বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণ সক্ষমতা, আধুনিক কারিগরি প্রশিক্ষণ কার্যক্রম এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারের উপযোগী দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার উদ্যোগ সরেজমিনে দেখতে গাজীপুরের সফিপুরে আনসার-ভিডিপি একাডেমি পরিদর্শন করেছেন চার দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা।
সোমবার (২৬ অক্টোবর) সিঙ্গাপুর, মরক্কো, কসোভো ও মালদ্বীপের রাষ্ট্রদূত ও কূটনৈতিক প্রতিনিধিরা একাডেমিটি পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁদের সামনে বাহিনীর প্রশিক্ষণ অবকাঠামো, প্রযুক্তিনির্ভর দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রম, কর্মমুখী শিক্ষা এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারে কর্মসংস্থানের সম্ভাবনা তুলে ধরা হয়।
এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানান বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর সহকারী পরিচালক ও গণসংযোগ কর্মকর্তা মো. নাজমুস সাকিব।
বাহিনীর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ প্রতিনিধিদলকে এসব বিষয়ে অবহিত করেন। তিনি বাহিনীর সাংগঠনিক কাঠামো, প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, আধুনিকায়ন, সদস্যদের দক্ষতা উন্নয়ন এবং জননিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাহিনীর অবদান তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত বিস্তৃত দেশের বৃহত্তম স্বেচ্ছাসেবী ও আধাসামরিক বাহিনী। সাত দশকেরও বেশি সময় ধরে জাতীয় নিরাপত্তা ও আর্থসামাজিক উন্নয়নে বাহিনীটি ভূমিকা পালন করে আসছে।
মহাপরিচালক বলেন, পরিবর্তিত জাতীয় প্রেক্ষাপটে বাহিনীতে বহুমুখী কাঠামোগত সংস্কার করা হয়েছে। এর আওতায় সর্বস্তরে ৫০ শতাংশ নারী প্রতিনিধিত্ব নিশ্চিত করার পাশাপাশি নিজস্ব আধুনিক এন্টারপ্রাইজ রিসোর্স প্ল্যানিং (ইআরপি) প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডল পর্যন্ত সদস্যদের একটি সুসংহত নেটওয়ার্কে যুক্ত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নিজস্ব আনসার-ভিডিপি উন্নয়ন ব্যাংক এবং ‘প্রকল্প সঞ্জীবন’-এর সহায়তায় আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও তৃণমূল পর্যায়ে উদ্যোক্তা সৃষ্টির মাধ্যমে বাহিনীটি জাতিসংঘের টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (এসডিজি) অর্জনে অবদান রেখে চলেছে।
আবদুল মোতালেব সাজ্জাদ মাহমুদ বলেন, অভ্যন্তরীণ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি একবিংশ শতাব্দীর উপযোগী দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তোলাও বাহিনীর অন্যতম অগ্রাধিকার। প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা ও শৃঙ্খলা বজায় রেখে আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) এবং বৈশ্বিক মানদণ্ড অনুসরণ করে তথ্যপ্রযুক্তি ও কারিগরি ক্ষেত্রে নৈতিক অভিবাসন নিশ্চিত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
তিনি আরও বলেন, জাপানসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদারত্ব স্থাপন করা হয়েছে। নিজস্ব বায়োমেট্রিক ও ডেটাবেজ ব্যবস্থার মাধ্যমে মধ্যস্বত্বভোগীদের ভূমিকা ছাড়াই নিরাপদ কর্মসংস্থান, প্রশিক্ষণ এবং বৈধ চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রবাহ নিশ্চিত করতে বাহিনী কাজ করছে।
তেজগাঁওয়ে নির্মাণাধীন আধুনিক সদর দপ্তর এবং যুগোপযোগী কল্যাণমুখী কাঠামোর ওপর ভিত্তি করে প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন ও দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সর্বোচ্চ নিষ্ঠা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন তিনি।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঘুরে দেখলেন কূটনীতিকরা
একাডেমি পরিদর্শনের পর প্রতিনিধিদল বৈদ্যুতিক গাড়িতে (ইভি) করে প্রান্তিক শক্তি প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (পিএসটিসি) পরিদর্শন করেন। এ সময় তাঁরা ৬জি ওয়েল্ডিং কর্মশালা, সবুজ জ্বালানি ও সৌরবিদ্যুৎবিষয়ক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম, ড্রাইভিং সিমুলেটর প্রদর্শনী, ভ্রাম্যমাণ আইসিটি প্রশিক্ষণ বাস, কুটিরশিল্প প্রশিক্ষণ, জাপানি ভাষা প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, আতিথেয়তা ও রন্ধনশিল্প প্রশিক্ষণ কেন্দ্র, অরণ্য অবকাশ এবং নির্মাণ, ড্রাইভিং ও গার্মেন্টস শিল্পবিষয়ক গণপ্রশিক্ষণ কার্যক্রম ঘুরে দেখেন।
প্রশিক্ষণ কার্যক্রমের ব্যবহারিক দিক, আধুনিক সরঞ্জাম এবং কর্মমুখী দক্ষতা অর্জনের সুযোগ সম্পর্কে তাঁদের অবহিত করা হয়। প্রশিক্ষণব্যবস্থার মান ও সুযোগ-সুবিধা পরিদর্শন করে প্রতিনিধিদল সন্তোষ প্রকাশ করেন।
পরিদর্শনে কর্মমুখী ও কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার গুরুত্ব তুলে ধরা হয়। ৬জি ওয়েল্ডিং, নির্মাণ, ড্রাইভিং, গার্মেন্টস, আতিথেয়তা ও রন্ধনশিল্পের মতো খাতে দক্ষতা অর্জন দেশের শিল্পায়ন, সেবা খাতের সম্প্রসারণ এবং শ্রমবাজারের চাহিদা পূরণে ভূমিকা রাখতে পারে।
একই সঙ্গে সৌরবিদ্যুৎ ও সবুজ জ্বালানিবিষয়ক প্রশিক্ষণ টেকসই উন্নয়ন ও পরিবেশবান্ধব অর্থনীতির বিকাশে সহায়ক হতে পারে। আইসিটি প্রশিক্ষণ ও জাপানি ভাষা শিক্ষার সমন্বয় প্রশিক্ষণার্থীদের প্রযুক্তিগত ও ভাষাগত দক্ষতা বাড়ানোর পাশাপাশি আন্তর্জাতিক কর্মপরিবেশে খাপ খাইয়ে নেওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর ৬০ লাখের বেশি সদস্যের নেটওয়ার্ককে কেন্দ্র করে দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মমুখী প্রশিক্ষণের উদ্যোগ প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক সক্ষমতা বৃদ্ধির সম্ভাবনা তৈরি করছে। এসব প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, আত্মকর্মসংস্থান ও উদ্যোক্তা উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে। পাশাপাশি দেশীয় শিল্প ও সেবা খাতে দক্ষ কর্মীর চাহিদা পূরণ, প্রবাসে কর্মসংস্থানের উপযোগী জনশক্তি তৈরি এবং বৈদেশিক আয় বৃদ্ধিতেও অবদান রাখার সুযোগ রয়েছে।
প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থান ও অর্থনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্যে সংযোগ স্থাপনের মাধ্যমে বাহিনীর জনকল্যাণমূলক ভূমিকা আরও বিস্তৃত হতে পারে। দক্ষ, আত্মনির্ভর ও উৎপাদনশীল জনগোষ্ঠী গড়ে তোলার এ উদ্যোগ জননিরাপত্তা নিশ্চিত করার পাশাপাশি জাতীয় উন্নয়ন ও সামাজিক স্থিতিশীলতা জোরদারেও সহায়ক হতে পারে।
চার দেশের কূটনৈতিক প্রতিনিধিদের এ পরিদর্শন বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রশিক্ষণ সক্ষমতা, আধুনিকায়ন এবং দক্ষ জনশক্তি উন্নয়নের উদ্যোগ আন্তর্জাতিক পরিসরে তুলে ধরার সুযোগ সৃষ্টি করেছে। একই সঙ্গে প্রশিক্ষণ, কারিগরি দক্ষতা ও কর্মসংস্থানভিত্তিক উন্নয়ন কার্যক্রমে সহযোগিতা এবং অভিজ্ঞতা বিনিময়ের সম্ভাবনাও উন্মোচিত হয়েছে।
অনুষ্ঠানে মালদ্বীপের হাইকমিশনার মিস শিউনীন রশিদ, কসোভোর রাষ্ট্রদূত লুলজিম প্লানা, সিঙ্গাপুরের ভারপ্রাপ্ত হাইকমিশনার ফিলিপ ওং এবং মরক্কোর রাষ্ট্রদূত লাল্লা বুতাইনা এল কেরদৌদি এল কৌলালি উপস্থিত ছিলেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















