ঢাকা ০৭:১৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ২৪ ভাদ্র ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
ঘুষের অভিযোগ তুলতে গিয়ে সিনিয়র সচিব সালেহ আহমেদের ঘটনাই ফাঁস তালা ভেঙে বসতি, আড়াই–তিন বছর বিল বকেয়া; সংযোগ বিচ্ছিন্নে ‘নিরাপত্তার অজুহাত’ আকিজ সিমেন্টে ১৪৮ কোটি টাকার অনিয়ম কুমিল্লায় নারী উদ্যোক্তাদের স্যানিটারি ন্যাপকিন বিক্রয় বিষয়ক প্রশিক্ষণ রংপুর রেঞ্জের শ্রেষ্ঠ জেলা পুলিশ নির্বাচিত ঠাকুরগাঁও বাঁধনের ওপর হামলা, সংসদে যা বললেন বিএনপির নারী এমপি ফায়ার সার্ভিস কর্মকর্তা কামরুজ্জামান সুমনের বিরুদ্ধে প্রতারণার অভিযোগ আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস উপলক্ষে কোটালীপাড়ায় আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত দেশে ফিরলেই শেখ হাসিনাকে জেলে যেতে হবে: শামা ওবায়েদ লভ্যাংশ না নিয়ে আয়ের ওপর নেওয়া হয়েছে টাকা : সংসদীয় স্থায়ী কমিটি
ধলপুরে শতাধিক ফ্ল্যাটে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল নেই

তালা ভেঙে বসতি, আড়াই–তিন বছর বিল বকেয়া; সংযোগ বিচ্ছিন্নে ‘নিরাপত্তার অজুহাত’

রাজধানীর ধলপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর কোয়ার্টারে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করেই শতাধিক ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২১টি ভবনে প্রায় ১৮০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা ১০০ থেকে ১২০টি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না হওয়ার তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, আড়াই থেকে তিন বছর ধরে এসব ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস বিলও পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে গত ৫ আগস্টের পর ওই কোয়ার্টারের কয়েকটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে কথিত অবৈধ দখলদাররা বসবাস শুরু করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ফ্ল্যাটে বসবাস, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং বছরের পর বছর বিল বকেয়া—সবই নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরের মধ্যে ঘটছে; অথচ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি।

এ ঘটনায় এনওসিএস মানিকনগর, ডিপিডিসির রাজস্ব আদায় ও অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

‘লাইন কাটতে গেলে আমাদের ওপর চড়াও হতে পারে’

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ডিপিডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চড়াও হতে পারেন।

নির্বাহী প্রকৌশলীর এমন বক্তব্যের পরই নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—আইনশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকলে প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হলো না কেন?

অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল কি না, করা হলে তার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

চিঠি দিয়েও ফল নেই!

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর অঞ্চল-৫-এর বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বজলুর রহমান জানান, বিষয়টি নিয়ে ডিপিডিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ডিপিডিসির সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট লোকজন সহযোগিতা করলে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে।

দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে যেন একে অন্যের দিকে দায় ঠেলে দেওয়ার চিত্রই স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, বিল আদায় হচ্ছে না—ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত কার? সরকারি কোষাগারের।

শতাধিক ফ্ল্যাটে বিল না দিলে দায় কার?

১০০ থেকে ১২০টি ফ্ল্যাটে যদি সত্যিই আড়াই থেকে তিন বছর ধরে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকে, তাহলে মোট বকেয়া কত?

প্রতিটি ফ্ল্যাটের মিটার নম্বর, গ্রাহকের নাম, সংযোগের ধরন, মাসিক বিল, বকেয়ার পরিমাণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির চিত্র বেরিয়ে আসবে।

প্রশ্ন হলো—এত বড় অঙ্কের বিল বকেয়া থাকার পরও নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয়েছে কি না? বিল তৈরি করা হয়েছে কি না? বিল আদায়ের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না? সংযোগ বিচ্ছিন্নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।

সংসদে বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা

গত ৭ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিপিডিসি ও সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতির কথা তুলে ধরেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ধলপুর কোয়ার্টারে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল আদায় না হওয়ার অভিযোগ নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

একদিকে বিদ্যুৎ খাতে রাজস্ব আদায় ও অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; অন্যদিকে একটি সরকারি আবাসিক এলাকায় শতাধিক ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন বিল আদায় না হওয়ার অভিযোগ উঠছে—এ বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা কী?

‘নিরাপত্তা’ নাকি দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত?

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে হামলার আশঙ্কা থাকলে সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার বিষয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সংস্থার করণীয় হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া এবং আইনানুগভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

শুধু ‘চড়াও হতে পারে’ আশঙ্কা দেখিয়ে বছরের পর বছর অবৈধ বা অনাদায়ী সংযোগ চালু রাখা হলে সরকারি রাজস্ব রক্ষার দায়িত্বটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি

১. ১০০–১২০টি ফ্ল্যাটে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া?

২. গত আড়াই–তিন বছরে এসব মিটারে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে?

৩. বিল তৈরি হলেও আদায় হয়নি, নাকি বিলই তৈরি করা হয়নি?

৪. সংযোগগুলো বৈধ, নাকি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে?

৫. সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার জন্য কোনো কর্মকর্তা লিখিত অনুমোদন দিয়েছেন কি না?

৬. ডিপিডিসি ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে এ বিষয়ে কতবার চিঠি চালাচালি হয়েছে?

৭. সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে প্রশাসনিক বা পুলিশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল কি না?

৮. তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

৯. বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ে মামলা বা অন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না?

১০. দীর্ঘদিনের বকেয়া ও সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে কি না?

জবাবদিহি এখন জরুরি

ধলপুর কোয়ার্টারের অভিযোগ সত্য হলে এটি কেবল কয়েকটি ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার ঘটনা নয়। সরকারি আবাসিক ভবনে অবৈধ বসবাস, বিদ্যুৎ ব্যবহার, বিল আদায়ে ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলে থাকার অভিযোগ—সব মিলিয়ে এটি সরকারি সম্পদ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তাই বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, ডিপিডিসি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত বকেয়া, রাজস্ব ক্ষতি, সংযোগের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা জরুরি।

সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধ দখল থাকলে তা উচ্ছেদ করতে হবে, অবৈধ সংযোগ থাকলে আইনানুগভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হবে এবং বকেয়া রাজস্ব থাকলে তা আদায় করতে হবে—কিন্তু এতদিন কেন এসব করা হলো না, সেই প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে।

তথ্যবক্স

ধলপুর সিটি করপোরেশন কোয়ার্টার

– ভবন: ২১টি
– মোট ফ্ল্যাট: প্রায় ১৮০টি
– অভিযোগের আওতায়: প্রায় ১০০–১২০টি ফ্ল্যাট
– অভিযোগ: আড়াই–তিন বছর বিদ্যুৎ বিল বকেয়া
– গ্যাস বিল: বকেয়া থাকার অভিযোগ
– অভিযোগ: তালা ভেঙে অবৈধ বসবাস
– সংশ্লিষ্ট সংস্থা: ডিপিডিসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
– দায়িত্বশীল কর্মকর্তা: এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ঘুষের অভিযোগ তুলতে গিয়ে সিনিয়র সচিব সালেহ আহমেদের ঘটনাই ফাঁস

ধলপুরে শতাধিক ফ্ল্যাটে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল নেই

তালা ভেঙে বসতি, আড়াই–তিন বছর বিল বকেয়া; সংযোগ বিচ্ছিন্নে ‘নিরাপত্তার অজুহাত’

আপডেট সময় ০৬:৪৯:২৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৮ সেপ্টেম্বর ২০২৬

রাজধানীর ধলপুরে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের ১০ নম্বর কোয়ার্টারে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না করেই শতাধিক ফ্ল্যাটে বিদ্যুৎ ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে। ২১টি ভবনে প্রায় ১৮০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে সিটি করপোরেশনের কাছে হস্তান্তর করা ১০০ থেকে ১২০টি ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যুৎ বিল পরিশোধ না হওয়ার তথ্য অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। অভিযোগ রয়েছে, আড়াই থেকে তিন বছর ধরে এসব ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া রয়েছে। একই সঙ্গে গ্যাস বিলও পরিশোধ না করার অভিযোগ রয়েছে।

এদিকে গত ৫ আগস্টের পর ওই কোয়ার্টারের কয়েকটি ফ্ল্যাটের তালা ভেঙে কথিত অবৈধ দখলদাররা বসবাস শুরু করলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি—এমন অভিযোগও পাওয়া গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, ফ্ল্যাটে বসবাস, বিদ্যুৎ ব্যবহার এবং বছরের পর বছর বিল বকেয়া—সবই নাকি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরের মধ্যে ঘটছে; অথচ সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়নি।

এ ঘটনায় এনওসিএস মানিকনগর, ডিপিডিসির রাজস্ব আদায় ও অবৈধ সংযোগ নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রম নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে।

‘লাইন কাটতে গেলে আমাদের ওপর চড়াও হতে পারে’

ঘটনার বিষয়ে জানতে চাইলে এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম অভিযোগের বিষয়টি স্বীকার করেন। তবে তার দাবি, ওই এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা ডিপিডিসির কর্মকর্তা-কর্মচারীদের ওপর চড়াও হতে পারেন।

নির্বাহী প্রকৌশলীর এমন বক্তব্যের পরই নতুন প্রশ্ন সামনে এসেছে—আইনশৃঙ্খলার আশঙ্কা থাকলে প্রশাসনের সহায়তা নেওয়া হলো না কেন?

অবৈধ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে পুলিশ বা সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের সহায়তা চেয়ে লিখিত আবেদন করা হয়েছিল কি না, করা হলে তার পরিপ্রেক্ষিতে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে—এ বিষয়ে সংশ্লিষ্টদের কাছ থেকে স্পষ্ট তথ্য পাওয়া যায়নি।

চিঠি দিয়েও ফল নেই!

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের কর অঞ্চল-৫-এর বিদ্যুৎ বিভাগের তৎকালীন দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বজলুর রহমান জানান, বিষয়টি নিয়ে ডিপিডিসিকে চিঠি দেওয়া হয়েছে।

অন্যদিকে ডিপিডিসির সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী ওহিদুজ্জামান সাংবাদিকদের বলেন, সিটি করপোরেশনের সংশ্লিষ্ট লোকজন সহযোগিতা করলে অবৈধ বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করা সহজ হবে।

দুই প্রতিষ্ঠানের বক্তব্যে যেন একে অন্যের দিকে দায় ঠেলে দেওয়ার চিত্রই স্পষ্ট হচ্ছে। কিন্তু এর মধ্যে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ ব্যবহার হচ্ছে, বিল আদায় হচ্ছে না—ক্ষতিটা শেষ পর্যন্ত কার? সরকারি কোষাগারের।

শতাধিক ফ্ল্যাটে বিল না দিলে দায় কার?

১০০ থেকে ১২০টি ফ্ল্যাটে যদি সত্যিই আড়াই থেকে তিন বছর ধরে বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকে, তাহলে মোট বকেয়া কত?

প্রতিটি ফ্ল্যাটের মিটার নম্বর, গ্রাহকের নাম, সংযোগের ধরন, মাসিক বিল, বকেয়ার পরিমাণ এবং বিদ্যুৎ ব্যবহারের হিসাব পর্যালোচনা করলেই প্রকৃত রাজস্ব ক্ষতির চিত্র বেরিয়ে আসবে।

প্রশ্ন হলো—এত বড় অঙ্কের বিল বকেয়া থাকার পরও নিয়মিত মিটার রিডিং নেওয়া হয়েছে কি না? বিল তৈরি করা হয়েছে কি না? বিল আদায়ের জন্য নোটিশ দেওয়া হয়েছে কি না? সংযোগ বিচ্ছিন্নের কোনো উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল কি না?

এসব প্রশ্নের উত্তর এখনো অস্পষ্ট।

সংসদে বিদ্যুৎ খাতের ঘাটতি নিয়ে আলোচনা

গত ৭ সেপ্টেম্বর সংসদে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ডিপিডিসি ও সিটি করপোরেশন-সংশ্লিষ্ট বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় বড় ধরনের ঘাটতির কথা তুলে ধরেছেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। এমন প্রেক্ষাপটে ধলপুর কোয়ার্টারে বছরের পর বছর বিদ্যুৎ বিল আদায় না হওয়ার অভিযোগ নতুন করে গুরুত্ব পেয়েছে।

একদিকে বিদ্যুৎ খাতে রাজস্ব আদায় ও অপচয় কমানোর ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে; অন্যদিকে একটি সরকারি আবাসিক এলাকায় শতাধিক ফ্ল্যাটে দীর্ঘদিন বিল আদায় না হওয়ার অভিযোগ উঠছে—এ বৈপরীত্যের ব্যাখ্যা কী?

‘নিরাপত্তা’ নাকি দায়িত্ব এড়ানোর অজুহাত?

বিদ্যুৎ সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে গেলে হামলার আশঙ্কা থাকলে সেটি অবশ্যই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করার বিষয়। কিন্তু সে ক্ষেত্রে দায়িত্বশীল সংস্থার করণীয় হলো আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহায়তা নেওয়া এবং আইনানুগভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

শুধু ‘চড়াও হতে পারে’ আশঙ্কা দেখিয়ে বছরের পর বছর অবৈধ বা অনাদায়ী সংযোগ চালু রাখা হলে সরকারি রাজস্ব রক্ষার দায়িত্বটি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়—সেটিই এখন বড় প্রশ্ন।

তদন্তে যেসব বিষয় খতিয়ে দেখা জরুরি

১. ১০০–১২০টি ফ্ল্যাটে প্রকৃতপক্ষে কত টাকা বিদ্যুৎ বিল বকেয়া?

২. গত আড়াই–তিন বছরে এসব মিটারে কত ইউনিট বিদ্যুৎ ব্যবহার হয়েছে?

৩. বিল তৈরি হলেও আদায় হয়নি, নাকি বিলই তৈরি করা হয়নি?

৪. সংযোগগুলো বৈধ, নাকি অবৈধভাবে বিদ্যুৎ ব্যবহার করা হচ্ছে?

৫. সংযোগ বিচ্ছিন্ন না করার জন্য কোনো কর্মকর্তা লিখিত অনুমোদন দিয়েছেন কি না?

৬. ডিপিডিসি ও সিটি করপোরেশনের মধ্যে এ বিষয়ে কতবার চিঠি চালাচালি হয়েছে?

৭. সংযোগ বিচ্ছিন্ন করতে প্রশাসনিক বা পুলিশি সহায়তা চাওয়া হয়েছিল কি না?

৮. তালা ভেঙে ফ্ল্যাটে বসবাসকারীদের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে?

৯. বকেয়া বিদ্যুৎ বিল আদায়ে মামলা বা অন্য কোনো আইনগত পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে কি না?

১০. দীর্ঘদিনের বকেয়া ও সম্ভাব্য রাজস্ব ক্ষতির জন্য সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের কোনো জবাবদিহির আওতায় আনা হয়েছে কি না?

জবাবদিহি এখন জরুরি

ধলপুর কোয়ার্টারের অভিযোগ সত্য হলে এটি কেবল কয়েকটি ফ্ল্যাটের বিদ্যুৎ বিল বকেয়া থাকার ঘটনা নয়। সরকারি আবাসিক ভবনে অবৈধ বসবাস, বিদ্যুৎ ব্যবহার, বিল আদায়ে ব্যর্থতা এবং দীর্ঘদিন ধরে বিষয়টি ঝুলে থাকার অভিযোগ—সব মিলিয়ে এটি সরকারি সম্পদ ও রাজস্ব ব্যবস্থাপনার বড় ধরনের প্রশ্ন তৈরি করেছে।

তাই বিদ্যুৎ মন্ত্রণালয়, ডিপিডিসি এবং ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সমন্বয়ে নিরপেক্ষ তদন্ত করে প্রকৃত বকেয়া, রাজস্ব ক্ষতি, সংযোগের বৈধতা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা-কর্মচারীদের দায়িত্ব নির্ধারণ করা জরুরি।

সরকারি সম্পত্তিতে অবৈধ দখল থাকলে তা উচ্ছেদ করতে হবে, অবৈধ সংযোগ থাকলে আইনানুগভাবে বিচ্ছিন্ন করতে হবে এবং বকেয়া রাজস্ব থাকলে তা আদায় করতে হবে—কিন্তু এতদিন কেন এসব করা হলো না, সেই প্রশ্নের জবাবও দিতে হবে।

তথ্যবক্স

ধলপুর সিটি করপোরেশন কোয়ার্টার

– ভবন: ২১টি
– মোট ফ্ল্যাট: প্রায় ১৮০টি
– অভিযোগের আওতায়: প্রায় ১০০–১২০টি ফ্ল্যাট
– অভিযোগ: আড়াই–তিন বছর বিদ্যুৎ বিল বকেয়া
– গ্যাস বিল: বকেয়া থাকার অভিযোগ
– অভিযোগ: তালা ভেঙে অবৈধ বসবাস
– সংশ্লিষ্ট সংস্থা: ডিপিডিসি ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন
– দায়িত্বশীল কর্মকর্তা: এনওসিএস মানিকনগরের নির্বাহী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মোহাম্মদ ইব্রাহিম