সৌদি আরব ও দেশটির সমর্থিত ইয়েমেনি সেনাবাহিনীর সঙ্গে সংঘাতের ৩৭ দিনে ইয়েমেনের আরও ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা দখলে নিয়েছে হুথি বিদ্রোহীরা। এএফপির এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানা গেছে।
গত ৭ সেপ্টেম্বর সৌদি আরবের সঙ্গে হুথি বিদ্রোহীদের সংঘাত শুরু হয়। সেদিন সৌদি আরবের চারটি শহরে হুথিদের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলার মধ্য দিয়ে সংঘাতের সূত্রপাত ঘটে।
এরপর পেরিয়ে গেছে এক মাস সাত দিন, অর্থাৎ ৩৭ দিন। এই সময়ে একদিকে সৌদি আরবের বিমানবন্দর, জ্বালানি স্থাপনা, রাজধানী রিয়াদসহ বিভিন্ন বড় শহর এমনকি মক্কা ও মদিনায়ও ধারাবাহিক হামলা চালিয়েছে হুথি যোদ্ধারা। একই সময়ে ইয়েমেনের আরও ১৫ হাজার বর্গকিলোমিটার এলাকা নিজেদের দখলে নিয়েছে তারা।
ইয়েমেনের থিংক ট্যাংক সানা সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিজ এই সময়কালকে ‘অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন ও নির্ণায়ক এক পর্যায়’ হিসেবে অভিহিত করেছে। সংস্থাটির এক কর্মকর্তা এএফপিকে বলেন, “এখানে যা ঝুঁকির মুখে রয়েছে, তা হলো খোদ ইয়েমেন রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ, ইয়েমেনি নাগরিকেরা কেমন সমাজে বসবাস করবেন এবং সেই ভবিষ্যৎ কারা নির্ধারণ করবেন—সেসব বিষয়।”
হামলার এক মাস
এনডিটিভি ডেটাফাইয়ের সংগৃহীত তথ্য অনুযায়ী, ৭ সেপ্টেম্বর থেকে হুথিরা সৌদি আরবের বিমানবন্দর, তেল শোধনাগার, পাইপলাইন, গ্যাস প্রক্রিয়াজাতকরণ ও সংরক্ষণকেন্দ্র এবং সামরিক স্থাপনাগুলোর ওপর অন্তত দুই ডজন বড় ধরনের হামলা চালিয়েছে। এসব লক্ষ্যবস্তুর মধ্যে কিছু হুথি-নিয়ন্ত্রিত এলাকা থেকে ১ হাজার ২৫০ কিলোমিটারেরও বেশি দূরে অবস্থিত।
রিয়াদের কিং খালিদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে গত চার দিনে অন্তত তিনবার হামলা চালিয়েছে হুথিরা। এর জেরে কর্তৃপক্ষকে ফ্লাইট চলাচল স্থগিত করতে হয়। রয়টার্সের তথ্যমতে, বিমানবন্দরে এসব হামলায় অন্তত ১৮ জন নিহত এবং প্রায় ৩০০ জন আহত হয়েছেন।
এ ছাড়া সৌদি আরবের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের শহর আবহা, নাজরান ও জিজানের বিমানবন্দরগুলোতেও হামলা চালানো হয়েছে।
স্যাটেলাইট চিত্রে দেখা গেছে, হুথিদের ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলায় গত এক মাসে সৌদি আরবের অন্তত নয়টি জ্বালানি স্থাপনা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এসব স্থাপনার মধ্যে রয়েছে তেল শোধনাগার, তেলক্ষেত্র ও গ্যাস প্ল্যান্ট।
এসব হামলা সৌদি আরবের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থার দুর্বলতা সামনে এনেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনাগুলো রক্ষায় এই ব্যবস্থা কতটা কার্যকর, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। পাশাপাশি নিরাপত্তার জন্য যুক্তরাষ্ট্রের ওপর সৌদি আরবের নির্ভরতা নিয়েও নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে।
সংঘাত যেভাবে তীব্র হলো
জুলাইয়ের শেষ দিকে উত্তেজনা বাড়তে শুরু করে। সে সময় হুথিরা লোহিত সাগরে সৌদি জাহাজগুলোর ওপর নৌ-অবরোধের ঘোষণা দেয়। খামিস মুশাইত, নাজরান, জিজান ও আবহা শহরে হামলার মধ্য দিয়ে এই উত্তেজনা আরও তীব্র হয়। এসব হামলায় ৭০ জনেরও বেশি মানুষ আহত হন এবং তেল স্থাপনাগুলোতে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটে।
এরপর হুথিরা ঝটিকা স্থল অভিযান চালায় এবং গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক পথ বাব আল-মান্দাব প্রণালির কাছাকাছি লোহিত সাগরের উপকূলীয় বেশ কিছু এলাকা নিজেদের দখলে নেয়।
এর জবাবে সৌদি আরব বিমান হামলা চালিয়ে ইয়েমেনের আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত সরকারের সামরিক অভিযানকে সমর্থন জানিয়েছে। উল্লেখ্য, ৪ অক্টোবর থেকে ওই সরকারের বাহিনীগুলো কয়েকটি এলাকায় সাফল্য অর্জন করেছে।
ভবিষ্যৎ পরিস্থিতি
সানা সেন্টারের সহ-নির্বাহী পরিচালক ওসামা আল-রাওয়ানি বলেন, হুথিদের পরাজিত করা সহজ হবে না, কারণ তারা উল্লেখযোগ্য সামরিক সক্ষমতা গড়ে তুলেছে।
এএফপিকে ওসামা আল-রাওয়ানি বলেন, “তবে কোনো এলাকা ধরে রাখা এবং পাল্টা আক্রমণ চালানোর জন্য প্রয়োজন আর্থিক সম্পদ, রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি ও দৃঢ় সংকল্প—বিশেষ করে রিয়াদের পক্ষ থেকে। সৌদি আরবের অতীতের কর্মকাণ্ড এমন কোনো আস্থার জন্ম দেয় না যে, দীর্ঘস্থায়ী কোনো যুদ্ধ শেষ পর্যন্ত চালিয়ে যাওয়ার মতো সক্ষমতা বা ধৈর্য তাদের রয়েছে।”
তবে সংঘাত আরও তীব্র হলে সৌদি আরবের জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলার ঝুঁকি বাড়বে। এতে বিশ্বজুড়ে জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়তে পারে। এরই মধ্যে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের হামলার কারণে জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ছাড়া সংঘাত বাড়লে লোহিত সাগরে চলাচলকারী জাহাজগুলোর ওপরও হুথিদের হামলার আশঙ্কা তৈরি হতে পারে।
আন্তর্জাতিক ডেস্ক 
























