সরকারের উচ্চপর্যায়ের হস্তক্ষেপে খাদ্য অধিদপ্তরের ফ্যাসিস্ট ‘সেই’ আয়মান বিনতে ফেরদৌস নুপুরের বদলি অবশেষে বাতিল করা হয়েছে। এতে স্বস্তি ফেরার পাশাপাশি প্রাণ ফিরে পেয়েছেন বিভিন্ন সাইলো, সিএসডি ও এলএসডির দায়িত্বে থাকা অধীক্ষক, ম্যানেজার ও ওসিএলএসডিরা। অনেক বড় ধাক্কা খেয়েছে খাদ্য মন্ত্রণালয় ও অধিদপ্তরের বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট। পরিস্থিতি অনেকটাই কোমর ভাঙার মতো। আওয়ামী লীগের ফ্যাসিস্ট ও দুর্নীতিবাজ উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক নুপুরের প্রশ্নবিদ্ধ বদলির আদেশ বাতিল হওয়ায় জামালপুরের রাইস মিল মালিকরা মিষ্টি বিতরণ করেছেন।
রোববার (৫ জুলাই) দুপুরে আলোচিত বদলি বাতিলের এ প্রজ্ঞাপনের খবর ছড়িয়ে পড়ে। খাদ্য অধিদপ্তরের পরিচালক (প্রশাসন) রেজা মোহাম্মদ মহসিন প্রজ্ঞাপনে স্বাক্ষর করেন।
সূত্র জানায়, মন্ত্রণালয়ের ২৩ এপ্রিলের আদেশ উপেক্ষা করে বদলির প্রজ্ঞাপন জারি করেছিল খাদ্য অধিদপ্তর। জামালপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক আয়মান বিনতে ফেরদৌস নুপুরকে সিংহজানী এলএসডি-১ এর এসএমও এবং এসএমও ইসরাত আহমেদ পাপেলকে নেত্রকোনার মদন উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে বদলি করা হয়। নুপুর পতিত আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা মির্জা আজমের ঘনিষ্ঠ। সরকারের উচ্চপর্যায় বিষয়টি জানার পর তোলপাড় শুরু হয়। সূত্র মতে, সিন্ডিকেটের হস্তক্ষেপে খাদ্য অধিদপ্তর বদলির এ প্রজ্ঞাপন জারি করতে বাধ্য হয়েছিল। এক্ষেত্রে নিয়মের কোনো তোয়াক্কা করা হয়নি। গোপন করে রাখা হয়েছিল অসম্পূর্ণ নথি। এ নিয়ে শনিবার পেপার পত্রিকার প্রথম পৃষ্ঠায় অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।
জানা যায়, আয়মান বিনতে ফেরদৌস নুপুর ২০২১ সালের ১১ আগস্ট আওয়ামী লীগের ডাকসাইটে নেতা মির্জা আজমের ডিও লেটার নিয়ে জামালপুরের মেলান্দহ খাদ্য গুদামের দায়িত্ব নেওয়ার চেষ্টা চালান। পারিবারিক সমস্যার কথা উল্লেখ করে তখন বদলির সুপারিশ করা হয়েছিল। অথচ নুপুরের বাড়ি থেকে এ গুদামের দূরত্ব প্রায় ৫০ কিলোমিটার। তদবির না রাখায় কয়েকদিনের মাথায় ময়মনসিংহের আঞ্চলিক খাদ্য নিয়ন্ত্রক সুরাইয়া খাতুনকে অধিদপ্তরে সংযুক্ত করা হয়। নাকানি-চুবানি খাওয়ানো হয় মহাপরিচালকসহ অন্যদের। সূত্র মতে, নুপুরের বাবা আওয়ামী লীগ নেতা প্রয়াত আব্দুল ওয়াদুদ অদু যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা ছিলেন। মির্জা আজম তার অধীনে ছাত্রলীগের রাজনীতি করতেন। নুপুর আওয়ামী লীগের প্রভাবে দীর্ঘ ১৪ বছর বহু ঘটনার জন্ম দেন।
সূত্র জানায়, চলতি বোরো সংগ্রহ মৌসুমে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জন, সংগ্রহ কার্যক্রম নিরবিচ্ছিন্ন ও নির্বিঘ্ন রাখতে খাদ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ অফিস আদেশ জারি করে। পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত সাইলো অধীক্ষক, সিএসডি ম্যানেজার এবং বিভিন্ন শ্রেণির এলএসডির ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের (ওসিএলএসডি) বদলি ও পদায়ন বন্ধ রাখতে বলা হয়। কোনো কারণে পদ শূন্য ও কেউ গুরুতর অসুস্থ হলে খাদ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মন্ত্রণালয়কে জানিয়ে শূন্য পদে বদলি ও পদায়ন করতে পারবেন বলে ওই আদেশে বলা হয়েছিল। গত ২৩ এপ্রিল উপ-সচিব মো. আবু নাসার উদ্দিন এ আদেশ জারি করেন। সূত্র মতে, মাঠ প্রশাসনের কর্মকর্তাদের বদলি বাণিজ্য সিন্ডিকেট মুক্ত রাখতে সংগ্রহ মৌসুমে এ ধরনের অফিস আদেশ জারি করে খাদ্য মন্ত্রণালয়।
জানা যায়, উপকারভোগীদের ডিও ইস্যু এবং চাল ও গম বিতরণের ক্ষেত্রেও আয়মান বিনতে ফেরদৌস নুপুর অনিয়ম ও দুর্নীতি করেন। অনেক ক্ষেত্রে বিতরণের দায়িত্ব পালন করান আলোচিত ‘সেই’ নৈশ প্রহরী দিয়ে। এর আগে দীর্ঘ ৬ বছর ১ মাস ২ গুদামে ওসিএলএসডির দায়িত্বে থেকে নুপুর বহু ঘটনার জন্ম দিয়ে বিতর্কিত হন। অনিয়ম ও দুর্নীতি করে হাতিয়ে নেন কোটি কোটি টাকা। আওয়ামী লীগের প্রভাব বিস্তার করে প্রয়াত মুক্তিযোদ্ধা বাবা ও গুদামের ‘সেই’ নৈশ প্রহরী দিয়ে পেশাদার সাংবাদিকদের নামে দায়ের করান মিথ্যা মামলা। পরে অবশ্য আদালতে মামলাগুলো মিথ্যা প্রমাণিত হয়। নৈশ প্রহরীকে দিয়েই চালানো হয় যাবতীয় কার্যক্রম। যেখানে বদলি, সেখানেই নিয়ে যান মুক্তিযোদ্ধা কোটার ‘সেই’ নৈশ প্রহরীকে।
সূত্র জানায়, নুপুর তদবির করে ২০১০ সালের ২৯ জুন মুক্তিযোদ্ধা কোটায় খাদ্য পরিদর্শকের চাকরি নেন। প্রভাব বিস্তার করে একটানা ৫ বছর ৫ মাস শেরপুর জেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে সংযুক্ত ছিলেন। ৩ বছর ৪ মাস ৩ দিন নকলা খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডির দায়িত্ব পালন করেন। এ সময় খাদ্য বিভাগকে বিষিয়ে তোলেন। তার স্থলে অন্যদের বদলি হলেও রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে যোগদান করতে দেননি। মাঝে ২ মাস অন্যত্র থাকার পর বিশেষ তদবিরে ২ বছর ৮ মাস ২৭ দিন ঝিনাইগাতী খাদ্য গুদামের ওসিএলএসডি ছিলেন। ১ বছর ৯ মাস ৫ দিনের মাথায় উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রক হিসেবে পদোন্নতি পান। ১ বছরের কম সময় ধোবাউড়ায় থাকার পর ২০২৪ সালের ৫ ডিসেম্বর জামালপুর সদর উপজেলা খাদ্য নিয়ন্ত্রকের কার্যালয়ে যোগ দেন।
নিজস্ব প্রতিবেদক 






















