রংপুরের পীরগঞ্জ পৌরসভার পরিচালনায় নগর মাতৃসদন কেন্দ্রে প্রসূতি শ্রাবণী বেগম (১৯) ও তাঁর গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনের লিখিত অভিযোগের পর তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে রংপুরের সিভিল সার্জন কার্যালয়। কমিটিকে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
গত ১৮ আগস্ট সন্তান প্রসবের উদ্দেশ্যে পীরগঞ্জ পৌরসভা পরিচালিত নগর মাতৃসদন কেন্দ্রে ভর্তি হন শ্রাবণী বেগম। পরে সেখানে তাঁর মৃত্যু হয়। এ ঘটনায় চিকিৎসায় অবহেলা, দায়িত্বে গাফিলতি, চিকিৎসা প্রদানে বিলম্ব এবং যথাযথ জরুরি ব্যবস্থাপনা না থাকার অভিযোগ এনে নিহতের বাবা মতিয়ার রহমান রংপুরের সিভিল সার্জনের কাছে লিখিত অভিযোগ করেন।
অভিযোগের বিষয়গুলো যাচাই ও ঘটনার প্রকৃত কারণ উদঘাটনে গত ৩০ আগস্ট তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটির সভাপতি করা হয়েছে রংপুরের ডেপুটি সিভিল সার্জন ডা. হিফজুর হাসান খানকে। সদস্য হিসেবে রয়েছেন তারাগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের গাইনি বিভাগের সহকারী অধ্যাপক ডা. কেয়া রানী রায় এবং রংপুর সিভিল সার্জন কার্যালয়ের মেডিকেল অফিসার ডা. অনির্বাণ মজুমদার।
সিভিল সার্জন কার্যালয়ের আদেশে অভিযোগের বিষয়গুলো তদন্ত করে আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন দাখিল করতে বলা হয়েছে।
এ বিষয়ে রংপুরের সিভিল সার্জন বলেন, “অভিযোগ পাওয়ার পরপরই ডেপুটি সিভিল সার্জনকে প্রধান করে তিন সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। আগামী পাঁচ কার্যদিবসের মধ্যে তাদের প্রতিবেদন দিতে বলা হয়েছে। চিকিৎসায় কোনো ধরনের গাফিলতির প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনগত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
তদন্ত কমিটি গঠনের খবরে স্বস্তি প্রকাশ করলেও স্বজন ও এলাকাবাসীর দাবি, কোনো প্রভাবশালী মহলের প্রভাব, পায়তারা বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই তদন্ত কার্যক্রম পরিচালনা করতে হবে। তাঁদের প্রত্যাশা, শ্রাবণী ও তাঁর অনাগত সন্তানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটন করে দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হবে।
নিহত শ্রাবণীর স্বজনরা বলেন, ঘটনার সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক, তদন্তে কোনো ধরনের পক্ষপাতিত্ব তাঁরা মেনে নেবেন না। নগর মাতৃসদনে ওই সময়ের চিকিৎসা কার্যক্রম, কর্তব্যরত চিকিৎসক ও জনবল, রোগীর চিকিৎসার সময়কাল, জরুরি ব্যবস্থাপনা, রোগীর শারীরিক অবস্থার অবনতি এবং শেষ পর্যন্ত কেন ও কখন অন্যত্র পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল—এসব বিষয় তদন্তের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন তাঁরা।
অনেকবার উঠেছিল নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম নিয়ে প্রশ্ন
এর আগে ১৯ ও ২০ আগস্ট প্রকাশিত প্রতিবেদনে শ্রাবণীর মৃত্যুর ঘটনায় স্বজনদের চিকিৎসায় অবহেলা ও ভুল চিকিৎসার অভিযোগের পাশাপাশি নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম নিয়েও বিভিন্ন প্রশ্ন তুলে ধরা হয়।
২০ আগস্ট স্বজন ও এলাকাবাসীর বিক্ষোভের পর পীরগঞ্জ পৌরসভার প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মাহমুদুল হাসান ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি শান্ত করেন। পরে সরেজমিনে পরিদর্শন শেষে নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করেন এবং অভিযোগ তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আশ্বাস দেন।
এর আগে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা (UH&FPO) ডা. মাসুদ রানা জানিয়েছিলেন, প্রকল্পের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম বন্ধের জন্য একাধিকবার মৌখিক নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।
অন্যদিকে ইউএনও মাহমুদুল হাসান জানিয়েছিলেন, কর্তব্যরত চিকিৎসকের কাছ থেকে তিনি জানতে পেরেছেন শ্রাবণী একলামশিয়ায় আক্রান্ত ছিলেন এবং উচ্চ রক্তচাপের কারণে তাঁর খিঁচুনি হয়েছিল। তবে মৃত্যুর প্রকৃত কারণ তদন্তের মাধ্যমে উদঘাটিত হবে বলেও তিনি জানিয়েছিলেন।
‘ডেলিভারির সক্ষমতা বা ব্যবস্থাপনা ছিল না’—স্বাস্থ্য কর্মকর্তার দাবি
নগর মাতৃসদনের দীর্ঘদিনের কার্যক্রম ও সেখানে চিকিৎসাসেবা নিয়ে ওঠা অভিযোগ সম্পর্কে পীরগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. মাসুদ রানা বলেন, “আমি ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে পীরগঞ্জে যোগদান করেছি। যোগদানের পর থেকেই নগর মাতৃসদন কেন্দ্রটি নিয়ে নানা অনিয়ম, অব্যবস্থাপনা, কর্মীদের বেতন-ভাতা থেকে বঞ্চিত করা, স্বজনপ্রীতি ও নারী হয়রানিসহ বিভিন্ন অভিযোগ শুনেছি।”
তিনি বলেন, “সর্বশেষ চিকিৎসায় অবহেলা ও অদক্ষতার অভিযোগে প্রসূতি শ্রাবণী ও তাঁর গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর ঘটনায় প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রম নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে এসেছে। নগর মাতৃসদন থেকে চিকিৎসা নেওয়া অনেক প্রসূতিকে পরবর্তীতে আমার হাসপাতালে মুমূর্ষু অবস্থায় ডেলিভারির জন্য আসতে দেখেছি।”
ডা. মাসুদ রানা আরও বলেন, তিনি নিজে নগর মাতৃসদন কেন্দ্রটি সরেজমিনে পরিদর্শন করেছেন। তাঁর দাবি, “সেখানে ডেলিভারি করানোর প্রয়োজনীয় সক্ষমতা ও ব্যবস্থাপনা আমি দেখতে পাইনি। এ কারণে প্রতিষ্ঠানটি বন্ধের জন্য তৎকালীন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোছা. খাদিজা বেগম এবং পরবর্তীতে মোছা. পপি খাতুনকে একাধিকবার লিখিতভাবে জানিয়েছি। কিন্তু কোনো কারণে তখন প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ করা সম্ভব হয়নি।”
তিনি আরও বলেন, “নগর মাতৃসদনটি পীরগঞ্জের স্বাস্থ্যসেবার জন্য একটি গলার কাঁটা হয়ে দাঁড়িয়েছিল।”
তবে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা ও পরিচালনা নিয়ে যেসব গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তদন্ত ছাড়া কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো উচিত নয় বলেও সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
ডা. মাসুদ রানা অভিযোগ করে বলেন, “পৌর সচিব আব্দুর রহিম প্রামাণিককে কেন্দ্র করে এবং প্রজেক্ট ম্যানেজার রিয়াজ আহমেদসহ একটি সিন্ডিকেটের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি পরিচালিত হওয়ার অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের আধিপত্য, যোগসাজশ ও কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে স্বাস্থ্যসেবার নামে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগ আমি শুনেছি।” তবে এসব অভিযোগের সত্যতা তদন্তের মাধ্যমে যাচাই হওয়া প্রয়োজন।
এখন তদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষা
প্রসূতি শ্রাবণী ও তাঁর গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ, চিকিৎসায় কোনো গাফিলতি ছিল কি না, জরুরি ব্যবস্থাপনায় ঘাটতি ছিল কি না এবং নগর মাতৃসদনের চিকিৎসা কার্যক্রম নির্ধারিত নিয়ম ও সক্ষমতার মধ্যে পরিচালিত হয়েছিল কি না—এসব প্রশ্নের উত্তর এখন তদন্ত প্রতিবেদনের ওপর নির্ভর করছে।
স্বজন ও এলাকাবাসীর প্রত্যাশা, কোনো প্রভাবশালী মহলের পায়তারা বা হস্তক্ষেপ ছাড়াই নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদঘাটন করা হবে এবং অভিযোগ প্রমাণিত হলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
মেয়াদ শেষের পরও কার্যক্রম—জবাবদিহি কার?
স্বজন ও এলাকাবাসীর আরও প্রশ্ন, ২০২৫ সালেই যদি নগর মাতৃসদন প্রকল্পের কার্যক্রমের মেয়াদ শেষ হয়ে থাকে, তাহলে শ্রাবণীর মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিষ্ঠানটি প্রকাশ্যে কীভাবে চিকিৎসাসেবা ও প্রসূতি কার্যক্রম চালিয়ে গেল? মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও একটি প্রতিষ্ঠান এতদিন কার অনুমোদন, তদারকি ও দায়িত্বে পরিচালিত হয়েছে—এর জবাবদিহি কোথায়? সংশ্লিষ্ট প্রশাসনের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা কি এ দায় এড়িয়ে যেতে পারেন?
তাঁদের দাবি, শুধু শ্রাবণীর মৃত্যুর চিকিৎসাগত কারণ অনুসন্ধান করলেই হবে না; মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও নগর মাতৃসদনের কার্যক্রম কীভাবে চলেছে, কে বা কারা এর অনুমোদন ও তদারকি করেছে এবং সংশ্লিষ্ট প্রশাসনিক কর্তৃপক্ষের ভূমিকা কী ছিল—এসব বিষয়ও তদন্তের আওতায় আনতে হবে।
তারিকুল ইসলাম তারিক পীরগঞ্জ (রংপুর) প্রতিনিধি 


















