রাষ্ট্রায়ত্ত অগ্রণী ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা নিয়োগের সিদ্ধান্তে ব্যাংকটির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে ক্ষোভ, হতাশা ও মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে বেসরকারি ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) পদমর্যাদার একজন কর্মকর্তাকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন দেওয়ায় ব্যাংকপাড়ায় শুরু হয়েছে আলোচনা-সমালোচনা। বিষয়টি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমেও চলছে তর্ক-বিতর্ক।
অগ্রণী ব্যাংকের বিভিন্ন শাখায় একের পর এক জালিয়াতি, অর্থ আত্মসাৎ, ভল্ট থেকে টাকা সরিয়ে নেওয়া এবং লকারের স্বর্ণালংকার নিয়ে যাওয়ার অভিযোগের মধ্যে নতুন এমডি নিয়োগের বিষয়টি সামনে এসেছে। এসব ঘটনায় ব্যাংকটির শাখা পর্যায়ের নিরাপত্তা, অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ও তদারকি ব্যবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন গ্রাহকরা।
ব্যাংকের বিভিন্ন সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, নীলফামারীর সৈয়দপুর, পাবনার কাশিনাথপুর, চাঁদপুরের ছেংগারচর বাজার, চট্টগ্রামের লালদিঘী পূর্ব করপোরেট ও মুন্সীগঞ্জের শ্রীনগর শাখায় বড় অঙ্কের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ সামনে এসেছে। এর বাইরে আরও কয়েকটি শাখায় অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ রয়েছে। এসব ঘটনার কয়েকটির তদন্ত চলছে। কোনো কোনো ঘটনায় মামলা ও গ্রেপ্তারও হয়েছে।
ব্যাংক সূত্রের অভিযোগ, দুর্বল ব্যবস্থাপনা, পর্যাপ্ত তদারকির অভাব এবং অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ ব্যবস্থার দুর্বলতার সুযোগে এসব ঘটনা ঘটেছে।
এমন পরিস্থিতিতে বেসরকারি ব্যাংক থেকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি নিয়োগের বিষয়টি মেনে নিতে পারছেন না ব্যাংকটির নির্বাহী কর্মকর্তা ও কর্মচারীদের অনেকে। তাদের মতে, অগ্রণী ব্যাংকের অভিজ্ঞ কোনো কর্মকর্তা কিংবা সরকারি ব্যাংকের কোনো যোগ্য কর্মকর্তাকে এমডি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলে ব্যাংকটির বিদ্যমান সমস্যাগুলো সম্পর্কে ভালোভাবে অবগত থেকে কার্যকরভাবে ব্যবস্থাপনার হাল ধরা সম্ভব হতো।
তাদের ভাষ্য, ব্যাংকের শাখাগুলোতে একের পর এক অনিয়ম ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগের মধ্যে বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগ না দিয়ে অগ্রণী ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ ব্যবস্থাপনা সম্পর্কে অভিজ্ঞ কাউকে দায়িত্ব দেওয়া হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনা সহজ হতে পারে।
নূর মোহাম্মদকে ঘিরে প্রশ্ন
সরকারের পক্ষ থেকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের জন্য মনোনীত নূর মোহাম্মদ যমুনা ব্যাংকের ডেপুটি ম্যানেজিং ডিরেক্টর (ডিএমডি) হিসেবে আছেন। ২০২০ সালের শেষের দিকে তিনি যমুনা ব্যাংকের ডিএমডি হিসেবে নিয়োগ পান।
এর আগে তিনি ইউনাইটেড কমার্শিয়াল ব্যাংকের (ইউসিবি) সিনিয়র এক্সিকিউটিভ ভাইস প্রেসিডেন্ট ও করপোরেট বিজনেস বিভাগের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৮ সালে ইস্টার্ন ব্যাংকে প্রবেশনারি অফিসার হিসেবে ব্যাংকিং ক্যারিয়ার শুরু করেন নূর মোহাম্মদ। পরে তিনি ওয়ান ব্যাংকেও কাজ করেন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফাইন্যান্স বিষয়ে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি অর্জন করেছেন তিনি।
বেসরকারি ব্যাংকগুলোতে ডিএমডির পরবর্তী পদ অ্যাডিশনাল ম্যানেজিং ডিরেক্টর (এএমডি), যা সরকারি ব্যাংকের ডিএমডি পদের সমমান—এমন যুক্তি তুলে ধরে নূর মোহাম্মদের মনোনয়ন নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন কেউ কেউ। তাদের প্রশ্ন, এ অবস্থায় তিনি কীভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন পেলেন।
সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যেও হতাশা
এ নিয়োগকে ঘিরে সরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের মধ্যেও নানা আলোচনা চলছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি ব্যাংকে ডিএমডি থেকে এমডি হওয়ার জন্য যোগ্য কর্মকর্তাদের কর্মদক্ষতা ও অভিজ্ঞতা কেন মূল্যায়ন করা হলো না। একই সঙ্গে প্রশ্ন উঠেছে, তাহলে কি সরকারি ব্যাংকের ডিএমডি পর্যায়ের কর্মকর্তারা অযোগ্য বা অদক্ষ। ডিএমডির নিচের পর্যায়ের কর্মকর্তাদের মধ্যেও এ ঘটনায় হতাশা তৈরি হয়েছে বলে জানা গেছে।
অনেক কর্মকর্তার বক্তব্য, তারা বেসরকারি ব্যাংকের চাকরি ছেড়ে সরকারি ব্যাংকে এসেছেন। এখন সরকারি ব্যাংকের এমডি পদেও যদি বেসরকারি ব্যাংক থেকে কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়, তাহলে কাজের উদ্যম ও স্পৃহা কমে যায়।
অন্যদিকে বেসরকারি ব্যাংকের কয়েকজন কর্মকর্তা বলছেন, যারা সৎভাবে জীবনযাপন করতে চান, তারা সরকারি চাকরি ছেড়ে বেসরকারি ব্যাংকে চাকরি করেন। তাদের মতে, বর্তমান এমডি নিয়োগের বিষয়টি যেন সরকারি চাকরি বনাম বেসরকারি চাকরির খেলায় পরিণত হয়েছে।
বেসরকারি ব্যাংক থেকে সরকারি ব্যাংকে এমডি নিয়োগ দেওয়ার ঘটনা এবারই প্রথম নয়। অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদও অগ্রণী ব্যাংকে যোগ দেওয়ার আগে সাউথইস্ট ব্যাংকের এমডি ছিলেন। ২০০৫ সালে বিএনপি সরকারের সময়ে তাকে অগ্রণী ব্যাংকের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে একটি ইংরেজি দৈনিকের সঙ্গে আলাপকালে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর বেসরকারিকরণের পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদ। তার ওই বক্তব্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পোস্ট করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক রাখার পক্ষে যুক্তি তুলে ধরেন একজন কর্মকর্তা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে অগ্রণী ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বলেন, দীর্ঘদিন কাজ করে ডিএমডি পর্যায়ে ওঠা কর্মকর্তাদের প্রত্যাশা থাকে একসময় তারাও এমডি হবেন। কিন্তু বাইরে থেকে কাউকে এনে এমডি নিয়োগ দেওয়া হলে তাদের মধ্যে হতাশা তৈরি হতে পারে। পাশাপাশি নতুন এমডিকে তারা কতটা সহযোগিতা করবেন, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। এ ধারা অব্যাহত থাকলে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর চেইন অব কমান্ড ভেঙে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
নতুন এমডির নিয়োগ সম্পর্কে জানতে অগ্রণী ব্যাংকের চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, নতুন এমডি এখনো ব্যাংকে যোগদান করেননি। যোগদানের আগে কিছু প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হয়। সংশ্লিষ্ট প্রক্রিয়ার ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় ক্লিয়ারেন্সসহ বিভিন্ন বিষয় রয়েছে। এরপর অবসরজনিত বিষয় নিষ্পত্তি হয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুমোদন আসবে। এসব প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার পরই তিনি দায়িত্ব নিতে পারবেন। বর্তমানে ব্যাংকের এমডির দায়িত্বে যিনি আছেন, তিনিই দায়িত্ব পালন করছেন।
এ বিষয়ে অর্থনৈতিক বিশ্লেষক ও গবেষক এম হেলাল আহম্মেদ খান বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগের বিষয়টি নিয়ে অসন্তোষের অন্যতম কারণ হতে পারে দীর্ঘদিন ধরে পদোন্নতির মাধ্যমে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোর নেতৃত্বে আসার প্রচলিত ব্যবস্থা। তবে সরকারি না বেসরকারি ব্যাংক—এটি মুখ্য বিষয় নয়। মূল বিষয় হওয়া উচিত প্রার্থীর পেশাদারিত্ব, ব্যাংক পরিচালনার অভিজ্ঞতা, দক্ষতা, যোগ্যতা ও জবাবদিহিতা।
তিনি আরও বলেন, ব্যাংক খাতে বর্তমানে যে আস্থার সংকট রয়েছে, সেটি আরও বাড়ে এমন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া উচিত নয়। বেসরকারি ব্যাংক থেকেও ভালো পেশাজীবী নেওয়া যেতে পারে, তবে যাদের অতীত রেকর্ড ভালো, সংকট মোকাবিলায় দক্ষতা রয়েছে এবং যেসব ব্যাংককে তারা ভালোভাবে পরিচালনা করেছেন, তাদেরই বাছাই করা উচিত। একই সঙ্গে যাদের বিরুদ্ধে অতীতে ব্যাংকিং অনিয়ম, কেলেঙ্কারি বা তদন্তের অভিযোগ রয়েছে, তাদের রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ দেওয়া উচিত নয়।
এ অর্থনৈতিক বিশ্লেষকের মতে, অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান পরিস্থিতিতে নতুন এমডি যদি পেশাদারিত্ব ও দক্ষতার সঙ্গে ব্যাংকটিকে ঘুরে দাঁড় করাতে পারেন, তাহলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তুষ্ট হওয়ার বড় কারণ থাকা উচিত নয়। তবে শুরুতেই কর্মকর্তাদের মধ্যে যে সংশয় তৈরি হয়েছে, তা দূর করা জরুরি। কারণ এর প্রভাব সেবার মান ও আমানতকারীদের আস্থায় পড়তে পারে।
তিনি বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পরিচালক, এমডি ও চেয়ারম্যান নিয়োগ এবং বোর্ড পুনর্গঠনে রাজনৈতিক বিবেচনা এড়িয়ে পূর্ণ পেশাদারিত্ব, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাহলেই ব্যাংক খাতে আস্থার সংকট কমানো এবং একটি ভালো কর্মপরিবেশ তৈরি করা সম্ভব।
উল্লেখ্য, রাষ্ট্রায়ত্ত জনতা ও অগ্রণী ব্যাংকের এমডি ও সিইও পদে বেসরকারি ব্যাংকের দুই শীর্ষ কর্মকর্তাকে নিয়োগের সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। সাউথইস্ট ব্যাংকের অতিরিক্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও চিফ রিস্ক অফিসার মো. মাহবুব আলমকে জনতা ব্যাংক এবং যমুনা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক নূর মোহাম্মদকে অগ্রণী ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগের জন্য মনোনয়ন দেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া জনতা ব্যাংকের উপব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. নূরুল হুদাকে বেসিক ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগে সম্মতি দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে সোনালী ব্যাংকের এমডি ও সিইও মো. শওকত আলী খানের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের অবশিষ্ট মেয়াদ বাতিলের আগের আদেশ প্রত্যাহার করায় তিনি পদে বহাল থাকছেন।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) অর্থ মন্ত্রণালয়ের আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের রাষ্ট্রমালিকানাধীন বাণিজ্যিক ব্যাংক-১ শাখা থেকে এ বিষয়ে পরবর্তী কার্যক্রম নিতে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যানদের কাছে পৃথক চারটি চিঠি দেওয়া হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















