বান্দরবানের লামা বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা (ডিএফও) মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে জোত ও ট্রানজিট পারমিটের আড়ালে কাঠ পাচারে সহায়তা, বদলি-পদায়নে অর্থ লেনদেন, ইটভাটা ও চেকস্টেশন থেকে মাসোহারা এবং বনায়ন প্রকল্পের অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় ও বন-সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, অসাধু কর্মকর্তাদের যোগসাজশে মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনাঞ্চল উজাড় হচ্ছে। এসব অভিযোগের পরও চট্টগ্রাম অঞ্চলের বন সংরক্ষক (সিএফ) মিহির কুমার দে কার্যকর ব্যবস্থা নিচ্ছেন না বলে অভিযোগ । বান্দরবান থেকে শামসুল ইসলাম আকাশের রিপোর্টে বিস্তারিত।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ১০ লাখ টাকার বিনিময়ে ফরেস্টার রনি পারভেজকে পাঁচটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। তিনি লামা বন আদালতের এফসিসিও, বমুবিলছড়ি বিট, বিশেষ টহল দল, লামা রেঞ্জ ও লামামুখ চেকস্টেশনের দায়িত্বে রয়েছেন বলে তাঁদের দাবি। একই ব্যক্তির হাতে এতগুলো দায়িত্ব দেওয়ায় নজরদারি দুর্বল হয়ে কাঠ পাচারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলেও অভিযোগ তাঁদের। আরও ১৫ লাখ টাকার বিনিময়ে আব্দুল মালেক নামে এক রেঞ্জারকে লামা সদর রেঞ্জের দায়িত্ব দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তবে এসব লেনদেনের সমর্থনে নথি দেওয়া হয়নি।
ইটভাটার মালিকদের অভিযোগ, লামা বন বিভাগের আওতাধীন কাঠ পোড়ানো ৪০টি ইটভাটা থেকে এককালীন পাঁচ লাখ টাকা এবং মাসে ১০ হাজার টাকা করে ডিএফওর নামে নেওয়া হয়েছে। টাকা না দিলে ভাটার লাকড়ি জব্দ ও বারবার অভিযান চালানো হয় বলে তাঁদের দাবি। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের অভিযোগ, বেকারিতে জ্বালানি কাঠ ব্যবহারের সুযোগ দেওয়ার বিনিময়েও মাসে প্রায় পাঁচ লাখ টাকা আদায় করা হয়। ফার্নিচার পরিবহনের অনুমোদনের নামে এক হাজার টাকা নেওয়ার অভিযোগও রয়েছে।
বনায়ন প্রকল্প নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন বন-সংশ্লিষ্টরা। তাঁদের দাবি, ৮০ হেক্টর এলাকায় বাগান সৃজনের বরাদ্দ থাকলেও বাস্তবে কাজ হয়েছে মাত্র ৩০ হেক্টরে। অবশিষ্ট ৫০ হেক্টরের বরাদ্দ কোথায় ব্যয় হয়েছে, তা তদন্তের দাবি জানিয়েছেন তাঁরা। আউটসোর্সিংয়ের ছয় কর্মচারীকে সরকারি কাজের পরিবর্তে ডিএফওর ব্যক্তিগত কাজে ব্যবহারের অভিযোগও উঠেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, প্রত্যেক কর্মচারীর মাসিক সরকারি বেতন-ভাতা প্রায় ১৮ হাজার টাকা।
বাঁশ কাটা ও পরিবহনেও অর্থ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, বর্ষায় বাঁশ কাটা ও পরিবহন বন্ধের নির্দেশনা থাকা সত্ত্বেও ঘুষের বিনিময়ে পরিবহন পাশ দেওয়া হচ্ছে। প্রতি বাঁশে ডিএফওর নামে পাঁচ টাকা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ তাঁদের। মাতামুহুরী সংরক্ষিত বনের বাঁশ মহাল বন্ধ থাকলেও রাতে ভুয়া টিপিতে বাঁশ পরিবহনের দাবি করেছেন তাঁরা। তবে সংশ্লিষ্ট নিষেধাজ্ঞার আদেশ ও টিপির কপি পাওয়া যায়নি।
ইয়াংছা মৌজার ৫০ নম্বর এফএল জোতের অনুমোদনও খতিয়ে দেখার দাবি উঠেছে। সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, ওই জোতে দুই হাজার ৪২২টি সেগুন ও ২৩৮টি গামারীসহ মোট দুই হাজার ৬৬০টি গাছ কাটার অনুমোদন দেওয়া হয়। সেগুনের প্রায় ১৮ হাজার এবং গামারীর প্রায় দুই হাজার ৭০০ ঘনফুট কাঠের সাইজলিস্ট অনুমোদনের কথা উল্লেখ রয়েছে। এর মধ্যে দুই হাজার ৩৮৮টি গাছের বিপরীতে প্রায় ১৬ হাজার ঘনফুট কাঠ পরিবহনে ৪৮টি টিপি নেওয়ার তথ্য দেওয়া হয়েছে। অনুমোদন ও পরিবহনের হিসাব মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।
সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, কাঠ পরিবহনে প্রতি ঘনফুটে ডিএফওর নামে ৪০ টাকা আদায় করা হয়। সদর রেঞ্জের টিপি শাখায় প্রায় ১০ বছর ধরে দায়িত্ব পালনকারী মো. সেলিম প্রতিটি টিপির বিপরীতে ডিএফওর জন্য ১০ হাজার টাকা নেন বলেও তাঁদের দাবি। মাসে আড়াই শতাধিক টিপি অনুমোদনের অভিযোগের পাশাপাশি সরকারি শাখায় বেসরকারি ব্যক্তির দায়িত্ব পালন নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
ডলুছড়ি রেঞ্জ কর্মকর্তা এ কে এম আলতাফ হোসেন ও রনি পারভেজ অর্থ আদায়ে মধ্যস্থতা করেন বলে স্থানীয় সূত্রগুলোর অভিযোগ। আলতাফের বিরুদ্ধে ফাইতং সড়ক দিয়ে মাসিক চুক্তিতে কাঠ পাচারের সুযোগ দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। তাঁর বক্তব্য পাওয়া যায়নি। সরবরাহ করা বিবরণ অনুযায়ী, ডিএফওর নম্বরে একাধিকবার কল করেও সংযোগ পাওয়া যায়নি। সিএফ মিহির কুমার দে গাড়িতে থাকার কথা জানান; নেটওয়ার্ক সমস্যায় কথোপকথন শেষ হওয়ায় অভিযোগগুলোর বিষয়ে তাঁর বিস্তারিত জবাব পাওয়া যায়নি। জোত ও টিপির রেকর্ড, বনায়নের বরাদ্দ-ব্যয় এবং পদায়নের আদেশ যাচাই করে নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন বন-সংশ্লিষ্টরা।
সংবাদ শিরোনাম ::
লামার ডিএফও মোস্তাফিজুর রহমানের বিরুদ্ধে ঘুষ-বাণিজ্য, কাঠ পাচার ও বন উজাড়ের অভিযোগ
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১২:২১:৫১ অপরাহ্ন, সোমবার, ১২ অক্টোবর ২০২৬
- ৫২২ বার পড়া হয়েছে
জনপ্রিয় সংবাদ























