ডিলারদের দোকানে দোকানে সাঁটানো সারের সরকারি মূল্যতালিকা। তবে তা নিছক লোক দেখানো। কোনো সারই সরকার নির্ধারিত দামে বিক্রি করেন না ডিলাররা। সবচেয়ে বেশি চাহিদা থাকা দেশে উৎপাদিত টিএসপির দামও এখানে দ্বিগুণ। প্রশাসনের তদারকিও নেই এসব বিষয়ে। সারের বাজারের এই চিত্র গাজীপুর জেলার বিভিন্ন উপজেলার।
তথ্য বলছে, বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ কর্পোরেশন (বিসিআইসি) ও বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন কর্পোরেশনের (বিএডিসি) গুদাম থেকে সার বের হয়ে ডিলার ও সাব-ডিলারদের কাছে যায়। ডিলার ও সাব-ডিলারদের কাছে থাকা সারের তথ্য নিয়মিত হালনাগাদ করে কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর। ইউরিয়া সারের জোগান আসে শিল্প মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিসিআইসির স্থানীয় উৎপাদন ও বিদেশ থেকে আমদানির মাধ্যমে। আর নন-ইউরিয়া সারের টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি এর জোগান দিয়ে থাকে কৃষি মন্ত্রণালয়ের আওতাধীন বিএডিসি। এর পাশাপাশি নন-ইউরিয়া সারের একটা যোগান আসে বেসরকারি আমদানিকারকদের মাধ্যমে। তবুও সরকার নির্ধারিত দামে কেনও সার পাচ্ছেন না কৃষকরা? এমন প্রশ্ন এখন সবার।
অনুসন্ধানে দেখা যায়, সরকার নির্ধারিত মূল্যকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে চলতি রবি মৌসুমে কৃত্রিম সংকট দেখিয়ে জেলার ডিলার, সাব-ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সরকার নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন। বিশেষ করে ইউরিয়া, ট্রিপল সুপার ফসফেট (টিএসপি) ও মিউরেট অব পটাশ (এমওপি) সার বেশি দামে বিক্রি করছে। আর ডিলার ও বিক্রেতাদের এসব কাজে সহযোগিতা করছেন উপজেলা কৃষি অফিসের কর্মকর্তারাও। এমন সময়ে উপজেলা কৃষি অফিসের নিরব ভূমিকা কৃষকদের মনেও জাগিয়ে তুলছে নানা প্রশ্ন।
কৃষকদের অভিযোগ, ডিলারেরা কৃষকদের কাছে সার বিক্রি না করে অতিরিক্ত দামে খুচরা বিক্রেতাদের কাছে বিক্রি করছেন। পরে সেই সার খুচরা বিক্রেতাদের কাছ থেকে কৃষকদের বেশি দামে কিনতে হচ্ছে। এর পরও চাহিদামত সার পাচ্ছেন না তারা। যদিও কৃষি অধিদপ্তর সারের কোনো সংকট নেই বলে দাবি করছেন।
সরেজমিনে কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ডিলার ও খুচরা সার বিক্রেতারা দোকানে মূল্য তালিকা টাঙ্গিয়ে রাখলেও সে অনুযায়ী বিক্রি করছেন না তারা। প্রতি বস্তা সার সরকারি মূল্যের চেয়ে প্রকারান্তরে ২০০ থেকে ৩০০ টাকা বেশি দরে বিক্রি করছেন। কৃষক সার কিনতে গেলে ডিলার ও খুচরা বিক্রেতারা সংকটের কথা বলেন। তবে দাম বেশি দিলেই সার পাওয়া যাচ্ছে। এ ছাড়া বিক্রেতারা কৃষকদের কোনো সঠিক বিক্রয় রসিদ দেন না। আর যেটা কৃষকদের দেন তার চেয়ে বেশি দাম দিয়ে সার কিনতে হয়। ডিলার/খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তারা এভাবে জিম্মি হয়ে পড়েছে। সরকার অনুমোদিত এই সকল ডিলার/সাব-ডিলাররা সরকারি নির্দেশনা না মানায় দেখা দিয়েছে সারের কৃত্রিম সংকট। আর এতে বাড়বে কৃষি উৎপাদন খরচ।
কয়েকজন কৃষকের সাথে কথা হলে তারা বলেন, বর্তমানে আলু, গম ও ভুট্টা মাঠে, ধান রোপণ শুরু হয়েছে। এ সময় টিএসপি, বিওপি ও এমওপি সারের সংকট দেখা দিয়েছে। দামের চেয়ে অতিরিক্ত টাকা দিলেই সার মিলছে। ডিলারের কাছে গেলে বলে সার নেই। ডিলাররা রাতারাতি সার নিয়ে খুচরা বিক্রেতাদের দিয়ে দিচ্ছেন। এজন্য আমরা সার পাচ্ছি না। উপজেলা প্রশাসন যদি অভিযান চালায় তাহলে আর সারের কৃত্রিম সংকট থাকবে না।
বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরোর (বিবিএস) তথ্য বলছে, ২০২৪ সালের জুনে খাবারসহ শ্রমিক খরচ ছিল ৫৪৪ টাকা। আগের বছরের জুলাইয়ে তা ছিল ৫১১ টাকা। ২০২৩ সালে বিগত আওয়ামী লীগ সরকার ইউরিয়া, ডিএপি, টিএসপি ও এমওপি সারের দাম কেজিপ্রতি ছয় টাকা বাড়ানোর এক বছরেরও কম সময়ের মধ্যে প্রতি কেজিতে আরও পাঁচ টাকা বেড়েছে। চলতি অর্থবছরে মোট ৫৯ লাখ টন ইউরিয়া, টিএসপি, ডিএপি ও এমওপি প্রয়োজন হবে বলে সরকারের পূর্বাভাসে বলা হয়েছে। এক বছর আগের তুলনায় তা তিন শতাংশ বেশি।
রাসায়নিক সার প্রধানত শুষ্ক মৌসুমের বোরো ধান চাষে ব্যবহার করা হয়। এই ধান মে মাসে কাটা হয়।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, বোরো ধান চাষে যে পরিমাণ সার প্রয়োজন হয় এর প্রায় ৬০ শতাংশ প্রয়োগ করা হয় ডিসেম্বর থেকে মার্চে। কিন্তু অনেককে চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না।
বিভিন্ন সূত্র বলছে, জেলার কাপাসিয়া, কালীগঞ্জ, কালিয়াকৈর, সদর উপজেলাসহ অনেক স্থানে বিক্রেতারা বেশি দাম নেয়ার কারণে সার বিক্রির পর রশিদ দিতে অস্বীকার করেছেন। সার, কীটনাশক ও শ্রমিকের বাড়তি খরচের কারণে তাদের মতো কৃষকরা ধান চাষে হিমশিম খাচ্ছে। অন্যদিকে, তারা ফসলের ন্যায্যমূল্য থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, চাষের মৌসুমে বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে দপ্তর ও স্থানীয় প্রশাসনের অভিযান অব্যাহত রাখতে হবে। তাহলে নির্ধারিত দামের তুলনায় সারের দাম বেশি হওয়ার কথা নয়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন খুচরা সার বিক্রেতা জানান, গত দুই মাস আগে থেকেই ইঙ্গিত হিসেবে সারের দাম টুকটাক বাড়ানো হচ্ছিল। মূলত তখন থেকেই গুদাম ঘরে সার মজুত শুরু হয়েছে। এখন সংকট দেখিয়ে আমাদের থেকে দাম বেশি নিচ্ছেন ডিলাররা। বলছেন সার নেই! বাড়তি টাকা দিলে ঠিকই চাহিদামত সার মিলছে। এসব ক্রয়-বিক্রয়ে কোন বিক্রয় রশিদ দেওয়া হচ্ছে না।
এদিকে ডিলারদের দাবি, চাহিদার তুলনায় বরাদ্দ কম পাওয়ার কারণে বাজারে সারের কিছুটা সংকট তৈরি হয়েছে। এছাড়া কৃষকরা সার সংকটের গুজবে প্রয়োজনের চেয়ে অতিরিক্ত সার কিনতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে। এ কারণে গুজবের মাত্রা আরও বেশি যোগ হয়েছে।
গাজীপুর জেলার কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপ-পরিচালক জানান, এখন সারের কোন ঘাটতি নেই। এর পরও কোথাও কোথাও সংকটের অজুহাতে বেশি দামে সার বিক্রি করার অভিযোগ পাওয়া যাচ্ছে। আমরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিচ্ছি। আর কৃষি অফিস সংশ্লিষ্ট কেউ জড়িত থাকলেও ব্যবস্থা নেয়া হবে।
গাজীপুর জেলার জেলা প্রশাসক বলেন, বাজার স্থিতিশীল রাখার জন্য আমাদের অভিযান চলমান রয়েছে। কৃত্রিম সার সংকট ও বেশি দামে সার বিক্রির কোন সুযোগ নেই।
এম এ হোসেন 
























