একই কর্মস্থলে প্রায় ২৮ বছর। এর মধ্যে বদলির আদেশ হয়েছে একাধিকবার। অভিযোগ রয়েছে, প্রভাবশালী মহলকে ‘ম্যানেজ’ করে প্রতিবারই সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুর উপজেলা স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) কার্যালয়ে থেকে গেছেন কম্পিউটার অপারেটর ধীরেন্দ্র সূত্রধর। দীর্ঘ সময়ে তার বিরুদ্ধে উঠেছে অনিয়ম, ক্ষমতার অপব্যবহার, সরকারি অর্থের ব্যবস্থাপনায় প্রভাব বিস্তার এবং কর্মকর্তা-কর্মচারীদের হয়রানিসহ নানা অভিযোগ। কিন্তু রহস্যজনক কারণে সব অভিযোগই চাপা পড়ে গেছে। কোনো কিছুই যেন টলাতে পারেনি তার অবস্থান।
সর্বশেষ চাকরির মেয়াদ শেষ করে গত ১৮ আগস্ট লিভ প্রিপারেশন লিভে (এলপিআর) যাওয়ার পরও তিনি কর্মস্থলে সক্রিয় থাকায় নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, এলপিআরে যাওয়ার পরও গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক নথিতে স্বাক্ষর করছেন তিনি। অফিসের নিয়মিত কার্যক্রমেও তার প্রভাব রয়েছে। এমনকি তার মাধ্যমে দীর্ঘদিন ধরে চলে আসা কিছু বিতর্কিত কর্মকাণ্ডও অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ করেছেন সংশ্লিষ্ট কয়েকজন।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জগন্নাথপুর এলজিইডি কার্যালয়ে দীর্ঘদিন অবস্থানের কারণে দপ্তরের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে ধীরেন্দ্র সূত্রধরের ব্যাপক প্রভাব তৈরি হয়েছে। পদে তিনি কম্পিউটার অপারেটর হলেও গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন কাজ তার নিয়ন্ত্রণে চলে।
জানা গেছে, হবিগঞ্জের মাধবপুর উপজেলার বাসিন্দা ধীরেন্দ্র সূত্রধর চাকরিজীবনের বড় একটি সময় কাটিয়েছেন সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরে। দীর্ঘদিন একই দপ্তরে থাকার সুবাদে কর্মকর্তা-কর্মচারী থেকে শুরু করে ঠিকাদারদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ যোগাযোগ তৈরি হয়। অভিযোগ রয়েছে, একাধিকবার অন্যত্র বদলির উদ্যোগ নেওয়া হলেও অদৃশ্য প্রভাবের কারণে শেষ পর্যন্ত তিনি সুনামগঞ্জের জগন্নাথপুরেই থেকে যান।
সংশ্লিষ্টরা জানান, চলতি বছরের ১৮ আগস্ট চাকরির মেয়াদ শেষ করে এলপিআরে যান ধীরেন্দ্র সূত্রধর। কিন্তু এর পরও তাকে অফিসে দেখা যাচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ দাপ্তরিক কাগজপত্র তৈরি করছেন তিনি। শুধু তাই নয়, এলজিইডির অধীনে থাকা লেবার কন্ট্রাক্টিং সোসাইটি (এলসিএস) কর্মীদের নিয়েও রয়েছে অভিযোগ। এ ছাড়া সিলেট-জগন্নাথপুর সড়কসহ বিভিন্ন গ্রামীণ সড়কে প্রায় ২০ থেকে ২৫ জন এলসিএস কর্র্মীকে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে ধীরেন্দ্র কাজ পাইয়ে দিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তাদের কাছ থেকে জনপ্রতি ৫০০ টাকা করে ঘুষ নিচ্ছেন বলে জানা গেছে।
ধীরেন্দ্রর বিরুদ্ধে অফিসের অভ্যন্তরীণ নিয়ন্ত্রণ নিয়ে গুরুতর অভিযোগ করেছেন কয়েকজন কর্মচারী। তাদের দাবি, হিসাবরক্ষক হিসেবে প্রায় আড়াই বছর আগে সাদেক হাসান এই কার্যালয়ে যোগ দিলেও তিনি এখনো পূর্ণাঙ্গ দায়িত্ব বুঝে পাননি। বরং তাকে অনেকটা অফিস সহকারীর মতো কাজ করতে হচ্ছে। গুরুত্বপূর্ণ হিসাবসংক্রান্ত দায়িত্ব নিজের নিয়ন্ত্রণে রেখেছেন ধীরেন্দ্র সূত্রধর। এ ছাড়া কর্মচারীদের বিল এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের বিল প্রস্তুত ও চেকসংক্রান্ত কাজে তার কাছে গিয়ে ভোগান্তির শিকার হতে হয়।
দীর্ঘ ২৮ বছরের চাকরিজীবনে ধীরেন্দ্র সূত্রধর বিপুল সম্পদের মালিক হয়েছেন। নামে-বেনামে জমি, বাড়ি ও ব্যাংক হিসাবে বিপুল অর্থ থাকার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। এ ছাড়া তার পরিবারের সদস্যদের সিলেট শহরে বসবাস, সন্তানের বিদেশে পড়াশোনা এবং পরিবারের বিলাসবহুল জীবনযাপন নিয়েও নানা আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে ধীরেন্দ্র সূত্রধর নিজেকে আওয়ামী লীগের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচয় দিয়ে প্রভাব বিস্তার করতেন। বর্তমানে রাজনৈতিক পট পরিবর্তনের পর বিএনপির নেতাকর্মীদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা তৈরির চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগ উঠেছে, ধীরেন্দ্র সূত্রধরকে জগন্নাথপুর এলজিইডি কার্যালয়ে রাখার বিষয়ে উপজেলা প্রকৌশলী সোহরাব হোসেন প্রশাসনিকভাবে উদ্যোগ নিয়েছেন। এ বিষয়ে সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী বরাবর একটি চিঠিও দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে। এ বিষয়ে সোহরাব হোসেন দাবি করেন, তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ সঠিক নয়।
এদিকে ধীরেন্দ্র সূত্রধরের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘আমি সদ্য এলপিআরে গেছি। তবে অফিসে বেশ কিছু কাজ আছে, তা সারতে আরও কিছু সময় লাগবে।’ দুর্নীতির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমার ওপরে তো আরও অনেকেই আছেন, আমি একা দুর্নীতি করব কীভাবে? জ্ঞাতসারে আমি দুর্নীতি করিনি।’
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















