ঢাকা ১০:০৩ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬, ৪ কার্তিক ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
টেক্সটাইলের বর্জ্য পানি শোধনে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ কারওয়ান বাজার ও কৃষি মার্কেটে ভোক্তা অধিদপ্তরের অভিযান, ২০৪ লিটার সয়াবিন তেল বিনষ্ট পূজার ছুটিতে মেট্রোরেলের ট্রেনের ব্যবধান ১০–২০ মিনিট ঝামেলা নিয়েই জীবন কাটবে, মেনে নিয়েছি’: পরীমনি জামায়াত আমিরের বক্তব্য শুনে মানুষ হাসি-তামাশা করছে: রাশেদ খান নারী আসনের উপনির্বাচনে বিএনপির সাক্ষাৎকার শুরু এসএসসিতে ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পেল সৈয়দ আল মাহিদ সিদ্দিক তাজ ধর্ম যার যার, রাষ্ট্র সবার: প্রধানমন্ত্রী ঔষধ প্রশাসনের ‘আলাদিনের প্রদীপ’ সৈকত কুমার কর: জিম্মি দেশের ওষুধ খাত কুমিল্লায় রাসায়নিক দিয়ে কলা পাকানো, আড়তকে ৫০ হাজার টাকা জরিমানা

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন খালিদ

কান্না থামছে না স্বজনদের। মিলছে না প্রিয়জনের পরিচয়। প্রিয়জনের খোঁজে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি, আর মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বুকফাটা কান্না। কারও স্ত্রী নিখোঁজ, কারও দুই শিশুসন্তানসহ পুরো পরিবার। কেউ আবার খুঁজছেন ছয় ভাগিনা-ভাগনিকে। তাঁদের সবার চোখে একই প্রশ্ন—প্রিয় মানুষগুলো কোথায়?

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে রোববার বিকেলের দৃশ্যটা ছিল এমনই। এক পাশে উৎকণ্ঠিত স্বজনদের ভিড়, অন্য পাশে নিখোঁজদের খোঁজে ছোটাছুটি। কেউ মুঠোফোনে বাড়ির লোকজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ আবার কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কারও কাছেই নেই নিশ্চিত কোনো খবর।

ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এক দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। উদ্ধার হয়েছে ১০টি মরদেহ। কিন্তু সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন ১১ জন। তাঁদের মধ্যে আছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি ও দুই শিশুকন্যা। নিখোঁজ রয়েছেন ছাত্রদল নেতা ফয়সাল দেওয়ানের স্ত্রী মুক্তাও। মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই বিকৃত যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এখন স্বজনদের অপেক্ষা ডিএনএ পরীক্ষার ফলের জন্য। সেই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাঁদের কাছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে।

‘শুক্রবার সকালে নাহিদুর ফোন দিয়েছিল। বলেছিল, দেখা করব। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুনের ঘটনা শোনার পর যখন ওকে আবার ফোন দিলাম, ফোন আর ধরল না। তখনই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠছিল। কেমন জানি সন্দেহ লাগছিল।’ কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদ খালিদ। উখিয়ার পালংখালীতে কর্মরত এই ব্যক্তির চাচাতো ভাই নাহিদুর রহমান। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের আট নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নাহিদুরের সঙ্গে শুক্রবার সকালে হওয়া শেষ কথোপকথন এখন বারবার মনে পড়ছে তাঁর।

শুক্রবারের সেই ফোনকলের পর আর কথা হয়নি দুজনের। শনিবার সকালে আগুনের খবর পাওয়ার পর নাহিদুরকে ফোন দিয়েছিলেন খালিদ। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসেনি। তখন থেকেই মনের মধ্যে জমতে থাকে অজানা আশঙ্কা। রোববার বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে সেই আশঙ্কার কথাই বলছিলেন তিনি। নাহিদুরের পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত নন খালিদ। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর অপেক্ষারও অবসান নেই।

মর্গের সামনে অপেক্ষমাণ আরেকজন ফয়সাল দেওয়ান। ছাত্রদল নেতা ফয়সালের স্ত্রী মুক্তা অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাঁর স্ত্রীর মরদেহটি কোথায়, তা-ও জানেন না তিনি।

প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা আর মরদেহ ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন ফয়সাল। চোখের সামনে মর্গ, অথচ সেখানেও স্ত্রীর খোঁজ নেই। বুকচাপা কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছু নেই। আইনের কাছে আমরা বাঁধা। প্রক্রিয়া শেষে যেন দ্রুত স্ত্রীর মরদেহটা ফিরে পাই। যেন শেষবারের মতো সুন্দরভাবে তাকে বিদায় জানাতে পারি, দাফনের কাজটুকু সম্পন্ন করতে পারি।’

ফয়সালের আকুতি শুধু স্ত্রীর মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য। প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায়টুকু যথাযথভাবে জানাতে পারেন, সেটিই এখন তাঁর চাওয়া।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে এসেছেন ডলার মাহমুদ। তাঁর চাচাতো বোনের মেয়ে তাজিন, তাজিনের স্বামী নাহিদুর রহমান এবং তাঁদের দুই সন্তানসহ পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ। নাহিদুর ট্রেড ভিশন লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন। খবর পাওয়ার পর থেকে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ ও হাসপাতালের মর্গের মধ্যে ছোটাছুটি করছেন ডলার মাহমুদ। একদিকে স্বজনদের খোঁজ, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সামলানো—সব মিলিয়ে দম ফেলার সময়ও যেন পাচ্ছেন না তিনি।

ডলার মাহমুদ বলেন, ‘চাচাতো বোনের কাছেই বড় হয়েছি আমি, তাই এই বিপদে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বটা আমারই। খবর পাওয়ার পর থেকে স্থির থাকতে পারিনি। পোড়া রিসোর্টে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে খুঁজেছি, এখন মর্গে আইনি জটিলতা মেটানোর চেষ্টা করছি।’

উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহ নিয়ে তাঁদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জড়াজড়ি করে শৌচাগার থেকে যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আমাদের ধারণা, তারাই নাহিদুরের পরিবারের সদস্য।’ তবে এই ধারণা এখনো নিশ্চিত নয়। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত নাহিদুরের পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

নাহিদুর রহমানের বয়স ৪১ বছর। তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজির বয়স ৩৬ বছর। তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া ও সুনাইনা ইহানার বয়স যথাক্রমে ছয় ও তিন বছর। চার সদস্যের এই পরিবারটির খোঁজে উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছেন স্বজনেরা।

নাহিদুরের পরিবারের মতোই স্বজন হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে ইলিয়াস, রিয়াজ মাহমুদ রিপন ও আমিনুল ইসলামের। তাঁদের ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজ মিলছে না। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ফারিহা কবির ও তাঁর শিশুসন্তান ফায়িজান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী (জেরিফ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবিন আলভী ও ইসরাত জাহান মালিহা।

শনিবার থেকে তাঁদের খোঁজে ছুটছেন স্বজনেরা। কখনো রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে, কখনো হাসপাতালের মর্গে। কিন্তু কোথাও মিলছে না নিশ্চিত কোনো খবর।

তিন বোনের ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজে উদ্বিগ্ন আমিনুল ইসলাম। বাড়ি থেকে একের পর এক ফোন আসছে। ওপাশ থেকে স্বজনেরা জানতে চাইছেন, কোনো খবর পাওয়া গেছে কি না। তাঁদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেও কান্না ধরে রাখতে পারছেন না তিনি। অন্যদিকে, মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও কলে স্বজনদের সেখানকার পরিস্থিতি দেখাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতদের চাচা রিয়াজ মাহমুদ রিপন। প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষমাণ এই মানুষগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের অবস্থা এতটাই বিকৃত যে খালি চোখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিরা অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা জানতেও তদন্ত চলছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল তাঁদের মুঠোফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছে।

অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) জানান, নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন থাকলেও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ১০টি। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা দেখতে নতুন করে তল্লাশি চলছে। অর্থাৎ, মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধানেও তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।

রিসোর্টে বেড়াতে এসে আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু একটি অগ্নিকাণ্ড বদলে দিয়েছে স্বজনদের জীবন। এখন তাঁদের কাছে ছুটি, ভ্রমণ কিংবা আনন্দের কোনো স্মৃতি নেই। আছে শুধু নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজ আর একটি নিশ্চিত খবরের অপেক্ষা। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তত দিন স্বজনদের উৎকণ্ঠা কাটার কোনো সহজ পথ নেই।

খালিদের মনে ফিরে ফিরে আসছে নাহিদুরের শেষ ফোনকল। ফয়সাল অপেক্ষা করছেন স্ত্রীর মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য। ডলার মাহমুদ খুঁজছেন চার সদস্যের একটি পরিবারকে। আর আমিনুল ইসলাম ও রিয়াজ মাহমুদ রিপন অপেক্ষা করছেন ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে তাঁদের অপেক্ষা শুধু প্রিয়জনের পরিচয় জানার নয়, অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে শেষবারের মতো বিদায় জানানোরও।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

টেক্সটাইলের বর্জ্য পানি শোধনে যৌথ গবেষণার উদ্যোগ

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে কাঁদছেন খালিদ

আপডেট সময় ০৮:৩২:৪৭ অপরাহ্ন, সোমবার, ১৯ অক্টোবর ২০২৬

কান্না থামছে না স্বজনদের। মিলছে না প্রিয়জনের পরিচয়। প্রিয়জনের খোঁজে এক হাসপাতাল থেকে আরেক হাসপাতালে ছোটাছুটি, আর মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে বুকফাটা কান্না। কারও স্ত্রী নিখোঁজ, কারও দুই শিশুসন্তানসহ পুরো পরিবার। কেউ আবার খুঁজছেন ছয় ভাগিনা-ভাগনিকে। তাঁদের সবার চোখে একই প্রশ্ন—প্রিয় মানুষগুলো কোথায়?

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে রোববার বিকেলের দৃশ্যটা ছিল এমনই। এক পাশে উৎকণ্ঠিত স্বজনদের ভিড়, অন্য পাশে নিখোঁজদের খোঁজে ছোটাছুটি। কেউ মুঠোফোনে বাড়ির লোকজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন, কেউ আবার কান্না চেপে রাখার চেষ্টা করছেন। কিন্তু কারও কাছেই নেই নিশ্চিত কোনো খবর।

ইনানীর পাটুয়ারটেক সমুদ্রসৈকত এলাকার টুপটুপ রেস্টুরেন্ট অ্যান্ড রিসোর্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের পর এক দিনের বেশি সময় পেরিয়ে গেছে। উদ্ধার হয়েছে ১০টি মরদেহ। কিন্তু সেগুলোর পরিচয় নিশ্চিত হওয়া যায়নি। নিখোঁজের তালিকায় রয়েছেন ১১ জন। তাঁদের মধ্যে আছেন মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি অ্যান্ড পুলিশ সায়েন্স বিভাগের দ্বিতীয় ব্যাচের শিক্ষার্থী নাহিদুর রহমান, তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজি ও দুই শিশুকন্যা। নিখোঁজ রয়েছেন ছাত্রদল নেতা ফয়সাল দেওয়ানের স্ত্রী মুক্তাও। মরদেহগুলোর অবস্থা এতটাই বিকৃত যে চেহারা দেখে শনাক্ত করা যাচ্ছে না। এখন স্বজনদের অপেক্ষা ডিএনএ পরীক্ষার ফলের জন্য। সেই অপেক্ষার প্রতিটি মুহূর্ত যেন তাঁদের কাছে দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে উঠছে।

‘শুক্রবার সকালে নাহিদুর ফোন দিয়েছিল। বলেছিল, দেখা করব। শনিবার সকালে রিসোর্টে আগুনের ঘটনা শোনার পর যখন ওকে আবার ফোন দিলাম, ফোন আর ধরল না। তখনই বুকটা ছ্যাঁত করে উঠছিল। কেমন জানি সন্দেহ লাগছিল।’ কথাগুলো বলছিলেন মোহাম্মদ খালিদ। উখিয়ার পালংখালীতে কর্মরত এই ব্যক্তির চাচাতো ভাই নাহিদুর রহমান। যশোরের মনিরামপুর উপজেলার মোহনপুর গ্রামের আট নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা নাহিদুরের সঙ্গে শুক্রবার সকালে হওয়া শেষ কথোপকথন এখন বারবার মনে পড়ছে তাঁর।

শুক্রবারের সেই ফোনকলের পর আর কথা হয়নি দুজনের। শনিবার সকালে আগুনের খবর পাওয়ার পর নাহিদুরকে ফোন দিয়েছিলেন খালিদ। কিন্তু ওপাশ থেকে কোনো সাড়া আসেনি। তখন থেকেই মনের মধ্যে জমতে থাকে অজানা আশঙ্কা। রোববার বিকেলে কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে সেই আশঙ্কার কথাই বলছিলেন তিনি। নাহিদুরের পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা এখনো নিশ্চিত নন খালিদ। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত তাঁর অপেক্ষারও অবসান নেই।

মর্গের সামনে অপেক্ষমাণ আরেকজন ফয়সাল দেওয়ান। ছাত্রদল নেতা ফয়সালের স্ত্রী মুক্তা অগ্নিকাণ্ডের পর থেকে নিখোঁজ। উদ্ধার হওয়া মরদেহগুলোর মধ্যে তাঁর স্ত্রীর মরদেহটি কোথায়, তা-ও জানেন না তিনি।

প্রিয়জনকে হারানোর আশঙ্কা আর মরদেহ ফিরে পাওয়ার অনিশ্চয়তায় নিস্তব্ধ হয়ে পড়েছেন ফয়সাল। চোখের সামনে মর্গ, অথচ সেখানেও স্ত্রীর খোঁজ নেই। বুকচাপা কষ্ট নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমার আর হারাবার কিছু নেই। আইনের কাছে আমরা বাঁধা। প্রক্রিয়া শেষে যেন দ্রুত স্ত্রীর মরদেহটা ফিরে পাই। যেন শেষবারের মতো সুন্দরভাবে তাকে বিদায় জানাতে পারি, দাফনের কাজটুকু সম্পন্ন করতে পারি।’

ফয়সালের আকুতি শুধু স্ত্রীর মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য। প্রিয় মানুষটিকে শেষ বিদায়টুকু যথাযথভাবে জানাতে পারেন, সেটিই এখন তাঁর চাওয়া।

ঢাকা থেকে কক্সবাজারে ছুটে এসেছেন ডলার মাহমুদ। তাঁর চাচাতো বোনের মেয়ে তাজিন, তাজিনের স্বামী নাহিদুর রহমান এবং তাঁদের দুই সন্তানসহ পরিবারের চার সদস্য নিখোঁজ। নাহিদুর ট্রেড ভিশন লিমিটেডে কর্মরত ছিলেন। খবর পাওয়ার পর থেকে রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপ ও হাসপাতালের মর্গের মধ্যে ছোটাছুটি করছেন ডলার মাহমুদ। একদিকে স্বজনদের খোঁজ, অন্যদিকে প্রয়োজনীয় আইনি প্রক্রিয়া সামলানো—সব মিলিয়ে দম ফেলার সময়ও যেন পাচ্ছেন না তিনি।

ডলার মাহমুদ বলেন, ‘চাচাতো বোনের কাছেই বড় হয়েছি আমি, তাই এই বিপদে সবচেয়ে বেশি দায়িত্বটা আমারই। খবর পাওয়ার পর থেকে স্থির থাকতে পারিনি। পোড়া রিসোর্টে ফায়ার সার্ভিসের সঙ্গে খুঁজেছি, এখন মর্গে আইনি জটিলতা মেটানোর চেষ্টা করছি।’

উদ্ধার হওয়া তিনটি মরদেহ নিয়ে তাঁদের আশঙ্কার কথা জানিয়ে তিনি বলেন, ‘জড়াজড়ি করে শৌচাগার থেকে যে তিনজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে, আমাদের ধারণা, তারাই নাহিদুরের পরিবারের সদস্য।’ তবে এই ধারণা এখনো নিশ্চিত নয়। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত না হওয়া পর্যন্ত নাহিদুরের পরিবারের ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা নিশ্চিত করে বলা যাচ্ছে না।

নাহিদুর রহমানের বয়স ৪১ বছর। তাঁর স্ত্রী আফসানা মতিন তানজির বয়স ৩৬ বছর। তাঁদের দুই মেয়ে রুজাইনা ইনায়া ও সুনাইনা ইহানার বয়স যথাক্রমে ছয় ও তিন বছর। চার সদস্যের এই পরিবারটির খোঁজে উৎকণ্ঠার প্রহর গুনছেন স্বজনেরা।

নাহিদুরের পরিবারের মতোই স্বজন হারানোর আশঙ্কায় দিন কাটছে ইলিয়াস, রিয়াজ মাহমুদ রিপন ও আমিনুল ইসলামের। তাঁদের ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজ মিলছে না। নিখোঁজদের মধ্যে রয়েছেন ফারিহা কবির ও তাঁর শিশুসন্তান ফায়িজান, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী নাফিজ তেহামী (জেরিফ), জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী লায়লা জাহান নাবিলা এবং ইস্ট ওয়েস্ট ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী মিলিতা মেহেজাবিন আলভী ও ইসরাত জাহান মালিহা।

শনিবার থেকে তাঁদের খোঁজে ছুটছেন স্বজনেরা। কখনো রিসোর্টের ধ্বংসস্তূপে, কখনো হাসপাতালের মর্গে। কিন্তু কোথাও মিলছে না নিশ্চিত কোনো খবর।

তিন বোনের ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজে উদ্বিগ্ন আমিনুল ইসলাম। বাড়ি থেকে একের পর এক ফোন আসছে। ওপাশ থেকে স্বজনেরা জানতে চাইছেন, কোনো খবর পাওয়া গেছে কি না। তাঁদের সান্ত্বনা দিতে গিয়ে নিজেও কান্না ধরে রাখতে পারছেন না তিনি। অন্যদিকে, মর্গের সামনে দাঁড়িয়ে ভিডিও কলে স্বজনদের সেখানকার পরিস্থিতি দেখাতে গিয়ে কান্নায় ভেঙে পড়েন নিহতদের চাচা রিয়াজ মাহমুদ রিপন। প্রিয়জনের খোঁজে অপেক্ষমাণ এই মানুষগুলোর কাছে প্রতিটি মুহূর্ত যেন নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়ে দিচ্ছে।

উদ্ধার হওয়া ১০টি মরদেহের অবস্থা এতটাই বিকৃত যে খালি চোখে পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হচ্ছে না। ফলে মরদেহগুলোর পরিচয় নিশ্চিত করতে ডিএনএ পরীক্ষার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নিখোঁজ ব্যক্তিরা অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টের ভেতরে ছিলেন, নাকি বাইরে ছিলেন, তা জানতেও তদন্ত চলছে।

কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট তাসনীম জাহান জানান, নিখোঁজ ব্যক্তিদের অবস্থান সম্পর্কে নিশ্চিত হতে পুলিশের বিশেষ শাখা (এসবি) ও তদন্তকারী দল তাঁদের মুঠোফোন নম্বরের নেটওয়ার্ক লোকেশনসহ বিভিন্ন তথ্য বিশ্লেষণ করছে।

অন্যদিকে, ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের পরিচালক (প্রশিক্ষণ) জানান, নিখোঁজের তালিকায় ১১ জন থাকলেও মরদেহ উদ্ধার হয়েছে ১০টি। অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে ধ্বংসস্তূপের সব জায়গায় তল্লাশি চালানো সম্ভব হয়নি। এ ছাড়া কাঠের তৈরি ওপরের তলাগুলো ভেঙে নিচে পড়ে যাওয়ায় কেউ চাপা পড়ে আছেন কি না, তা দেখতে নতুন করে তল্লাশি চলছে। অর্থাৎ, মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্তের পাশাপাশি নিখোঁজদের সন্ধানেও তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে।

রিসোর্টে বেড়াতে এসে আনন্দে সময় কাটানোর কথা ছিল তাঁদের। কিন্তু একটি অগ্নিকাণ্ড বদলে দিয়েছে স্বজনদের জীবন। এখন তাঁদের কাছে ছুটি, ভ্রমণ কিংবা আনন্দের কোনো স্মৃতি নেই। আছে শুধু নিখোঁজ প্রিয়জনের খোঁজ আর একটি নিশ্চিত খবরের অপেক্ষা। মরদেহগুলোর পরিচয় শনাক্ত করতে ডিএনএ পরীক্ষার ফলের জন্য অপেক্ষা করতে হবে। তত দিন স্বজনদের উৎকণ্ঠা কাটার কোনো সহজ পথ নেই।

খালিদের মনে ফিরে ফিরে আসছে নাহিদুরের শেষ ফোনকল। ফয়সাল অপেক্ষা করছেন স্ত্রীর মরদেহ ফিরে পাওয়ার জন্য। ডলার মাহমুদ খুঁজছেন চার সদস্যের একটি পরিবারকে। আর আমিনুল ইসলাম ও রিয়াজ মাহমুদ রিপন অপেক্ষা করছেন ছয় ভাগিনা-ভাগনির খোঁজে।

কক্সবাজার সদর হাসপাতালের মর্গের সামনে তাঁদের অপেক্ষা শুধু প্রিয়জনের পরিচয় জানার নয়, অনিশ্চয়তার অবসান ঘটিয়ে শেষবারের মতো বিদায় জানানোরও।