রান্নার চুলার দুর্ভোগ থেকে শুরু করে ভারী শিল্পকারখানার চাকা বন্ধ হওয়ার উপক্রম-দেশজুড়ে এখন তীব্র থেকে তীব্রতর হচ্ছে গ্যাস সংকট। যেখানে দৈনিক প্রায় ৩,৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাসের চাহিদার বিপরীতে সরবরাহ নেমে এসেছে ২,১১৪ থেকে ২,১৫১ মিলিয়ন ঘনফুটে। এই ঘাটতির ফলে শিল্পকারখানার উৎপাদন ক্ষমতা ২০ থেকে ৫০ শতাংশে নেমে এসেছে, একই সঙ্গে রাজধানীসহ সারাদেশে সৃষ্টি হয়েছে বিদ্যুৎ ও সার সংকট। আকস্মিক এই গ্যাস সংকটের পেছনে বৈশ্বিক ভূ-রাজনীতি, এলএনজি আমদানিতে প্রতিবন্ধকতা এবং আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতির কথা বলা হলেও, তিতাস গ্যাস ট্রান্সমিশন অ্যান্ড ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানির ভেতরের সীমাহীন দুর্নীতি ও অনিয়মই এর মূল কারণ বলে চাঞ্চল্যকর অভিযোগ উঠেছে।
তিতাস সূত্রে জানা গেছে, তিতাসের আওতাভুক্ত এলাকায় দিনে প্রায় ২০০ কোটি (২ বিলিয়ন) ঘনফুট গ্যাসের প্রয়োজন হলেও সরবরাহ মিলছে ১৫০ কোটি (১.৫ বিলিয়ন) ঘনফুটেরও নিচে। বিতরণ নেটওয়ার্কের একেবারে শেষ প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় ঢাকার মোহাম্মদপুর, মিরপুর ও ধানমন্ডিসহ বিভিন্ন এলাকার বাসিন্দারা দিনের বেশিরভাগ সময় চুলায় গ্যাস পাচ্ছেন না। চাপের চরম ঘাটতির পাশাপাশি পাইপলাইনের ছিদ্র ও ফাটল দিয়ে পানি ঢোকায় এই সংকট আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে।
শিল্প ও আবাসিক খাতের এই চরম বিপর্যয়ের মধ্যে তিতাস গ্যাসের বর্তমান ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) শাহনেওয়াজ পারভেজের বিরুদ্ধে উঠে এসেছে হাজার কোটি টাকার দুর্নীতি, ঘুষ বাণিজ্য এবং অবৈধ নিয়োগের নথিভিত্তিক অভিযোগ।
অভিযোগে বলা হয়, কোনো লিখিত পরীক্ষা ছাড়াই ১৯৯৯ সালে আওয়ামী লীগের প্রভাব খাটিয়ে পেট্রোবাংলায় প্রথম শ্রেণির চাকরিতে নিয়োগ পান শাহনেওয়াজ পারভেজ। বিদেশি তিন বছরের বিটেক ডিগ্রি নিয়ে চাকরিতে যোগ দিলেও সরকারি নিয়ম মেনে কোনো ইকুইভ্যালেন্সি সার্টিফিকেট জমা দেননি তিনি, যা পেট্রোবাংলার চাকরিবিধিরও পরিপন্থী। পরবর্তীতে দীর্ঘ ২৩ বছর নিয়মবহির্ভূতভাবে একই বিভাগে (কন্ট্রাক্ট বিভাগ) কর্মরত থেকে একটি সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন।
চলতি বছরের গত ৯ সেপ্টেম্বর বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ মন্ত্রণালয় জিটিসিএল-এর এমডি শাহনেওয়াজ পারভেজকে তিতাস গ্যাসের এমডি হিসেবে নিয়োগের নির্দেশ দেয়। তিতাসের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ব্যাপক বাধা সত্ত্বেও তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এ পর্যন্ত সাভার, গাজীপুর ও নারায়ণগঞ্জের বিভিন্ন শিল্পকারখানায় প্রায় ১৫০টি নতুন সংযোগ ও লোড বৃদ্ধি করে অনিয়ম ও ঘুষের মাধ্যমে প্রায় ৭৫০ কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। এছাড়া প্রায় ১,৫০০টি অবৈধ সংযোগ থেকে প্রতি মাসে অন্তত ৩০ কোটি টাকা আদায় করা হতো বলেও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।
শুধু তিতাস নয়, ইতিপূর্বে পেট্রোবাংলার কন্ট্রাক্ট বিভাগে থাকাকালে সাগরে অফশোর বিডিং রাউন্ডের ক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক নীতি ভেঙে বহুজাতিক কোম্পানিকে নিরুৎসাহিত করা এবং ভারতের একটি কোম্পানিকে একক সুবিধা পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। সাবেক চেয়ারম্যান জনেন্দ্রনাথ সরকারের সঙ্গে যোগসাজশে ক্ষমতার অপব্যবহার, সিনিয়রিটি লঙ্ঘন করে পদোন্নতি গ্রহণ এবং সহকর্মীদের হয়রানির অসংখ্য তথ্য সামনে এসেছে।
মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, তাঁর বিরুদ্ধে ইতিপূর্বে একাধিক তদন্ত পরিচালিত হলেও রহস্যজনক কারণে তদন্তের ফলাফল প্রকাশ বা দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এসব দুর্নীতির বিষয়ে জানতে চাইলে গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানি লিমিটেডের (জিটিসিএল) এবং তিতাসের দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যবস্থাপনা পরিচালক শাহনেওয়াজ পারভেজ জানান, একটি মহল মন্ত্রণালয়ে তাঁর বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ দিয়েছে এবং তার তদন্তও হয়েছে; তবে মন্ত্রণালয় কী ব্যবস্থা নিয়েছে তা তাঁর জানা নেই।
বর্তমানে একদিকে চাহিদার তীব্র ঘাটতি, অন্যদিকে কায়েমী স্বার্থান্বেষী গোষ্ঠীর অনিয়ম—দুইয়ে মিলে দেশের অর্থনৈতিক চালিকাশক্তি ও জনজীবন স্তব্ধ হওয়ার জোড় উপক্রম হয়েছে। ভুক্তভোগী সাধারণ গ্রাহক ও বৈষম্যবিরোধী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা অনতিবিলম্বে এসব অনিয়ম ও দুর্নীতির তদন্তপূর্বক তিতাস এমডির অপসারণ এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















