রাষ্ট্রায়ত্ত একমাত্র ওষুধ উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান এসেনশিয়াল ড্রাগস কোম্পানি লিমিটেড (ইডিসিএল) এখন অনিয়ম, জালিয়াতি ও বেপরোয়া লুটপাটের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। বৈষম্যবিরোধী আন্দোলনের শহীদ ও আহত ‘জুলাই যোদ্ধা’দের পবিত্র নাম এবং স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের নাম ভাঙিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার বিশাল নিয়োগ বাণিজ্যের চাঞ্চল্যকর তথ্য প্রকাশ্যে এলেও সংশ্লিষ্টদের রহস্যজনক নীরবতা পুরো স্বাস্থ্য খাতকে স্তব্ধ করে দিয়েছে।
অভিযোগের তির প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আশরাফুজ্জামান, চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ ডেপুটি ম্যানেজার শামীম আহমেদ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা বরকত উল রইসের প্রতাপশালী ত্রয়ী সিন্ডিকেটের দিকে। কিন্তু সবচেয়ে বিস্ময়কর ও ক্ষোভের বিষয় হলো—এই ভয়াবহ দুর্নীতি, জালিয়াতি ও প্রশাসনিক নৈরাজ্যের বিষয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে বারবার লিখিত ও মৌখিকভাবে অবহিত করা সত্ত্বেও দপ্তরগুলো থেকে কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি!
‘জুলাই যোদ্ধা’ কোটার নামে আত্মীয়করণ ও ভুয়া নিয়োগের মহোৎসব
অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, ইডিসিএলে সম্প্রতি সম্পন্ন হওয়া প্রায় ৯০ জনের বিশাল নিয়োগপ্রক্রিয়ার পেছনের ভয়াবহ সত্য। ‘জুলাই যোদ্ধা’ কোটার ধোঁয়া তুলে স্বজনপ্রীতি ও জালিয়াতির এক নতুন নজির গড়েছেন ডেপুটি ম্যানেজার শামীম আহমেদ। তিনি এই কোটার নাম ভাঙিয়ে নিজের সগোত্রীয় স্বজনদের চাকরি দিয়েছেন।
এর জলজ্যান্ত প্রমাণ, শামীম আহমেদের নিকটাত্মীয় ছাব্বির আহমেদ (পিতা: মো. শাহজাহান আলী আকন্দ, গ্রাম: মিরপুর, পোস্ট: কাগইল-৫৮২০, উপজেলা: গাবতলী, জেলা: বগুড়া)-কে অনিয়ম করে সহকারী প্রকৌশলী কর্মকর্তা পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে।
এক নিরপেক্ষ অনুসন্ধানে উন্মোচিত হয়েছে যে, নিয়োগপ্রাপ্ত ৯০ জনের মধ্যে মাত্র ১০ থেকে ১৫ জন প্রকৃত জুলাই যোদ্ধা ছিলেন। বাকি সিংহভাগ পদে ভুয়া পরিচয়পত্র তৈরি এবং ৫০ কোটি টাকার গোপন লেনদেনের বিনিময়ে জালিয়াত চক্রটিকে বসানো হয়েছে।
ডিজি ও মন্ত্রীর নাম ভাঙিয়ে ধামাচাপা: এমডিকে জিম্মি নাকি আত্মতুষ্টি?
অভিযোগ রয়েছে, বরখাস্তকৃত কর্মকর্তা শামীম আহমেদ এবং তাঁর সহযোগী বরকত উল রইস ইডিসিএলের এমডি আশরাফুজ্জামানকে কার্যত জিম্মি করে পুরো প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, পদায়ন ও কোটি কোটি টাকার টেন্ডারপ্রক্রিয়া একক নিয়ন্ত্রণে নিয়েছেন।
মন্ত্রণালয় কিংবা সচেতন মহল থেকে যখনই এসব অনিয়ম নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে, তখনই শামীম-বরকত চক্র চরম দম্ভের সঙ্গে দাবি করেছে, “আমাদের হাতে কিছু নেই; এটি সরাসরি বোর্ড, স্বাস্থ্যমন্ত্রী এবং ওষুধ প্রশাসনের ডিজি আলমগীর সাহেবের নির্দেশনায় হচ্ছে।”
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় ও ওষুধ প্রশাসনকে অন্ধকারে রেখে কিংবা তাদের নাম অপব্যবহার করে এই কুচক্রী মহল রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানটিতে একচ্ছত্রভাবে অপকর্ম চালিয়ে যাচ্ছে।
বহিষ্কৃত দুর্নীতিবাজের ‘জাদুর কাঠি’র ছোঁয়ায় চোখধাঁধানো উত্থান
ইডিসিএলের নথিপত্র ঘেঁটে দেখা যায়, ২০১৩ সালে সহকারী ক্রয় কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে চরম দুর্নীতি, অর্থ আত্মসাৎ ও জালিয়াতির সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়ায় শামীম আহমেদকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছিল। কিন্তু আইনি ও প্রশাসনিক নিয়মকানুনকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়ে, কোনো প্রকার প্রাসঙ্গিক অভিজ্ঞতা বা পদোন্নতির যোগ্যতা ছাড়াই ‘জাদুর কাঠির ছোঁয়ায়’ তাঁকেই আবার সরাসরি ‘ডেপুটি ম্যানেজার’ পদে পুনর্বাসন করা হয়! একজন চিহ্নিত ও সাজাপ্রাপ্ত দুর্নীতিবাজকে কীভাবে কোনো যাচাই-বাছাই বা মন্ত্রণালয়ের স্পষ্ট অনুমোদন ছাড়া এত বড় সংবেদনশীল পদে বসানো হলো—তা প্রশাসনিক দেউলিয়াত্বকেই স্পষ্ট করে।
প্রতিষ্ঠানে ‘ত্রাসের রাজত্ব’, ব্ল্যাকমেইলিং ও কোটি কোটি টাকার চাঁদাবাজি
ডেপুটি ম্যানেজার পদে বসেই শামীম আহমেদ ইডিসিএলের প্রশাসন বিভাগকে নিজের ব্যক্তিগত সামন্তরাজ্যে পরিণত করেন। কোনো কারণ দর্শানোর নোটিশ ছাড়াই বরখাস্তের হুমকি, ইচ্ছামতো চাকরিচ্যুতির তালিকা তৈরি এবং বদলি বাণিজ্যের মাধ্যমে পুরো দপ্তরে একচ্ছত্র ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন তিনি।
কর্মচারীদের চাকরি বাঁচানো, পদোন্নতি পাইয়ে দেওয়া কিংবা বদলি ঠেকানোর ভয় দেখিয়ে নিয়মিত মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেওয়ার বিস্ফোরক অভিযোগ উঠেছে শামীম-বরকত সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। তাঁদের এমন বেপরোয়া অর্থলিপ্সায় শত শত দক্ষ ও নির্দোষ কর্মচারী আজ চাকরি হারানোর আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন।
অভিযোগে আরও উল্লেখ রয়েছে, এই নিয়োগ বাণিজ্য সিন্ডিকেটের সঙ্গে সরাসরি জড়িত রয়েছেন প্রশাসন শাখার কর্মকর্তা এডমিন তুষার।
মন্ত্রীকে বারবার নালিশ, তবুও ব্যবস্থা নেয়নি কোনো দপ্তর: এমডির বেপরোয়া প্রশ্রয়!
এই মহাসংকটের সবচেয়ে অন্ধকার দিক হলো প্রশাসনিক নীরবতা ও রহস্যজনক উদাসীনতা। ইডিসিএলের এই চরম লুটপাট, ভুয়া নিয়োগ ও কোটি কোটি টাকার দুর্নীতি নিয়ে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণমন্ত্রী সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলকে বারবার সরাসরি অবহিত ও অভিযোগ করা সত্ত্বেও রহস্যজনক কারণে বিভিন্ন দপ্তর থেকে কোনো দৃশ্যমান বা কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি।
এমনকি মন্ত্রী নিজেই ইতিপূর্বে বিতর্কিত কর্মকর্তাদের বদলি ও অপসারণের জন্য এমডিকে নির্দেশ দিয়েছিলেন বলে জানা যায়। কিন্তু এমডি আশরাফুজ্জামান মন্ত্রীর সেই মৌখিক নির্দেশনাকে পরিষ্কার বুড়ো আঙুল দেখিয়ে নিজের খেয়ালখুশিমতো প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করছেন এবং বরকত-শামীম সিন্ডিকেটকে ঢাল হয়ে সুরক্ষা দিয়ে যাচ্ছেন।
মন্ত্রীর নির্দেশ অমান্য করার পরও এমডির বিরুদ্ধে কোনো কঠোর প্রশাসনিক ব্যবস্থা না নেওয়া এবং বারবার অভিযোগ করার পরও দপ্তরগুলোর এই নিষ্ক্রিয়তা নিয়ে এখন জনমনে নানা প্রশ্ন ও তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। চক্রটি প্রকাশ্যে দম্ভোক্তি করে বেড়াচ্ছে—কোটি টাকা খরচ করে তারা অবস্থান তৈরি করেছে, তাই মন্ত্রী-এমপি কাউকেই তারা তোয়াক্কা করে না!
অবিলম্বে উচ্চপর্যায়ের তদন্ত ও কঠোর শাস্তির দাবি
জুলাই গণঅভ্যুত্থানের শহীদ ও আহত বীরদের নাম ভাঙিয়ে এমন নিকৃষ্ট দুর্নীতি এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ধ্বংসের পর আর চুপ থাকার সুযোগ নেই বলে মনে করছেন সংক্ষুব্ধ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও সচেতন নাগরিক সমাজ।
তাঁদের দাবি, অবিলম্বে নামকাওয়াস্তে নির্দেশ না দিয়ে মন্ত্রীর সরাসরি হস্তক্ষেপে একটি বিচার বিভাগীয় বা উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করতে হবে। একই সঙ্গে অবিলম্বে এমডি আশরাফুজ্জামান, ডেপুটি ম্যানেজার শামীম আহমেদ এবং প্রশাসনিক কর্মকর্তা বরকত উল রইসকে সাময়িক বরখাস্ত করে আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করার জোর দাবি জানানো হয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























