নারায়ণগঞ্জের জামাল ইয়ার্ন ট্রেডিং নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রায় ৪০ কোটি ৩৯ লাখ টাকার মূল্য সংযোজন কর (ভ্যাট) ফাঁকির প্রমাণ পেয়েছে নারায়ণগঞ্জ কাস্টমস, এক্সাইজ ও ভ্যাট কমিশনারেট। ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত সাড়ে ছয়শ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সুতা বিক্রি করেও প্রতিষ্ঠানটি যথাযথ ভ্যাট পরিশোধ করেনি। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে মামলা দায়ের করা হয়েছে। বুধবার জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) জনসংযোগ দপ্তর মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করেছে।
কাস্টমস সূত্র জানায়, নারায়ণগঞ্জ সদরের টানবাজার এলাকার এস এম মালেহ রোডে প্রতিষ্ঠানটির অবস্থান। এটি সুতা আমদানি ও সরবরাহের কাজ করে। কমিশনারেটের নিবারক দল সম্প্রতি আকস্মিক পরিদর্শনে গিয়ে প্রতিষ্ঠানের মজুত পণ্য ও হিসাব ব্যবস্থাপনা পর্যবেক্ষণ করে। ওই সময় প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট-সংক্রান্ত কোনো দলিল দেখাতে পারেনি।
এরপর দলটি প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন রেজিস্টার, খাতা, চালান বই ও গার্ড ফাইল জব্দ করে। কম্পিউটারে সংরক্ষিত তথ্যের এক্সেল কপি এবং প্রতিষ্ঠানের এক প্রতিনিধির স্বাক্ষরযুক্ত একটি বিবৃতিও জব্দ তালিকায় রয়েছে। এসব নথি প্রাথমিকভাবে পর্যালোচনা করে বিক্রির প্রকৃত তথ্য ও ভ্যাট রিটার্নের মধ্যে বড় ধরনের অসংগতি পাওয়া যায় বলে জানিয়েছে কমিশনারেট।
কমিশনারেটের হিসাবে, জব্দ করা নথিতে ২০২২ থেকে ২০২৬ সাল পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির মোট বিক্রির পরিমাণ পাওয়া গেছে ৬৫৯ কোটি ১৪ লাখ টাকার বেশি। এই বিক্রির ওপর ৫ শতাংশ ও সাড়ে ৭ শতাংশ হারে প্রযোজ্য ভ্যাটের পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ৪০ কোটি ৪০ লাখ টাকা।
অথচ ভ্যাট রিটার্নে প্রতিষ্ঠানটি যে তথ্য দিয়েছে, তার সঙ্গে এই হিসাবের বিস্তর ফারাক। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৬ সালের আগস্ট পর্যন্ত দাখিল করা রিটার্নে (মূসক-৯.১) মোট বিক্রি দেখানো হয়েছে মাত্র প্রায় ৩৯ কোটি ১৭ লাখ টাকা। অর্থাৎ প্রকৃত বিক্রির তুলনায় রিটার্নে দেখানো অঙ্ক ছিল খুবই সামান্য।
একই সময়ে ট্রেজারি চালানের মাধ্যমে সরকারি কোষাগারে প্রতিষ্ঠানটি ভ্যাট জমা দিয়েছে মাত্র ১ লাখ ৩৩ হাজার ৫০০ টাকা। প্রযোজ্য ভ্যাট থেকে এই জমা করা অর্থ বাদ দিলে সরকারের পাওনা দাঁড়ায় ৪০ কোটি ৩৯ লাখ ১০ হাজার ৯৪২ টাকা। কমিশনারেট জানিয়েছে, এই অর্থ আদায়যোগ্য।
তদন্তে আরও দেখা গেছে, প্রতিষ্ঠানটি পণ্য বিক্রির সময় ভ্যাট চালান ইস্যু করেনি। ভ্যাট ব্যবস্থায় চালান ইস্যু বাধ্যতামূলক, কারণ এর মাধ্যমেই লেনদেনের হিসাব নথিবদ্ধ হয় এবং কর আদায় নিশ্চিত করা যায়। চালান না দিলে বিক্রির প্রকৃত পরিমাণ লুকিয়ে রাখা সহজ হয়, যা এ ক্ষেত্রেও ঘটেছে বলে কর্তৃপক্ষ মনে করছে।
মামলার পাশাপাশি ফাঁকি দেওয়া ভ্যাটের ওপর সুদ আদায়ের উদ্যোগও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে কাস্টমস কর্তৃপক্ষ। ফলে প্রতিষ্ঠানটিকে মূল অঙ্কের চেয়েও বেশি অর্থ পরিশোধ করতে হতে পারে।
ঘটনাটি দেশের ভ্যাট ব্যবস্থার একটি পুরোনো দুর্বলতা সামনে এনেছে। দীর্ঘ চার বছর ধরে এত বড় অঙ্কের বিক্রি রিটার্নের বাইরে থেকে গেছে, অথচ তা ধরা পড়েছে আকস্মিক পরিদর্শনের মাধ্যমে। এতে বোঝা যায়, শুধু রিটার্নের তথ্যের ওপর নির্ভর না করে মাঠপর্যায়ের নজরদারি ও আকস্মিক অভিযান জোরদার করা প্রয়োজন। একই সঙ্গে ছোট ও মাঝারি ব্যবসায়ীদের ভ্যাট নিবন্ধন ও চালান ব্যবস্থার আওতায় আনতে আরও কার্যকর উদ্যোগ জরুরি।
উল্লেখ্য, এসব অভিযোগ প্রাথমিক পর্যালোচনার ভিত্তিতে আনা হয়েছে। মামলার বিচারিক প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটির বক্তব্য এবং চূড়ান্ত রায়ের ওপর বিষয়টির পূর্ণাঙ্গ চিত্র নির্ভর করবে। এ বিষয়ে প্রতিষ্ঠানটির কোনো মন্তব্য পাওয়া যায়নি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























