‘দীর্ঘ ১৭ বছর জেল-জুলুম ও নির্যাতন সহ্য করে আমাদের অনেক ত্যাগী কর্মী আজ পথে বসেছে। অথচ এই সময়েও টাকার কুমিরে রূপান্তরিত সুযোগসন্ধানীরা অর্থের বিনিময়ে সারের ডিলারশিপ পাচ্ছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।’ মাদারীপুর সদর উপজেলার কুনিয়া ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগকে কেন্দ্র করে এমনই তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন জেলা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহমুদুল হাসান।
অভিযোগ উঠেছে, প্রয়োজনীয় গুদাম, পরিবহন সুবিধা ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা থাকা সত্ত্বেও স্থানীয় একাধিক যোগ্য আবেদনকারীকে বাদ দিয়ে অনৈতিক লেনদেন ও প্রভাব খাটিয়ে ডিলারশিপ দেওয়া হয়েছে এক যুবলীগ নেতার চাচা তথা বিএনপি সভাপতির ভাই লাভলু হাওলাদারকে। এ নিয়ে মাদারীপুরজুড়ে শুরু হয়েছে তীব্র আলোচনা-সমালোচনা ও রাজনৈতিক অসন্তোষ।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, মাদারীপুর জেলার ৫৯টি ইউনিয়ন ও চারটি পৌরসভায় সার ডিলার নিয়োগের জন্য ৫৬৩ জন আবেদন করেন। যাচাই-বাছাই শেষে ৬৩ জনের সুপারিশের তালিকা জেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটিতে পাঠানো হয়। পরে মন্ত্রণালয় তালিকাটি অনুমোদন দেয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
সূত্রে জানা গেছে, ডিলারশিপ পাওয়া লাভলু হাওলাদার কুনিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী যুবলীগের সাধারণ সম্পাদক এম রুহুল আমিন হাওলাদার শিমুলের চাচা এবং ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি সালাম হাওলাদারের ফুফাতো ভাই। তাঁর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা ও পারিবারিক সম্পর্ককে কেন্দ্র করে স্থানীয় বিএনপির একাংশের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।
অভিযোগকারীদের একাংশের দাবি, লাভলু হাওলাদারের সঙ্গে দীর্ঘদিন আওয়ামী লীগের সংশ্লিষ্টতা ছিল। এ অবস্থায় তাঁর আবেদন যাচাইয়ের সময় রাজনৈতিক পরিচয়, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা, আর্থিক সক্ষমতা এবং প্রয়োজনীয় অবকাঠামো কতটা গুরুত্ব পেয়েছে, তা প্রকাশ করা উচিত। লাভলু হাওলাদার দীর্ঘদিন ঢাকায় ছিলেন, এখনো তিনি ঢাকায় আছেন। তাঁর ব্যবসা-বাণিজ্য সব ঢাকায়। কোনোভাবেই ডিলারশিপ পাওয়ার যোগ্য নন তিনি। তিনি অনৈতিক উপায়ে ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে মন্তব্য করেন আবেদনকারীদের একাংশ।
ডিলারশিপের আবেদনকারী সরোয়ার হোসেনের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় গুদাম ও গাড়ি রাখার জায়গা থাকার পরও তিনি নির্বাচিত হননি। তিনি বলেন, আমার বড় গোডাউন আছে, গাড়ি রাখার জায়গা আছে, প্রয়োজনীয় সবকিছুই রয়েছে। প্রকৃতভাবে যাচাই-বাছাই করলে আমি ডিলারশিপ পেতাম বলে মনে করি। কিন্তু লাভলু হাওলাদার কীভাবে ডিলার হলেন, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।
সরোয়ারের অভিযোগ, প্রভাব খাটিয়েই লাভলু ডিলারশিপ পেয়েছেন। তাঁর দাবি, লাভলু দীর্ঘদিন ঢাকায় ব্যবসা করেছেন। এ কারণে তাঁর বর্তমান ব্যবসায়িক অবস্থান, স্থানীয় পর্যায়ে সার বিতরণের সক্ষমতা এবং নিয়োগের শর্ত পূরণের বিষয়গুলো যাচাই করা প্রয়োজন।
একই ধরনের অভিযোগ করেছেন আবেদনকারী সাগর হোসেন। তাঁর দাবি, ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা ও প্রয়োজনীয় যোগ্যতা থাকা সত্ত্বেও তাঁকে বাদ দেওয়া হয়েছে। নির্বাচিত ব্যক্তির যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা কীভাবে যাচাই করা হয়েছে, সে প্রশ্নও তোলেন তিনি।
কুনিয়া ইউনিয়নের আরেক আবেদনকারী মো. জাহাঙ্গীর মাতুব্বর জানান, নিজস্ব গুদাম ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা থাকার পরও তিনি ডিলারশিপ পাননি। তাঁর অভিযোগ, অন্য আবেদনকারীদের কেউ কেউ ভাড়া করা গুদাম দেখিয়েও নিয়োগ পেয়েছেন।
ডিলার নিয়োগে আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ তুলেছেন স্থানীয় বিএনপির একাংশের কয়েকজন নেতাকর্মী। তাঁদের দাবি, দীর্ঘদিন রাজনৈতিক প্রতিকূলতার মধ্যে থাকা অনেক নেতাকর্মী ডিলারশিপ পাননি। অন্যদিকে, আওয়ামী লীগের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা রয়েছে বলে তাঁরা দাবি করেন, এমন একজন ব্যক্তি ডিলারশিপ পেয়েছেন।
অভিযোগকারীদের কেউ কেউ অর্থের বিনিময়ে ডিলারশিপ দেওয়ার কথাও বলেছেন। এ ছাড়া বাদ পড়া আবেদনকারীদের একাংশের দাবি, প্রভাবশালী মহলের পছন্দের ব্যক্তিদের নাম সুপারিশের তালিকায় স্থান পেয়েছে।
অভিযোগের বিষয়ে লাভলু হাওলাদার দাবি করেন, তিনি দীর্ঘদিন বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। তাঁর ভাষ্যমতে, আওয়ামী লীগের শাসনামলে প্রায় ১৭ বছর তিনি দেশের বাইরে ছিলেন এবং সে সময় দেশে ফিরতে পারেননি। বিএনপির সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকার কারণেই তিনি সার ডিলারশিপ পেয়েছেন বলে দাবি করেন তিনি। যুবলীগ নেতা তাঁর দূরসম্পর্কের আত্মীয় বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
তালিকা প্রকাশের পর মাদারীপুর সদর উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক গাউছ-উর রহমান বলেন, কুনিয়া ইউনিয়নে ডিলার নিয়োগে অনিয়ম হয়ে থাকলে পুনরায় তদন্ত করে যোগ্য ব্যক্তিদের হাতে ডিলারশিপ তুলে দেওয়া উচিত।
ডিলার নিয়োগের বাছাইপ্রক্রিয়া নিয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও মনিটরিং কমিটির সদস্যসচিব দীপ্তি রানী সরকার বলেন, প্রতিটি ইউনিয়ন থেকে নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করে আগ্রহী প্রার্থীদের নাম প্রস্তাব করে জেলা কমিটির কাছে পাঠানো হয়েছে।
জেলা কৃষি কর্মকর্তা রহিমা খাতুন জানান, তিনি যাচাই-বাছাই কমিটিতে ছিলেন না। ওপর থেকে যাচাই-বাছাই করে যে তালিকা পাঠানো হয়েছে, তাঁরা সেটিই পাঠিয়েছেন। অনিয়ম থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে খতিয়ে দেখে ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) জাকিয়া সুলতানা বলেন, স্বচ্ছতার সঙ্গে সুপারিশ করা হয়েছে। এটি নিয়োগ কমিটির সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত। এর আগে তিনি বলেন, অনিয়মের বিষয়টি তাঁর জানা নেই। এ ধরনের ঘটনা ঘটে থাকলে অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















