ঢাকা ০৯:০১ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
বনানীর মার্ভেল ইন ঘিরে পায়েল–জুয়েল–এরশাদ সিন্ডিকেটে হোটেল ‘মার্ভেল ইন’ এ দেহ ব্যবসা ও জুয়ার আসর রূপালী ব্যাংকের পদোন্নতির তালিকায় বিতর্কিত ও ফ্যাসিবাদ ঘনিষ্ঠ কর্মকর্তা আবু হানিফ কুমিল্লার নেতা হাজী আমিন উর রশিদ ইয়াছিনের মায়ের ইন্তেকাল সাইফুজ্জামান চৌধুরীর বিদেশে থাকা সম্পদ জব্দের নির্দেশ ঘুষের অভিযোগ তুলতে গিয়ে সিনিয়র সচিব সালেহ আহমেদের ঘটনাই ফাঁস তালা ভেঙে বসতি, আড়াই–তিন বছর বিল বকেয়া; সংযোগ বিচ্ছিন্নে ‘নিরাপত্তার অজুহাত’ আকিজ সিমেন্টে ১৪৮ কোটি টাকার অনিয়ম কুমিল্লায় নারী উদ্যোক্তাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রয় বিষয়ক প্রশিক্ষণ রংপুর রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ জেলা পুলিশ নির্বাচিত ঠাকুরগাঁও বাঁধনের ওপর হামলা, সংসদে যা বললেন বিএনপির নারী এমপি

বনানীর মার্ভেল ইন ঘিরে পায়েল–জুয়েল–এরশাদ সিন্ডিকেটে হোটেল ‘মার্ভেল ইন’ এ দেহ ব্যবসা ও জুয়ার আসর

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে একটি গেস্ট হাউজকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর একাধিক অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ‘হোটেল মার্ভেল ইন’ নামে পরিচিত কথিত এই প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে পায়েল, জুয়েল ও এরশাদকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অনুমোদনহীনভাবে আবাসিক এলাকায় হোটেল বা গেস্ট হাউজ পরিচালনা, নারী সরবরাহ ও মানব পাচার, মাদক, জুয়া এবং কথিত ‘স্পেশাল সার্ভিস’-কেন্দ্রিক কার্যক্রম।
স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে অবস্থিত ‘মার্ভেল ইন’ মূলত একটি গেস্ট হাউজ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পায়েল, জুয়েল ও এরশাদ নামের ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই নেটওয়ার্ককে ‘পায়েল–জুয়েল–এরশাদ সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে সামনে রেখে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এবং সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কার্যক্রম আরও বেড়ে যায়। স্বল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির আসা-যাওয়া নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, গেস্ট হাউজটির আড়ালে কথিত ‘বিশেষ সেবা’ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে এবং এর সঙ্গে নারী সরবরাহকারী দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, চক্রটি শুধু একটি গেস্ট হাউজকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন এবং পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তরুণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলে তাদের দাবি। চাকরি, ভালো বেতন, মডেলিং, বিউটি সার্ভিস কিংবা বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের ঢাকায় আনার পর একটি চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা স্থানে সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর তদন্তের দাবি রাখে। কারণ অভিযোগ সত্য হলে শুধু কোনো গেস্ট হাউজের মালিক বা ব্যবস্থাপনা নয়, এর সঙ্গে দালাল, পরিবহনকারী, নিয়োগকারী, অনলাইন যোগাযোগকারী এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও তদন্তের আওতায় আসতে পারেন।
স্থানীয় সূত্রগুলোর আরও দাবি, গেস্ট হাউজ ও স্পা-কেন্দ্রিক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু দালাল বা বহিরাগত ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশে অবস্থান করে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করা হয়। এমনকি কিছু কক্ষ মাদক সেবনের জন্য ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ। স্থানীয় পর্যায়ে দাবি করা হচ্ছে, গেস্ট হাউজটির আড়ালে আর্থিক লেনদেনভিত্তিক জুয়ার কার্যক্রমও চলে। তবে জুয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রেও কোনো সরকারি অভিযান, মামলা বা আদালতের নথি ছাড়া এটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মার্ভেল ইনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নগুলোর একটি হলো প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা অনুমোদন নেই এবং আবাসিক এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয়ভাবে এমন দাবি করা হচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার নিবন্ধন, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র, অতিথি নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের গেস্ট হাউজের কার্যক্রমের কারণে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চালু হলে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট হয় এবং বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

অন্য এক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে নিয়মিত অশ্লীল কর্মকাণ্ড চলছে এবং এর সঙ্গে নারী পাচার ও মাদক ব্যবসার যোগসূত্র রয়েছে। তিনি বিষয়টি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, পুরো শহরের জন্য উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, মার্ভেল ইন-সংশ্লিষ্ট মালিক বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত মালিক অতীতে স্পা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একাধিক মামলার কারণে কিছু সময় আত্মগোপনে ছিলেন। পরে প্রায় দুই মাস আগে বনানীতে এই প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে।

তবে কারও অতীত ব্যবসা, মামলা বা আত্মগোপনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে মামলা নম্বর, আদালতের নথি, পুলিশ রেকর্ড, কোম্পানি বা ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা থাকার অভিযোগ নিজেই তার অপরাধ প্রমাণ করে না।

মার্ভেল ইনকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, বনানীর কিছু গেস্ট হাউজ ও স্পা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কথিত মাসোহারা নেওয়ার বিনিময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নীরবতা পালন করা হয়। অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তের দাবি রাখে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় এসব প্রতিষ্ঠানে পুলিশের তৎপরতা দেখা গেলেও কথিত মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে খবর পৌঁছে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অভিযানের তথ্য আগে থেকেই ফাঁস হচ্ছে কি না, নাকি অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা হচ্ছে না।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জানানো হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণও পাঠানো হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোন করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে এসব যোগাযোগের দাবি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, কল রেকর্ড বা অন্যান্য প্রমাণ প্রয়োজন।

স্থানীয় পর্যায়ে মার্ভেল ইন-এর সঙ্গে পায়েলের নাম বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অতীতে গোপালগঞ্জসহ রাজধানীর গুলশান-বনানী এলাকায় তার প্রভাব ছিল।
মার্ভেল ইন ছাড়াও একই এলাকায় করিম ভিলায় অবস্থিত একটি ‘লাক্সারী গেস্ট হাউজ’ নিয়েও স্থানীয়ভাবে নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হান্নান, সাকিবসহ প্রায় ছয়জন ব্যক্তি এর মালিকানার সঙ্গে যুক্ত।
এই গেস্ট হাউজের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো—পুলিশ যদি তাদের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাতে চায়, তাহলে তাদের জানিয়ে আসতে হবে। বনানী থানার পুলিশ তাদের ব্যবসা সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে বলেও তিনি দাবি করেন।
হান্নানের এই বক্তব্যও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, লাক্সারী গেস্ট হাউজের কিছু কক্ষে কথিত ‘স্পেশাল সার্ভিস’ দেওয়া হয়। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে নারী সরবরাহকারী দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততার কথাও বলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং পরে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে ডিজিটাল ফরেনসিক, কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে এসব তথ্যের মাধ্যমে কথিত নেটওয়ার্কের প্রকৃত কাঠামো শনাক্ত করতে পারে।
মার্ভেল ইনকে ঘিরে অভিযোগের আরেকটি দিক হলো প্রতিষ্ঠানের কথিত সুসংগঠিত পরিচালনা কাঠামো। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, পায়েল, জুয়েল ও এরশাদকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, নারী সরবরাহ, মাদক, কথিত যৌন ব্যবসা, জুয়া এবং আর্থিক লেনদেন—সবকিছুই একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে।
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণ সমাজকে ঘিরে। তাদের মতে, বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গেস্ট হাউজ বা স্পা সেন্টারের আড়ালে যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে, তাহলে তরুণদের একটি অংশ সহজেই এসব কর্মকাণ্ডের সংস্পর্শে আসতে পারে। বিশেষ করে মাদক ও যৌন শোষণের মতো কর্মকাণ্ডের বিস্তার সামাজিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
একজন কলেজ অধ্যাপকের বক্তব্য হিসেবে স্থানীয়ভাবে যে মতামত পাওয়া গেছে, তা হলো—এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেপথ্য কর্মকাণ্ড তরুণদের নৈতিক ও সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি অভিযান পরিচালনা করে এ ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত লাইসেন্স যাচাই, অতিথিদের পরিচয় যাচাই, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, মাদকবিরোধী অভিযান এবং দালাল চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।
অভিযোগগুলো সত্য হলে মার্ভেল ইন বা সংশ্লিষ্ট গেস্ট হাউজে কর্মরত কয়েকজন ব্যক্তি নয়, বরং একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব থাকতে পারে। সেই নেটওয়ার্কে দালাল, মাদক সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, অনলাইন যোগাযোগকারী এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা থাকতে পারেন। ফলে শুধু কোনো গেস্ট হাউজে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেই তদন্ত শেষ করা উচিত নয়।
বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আবাসিক ভবনে পরিচালিত গেস্ট হাউজগুলোর বৈধতা, ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা, অতিথি নিবন্ধন, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার এবং অন্যান্য আইনগত বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করলে তাদেরও আইনগত সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অপরাধ পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব।
পুলিশের বিরুদ্ধে কথিত মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগও পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুরো বাহিনীকে দায়ী করা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি অভিযোগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও জনআস্থার জন্য ক্ষতিকর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ সত্য হলে বনানীর একটি গেস্ট হাউজকে কেন্দ্র করে শুধু স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধ নয়, একটি বিস্তৃত মানবপাচার, মাদক ও অবৈধ আর্থিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের মার্ভেল ইন ও একই এলাকার লাক্সারী গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা, নগর ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক বৈধতা, তরুণ সমাজের নিরাপত্তা এবং মানবপাচার প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। পায়েল, জুয়েল ও এরশাদকে কেন্দ্র করে কথিত সিন্ডিকেটের প্রকৃত ভূমিকা, মার্ভেল ইন-এর বৈধতা, কথিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সত্যতা এবং পুলিশের ভূমিকা—সবকিছুই নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন।

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

বনানীর মার্ভেল ইন ঘিরে পায়েল–জুয়েল–এরশাদ সিন্ডিকেটে হোটেল ‘মার্ভেল ইন’ এ দেহ ব্যবসা ও জুয়ার আসর

বনানীর মার্ভেল ইন ঘিরে পায়েল–জুয়েল–এরশাদ সিন্ডিকেটে হোটেল ‘মার্ভেল ইন’ এ দেহ ব্যবসা ও জুয়ার আসর

আপডেট সময় ০৮:৪৮:৫৬ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর অভিজাত এলাকা বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে একটি গেস্ট হাউজকে ঘিরে উঠেছে গুরুতর একাধিক অভিযোগ। স্থানীয় বাসিন্দা ও সংশ্লিষ্ট একাধিক সূত্রের দাবি, ‘হোটেল মার্ভেল ইন’ নামে পরিচিত কথিত এই প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে পায়েল, জুয়েল ও এরশাদকে কেন্দ্র করে একটি সংঘবদ্ধ চক্র বিভিন্ন ধরনের অনৈতিক ও অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে। অভিযোগের মধ্যে রয়েছে অনুমোদনহীনভাবে আবাসিক এলাকায় হোটেল বা গেস্ট হাউজ পরিচালনা, নারী সরবরাহ ও মানব পাচার, মাদক, জুয়া এবং কথিত ‘স্পেশাল সার্ভিস’-কেন্দ্রিক কার্যক্রম।
স্থানীয় সূত্রগুলোর ভাষ্য অনুযায়ী, বনানীর ২৭ নম্বর সড়কে অবস্থিত ‘মার্ভেল ইন’ মূলত একটি গেস্ট হাউজ হিসেবে পরিচালিত হচ্ছে। তাদের অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে পায়েল, জুয়েল ও এরশাদ নামের ব্যক্তিদের একটি নেটওয়ার্কের সম্পৃক্ততা রয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ে এই নেটওয়ার্ককে ‘পায়েল–জুয়েল–এরশাদ সিন্ডিকেট’ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠানটিকে সামনে রেখে বিভিন্ন বয়সী নারী-পুরুষের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে এবং সন্ধ্যার পর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত কার্যক্রম আরও বেড়ে যায়। স্বল্প সময়ের জন্য বিভিন্ন ব্যক্তির আসা-যাওয়া নিয়েও স্থানীয়দের মধ্যে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে। তাদের দাবি, গেস্ট হাউজটির আড়ালে কথিত ‘বিশেষ সেবা’ দেওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে এবং এর সঙ্গে নারী সরবরাহকারী দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের একটি নেটওয়ার্ক যুক্ত থাকতে পারে।
স্থানীয় কয়েকজনের অভিযোগ, চক্রটি শুধু একটি গেস্ট হাউজকে কেন্দ্র করে সীমাবদ্ধ নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, মোবাইল ফোন এবং পরিচিত ব্যক্তিদের মাধ্যমে তরুণীদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় বলে তাদের দাবি। চাকরি, ভালো বেতন, মডেলিং, বিউটি সার্ভিস কিংবা বিভিন্ন ধরনের কাজের প্রলোভন দেখিয়ে তরুণীদের ঢাকায় আনার পর একটি চক্রের মাধ্যমে বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান বা স্থানে সরবরাহ করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
মানব পাচারের মতো গুরুতর অভিযোগের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও গভীর তদন্তের দাবি রাখে। কারণ অভিযোগ সত্য হলে শুধু কোনো গেস্ট হাউজের মালিক বা ব্যবস্থাপনা নয়, এর সঙ্গে দালাল, পরিবহনকারী, নিয়োগকারী, অনলাইন যোগাযোগকারী এবং আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরাও তদন্তের আওতায় আসতে পারেন।
স্থানীয় সূত্রগুলোর আরও দাবি, গেস্ট হাউজ ও স্পা-কেন্দ্রিক একটি নেটওয়ার্কের মাধ্যমে মাদক সরবরাহের অভিযোগও রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কিছু দালাল বা বহিরাগত ব্যক্তি এসব প্রতিষ্ঠানের আশপাশে অবস্থান করে এবং নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের মাধ্যমে মাদক সরবরাহ করা হয়। এমনকি কিছু কক্ষ মাদক সেবনের জন্য ব্যবহার করা হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।
এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে জুয়ার আসর পরিচালনার অভিযোগ। স্থানীয় পর্যায়ে দাবি করা হচ্ছে, গেস্ট হাউজটির আড়ালে আর্থিক লেনদেনভিত্তিক জুয়ার কার্যক্রমও চলে। তবে জুয়ার অভিযোগের ক্ষেত্রেও কোনো সরকারি অভিযান, মামলা বা আদালতের নথি ছাড়া এটিকে প্রমাণিত ঘটনা হিসেবে বিবেচনা করার সুযোগ নেই।
মার্ভেল ইনকে ঘিরে সবচেয়ে গুরুতর প্রশ্নগুলোর একটি হলো প্রতিষ্ঠানটির বৈধতা। স্থানীয় সূত্রের দাবি, প্রতিষ্ঠানটি পরিচালনার জন্য প্রয়োজনীয় লাইসেন্স বা অনুমোদন নেই এবং আবাসিক এলাকায় এ ধরনের ব্যবসা পরিচালনার বৈধতা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। পুলিশের একটি সূত্রের বরাত দিয়ে স্থানীয়ভাবে এমন দাবি করা হচ্ছে যে প্রতিষ্ঠানটির প্রয়োজনীয় অনুমোদন নেই।
তবে কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধভাবে পরিচালিত হচ্ছে কি না, তা নিশ্চিত করতে ট্রেড লাইসেন্স, ব্যবসার নিবন্ধন, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার, অগ্নিনিরাপত্তা ছাড়পত্র, অতিথি নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমোদনের নথি পরীক্ষা করা জরুরি।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের গেস্ট হাউজের কার্যক্রমের কারণে এলাকার স্বাভাবিক পরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে। একজন স্থানীয় বাসিন্দার ভাষ্য, আবাসিক এলাকায় এ ধরনের প্রতিষ্ঠান চালু হলে এলাকার শান্তিপূর্ণ পরিবেশ নষ্ট হয় এবং বিশেষ করে কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ার আশঙ্কা থাকে। তিনি প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপ দাবি করেন।

অন্য এক বাসিন্দার অভিযোগ, প্রতিষ্ঠানটির আড়ালে নিয়মিত অশ্লীল কর্মকাণ্ড চলছে এবং এর সঙ্গে নারী পাচার ও মাদক ব্যবসার যোগসূত্র রয়েছে। তিনি বিষয়টি শুধু স্থানীয় সমস্যা নয়, পুরো শহরের জন্য উদ্বেগের কারণ বলে উল্লেখ করেন।

স্থানীয় সূত্রগুলো আরও দাবি করছে, মার্ভেল ইন-সংশ্লিষ্ট মালিক বা পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অতীত কর্মকাণ্ড নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, কথিত মালিক অতীতে স্পা ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন এবং একাধিক মামলার কারণে কিছু সময় আত্মগোপনে ছিলেন। পরে প্রায় দুই মাস আগে বনানীতে এই প্রতিষ্ঠান চালু করা হয়েছে বলে স্থানীয়ভাবে দাবি করা হচ্ছে।

তবে কারও অতীত ব্যবসা, মামলা বা আত্মগোপনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে হলে মামলা নম্বর, আদালতের নথি, পুলিশ রেকর্ড, কোম্পানি বা ব্যবসায়িক নিবন্ধন এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির বক্তব্য প্রয়োজন। কোনো ব্যক্তির বিরুদ্ধে মামলা থাকার অভিযোগ নিজেই তার অপরাধ প্রমাণ করে না।

মার্ভেল ইনকে ঘিরে পুলিশের ভূমিকা নিয়েও স্থানীয় পর্যায়ে প্রশ্ন উঠেছে। স্থানীয় কয়েকটি সূত্রের দাবি, বনানীর কিছু গেস্ট হাউজ ও স্পা-কেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে কথিত মাসোহারা নেওয়ার বিনিময়ে অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে নীরবতা পালন করা হয়। অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি অত্যন্ত গুরুতর এবং পুলিশের অভ্যন্তরীণ তদন্তের দাবি রাখে।

স্থানীয়দের অভিযোগ, বিভিন্ন সময় এসব প্রতিষ্ঠানে পুলিশের তৎপরতা দেখা গেলেও কথিত মূল হোতারা ধরাছোঁয়ার বাইরে থেকে যায়। এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে অভিযান পরিচালনার আগেই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানে খবর পৌঁছে যায় বলেও অভিযোগ রয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে—অভিযানের তথ্য আগে থেকেই ফাঁস হচ্ছে কি না, নাকি অভিযোগগুলো যথাযথভাবে তদন্ত করা হচ্ছে না।

অভিযোগকারীদের আরও দাবি, বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার এসব প্রতিষ্ঠানের বিষয়ে জানানো হয়েছে। অভিযোগের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন তথ্য ও প্রমাণও পাঠানো হয়েছে বলে তারা দাবি করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, ফোন করেও কাঙ্ক্ষিত সাড়া পাওয়া যায়নি। তবে এসব যোগাযোগের দাবি যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট হোয়াটসঅ্যাপ বার্তা, কল রেকর্ড বা অন্যান্য প্রমাণ প্রয়োজন।

স্থানীয় পর্যায়ে মার্ভেল ইন-এর সঙ্গে পায়েলের নাম বিশেষভাবে আলোচিত হচ্ছে। তার অতীত রাজনৈতিক পরিচয় নিয়েও বিভিন্ন আলোচনা রয়েছে। স্থানীয় কয়েকজনের দাবি, অতীতে গোপালগঞ্জসহ রাজধানীর গুলশান-বনানী এলাকায় তার প্রভাব ছিল।
মার্ভেল ইন ছাড়াও একই এলাকায় করিম ভিলায় অবস্থিত একটি ‘লাক্সারী গেস্ট হাউজ’ নিয়েও স্থানীয়ভাবে নানা অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, হান্নান, সাকিবসহ প্রায় ছয়জন ব্যক্তি এর মালিকানার সঙ্গে যুক্ত।
এই গেস্ট হাউজের মালিকানার সঙ্গে যুক্ত হান্নানের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি অভিযোগের বিষয়ে পুলিশের অবস্থান নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। তার বক্তব্যের সারমর্ম হলো—পুলিশ যদি তাদের প্রতিষ্ঠানে অভিযান চালাতে চায়, তাহলে তাদের জানিয়ে আসতে হবে। বনানী থানার পুলিশ তাদের ব্যবসা সম্পর্কে ভালোভাবেই জানে বলেও তিনি দাবি করেন।
হান্নানের এই বক্তব্যও তদন্তের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক সামনে আনে।
স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, লাক্সারী গেস্ট হাউজের কিছু কক্ষে কথিত ‘স্পেশাল সার্ভিস’ দেওয়া হয়। এ ধরনের অভিযোগের সঙ্গে নারী সরবরাহকারী দালাল ও মধ্যস্বত্বভোগীদের সম্পৃক্ততার কথাও বলা হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, নির্দিষ্ট মোবাইল নম্বর ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে সম্ভাব্য গ্রাহকদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হয় এবং পরে তাদের নির্দিষ্ট স্থানে নিয়ে যাওয়া হয়।
এই অভিযোগগুলোর সত্যতা যাচাই করতে হলে ডিজিটাল ফরেনসিক, কল রেকর্ড, আর্থিক লেনদেন, সিসিটিভি ফুটেজ এবং প্রত্যক্ষদর্শীদের বক্তব্য গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ হতে পারে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী চাইলে এসব তথ্যের মাধ্যমে কথিত নেটওয়ার্কের প্রকৃত কাঠামো শনাক্ত করতে পারে।
মার্ভেল ইনকে ঘিরে অভিযোগের আরেকটি দিক হলো প্রতিষ্ঠানের কথিত সুসংগঠিত পরিচালনা কাঠামো। স্থানীয় সূত্রগুলোর দাবি, পায়েল, জুয়েল ও এরশাদকে কেন্দ্র করে একটি সমন্বিত নেটওয়ার্ক কাজ করছে। তাদের অভিযোগ অনুযায়ী, নারী সরবরাহ, মাদক, কথিত যৌন ব্যবসা, জুয়া এবং আর্থিক লেনদেন—সবকিছুই একটি সমন্বিত ব্যবস্থার মাধ্যমে পরিচালিত হতে পারে।
স্থানীয়দের সবচেয়ে বড় উদ্বেগ তরুণ সমাজকে ঘিরে। তাদের মতে, বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় গেস্ট হাউজ বা স্পা সেন্টারের আড়ালে যদি অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড চলে, তাহলে তরুণদের একটি অংশ সহজেই এসব কর্মকাণ্ডের সংস্পর্শে আসতে পারে। বিশেষ করে মাদক ও যৌন শোষণের মতো কর্মকাণ্ডের বিস্তার সামাজিক নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের কারণ হতে পারে।
একজন কলেজ অধ্যাপকের বক্তব্য হিসেবে স্থানীয়ভাবে যে মতামত পাওয়া গেছে, তা হলো—এ ধরনের প্রতিষ্ঠানের নেপথ্য কর্মকাণ্ড তরুণদের নৈতিক ও সামাজিক আচরণে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও অভিভাবকদের পক্ষ থেকেও প্রশাসনের দ্রুত হস্তক্ষেপের দাবি রয়েছে বলে স্থানীয় সূত্রগুলো জানায়।
অপরাধ বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু একটি অভিযান পরিচালনা করে এ ধরনের সমস্যার স্থায়ী সমাধান সম্ভব নয়। প্রয়োজন গোয়েন্দা নজরদারি, নিয়মিত লাইসেন্স যাচাই, অতিথিদের পরিচয় যাচাই, সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ, মাদকবিরোধী অভিযান এবং দালাল চক্র শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনা।
অভিযোগগুলো সত্য হলে মার্ভেল ইন বা সংশ্লিষ্ট গেস্ট হাউজে কর্মরত কয়েকজন ব্যক্তি নয়, বরং একটি বৃহত্তর নেটওয়ার্কের অস্তিত্ব থাকতে পারে। সেই নেটওয়ার্কে দালাল, মাদক সরবরাহকারী, পরিবহনকারী, অনলাইন যোগাযোগকারী এবং অর্থ লেনদেনের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা থাকতে পারেন। ফলে শুধু কোনো গেস্ট হাউজে অভিযান চালিয়ে কয়েকজনকে আটক করলেই তদন্ত শেষ করা উচিত নয়।
বনানীর মতো গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় আবাসিক ভবনে পরিচালিত গেস্ট হাউজগুলোর বৈধতা, ট্রেড লাইসেন্স, অগ্নিনিরাপত্তা, অতিথি নিবন্ধন, ভবনের অনুমোদিত ব্যবহার এবং অন্যান্য আইনগত বিষয় নিয়মিত পরীক্ষা করা জরুরি। কোনো প্রতিষ্ঠান বৈধ ব্যবসা পরিচালনা করলে তাদেরও আইনগত সুরক্ষা পাওয়ার অধিকার রয়েছে। একইভাবে কোনো প্রতিষ্ঠানের আড়ালে অপরাধ পরিচালিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া প্রশাসনের দায়িত্ব।
পুলিশের বিরুদ্ধে কথিত মাসোহারা গ্রহণের অভিযোগও পৃথকভাবে তদন্তের দাবি রাখে। কোনো পুলিশ সদস্যের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে পুরো বাহিনীকে দায়ী করা যেমন যুক্তিসঙ্গত নয়, তেমনি অভিযোগকে সম্পূর্ণ উপেক্ষা করাও জনআস্থার জন্য ক্ষতিকর।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—অভিযোগ সত্য হলে বনানীর একটি গেস্ট হাউজকে কেন্দ্র করে শুধু স্থানীয় পর্যায়ের অপরাধ নয়, একটি বিস্তৃত মানবপাচার, মাদক ও অবৈধ আর্থিক নেটওয়ার্ক সক্রিয় থাকার আশঙ্কা তৈরি হয়।
বনানীর ২৭ নম্বর সড়কের মার্ভেল ইন ও একই এলাকার লাক্সারী গেস্ট হাউজকে ঘিরে ওঠা অভিযোগ এখন শুধু স্থানীয় বাসিন্দাদের আলোচনার বিষয় নয়; এটি আইনশৃঙ্খলা, নগর ব্যবস্থাপনা, ব্যবসায়িক বৈধতা, তরুণ সমাজের নিরাপত্তা এবং মানবপাচার প্রতিরোধের মতো গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সঙ্গে যুক্ত। পায়েল, জুয়েল ও এরশাদকে কেন্দ্র করে কথিত সিন্ডিকেটের প্রকৃত ভূমিকা, মার্ভেল ইন-এর বৈধতা, কথিত অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের সত্যতা এবং পুলিশের ভূমিকা—সবকিছুই নথি ও প্রমাণের ভিত্তিতে তদন্ত করা প্রয়োজন।