ইসরায়েলের পার্লামেন্ট নির্বাচনে ভোট দিতে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে প্রায় ৬৭ হাজার নাগরিক দেশে ফিরেছেন বলে জানিয়েছে মার্কিন সংবাদমাধ্যম দ্য নিউইয়র্ক টাইমস। ফিলিস্তিনে সামরিক অভিযান, ইরানে হামলা এবং সরকারের অতি-ডানপন্থী নীতির বিরোধিতার কারণে এবারের নির্বাচনে প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু চাপে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
ইসরায়েলি সংবাদমাধ্যম ও বিভিন্ন সূত্রের বরাত দিয়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে ফেরা প্রবাসী ভোটারদের অনেকেই নেতানিয়াহু ও তাঁর নেতৃত্বাধীন অতি-ডানপন্থী জোটের বিরোধী। মধ্যপ্রাচ্যে দীর্ঘস্থায়ী সংঘাত এবং সরকারের অতি-রক্ষণশীল দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন চান তাঁরা। এসব নীতির বিরুদ্ধে ভোট দেওয়াকে নিজেদের দায়িত্ব বলে মনে করছেন অনেক প্রবাসী ইসরায়েলি।
নেতানিয়াহুর বিরুদ্ধে ভোট দিতে নিউইয়র্ক থেকে ইসরায়েলে এসেছেন মোশে লাভি। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেসকে (এপি) তিনি বলেন, বর্তমান সরকারের ওপর থেকে তাঁর আস্থা উঠে গেছে। ভোট দেওয়ার মাধ্যমেই তিনি নিজের মতামত তুলে ধরতে চান।
নেতানিয়াহুর বিরোধিতাকারীদের মধ্যে লাভি একা নন। ২০২৩ সালের ৭ অক্টোবরের হামলার পর প্রথম নির্বাচনে ভোট দিতে দেশে ফেরা প্রায় ৬৭ হাজার ইসরায়েলির একজন তিনি। শুধু ভোট দেওয়ার জন্য দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে দেশে ফেরার কারণ ব্যাখ্যা করে দ্য নিউইয়র্ক টাইমসকে লাভি বলেন, ইসরায়েলের কূটনৈতিক সিদ্ধান্ত বিদেশে বসবাসরত নাগরিকদের জীবনেও প্রভাব ফেলে। তাই এসব নীতির বিষয়ে মত প্রকাশের অধিকার তাঁরও রয়েছে।
নির্বাচনের আগে ক্ষমতায় টিকে থাকার প্রচেষ্টায় নেতানিয়াহু ইরান ও হামাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধকে কাজে লাগিয়ে জাতীয়তাবাদী মনোভাব জোরদার করেছেন বলে সমালোচকদের অভিযোগ। এ ছাড়া পশ্চিম তীরে ফিলিস্তিনিদের ওপর বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে তাঁর সরকারের ভূমিকা নিয়েও সমালোচনা রয়েছে।
তবে এসবের মধ্যেও জনমত জরিপে নেতানিয়াহু সাবেক সেনাপ্রধান গাদি আইজেনকোটের সঙ্গে প্রায় সমানে সমান অবস্থানে রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আইজেনকোট সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইয়াইর লাপিদ ও নাফতালি বেনেটের সঙ্গে জোট গঠন করেছেন।
নেতানিয়াহুর কর্মকাণ্ড অতি-রক্ষণশীল ইসরায়েলিদের একটি অংশের সমর্থন পেলেও মধ্যপন্থী ভোটারদের অনেকের কাছে, বিশেষ করে বিদেশে বসবাসরত ইসরায়েলিদের কাছে, তিনি ক্রমেই অজনপ্রিয় হয়ে উঠেছেন।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ বিশ্লেষক মাইরাভ জোনজেইন ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম দ্য টাইমসকে বলেন, ৭ অক্টোবরের হামলার পর অনেক ইসরায়েলি দেশ ছেড়ে চলে গেছেন। তাঁদের কেউ কেউ দেশের ভেতরে থাকা মানুষের তুলনায় ইসরায়েলের প্রতি বৈরিতা ও বিচ্ছিন্নতা বেশি অনুভব করছেন। এ কারণে তাঁরা ভোটের মাধ্যমে নেতানিয়াহুকে ক্ষমতা থেকে সরানোর চেষ্টা করতে পারেন।
কানাডার টরন্টোতে বসবাসকারী ইয়েল নাত্রা এপিকে জানান, গত দুই দশকে তিনি ইসরায়েলের কোনো নির্বাচনে ভোট দেননি। তবে দেশটিতে কট্টর ডানপন্থীদের উত্থানের প্রেক্ষাপটে এবার ভোট দেওয়াকে জরুরি মনে করছেন তিনি।
নাত্রা বলেন, তিনি যে ইসরায়েলে বড় হয়েছেন, সেটি হারিয়ে যাচ্ছে। এবার পরিস্থিতির পরিবর্তন না হলে ভবিষ্যতে কী ঘটবে, তা তিনি জানেন না।
‘এই সরকার প্রতিদিন সংকটের গর্ত আরও গভীর করছে’
যুক্তরাষ্ট্র থেকে চার আত্মীয়কে সঙ্গে নিয়ে ভোট দিতে ইসরায়েলে এসেছেন হাদার সাসকিন্দ। তাঁর উদ্দেশ্য, ইসরায়েলের গণতন্ত্রকে পুনরায় নিশ্চিত করার প্রক্রিয়ায় অংশ নেওয়া।
এপিকে সাসকিন্দ বলেন, ইসরায়েল সংকটের গর্তে পড়েছে এবং নেতানিয়াহু ও তাঁর নেতৃত্বাধীন সরকার প্রতিদিন সেই সংকট আরও গভীর করছে। নতুন সরকারের প্রথম কাজ হওয়া উচিত এই পরিস্থিতির অবনতি থামানো।
সাসকিন্দ চান, নতুন সরকার পশ্চিম তীর ও গাজা উপত্যকায় বর্তমান নীতিতে পরিবর্তন আনুক, বসতি সম্প্রসারণ বন্ধ করুক এবং বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে পদক্ষেপ নিক।
দ্য টাইমসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, মিশাল লেভিত ও গিলি শাভিত নামের এক যুগল নির্বাচনের আগের দিন বিয়ের আয়োজন করেছেন। তাঁদের উদ্দেশ্য ছিল, বিভিন্ন দেশ থেকে আসা প্রায় ৩০ জন অতিথি যেন বিয়েতে অংশ নেওয়ার পাশাপাশি ভোট দেওয়ার সুযোগ পান।
ভোট দিতে ইসরায়েলে ফেরা অনেকেরই একসময় নেতানিয়াহুর প্রতি সমর্থন ছিল। নিজেকে ডানপন্থী মতাদর্শের অনুসারী হিসেবে পরিচয় দেওয়া নাত্রা জানান, নব্বইয়ের দশকে তিনি নেতানিয়াহুকে ভোট দিয়েছিলেন। কিন্তু ৭ অক্টোবরের হামলার নিরাপত্তাগত ব্যর্থতার দায় নিতে নেতানিয়াহুর অনীহা এবং অতি-রক্ষণশীল ইহুদি সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁর সমর্থনের কারণে তিনি নেতানিয়াহুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছেন।
নাত্রার ছোট বোন তামার ইচিলভ বলেন, নেতানিয়াহুর শাসনামলে গাজা ও অধিকৃত পশ্চিম তীরে ইসরায়েলের কর্মকাণ্ড বিশ্বজুড়ে ইহুদিবিদ্বেষ বাড়িয়ে তুলেছে বলে তিনি মনে করেন। এসব কারণেই ভোট দিতে ইসরায়েলে আসার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তিনি।
দ্য টাইমসকে ইচিলভ বলেন, মানুষ তাঁদের পছন্দ করে না—এমন পরিস্থিতির জন্য ইসরায়েলের কর্মকাণ্ডও দায়ী বলে তিনি মনে করেন।
৪৪ বছর বয়সী এতি উইসোটজকি কোহেন জানান, ইসরায়েলে গণতান্ত্রিক পরিস্থিতির অবনতি এবং উদারপন্থী মত প্রকাশের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসায় গত বছর তিনি স্বামী ও দুই সন্তানকে নিয়ে যুক্তরাজ্যে চলে যান। তবে ভোট দেওয়ার জন্য এবার তিনি দেশে ফিরেছেন।
কোহেন বলেন, ইরানের সঙ্গে ইসরায়েলের ‘১২ দিনের যুদ্ধ’-এর সময় তাঁর মনে হয়েছে, ক্ষমতায় টিকে থাকার জন্য নেতানিয়াহুর সরকার যেকোনো কিছু করতে পারে। তাঁর ভাষায়, সরকার ইসরায়েলি জনগণকে দাবার ঘুঁটি হিসেবে দেখছে। ভবিষ্যতে তিনি দেশে ফিরে স্থায়ী হতে চান, তবে নেতানিয়াহু ক্ষমতায় থাকলে তা কঠিন হবে বলে মনে করেন তিনি।
এক দশকেরও বেশি সময় আগে কানাডায় চলে যাওয়া জোরিক নিতজানও ভোট দিতে ইসরায়েলে ফিরেছেন। তাঁর মতে, নেতানিয়াহুর রাজনৈতিক আন্দোলনকে পরাজিত করে দেশকে আবার সঠিক পথে ফিরিয়ে আনার এটিই শেষ সুযোগ হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
























