বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশন (বিসিআইসি)-এর বিভিন্ন পর্যায়ে দীর্ঘদিন ধরে একাধিক প্রভাবশালী দুর্নীতির চক্র সক্রিয় রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানটি ক্রমাগত অধঃপতনের দিকে যাচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, এসব চক্র এতটাই প্রভাবশালী যে, হাতেনাতে অনিয়ম-অপকর্ম ধরা পড়লেও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয় না। এ কারণেই প্রতিষ্ঠানটির কাঙ্ক্ষিত উন্নতি হচ্ছে না বলে অভিযোগকারীদের দাবি।
বিসিআইসিতে বর্তমানে যেসব অনিয়ম-দুর্নীতি হচ্ছে, তার অধিকাংশের মূলে প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলম রয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। কোনো প্রতিষ্ঠানের প্রশাসন, ক্রয়, বিপণন ও হিসাব-সংক্রান্ত কার্যক্রম যখন একই গোষ্ঠীর প্রভাব ও নিয়ন্ত্রণে চলে আসে, তখন স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি দুর্বল হওয়ার পাশাপাশি অনিয়ম ও দুর্নীতির সুযোগও বেড়ে যায়। অভিযোগ অনুযায়ী, কর্মচারী প্রধান শরীফুল আলমের নেতৃত্বে বিসিআইসিতে এমন পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে।
বিসিআইসিতে কর্মচারী প্রধান (সিওপি) পদটি প্রশাসনিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। আ ন ম শরীফুল আলম এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে একদিকে অনিয়ম-দুর্নীতিকে উৎসাহিত করছেন এবং নিজেও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়ছেন; অন্যদিকে সৎ ও যোগ্য কর্মকর্তা-কর্মচারীদের নানাভাবে হয়রানি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁকে কেন্দ্র করে একটি বিশেষ গোষ্ঠী দীর্ঘদিন ধরে অবৈধ সুবিধা ভোগ করে আসছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। চিহ্নিত দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক বা আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার ক্ষেত্রে তিনি বাধা সৃষ্টি করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। ফলে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অনেক কর্মকর্তা দীর্ঘদিন ধরে পদে বহাল থাকছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
অন্যদিকে, বিসিআইসির অভ্যন্তরে সৎ ও দায়িত্বশীল কর্মকর্তাদের একটি অংশ বিভিন্ন ধরনের চাপ, বদলি ও প্রশাসনিক হয়রানির মুখোমুখি হচ্ছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, বিসিআইসির কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলম নিজেও একটি সক্রিয় সিন্ডিকেটের অংশ। ব্যাচমেটদের নিয়ে তিনি শক্তিশালী এই সিন্ডিকেট গড়ে তুলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। প্রতিষ্ঠানটিতে দুর্নীতির ক্ষেত্রে বিপণন, হিসাব ও প্রশাসন বিভাগসহ বিভিন্ন কারখানার ব্যবস্থাপনা পরিচালকদের একটি অংশ একজোট হয়ে কাজ করছে বলে দাবি করা হয়েছে। বড় বড় দুর্নীতির প্রমাণ কৌশলে এড়িয়ে যাওয়া হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে। গণমাধ্যমে খবর প্রকাশের পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও পরে তা ধামাচাপা দেওয়া হয় বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, বিপুল অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলম এসব ঘটনা ধামাচাপা দিতে ভূমিকা রাখেন। ছোটখাটো অনিয়ম নিয়ে তাঁর দপ্তরকে ব্যস্ত থাকতে দেখা গেলেও বড় অনিয়মের ক্ষেত্রে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হয় না বলে অভিযোগ রয়েছে।
বিসিআইসিতে সরকারি করের অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিরাও পার পেয়ে গেছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ ধরনের একটি ঘটনায় শরীফুল আলমের ভূমিকা ছিল বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। তখন তিনি বিসিআইসির মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) পদে ছিলেন এবং অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে সাধারণ কর্মশাখার দায়িত্বও পালন করছিলেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব কর্মকাণ্ডের পুরস্কার হিসেবেই পরবর্তী সময়ে তিনি কর্মচারী প্রধান পদে পদোন্নতি পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। আরও দাবি করা হয়েছে, অবৈধ সুবিধা আদায়ের জন্য বিসিআইসির কিছু কর্মকর্তা শরীফুল আলমের সহযোগিতা নিয়ে থাকেন এবং বিনিময়ে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হন।
প্রশাসনিক অদক্ষতা
বিসিআইসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতে, আ ন ম শরীফুল আলমের প্রশাসনিক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। তবে অনিয়মের কৌশল, মন্ত্রণালয় বা ঊর্ধ্বতন মহলে তদবির এবং পদ ধরে রাখার ক্ষেত্রে তিনি দক্ষ বলে অভিযোগকারীদের দাবি। কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ কেউ তাঁকে ‘লেবাস ব্যবসায়ী’ বলে আখ্যায়িত করেন বলেও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। অতীতে মৃত ব্যক্তির পদোন্নতি প্রদান এবং প্রশাসনিক বিভিন্ন ভুলের মাধ্যমে তিনি সরকারি কাজে অদক্ষতার পরিচয় দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ বইয়ের প্রকাশনার পুরস্কার হিসেবে সিওপি পদে পদায়নের অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বঙ্গবন্ধু পরিষদের সঙ্গে যুক্ত আ ন ম শরীফুল আলমের চেয়ে যোগ্য ও জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি কর্মচারী প্রধানের (সিওপি) পদ পেয়েছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। এ পদ পাওয়ার উদ্দেশ্যে তিনি ‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ নামে একটি বইও লেখেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বইটির প্রকাশনা-সংশ্লিষ্ট কার্যকরী পরিষদের আহ্বায়ক ছিলেন আ ন ম শরীফুল আলম বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
শরীফুল আলমের নিয়োগ
অনুসন্ধানে জানা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, আ ন ম শরীফুল আলম সরাসরি ষষ্ঠ গ্রেডে নিয়োগ পান। ফু-ওয়াং কোম্পানির অভিজ্ঞতার সনদ ব্যবহার করে তিনি এ পদে নিয়োগ পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ নেতা তোফায়েল আহমেদের প্রত্যক্ষ সুপারিশে শরীফুল আলম বিসিআইসিতে চাকরি পান বলেও দাবি করা হয়েছে। স্থানীয়ভাবে খোঁজ নিয়ে জানা গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, শরীফুলের বাবা থানা পর্যায়ের কৃষক লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর শরীফুল আলম বিএনপির নেতা হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে শরীফুল আলম কখনো এনসিপি, কখনো জামায়াত, আবার কখনো বিএনপির অনুসারী হিসেবে পরিচিত হওয়ার চেষ্টা করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। কোন রাজনৈতিক দল ক্ষমতায় আসে, তা দেখার অপেক্ষায় ছিলেন বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। বিএনপি সরকার গঠনের পর সাবেক ছাত্রদল-সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা উদ্যোগ নিয়ে বিসিআইসিতে ‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম’ গঠন করেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। আ ন ম শরীফুল আলম সিওপি পদের প্রভাব খাটিয়ে অনেকটা জোর করে ওই ফোরামের সহসভাপতির পদ দখল করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
আ ন ম শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে ফোরামের অভিযোগ
‘বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরাম’-এর সহসভাপতির পদ গ্রহণের কিছুদিন পরই ফোরামের সদস্যদের কাছে শরীফুল আলমের ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দেয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একপর্যায়ে ফোরামের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক তাঁর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে বিসিআইসি কর্তৃপক্ষের কাছে অভিযোগপত্র জমা দেন বলে দাবি করা হয়েছে। তবে শরীফুল আলম উল্টো কৌশল অবলম্বন করে বিসিআইসির কয়েকজন কর্মকর্তার সহযোগিতায় ফোরামের নেতাদের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্রে জড়ান বলে অভিযোগ রয়েছে।
নিয়োগ ও বদলি-বাণিজ্য
বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে লোক নিয়োগ ও পদায়নের মাধ্যমে বড় অঙ্কের অর্থ হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে বিসিআইসির কর্মচারী প্রধান (সিওপি) শরীফুল আলমের বিরুদ্ধে। যেসব গুরুত্বপূর্ণ পদে প্রকৌশলী থাকার কথা, সেখানে তাঁর আস্থাভাজন অনভিজ্ঞ ব্যক্তিদের পদায়নের মাধ্যমে তিনি আর্থিকভাবে লাভবান হচ্ছেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
মন্ত্রণালয়সহ বিভিন্ন পর্যায় থেকে প্রায়ই বদলি ও পদায়নের তদবির আসে সিওপির কাছে। এসব তদবিরের সঙ্গে নিজের স্বার্থসংশ্লিষ্ট কাজও করিয়ে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। বদলি ও পদায়নকে কেন্দ্র করে তিনি কমিশন-বাণিজ্যে জড়িত বলেও দাবি করা হয়েছে। এ ক্ষেত্রে সিইউএফএলে কর্মরত আরিফ নামের এক কর্মচারীকে প্রায়ই ব্যবহার করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচার রয়েছে, আরিফের ছোট ভাই প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে কর্মরত। এই পরিচয়কে কাজে লাগিয়ে শরীফুল আলমের বদলি-বাণিজ্য চলছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
সরকারি সফরের নামে বিয়ের অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার অভিযোগ
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিসিআইসির কর্মচারী প্রধান (সিওপি) হিসেবে পদায়ন হওয়া শরীফুল আলম দাপ্তরিক সফরের কথা বলে দলবল নিয়ে রাঙামাটি গিয়ে বিয়ের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এমন কর্মকাণ্ডে সাধারণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
স্বজনপ্রীতি
নিজের সিন্ডিকেটের সদস্য ও আস্থাভাজন ব্যক্তিদের দিয়ে বিসিআইসির প্রধান কার্যালয় সাজানো হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে, সিন্ডিকেটের সদস্য নন—এমন সাধারণ কর্মকর্তাদের ওপর দমন-পীড়ন চালানো হচ্ছে বলেও দাবি করা হয়েছে। শরীফুল আলমের আস্থাভাজন কর্মকর্তারা দক্ষ না হলেও তাঁদের বদলি করে প্রধান কার্যালয়ে পদায়নের ব্যবস্থা করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব ক্ষেত্রে ঊর্ধ্বতন মহলের চাপের কথা বলা হলেও সেই চাপ কোথা থেকে আসে, তা নিয়ে প্রশ্ন তোলার সুযোগ নেই বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
উত্তরবঙ্গ গ্রুপিংয়ের অভিযোগ
কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলম কুমিল্লা-নোয়াখালী এলাকার লোকজনকে তাঁর কাছে না আসার কথা বলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানিয়েছেন, দাপ্তরিক কাজে সিওপির কাছে গেলে তিনি প্রায়ই এ ধরনের কথা বলেন। ওই কর্মকর্তা বলেন, তাঁরা এতে আশাহত হয়েছেন। কর্মচারী প্রধানের পদে থেকে এমন আচরণ তাঁর দায়িত্বশীল ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তৈরি করে। বিশেষ করে কুমিল্লা অঞ্চলের কর্মকর্তাদের সঙ্গে তিনি বৈষম্যমূলক আচরণ করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের কর্মকর্তাদের হয়রানির অভিযোগ
শরীফুল আলম আগে অনেকটা জোর করে বিসিআইসি জাতীয়তাবাদী অফিসার্স ফোরামের সহসভাপতির পদে যুক্ত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে ওই ফোরামে থাকতে না পেরে তিনি ফোরামের নেতাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নেন বলেও দাবি করা হয়েছে। ফোরামের নেতাদের হয়রানি ও দমন-পীড়নের কৌশল নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।
এ ধরনের ফোরাম গঠন করা যায় কি না, তা খতিয়ে দেখতে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কমিটির আহ্বায়ক করা হয়েছে সরকারের যুগ্মসচিব ও বিসিআইসির পরিচালক (বাণিজ্যিক) মো. মনিরুজ্জামানকে। কমিটির সদস্য হিসেবে রয়েছেন আইন উপবিভাগের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) মো. সাজেদুল আলম। সদস্যসচিব হিসেবে রয়েছেন অতিরিক্ত প্রধান হিসাবরক্ষক আবদুল্লাহ আল মামুন।
প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, কমিটির সদস্যরা সরকারবিরোধী মতাদর্শের কর্মকর্তা। তবে এ দাবির পক্ষে কোনো সুনির্দিষ্ট তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে আ ন ম শরীফুল আলম ‘বঙ্গবন্ধু পরিষদ’ নামের সংগঠনের নেতৃত্ব পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। বঙ্গবন্ধু পরিষদের নেতা হিসেবে তিনি ‘হৃদয়ে বঙ্গবন্ধু’ নামে বই লেখেন এবং প্রকাশনার দায়িত্বও পালন করেন বলে দাবি করা হয়েছে। এর মাধ্যমে তিনি জ্যেষ্ঠ ও যোগ্য কর্মকর্তাদের ডিঙিয়ে সিওপি পদে পদায়ন পেয়েছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
ব্যবস্থাপনা পরিচালক পদে প্রকৌশলীদের বঞ্চিত করার অভিযোগ
বিসিআইসি মূলত প্রকৌশলনির্ভর ভারী শিল্পপ্রতিষ্ঠান। এখানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দক্ষ প্রকৌশলীদের পদায়ন করা উচিত বলে সংশ্লিষ্টদের মত। তবে বিভিন্ন কারখানায় প্রকৌশলীরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। যথাযথ দক্ষতা থাকা সত্ত্বেও তাঁরা তা কাজে লাগাতে পারছেন না বলেও দাবি করা হয়েছে।
গুরুত্বপূর্ণ দুটি নন-ইউরিয়া সার কারখানা—টিএসপিসিএল ও ডিএপিএফসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে বিসিআইসির প্রশাসন বিভাগের দুই কর্মকর্তা রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। টিএসপিসিএলে বর্তমানে ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে এ টি এম বাকী এবং ডিএপিএফসিএলে মঈনুল হোসেন দায়িত্ব পালন করছেন। তাঁদের দুজনেরই চাকরিতে যোগদান সহকারী ব্যবস্থাপক (নিরাপত্তা) হিসেবে হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। অর্থাৎ তাঁরা কেউই প্রকৌশল বিভাগের কর্মকর্তা নন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অন্যদিকে, সিইউএফএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বে রয়েছেন হিসাব ক্যাডারের কর্মকর্তা মিজানুর রহমান। তিনি অতীতে দুর্নীতির দায়ে একবার চাকরিচ্যুত হয়েছিলেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। বিসিআইসির পরিচালক (কারিগরি ও প্রকৌশল) পদেও হিসাব ক্যাডারের একজন কর্মকর্তা রয়েছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব পদায়নের পেছনে কর্মচারী প্রধান (সিওপি) শরীফুল আলমের ভূমিকা রয়েছে এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা তাঁর সিন্ডিকেটের সদস্য বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
বর্তমানে আইসিটি বিভাগের বিভাগীয় প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন দীর্ঘদিন প্রশাসন বিভাগে চাকরি করা জিএম মুহাম্মদ সোলায়মান। বিসিআইসিতে যোগ্য ও দক্ষ প্রকৌশলী থাকা সত্ত্বেও আইসিটিতে অনভিজ্ঞ মুহাম্মদ সোলায়মানকে মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন) পদ থেকে সরিয়ে প্রধান কার্যালয়ের আইসিটি বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কর্মচারী বিভাগের অধীন নিয়োগের নিয়ন্ত্রণ শরীফুল আলমের হাতে নেওয়ার কৌশল হিসেবে এ পদায়ন করা হয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুহাম্মদ সোলায়মান একজন সৎ কর্মকর্তা হিসেবে পরিচিত। তাঁকে নিয়োগ শাখার প্রধান রেখে অনিয়ম করা কঠিন হওয়ায় কৌশলে তাঁকে সরিয়ে আইসিটি বিভাগের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর ফলে তাঁর দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা থেকে বিসিআইসি বঞ্চিত হচ্ছে এবং সংস্থাটির আইসিটি বিভাগও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিভিন্ন কমিটি গঠনে স্বেচ্ছাচারিতার অভিযোগ
বিসিআইসির কর্মচারী প্রধান (সিওপি) আ ন ম শরীফুল আলম বিভিন্ন কমিটি গঠনের ক্ষেত্রে স্বজনপ্রীতি করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। অভিযুক্ত কর্মকর্তাদের রক্ষার জন্য তাঁর প্রতি নমনীয় কর্মকর্তাদের দিয়ে কমিটি গঠন করা হয় এবং কমিটিগুলো প্রকৃত তথ্য তুলে না ধরে তাঁর পছন্দমতো প্রতিবেদন দাখিল করে বলে দাবি করা হয়েছে। এর ফলে আর্থিক অনিয়মে অভিযুক্ত কর্মকর্তারা পার পেয়ে যান বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে, শরীফুল আলমের সঙ্গে বিভিন্ন বিষয়ে দ্বন্দ্ব রয়েছে—এমন কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে তিনি নিজেই উড়ো চিঠি লিখে পছন্দের ব্যক্তিদের দিয়ে তদন্ত কমিটি গঠন করেন এবং তাঁদের হয়রানি করেন বলে অভিযোগ করা হয়েছে। তাঁর ভয়ে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা মুখ খুলতে সাহস পান না বলেও প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, কেউ মুখ খুললে তাঁর বিরুদ্ধে উড়ো চিঠি, দমন-পীড়ন ও প্রশাসনিক হয়রানির আশ্রয় নেওয়া হয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 























