক্ষতি ও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়ছে। একটি কার্গো জাহাজ যদি কম গভীরতার কারণে পূর্ণ মালামাল নিতে না পারে, তবে একই পণ্য পরিবহনে অতিরিক্ত ট্রিপ দিতে হয়। এতে পরিবহন ব্যয় বাড়ে, যার প্রভাব পড়ে বাজারদরে। তাই ড্রেজিং খাতে দুর্বলতা কেবল একটি প্রতিষ্ঠানের সমস্যা নয়; এটি জাতীয় অর্থনীতির সঙ্গেও সরাসরি সম্পর্কিত।
সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকদের মতে, এখন প্রয়োজন ব্যক্তি নয়, পুরো ব্যবস্থার সংস্কার। তবে নেতৃত্বের জবাবদিহিতা ছাড়া সেই সংস্কার সম্ভব নয়। প্রধান প্রকৌশলী হিসেবে রাকিবুল ইসলামের সময়কালে গৃহীত প্রকল্প, ব্যয়, ফলাফল, যন্ত্রপাতি ব্যবস্থাপনা, টেন্ডার প্রক্রিয়া এবং পদায়ন সিদ্ধান্তগুলো স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসতে পারে। অভিযোগ সত্য না হলে তিনিও দায়মুক্ত হবেন, আর সত্য হলে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।
প্রশাসন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি প্রতিষ্ঠানে আস্থা ফিরিয়ে আনতে অভিযোগের দ্রুত ও নিরপেক্ষ নিষ্পত্তি জরুরি। দীর্ঘসূত্রতা তৈরি হলে গুজব বাড়ে, কর্মপরিবেশ নষ্ট হয় এবং সেবার মান কমে যায়। তাই বিআইডব্লিউটিএ’র মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে যে কোনো অভিযোগ গুরুত্বের সঙ্গে দেখা উচিত।
এদিকে নদী ও নৌপথ রক্ষায় কাজ করা পরিবেশবাদীরা মনে করেন, ড্রেজিংকে শুধু ব্যয় প্রকল্প হিসেবে না দেখে জাতীয় সম্পদ রক্ষার উদ্যোগ হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। নদী বাঁচলে কৃষি, বাণিজ্য, পরিবহন ও জীববৈচিত্র্য রক্ষা পাবে। তাই এই খাতে দুর্নীতি বা অব্যবস্থাপনা চলতে দেওয়া মানে দেশের ভবিষ্যৎকে ঝুঁকিতে ফেলা।
সব মিলিয়ে বিআইডব্লিউটিএ’র প্রধান প্রকৌশলী রাকিবুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু ব্যক্তি-সমালোচনার বিষয় নয়; এটি রাষ্ট্রীয় অর্থ ব্যবস্থাপনা, নদী রক্ষা, নৌপথ সচল রাখা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতার বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। সংশ্লিষ্ট মহল মনে করছে, স্বচ্ছ তদন্ত, কার্যকর সংস্কার এবং প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ছাড়া এই বিতর্কের অবসান হবে না। দেশের নৌপথ রক্ষার স্বার্থে এখন সবার নজর বিআইডব্লিউটিএ’র পরবর্তী পদক্ষেপের দিকে।