প্রত্যন্ত গ্রামের মাটি থেকে উঠে এসে মেধা, অধ্যবসায় ও কর্মনিষ্ঠার মাধ্যমে নিজের অবস্থান তৈরি করা যায়—কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস যেন তারই এক উজ্জ্বল উদাহরণ।
নেত্রকোনার আটপাড়া উপজেলার রাণীগাঁও গ্রামে তাঁর জন্ম। বাবা প্রয়াত গণেশ চন্দ্র দাস ছিলেন বাংলাদেশ ডাক বিভাগের পরিদর্শক এবং মা মানদা রানী দাস ছিলেন গৃহিণী। সাধারণ পারিবারিক পরিবেশে বেড়ে ওঠা কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস ছোটবেলা থেকেই মেধা ও অধ্যবসায়ের পরিচয় দেন। অষ্টম শ্রেণিতে বৃত্তি অর্জন এবং ১৯৯৫ সালে মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয় থেকে এসএসসি পরীক্ষায় ছয় বিষয়ে লেটারসহ স্টার মার্ক পেয়ে উত্তীর্ণ হওয়া ছিল তাঁর শিক্ষাজীবনের উল্লেখযোগ্য অর্জন।
১৯৯৭ সালে নেত্রকোনা সরকারি কলেজ থেকে এইচএসসি পরীক্ষায় চার বিষয়ে লেটারসহ প্রথম শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়ে তিনি বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি অনুষদে ভর্তি হন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ এবং শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন বিভাগে পড়ার সুযোগ থাকলেও তিনি কৃষিশিক্ষাকে নিজের ভবিষ্যৎ গড়ার পথ হিসেবে বেছে নেন। ২০০৩ সালে কৃষিতে স্নাতক (সম্মান) এবং ২০০৫ সালে কৃষিতত্ত্বে প্রথম শ্রেণিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেন।
তাঁর কর্মজীবনের পথটিও ছিল অভিজ্ঞতা ও অধ্যবসায়ের ধারাবাহিক যাত্রা। ২০০৬ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরোতে কর্মজীবন শুরু, ২০০৮ সালে সোনালী ব্যাংকে কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন এবং অবশেষে ২০১০ সালে ২৮তম বিসিএসের মাধ্যমে কৃষি ক্যাডারে যোগদান—প্রতিটি ধাপ তাঁকে নতুন অভিজ্ঞতায় সমৃদ্ধ করেছে।
কক্সবাজার, সিলেট, শেরপুর, জামালপুর ও ময়মনসিংহে দায়িত্ব পালন করে তিনি কৃষি প্রশাসনের নানা ক্ষেত্রে অভিজ্ঞতা অর্জন করেন। খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করা, নিরাপদ খাদ্য উৎপাদন, কৃষির বাণিজ্যিকীকরণ, কৃষি যান্ত্রিকীকরণ ও সুষম সার ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করেছেন। বর্তমানে তিনি কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রশাসন ও অর্থ উইংয়ে অতিরিক্ত উপপরিচালক (এল.আর.) হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন।
তবে তাঁর অর্জনের গল্প শুধু চাকরির পদবি কিংবা পেশাগত সাফল্যে সীমাবদ্ধ নয়; গবেষণার জগতে প্রবেশও তাঁর স্বপ্নের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
২০১৫ সালে চীন সরকারের আমন্ত্রণে হাইব্রিড ধান চাষের আধুনিক প্রযুক্তিবিষয়ক ৯০ দিনব্যাপী প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেন। চীন, ভারত, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়া সফরের অভিজ্ঞতাও তাঁর পেশাগত জ্ঞানকে সমৃদ্ধ করেছে।
বর্তমানে বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্রহ্মপুত্র-যমুনা অববাহিকার চরাঞ্চলে শস্যবিন্যাসের উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির ওপর পিএইচডি গবেষণা করছেন। তাঁর গবেষণাপত্র “Maize-based intercropping systems in Bangladesh: Exploring the potential of spice and tuber crops in charland areas” আন্তর্জাতিক গবেষণা সাময়িকী Agronomy Journal-এ প্রকাশিত হয়েছে। এই অর্জন প্রমাণ করে, দায়িত্বশীল চাকরির পাশাপাশি জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার প্রতিও তাঁর গভীর আগ্রহ রয়েছে।
মানুষের জন্য কাজ করাই বড় অর্জন
একজন মানুষের প্রকৃত সাফল্য কেবল নিজের উন্নতিতে নয়, অন্য মানুষের জীবনেও ইতিবাচক পরিবর্তন আনার মধ্যে নিহিত। কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস সেই মানবিক মূল্যবোধকে ধারণ করেন তাঁর জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ডে।
তিনি Lions Club of Dhaka-Mymensingh Heritage-এর সদস্য হিসেবে নিজ এলাকার প্রায় ৭০০ দরিদ্র ও অসহায় মানুষকে বিনামূল্যে চক্ষুচিকিৎসাসেবা প্রদান এবং ১১০ জনের চোখের ছানি অপারেশনের উদ্যোগে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছেন। পাশাপাশি সপ্তগ্রাম জনকল্যাণ সমিতি এবং ময়মনসিংহ উৎপাদনমুখী সমবায় সমিতি লিমিটেডের সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন।
একদিকে কৃষি প্রশাসনের দায়িত্ব, অন্যদিকে গবেষণা এবং অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়ানোর প্রয়াস—এই তিনটি ক্ষেত্র তাঁর জীবনকে দিয়েছে আলাদা তাৎপর্য।
আমাদের গর্ব, আমাদের অনুপ্রেরণা
মোহনগঞ্জ পাইলট সরকারি উচ্চ বিদ্যালয়ের একজন প্রাক্তন শিক্ষার্থী হিসেবে কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাসকে নিয়ে আমরা গর্ব করতেই পারি।
তাঁর এই পথচলা নতুন প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন দেখতে, বাধা অতিক্রম করতে এবং নিজেদের যোগ্য মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে অনুপ্রাণিত করুক।
আমাদের প্রত্যাশা—কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাস সুস্থ থাকুন, দীর্ঘ কর্মজীবনে কৃষি ও কৃষকের কল্যাণে আরও অবদান রাখুন এবং মানবসেবার মাধ্যমে মানুষের ভালোবাসায় সিক্ত হোন।
শুধু একজন সফল কর্মকর্তা হিসেবে নয়, একজন দায়িত্বশীল গবেষক ও মানবিক মানুষ হিসেবেও তাঁর পথচলা হয়ে উঠুক আগামী প্রজন্মের জন্য অনুকরণীয়।
শ্রদ্ধা ও শুভকামনা—আমাদের গর্বিত পাইলটিয়ান কৃষিবিদ পরেশ চন্দ্র দাসের জন্য।
মো. আরিফুল ইসলাম মুরাদ-সিনিয়র সাংবাদিক 



















