চুয়াডাঙ্গার জীবননগর উপজেলার কেডিকে ইউনিয়নে সরকারি সার ও কৃষি প্রণোদনা বিতরণে অনিয়ম, ভুয়া কার্ড ও বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে সার বরাদ্দ এবং কমিশন বাণিজ্যের অভিযোগ উঠেছে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের বিরুদ্ধে। অভিযোগ অনুসন্ধানে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে উপজেলা কৃষি বিভাগ। তবে তদন্তের প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলে নিরপেক্ষ ও পূর্ণাঙ্গ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা।
স্থানীয় কৃষক ও একাধিক সূত্রের অভিযোগ, সরকারি সার ও কৃষি প্রণোদনা প্রকৃত চাষিদের কাছে পৌঁছানোর পরিবর্তে একটি অংশ ভুয়া কার্ড ও বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে খুচরা সার বিক্রেতাদের কাছে বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় আর্থিক লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে।
স্থানীয় সূত্র ও ভুক্তভোগী কৃষকদের ভাষ্য অনুযায়ী, কেডিকে ইউনিয়নে দীর্ঘদিন ধরে দায়িত্ব পালন করছেন উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামান। একই কর্মস্থলে দীর্ঘ সময় থাকার কারণে স্থানীয় রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক মহলে তাঁর প্রভাব তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। কৃষকদের দাবি, অতীতে স্থানীয় আওয়ামী লীগের সভাপতি শুকুর সরকার এবং সাধারণ সম্পাদক ও ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান খায়রুল বাসার শিপলুর সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। এই প্রভাব কাজে লাগিয়ে তিনি অনিয়ম করে আসছেন বলেও অভিযোগ করেছেন কেউ কেউ।
অভিযোগকারীদের দাবি, কেডিকে ইউনিয়নের প্রায় ২০টি খুচরা সার দোকানের অনুকূলে নামে-বেনামে একাধিক ভুয়া সার কার্ড তৈরি করা হয়েছিল। এসব কার্ড এবং উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের স্বাক্ষর করা বিশেষ স্লিপের মাধ্যমে দোকানগুলোতে সার বরাদ্দ দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে।
কৃষকদের অভিযোগ, এভাবে বরাদ্দ দেওয়া সারের বিপরীতে বস্তাপ্রতি ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা পর্যন্ত কমিশন নেওয়া হতো। একই সঙ্গে সরকারি কৃষি প্রণোদনা বিতরণেও অনিয়ম ও জালিয়াতির অভিযোগ করেছেন তাঁরা। তাঁদের ভাষ্য, এর ফলে প্রকৃত চাষিরা সরকারি সহায়তা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, অন্যদিকে কিছু ব্যবসায়ী বাড়তি সুবিধা পেয়েছেন।
তবে ভুয়া কার্ডের সংখ্যা, বরাদ্দ দেওয়া সারের পরিমাণ, আর্থিক লেনদেনের প্রমাণ এবং প্রণোদনা বিতরণে অনিয়মের সুনির্দিষ্ট তথ্য স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি। তদন্তে সংশ্লিষ্ট কার্ড, স্লিপ, বরাদ্দের নথি ও বিতরণ তালিকা পরীক্ষা করা হলে অভিযোগগুলোর সত্যতা নির্ধারণ করা সম্ভব হবে।
কেডিকে ইউনিয়নের ভুক্তভোগী কৃষক ইনামুল, ইসরাইল, ইব্রাহিম ও খলিল অভিযোগ করেন, সার ও কৃষি বিষয়ে প্রয়োজনীয় পরামর্শ নিতে তাঁরা অনেক সময় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে কার্যালয়ে পান না। অথচ খুচরা বিক্রেতাদের ভুয়া কার্ড ও স্লিপের মাধ্যমে একসঙ্গে পাঁচ থেকে ১০ বস্তা পর্যন্ত সার দেওয়া হয়েছে বলে তাঁদের দাবি।
কৃষকদের ভাষ্য, সরকারি সার বিতরণব্যবস্থায় প্রকৃত চাষিদের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন। তাঁদের অভিযোগ, কৃষকের নামে বরাদ্দ করা সহায়তা যদি অনিয়মের মাধ্যমে ব্যবসায়ীদের হাতে চলে যায়, তাহলে উৎপাদন খরচ কমানো ও কৃষি উৎপাদন বাড়ানোর সরকারি উদ্যোগ ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
তদন্ত কমিটি গঠনের পর দ্রুত তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা এবং অভিযুক্ত কর্মকর্তার তদন্ত কমিটির সামনে উপস্থিত হওয়া নিয়েও স্থানীয়দের একাংশ প্রশ্ন তুলেছেন। তাঁদের অভিযোগ, স্থানীয় প্রভাবশালীদের সঙ্গে যোগাযোগের মাধ্যমে তদন্তের ফল প্রভাবিত করার চেষ্টা হতে পারে। তবে তদন্ত প্রভাবিত করার এই অভিযোগের পক্ষে সুনির্দিষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়নি। ফলে বিষয়টি তদন্তের স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতার প্রশ্ন হিসেবেই বিবেচনার দাবি রাখে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা নুরুজ্জামানের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
জীবননগর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলমগীর হোসেন জানান, সংবাদমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশিত হওয়ার পর তাঁদের নজরে এসেছে। অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিকে আগামী সাত কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত শেষ করে প্রতিবেদন জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
তিনি বলেন, তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়ার পর অভিযোগের সত্যতা ও প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
এ ঘটনায় জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল ইসলামের হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন ভুক্তভোগী কৃষক ও এলাকার সচেতন মহলের প্রতিনিধিরা। তাঁদের দাবি, তদন্ত যেন কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং সার বরাদ্দের নথি, ভুয়া কার্ড ও স্লিপের ব্যবহার, দোকানভিত্তিক বিতরণ তালিকা এবং কৃষি প্রণোদনার উপকারভোগীদের তথ্য যাচাই করা হয়।
সরকারি সার ও কৃষি প্রণোদনা কৃষকের উৎপাদন ব্যয় কমানো এবং কৃষি উৎপাদন সচল রাখার গুরুত্বপূর্ণ সহায়তা। তাই এসব সুবিধা বিতরণে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে তা নিরপেক্ষভাবে অনুসন্ধান করা জরুরি। অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি প্রকৃত কৃষকদের অধিকার নিশ্চিত করাও প্রয়োজন।
এখন তদন্ত কমিটির প্রতিবেদনের দিকে তাকিয়ে রয়েছেন স্থানীয় কৃষকেরা। অভিযোগের সত্যতা, সরকারি সার ও প্রণোদনা বিতরণে কোনো অনিয়ম হয়েছে কি না এবং এ ক্ষেত্রে কারও দায় রয়েছে কি না—তা নির্ধারণে নথিভিত্তিক ও নিরপেক্ষ তদন্তই হবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















