সততার মুখোশ পরা একজন কর্মকর্তার আড়ালে ঢাকা বন বিভাগে গড়ে উঠেছে এক ভয়ংকর দুর্নীতির সাম্রাজ্য! সরকারি বনভূমি রক্ষার দায়িত্বে থাকা ডিএফও বশিরুলের মুখে জিরো টলারেন্সের কথা শোনা গেলেও বাস্তবে চলছে চরম ভণ্ডামি ও হরিলুট। নাটকের পর নাটক সাজিয়ে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়, আর তার পরপরই বন দখলকারী রফিকুল, মোকসেদ, শাহীন ও জাকিরদের সঙ্গে মোটা অঙ্কের ঘুষের লেনদেনে আবারও দখল হয়ে যায় সরকারি জমি। নিজে সৎ সেজে মাঠপর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দিয়ে ভয়াবহ দুর্নীতি করানোর মূল রূপকার এই ডিএফও বশিরুল। একের পর এক অভিযোগ জমা পড়লেও আজ পর্যন্ত তিনি একটির বিরুদ্ধেও নেননি কোনো ব্যবস্থা।
অনুসন্ধানে চন্দ্রা, মৌচাক, রাথুরা ও কাশিমপুর বিটের একের পর এক চাঞ্চল্যকর তথ্য ও অনিয়মের প্রমাণ উঠে এসেছে। চন্দ্রা স্পিনিং মিল-সংলগ্ন ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে কারিগরপাড়ায় আশরাফ হোসেন ইটের দেয়াল তুলে চার কক্ষের অর্ধপাকা ভবন বানাচ্ছেন। চন্দ্রা টাওয়েল টেক্স-সংলগ্ন এলাকায় সংরক্ষিত বনভূমিতে আকাশমণি গাছ কেটে রাস্তা নির্মাণ করেছেন তৌহিদুল ইসলাম সিদ্দিকী। ২০২৫ সালের ১৩ মার্চ তাঁর বিরুদ্ধে মামলা ও গ্রেপ্তার হলেও জামিনে বেরিয়ে বন বিভাগের অসাধু কর্মকর্তাদের টাকা দিয়ে ম্যানেজ করে আবারও রাস্তার কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন।
অনুসন্ধানে উঠে আসে টাকার বিনিময়ে বন বিভাগের জমি বেচাকেনার এই উৎসবের চিত্র ভয়াবহ! কালিয়াকৈরের ভুলুয়া এলাকায় শাকিল ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকার বিনিময়ে বনের জমিতে বাড়ি করছেন। কালামপুরে সামাদ ১ লাখ ৫ হাজার টাকা বিট স্টাফদের দিয়ে তিন রুমের টিনশেড ঘর তুলেছেন। কুঁচপাড়ায় দালাল রতনের মাধ্যমে ২ লাখ ৯০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে রনজিত বনের জমিতে পাঁচ রুমের ভবন বানাচ্ছেন। বটতলায় সাবেক ইসমাইল কমিশনারের ছেলে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা দিয়ে পাকা দোকান করেছেন। চান্দরা মৌজায় রিমা নামের এক নারী ২ লাখ ২০ হাজার টাকা দিয়ে তিন রুমের টিনশেড ঘর তুলেছেন, আর তাঁর পাশেই শাহীন ও মাহবুব ৬ লাখ ৭০ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ৪০ হাত লম্বা জুটের গোডাউন বানিয়েছেন।
স্থানীয়রা জানান, চন্দ্রা বিটের শিল্প কুঞ্জ পার্কের কাছে মোতালেব ডাক্তার ৪ লাখ টাকা বিট কর্মকর্তা ইকবাল হোসেনকে দিয়ে পাকা দেয়াল তুলে দোকান করছেন। সকিনার মোড়ে জাকির ২ লাখ ৩৪ হাজার টাকা ঘুষ দিয়ে ইকবাল, লুৎফর, মামুন ও লতিফকে ম্যানেজ করে পাঁচ রুমের ঘর তুলছেন। অভিযোগ ওঠার পর ইকবাল লোকদেখানো একটু বারান্দা ভেঙে চলে এলেও পুরো ঘর বহাল তবিয়তে রয়েছে! এ ছাড়া চান্দরা খেলার মাঠে শাহিনের মামার পুড়ে যাওয়া ঘর নতুন করে ৩০–৪০টি রুম হিসেবে আবার তৈরি করা হয়েছে, যেখান থেকে বিপুল পরিমাণ টাকা হাতিয়ে নিয়েছে ইকবাল, লুৎফর, মামুন, লতিফ সিন্ডিকেট। মাটিকাটা ইনক্রেটেবল ফ্যাক্টরির কাছে সাবেদ ওরফে পীর সাহেব ১ লাখ টাকা দিয়ে এবং পাশেই ভুলুয়া মৌজার কফিল উদ্দিনের ছেলে আনোয়ার হোসেন ওরফে ব্ল্যাক আনোয়ার ৭ লাখ টাকার বিনিময়ে ইটের দেয়াল তুলে বাড়ি বানিয়েছেন।
মৌচাক বন বিটের ভান্নারা সাব-বিটে বনফুল বাজারে নতুন করে ৩৪টি অবৈধ দোকান তোলা হয়েছে, যার প্রতিটির জন্য ৩০ হাজার টাকা হাতিয়ে নেওয়া হয়েছে। আলিফ কম্পোজিট লিমিটেড নামের ফ্যাক্টরি বনের জমি দখল করলেও উচ্ছেদ ঠেকাতে বিট কর্মকর্তা শাজাহান মিয়ার মাধ্যমে ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকার লেনদেন হয়েছে। মাঝুখান মৌজায় আজিজুল ডাক্তার ও তাঁর ভাই বিট কর্মকর্তার সঙ্গে আঁতাত করে শত শত গজারি ও আকাশমণির গাছ কেটে সাবাড় করে ফেলেছেন।
সংরক্ষিত বন রক্ষায় দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের এই দেউলিয়াপনা সীমা ছাড়িয়েছে শ্রীপুর রেঞ্জের রাথুরা বিটেও। গত ৪ জুন রাতে রাথুরা বিটের সিএস ১৩৬৯ ও ১৩৭১ দাগ থেকে মোজাম্মেল নামের এক ব্যক্তির কাছে মাত্র ৮ হাজার টাকায় ১০টি বিশাল গজারি গাছ কেটে বিক্রি করেছেন বিট অফিসার শেখ ইমদাদ হোসেন। নথিপত্র অনুযায়ী, ২০২৫ সালের ৩ নভেম্বর রাথুরা অঞ্চল থেকে তাঁকে সিলেটে বদলির আদেশ দেওয়া হলেও, বন সংরক্ষকের গাড়িচালক বিল্লাল ও প্রধান অফিস সহকারী আতিয়ার রহমানের মাধ্যমে মোটা অঙ্কের ঘুষ লেনদেনে তিনি একই জায়গায় বহাল থেকে একের পর এক অবৈধ কর্মকাণ্ড চালিয়ে যাচ্ছেন! বেলতলীতে বশির হোসেন ৫০ হাজার টাকায় এবং কবরঘাটায় রফিকুল ইসলাম মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে বনের জমিতে প্রকাশ্যে ঘর বানাচ্ছেন।
কাশিমপুর বিটের মাধবপুরে ইমরান নামের এক ব্যক্তি বিট কর্মকর্তা চান মিয়াকে ম্যানেজ করে দুই কক্ষের হাফ বিল্ডিং তুলছেন। অপরদিকে, রাজেন্দ্রপুর রেঞ্জের নিশ্চিন্তপুরে আউলিয়ার টেক মাজারের সামনে বনের গাছপালা কেটে কালীগঞ্জের এক প্রভাবশালী ঠিকাদারের কাছ থেকে টাকা নিয়ে নতুন করে পিচঢালাই রাস্তা বানিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
সবচেয়ে বড় প্রহসন ঘটেছে মৌচাক বিটের ভান্নারা মৌজায়। ২০২৩ সালে জাঁকজমকপূর্ণ উচ্ছেদ অভিযান চালিয়ে ১৪ কোটি টাকা মূল্যের প্রায় ৭০ শতাংশ জমি উদ্ধার করা হলেও, মাত্র দুই বছরের মাথায় কাঁটাতারের বেড়া ও খুঁটি কেটে আবারও মার্কেট গড়ে তোলা হয়েছে। বনপ্রহরী আমিনুল, জামাল ও মোবারকের সহযোগিতায় রাতে এই পুনর্দখল চলছে। সরকারি সার্ভেয়ার রনি হোসেন সরেজমিনে মেপে জবরদখলের সুস্পষ্ট প্রমাণ পেলেও গত দুই মাসে কোনো উচ্ছেদ চালানো হয়নি। উল্টো সাংবাদিকরা প্রশ্ন করলে বিট কর্মকর্তা শাজাহান অসৌজন্যমূলক আচরণ করে ক্ষোভ ঝাড়েন।
বাড়ইপাড়া বনবিটে প্রায় এক হাজার বিঘা জমি দখলের প্রতিযোগিতায় মেতেছে সিন্ডিকেট। সাহসে ভর করে অভিযুক্ত শাহ আলম ক্যামেরার সামনেই স্বীকার করেছেন, বনের জমিতে ঘর করতে বিট অফিসে ২০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে, টাকা ছাড়া এখানে ঘর করা যায় না! একইভাবে অভিযুক্ত আশরাফ চার রুমের পাকা বাড়ি বানিয়ে বন বিভাগকে ম্যানেজ করার কথা প্রকাশ্যেই জানিয়েছেন।
বন রক্ষার জিরো টলারেন্স নীতিকে বুড়ো আঙুল দেখিয়ে এই শত শত একর বনভূমি বিক্রি, অবৈধ স্থাপনা নির্মাণ আর গাছ কাটার পুরো সিন্ডিকেটের পেছনে রয়েছেন মূল হোতা ডিএফও বশিরুল। নিজের সাজানো সিন্ডিকেটকে দিয়ে বনের জমি বেচে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া এই কর্মকর্তা ওদিকে বনের সরকারি গেস্টহাউসগুলো অবৈধভাবে দখল করে নিজের আত্মীয়স্বজন নিয়ে আমোদ-ফুর্তিতে ব্যস্ত দিন কাটাচ্ছেন।
বনভূমি ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষায় অবিলম্বে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও উচ্চপর্যায়ের নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে এই লটারির মতো দুর্নীতিবাজ ডিএফও বশিরুলসহ তাঁর সিন্ডিকেটের সব বিট কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণের জোর দাবি জানাচ্ছে সর্বস্তরের জনগণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 





















