সংবাদ শিরোনাম ::
কালিয়াকৈরে পল্লী উন্নয়ন দিবস পালন, বিতরণকে ঘিরে সাময়িক হট্টগোল চট্টগ্রামে পাহাড়ধসের শঙ্কা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় প্রশাসনের মাইকিং মালয়েশিয়া শ্রমবাজারে দুর্নীতির অভিযোগ, এজেন্সি মালিকদের সম্পদ অনুসন্ধানে দুদক টেন্ডারে ১৪ সর্বনিম্ন দরদাতাকে পেছনে ফেলে কাজ পেলেন ১৫ নম্বর ঠিকাদার খাদ্য অধিদপ্তরের ফ্যাসিস্ট সেই নুপুরের বদলি বাতিল সব নাগরিককে ডিজিটাল সেবার আওতায় আনতে হবে : অর্থমন্ত্রী বোরহানউদ্দিনে পিকআপ উল্টে চালক নিহত পাসপোর্ট অফিসে এক গ্রাম থেকে ১১২ জন নিয়োগের অভিযোগ দুর্নীতির অভিযোগে ডিএসসিসির প্রধান প্রকৌশলী বোরহানের বিরুদ্ধে তদন্তের নির্দেশ জুলাইকে ব্যঙ্গ করে ফেসবুক পোস্ট, বিইউবিটি কর্মকর্তা বরখাস্ত

পাসপোর্ট অফিসে এক গ্রাম থেকে ১১২ জন নিয়োগের অভিযোগ

কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে নিয়োগ পেয়েছেন ১৮৫ জন। এর মধ্যে ১১২ জনই কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামের বাসিন্দা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে গোপনে এই নিয়োগ সম্পন্ন হয়। এমনকি লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা কিংবা কোনো প্রতিযোগিতামূলক যাচাইয়ের ব্যবস্থাও করা হয়নি।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছয়টি ক্যাটাগরিতে এই ১৮৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১০৪ জন, ডেসপ্যাচ রাইডার বা মেসেঞ্জার ৫৯ জন, লিফটম্যান ১০ জন, গার্ডেনার (মালি) ছয়জন, পাম্প অপারেটর চারজন এবং ইলেকট্রিশিয়ান দুজন।

ইলেকট্রিশিয়ানদের বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার ২১২ টাকা। পাম্প অপারেটর ১৯ হাজার ৬৩৬ টাকা। গার্ডেনার ১৮ হাজার ৬৬০ টাকা। ডেসপ্যাচ রাইডার, লিফটম্যান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পাবেন ১৮ হাজার ১৮৯ টাকা করে।

যমুনা স্টার সেভের সঙ্গে গোপন চুক্তি

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ‘যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে বিপুল অর্থের বিনিময়ে গোপনে চুক্তি করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঘুষ লেনদেনসংক্রান্ত কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতে এসেছে।

কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রতিযোগিতা বা পরীক্ষা ছাড়া এই নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া সমন্বয় করেছেন পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক সালাউদ্দিন এবং উপপরিচালক তারিক সালমান। তাদের কাজের তদারকি করেছেন পরিচালক শিহাব উদ্দিন। নিয়োগ প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করেছেন এই কর্মকর্তা।

এক গ্রাম থেকে ১১২ জন নিয়োগ

নিয়োগ পাওয়া ১৮৫ জনের মধ্যে ১১২ জনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা যাচাই করে এর প্রমাণ পায় ।

এই ১১২ জনের মধ্যে ৮৮ জনের নামের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাসপোর্ট অফিসে সুইপার (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), এমএলএসএস, নৈশপ্রহরী ও ডেসপ্যাচ রাইডার পদে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হওয়া চুক্তির মেয়াদ শেষের ছয় মাস পর নতুন নিয়োগেও ঘুরেফিরে তারাই জায়গা পেয়েছেন।

আগেও ছিলেন এক গ্রামের ১৫০ জন

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো মেয়াদে পাসপোর্ট অফিসে জনবল সরবরাহ করেছে ‘কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড’। ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে কাজ করেছেন ২৫০ জন। তাদের মধ্যে ১৫০ জনের বাড়ি ছিল কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামে। সেই ১৫০ জনের মধ্য থেকে নতুন করে ১১২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের সময়ে ওই নিয়োগের নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন এডিজি রফিকুল ইসলাম।

তার সুপারিশে সে সময়ে সুইপার (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) পদে নিয়োগ পাওয়া ২৮ জন এবারও অন্যান্য পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা হলেন মো. শরিফ মিয়া, মো. জাফর ফকির, মো. শরিফুল ইসলাম, মালা জমাদ্দার, সুরেশ ত্রিপুরা, মো. কামরুজ্জামান, উমার চরন পাল, আহম্মেদ শরিফ, মো. আব্দুল হান্নান ভূঁইয়া, মো. আবু হানিফ, মো. ইমরান খান, শ্রী সজল হরিজন, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বাভূরুল ইসলাম, মো. শহিদুল ইসলাম, উসমান গনি, মো. সেলিম চৌধুরী, মো. খাদেমুল ইসলাম সাগর, মো. বাবুল মিয়া, মো. জুবায়ের হোসেন, নূর মোহাম্মাদ শেখ সাদী, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান, মো. এমদাদ হোসেন, মো. মহসিন, মো. সালাহ উদ্দিন, মো. নুর ইসলাম ও মো. আল আমিন।

আওয়ামী লীগ আমলে এমএলএসএস পদে থাকা ৩০ জনও নতুন করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা হলেন মো. মাহাবুবুর রহমান, মো. ইউনুচ আলী, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. আ. কাদির, মো. বদর উদ্দিন প্রামানিক, মো. আতিকুর রহমান, মো. শফিকুল ইসলাম রতন, মো. শহিদউল্লাহ, মো. কাউছার আহম্মেদ, শাহনাজ আক্তার রুনা, মাহামুদা আল হুসনা, মো. হাবিবুর রহমান, মো. শাহাবুদ্দিন, মো. আবুল বাশার খন্দকার, মো. সাদ্দাম হোসেন, মো. আলী আকবর টুটন, মো. আবু তাহের, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. সরফরাজ খান প্রিন্স, মো. আমিনুল ইসলাম, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. হাফিজুর রহমান, মো. মারুফুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. জাহিদুল হক, মনি রানী, মো. মিজানুর রহমান, মো. আফজাল আহম্মেদ, মো. সাইফুল ইসলাম ও সাখাওয়াত।

আগে নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত থাকা ৩০ জনও নতুন নিয়োগে জায়গা পেয়েছেন। তারা হলেন মো. সাজ্জাদ হোসেন, মো. শাহ জালাল, মো. লিংকন মিয়া, মো. আজিজুল ইসলাম, মো. ওসমান গনি, মো. সাখাওয়াত হোসেন, মো. শাহজাহান ভূঁইয়া, মো. আবু রাসেল, মো. খায়রুল খান, মো. মাসুদুর রহমান, ফয়সাল আহম্মেদ, মো. মজিবুর রহমান, মো. জিয়াউর রহমান, মো. শহিদ মিয়া, হিমেল রানা, মো. আফজাল হোসেন, এমদাদুল হক, মো. নজরুল ইসলাম, রুবেল মিয়া, মো. শফিকুল ইসলাম, তোফাজ্জাল হোসেন, মো. রফিকুল ইসলাম, সজিব খন্দকার, মো. শরিফুল ইসলাম, মো. আব্দুর রহমান, মো. মোশারফ হোসেন, মো. আক্তার হোসেন, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. রিফাত আহম্মেদ ও রমেশ চন্দ্র হালদার। আগে ডেসপ্যাচ রাইডার পদে থাকা শাহিন মিয়াও নতুন করে নিয়োগ পেয়েছেন।

এক গ্রাম থেকে নিয়োগ যেভাবে হয়

আকবপুর গ্রাম থেকে গণনিয়োগের নেপথ্যে ছিলেন তাড়াইল উপজেলার ১নং তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাহেদ ভূঞা। তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম ছিলেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি)। আওয়ামী লীগ আমলে আবু জাহেদের সরবরাহ করা ১৫০ জনের সুপারিশকারী হিসেবে প্রয়াত এডিজি রফিকুল ইসলামের নাম লেখা রয়েছে।

পাসপোর্ট অফিসের একটি সূত্রের দাবি, আকবপুর থেকে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ১৫০ জনের মধ্যে অন্তত ১২০ জন এখন কোটিপতি। অন্যদিকে নিজ এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে চাকরি দেওয়ার সুবাদে বারবার তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আবু জাহেদ ভূঞা।

ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

সূত্র জানায়, কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন খানও এডিজি রফিকুলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। জয়নাল আবেদিন নানা সময়ে মৎস্যজীবী লীগ ও শ্রমিক লীগের বিভিন্ন পদে ছিলেন।

চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সঙ্গে কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ১৪ মে। এরপর দেড় মাস মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়, যা শেষ হয় ৩০ জুন। সুরক্ষা সেবা বিভাগ সাময়িকভাবে মেয়াদ বাড়ালেও এরপর আর নবায়ন করা হয়নি।

১ জুলাই ২০২৫ তারিখে অধিদপ্তর কান্ট্রি সিকিউরিটিকে লিখিতভাবে জানায়, এখন থেকে আর জনবল সরবরাহ করতে হবে না এবং সেদিন থেকে আর কোনো বেতনও দেওয়া হবে না।সে সময় কর্মরত ছিলেন ডেসপ্যাচ রাইডার ১১ জন, অফিস সহায়ক ৪৬ জন, নৈশপ্রহরী ৯১ জন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ৫৬ জনসহ আরও ১০ থেকে ১৫ জন।

ঘুষের বৈধতা দিয়ে বিনা বেতনে চাকরি

চিঠি দেওয়া হলেও বাস্তবে কান্ট্রি সিকিউরিটির জনবল বিদায় করেনি অধিদপ্তর। চুক্তি শেষ হওয়া সত্ত্বেও ১১ জন ডেসপ্যাচ রাইডার, ৪৬ জন অফিস সহায়ক, ৯১ জন নৈশপ্রহরী ও ৫৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অবৈধভাবে আগের কর্মস্থলেই রাখা হয়।

এই সময় সরকারি তহবিল থেকে তাদের বেতন দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে বেতনের বিকল্প হিসেবে প্রত্যেককে দৈনিক পাঁচটি করে দালালদের ফাইল সুপারিশের অঘোষিত অনুমতি দেওয়া হয়। ছয় মাস ধরে প্রতিটি কর্মী দৈনিক পাঁচটি করে অবৈধ ফাইল অনুমোদন দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করেন। নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় গত জানুয়ারিতে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ের সুপারিশ

আওয়ামী লীগের পুরো মেয়াদে জনবল সরবরাহ ‘কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর নামে হলেও বাস্তবে এর নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রভাবশালীদের হাতে। ওই সময়ের নিয়োগ নথিতে প্রতিটি জনবলের পাশে সুপারিশকারীর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কান্ট্রি সিকিউরিটির মাধ্যমে নিয়োগে সাবেক এডিজি রফিকুল ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুপারিশ ছিল। সেই তালিকা  হাতে এসেছে।

তালিকা অনুযায়ী, মো. আব্দুল হাই সরকারকে এমএলএসএস পদে নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সুপারিশ করা হয়। একই পদে মো. মঞ্জুর মোর্শেদের জন্য সুপারিশ করেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। মোসা. তানজিলার জন্য সুপারিশ করেন তৎকালীন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। মো. জাকির হোসেন ও আ. আওয়াল নামের দুজনের জন্য সুপারিশ আসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। মো. জিয়ারুল ইসলামকে এমএলএসএস পদে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএস মনির।

মো. বিপ্লব হোসেনের নিয়োগের সুপারিশ করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। নৈশপ্রহরী হিসেবে মো. মিজানুর রহমানের নিয়োগে সুপারিশ করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান। মাহবুব হোসেনকে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেন তৎকালীন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জয়নাল আবেদীনের সুপারিশে সুইপার পদে নিয়োগ পান মো. মাসুদ। অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মাসুদ রেজওয়ানের সুপারিশে এমএলএসএস পদে নিয়োগ পান মো. সোহরাব হোসেন, মো. আবু কাওছার ও মো. শরিফুল ইসলাম।

সুপারিশের তালিকায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও

মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সুপারিশের তালিকায় রয়েছেন খোদ পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এডিজি, পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকরাও। এডিজি আবু আসাদের সুপারিশে এমএলএসএস পদে আফসানা খাতুন, মো. হামিদুর রহমান ও মো. ওদিদুর রহমান; সুইপার পদে মো. আরিফুল ইসলাম লাভলু ও শ্রী পলাশ কুমার শীল; ডেসপ্যাচ রাইডার পদে হাফিজুর রহমান ও মো. হুমায়ুন কবির এবং নৈশপ্রহরী পদে মো. নাজমুল হাসান হৃদয়, মো. সাইফুল ইসলাম রুবেল, মো. ছলেমান ও মো. কবির হোসেন নিয়োগ পান।

সাবেক এডিজি ফজলুল হকের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. আবু বক্কর সিদ্দিক ওয়াজিদ, মো. নুরুন্নবী ও মো. জসিম উদ্দিন হাওলাদার; এমএলএসএস পদে হাবিবা আক্তার এবং সুইপার পদে রাজেশ লাল দাস নিয়োগ পান। আরেক অবসরপ্রাপ্ত এডিজি সিরাজ উদ্দিনের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. শহিদুল ইসলাম, মো. জাহিদুল ইসলাম ও মো. শামসুল আলম; এমএলএসএস পদে মো. মিজানুর রহমান; ডেসপ্যাচ রাইডার পদে নাজমুল হক এবং সুইপার পদে মো. আসলাম উদ্দিন নিয়োগ পান।

সদ্য সাবেক এডিজি সেলিনা বানুর সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ পান মো. লাবিবুল হাসান সুমন। সাবেক এডিজি মো. শাহজাহান আলীর সুপারিশে সুইপার পদে নিয়োগ পান মো. ইসমাইল ভূঁইয়া। পরিচালক শিহাব উদ্দিনের সুপারিশে এমএলএসএস পদে নিয়োগ পান মো. শরিফুল ইসলাম ও শ্রী দিলীপ কুমার। পরিচালক এ.কে. সরকারের সুপারিশে একই পদে মো. আকতার হোসেন সিকদার এবং পরিচালক রজি খন্দকারের সুপারিশে সুইপার পদে নিয়োগ পান লুৎফা। উপপরিচালক সাইদুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. ইকবাল হোসেন, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. নাঈমুর রহমান ও মো. মাহফুজুর রহমান এবং এমএলএসএস পদে মো. বাদল আলী নিয়োগ পান। উপপরিচালক শাহ মো. ওয়ালিউল্লাহর সুপারিশে সুইপার পদে দুলাল বাসফোর ও অনিল বাসফোর এবং উপপরিচালক বিপুল কুমারের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. সুমন মোল্লা নিয়োগ পান।

উপপরিচালক নাদিরার সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. ইমরান হোসাইন; উপপরিচালক জাহাঙ্গীরের সুপারিশে সুইপার পদে মো. শাহ জাহান আলী; উপপরিচালক রুহুল আমিনের সুপারিশে সুইপার মো. আক্তার হোসেন; উপপরিচালক আজিজুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী বিপ্লব কুমার দে; উপপরিচালক নজরুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী মো. মাসুদ করিম; উপপরিচালক মোতালেব হোসেনের সুপারিশে নৈশপ্রহরী মো. আরিফ হোসেন; উপপরিচালক মাজহারুল ইসলামের সুপারিশে এমএলএসএস পদে মো. আসাদুজ্জামান এবং সিস্টেম অ্যানালিস্ট নজরুল ইসলামের সুপারিশে সুইপার পদে শিবা দাস নিয়োগ পান।

সহকারী পরিচালক আতিকুল ইসলামের সুপারিশে এমএলএসএস পদে মো. ইকবাল মাসুদ; সহকারী পরিচালক মাসুদ রানার সুপারিশে একই পদে মো. আবু জাফর; সহকারী পরিচালক শাহজাহানের সুপারিশে ডেসপ্যাচ রাইডার পদে শ্রী রঞ্জন কুমার বিশ্বাস ও নৈশপ্রহরী মেহেদী হাসান নিয়োগ পান।

সহকারী পরিচালক আজিজুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী মো. মাসুদ রানা ও সুমন লস্কর; এমএলএসএস পদে মো. মশিউর রহমান এবং ডেসপ্যাচ রাইডার পদে রিফাত মোল্লা নিয়োগ পান। সহকারী পরিচালক মোজাম্মেল হকের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. আনোয়ার হোসেন এবং হিসাবরক্ষক তরিকুলের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ পান আজাহারুল ইসলাম।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও অভিযুক্তদের বক্তব্য

এসব বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিভাগ থেকে লিখিত আবেদন করতে বলা হয়। আবেদনের পর লিখিত উত্তর দেয় অধিদপ্তর। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগের বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সেই আলোকে সরকার কর্তৃক মনোনীত এবং নিবন্ধিত আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। গত ৭ জানুয়ারি অধিদপ্তরের চাহিদার ভিত্তিতে সরকার নির্ধারিত আউটসোর্সিং কোম্পানি ১৮৫ জন জনবল সরবরাহ করে।’

লিখিত উত্তরে বলা হয়েছে, ‘কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামের ১১২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার হয়েছে মর্মে যে প্রশ্ন করা হয়েছে তা সঠিক নয়। প্রশ্নে উল্লেখিত সাবেক এডিজি রফিকুল ইসলামের রেফারেন্সে কোনো কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে কি না সে বিষয়ে কোনো তথ্য অধিদপ্তরের নিকট নেই।’

এডিজি আবু আসাদের সুপারিশে নিয়োগের বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তর জানায়, এডিজি আবু আসাদের বিষয়ে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা সত্য নয়। তার রেফারেন্সে বা সুপারিশে কোনো আউটসোর্সিং জনবলের কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছে এমন কোনো তথ্য অধিদপ্তরের নিকট নেই।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালে মারা যান। তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাহেদ ভূঞার সঙ্গে  যোগাযোগ হয়। তিনি বলেন, প্রয়াত এডিজি রফিকুল ইসলাম সম্পর্কে তার ছোট ভাই। যখন তিনি দায়িত্বে ছিলেন, গ্রামের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি তার কাছে গেলে চাকরি দিতেন। তবে এ জন্য কারও কাছ থেকে এক টাকাও নেননি।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

কালিয়াকৈরে পল্লী উন্নয়ন দিবস পালন, বিতরণকে ঘিরে সাময়িক হট্টগোল

পাসপোর্ট অফিসে এক গ্রাম থেকে ১১২ জন নিয়োগের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৩:৫৭:৪০ অপরাহ্ন, সোমবার, ৬ জুলাই ২০২৬

কোনো ধরনের বিজ্ঞপ্তি ছাড়াই আউটসোর্সিংয়ের মাধ্যমে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তরে নিয়োগ পেয়েছেন ১৮৫ জন। এর মধ্যে ১১২ জনই কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামের বাসিন্দা। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মাত্র এক মাস আগে গোপনে এই নিয়োগ সম্পন্ন হয়। এমনকি লিখিত বা মৌখিক পরীক্ষা কিংবা কোনো প্রতিযোগিতামূলক যাচাইয়ের ব্যবস্থাও করা হয়নি।

চলতি বছরের জানুয়ারিতে ছয়টি ক্যাটাগরিতে এই ১৮৫ জনকে নিয়োগ দেওয়া হয়। এর মধ্যে পরিচ্ছন্নতাকর্মী ১০৪ জন, ডেসপ্যাচ রাইডার বা মেসেঞ্জার ৫৯ জন, লিফটম্যান ১০ জন, গার্ডেনার (মালি) ছয়জন, পাম্প অপারেটর চারজন এবং ইলেকট্রিশিয়ান দুজন।

ইলেকট্রিশিয়ানদের বেতন ধরা হয়েছে ২০ হাজার ২১২ টাকা। পাম্প অপারেটর ১৯ হাজার ৬৩৬ টাকা। গার্ডেনার ১৮ হাজার ৬৬০ টাকা। ডেসপ্যাচ রাইডার, লিফটম্যান ও পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা পাবেন ১৮ হাজার ১৮৯ টাকা করে।

যমুনা স্টার সেভের সঙ্গে গোপন চুক্তি

অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ‘যমুনা স্টার সেভ গার্ড সার্ভিসেস লিমিটেড’ নামের একটি কোম্পানির সঙ্গে বিপুল অর্থের বিনিময়ে গোপনে চুক্তি করে এই নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। ঘুষ লেনদেনসংক্রান্ত কয়েকটি ব্যাংক অ্যাকাউন্টের তথ্য হাতে এসেছে।

কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি, প্রতিযোগিতা বা পরীক্ষা ছাড়া এই নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া সমন্বয় করেছেন পাসপোর্ট অফিসের সহকারী পরিচালক সালাউদ্দিন এবং উপপরিচালক তারিক সালমান। তাদের কাজের তদারকি করেছেন পরিচালক শিহাব উদ্দিন। নিয়োগ প্রক্রিয়াও চূড়ান্ত করেছেন এই কর্মকর্তা।

এক গ্রাম থেকে ১১২ জন নিয়োগ

নিয়োগ পাওয়া ১৮৫ জনের মধ্যে ১১২ জনের বাড়ি কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামে। তাদের জাতীয় পরিচয়পত্রের ঠিকানা যাচাই করে এর প্রমাণ পায় ।

এই ১১২ জনের মধ্যে ৮৮ জনের নামের তালিকা বিশ্লেষণে দেখা গেছে, তারা বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে পাসপোর্ট অফিসে সুইপার (পরিচ্ছন্নতাকর্মী), এমএলএসএস, নৈশপ্রহরী ও ডেসপ্যাচ রাইডার পদে কর্মরত ছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় হওয়া চুক্তির মেয়াদ শেষের ছয় মাস পর নতুন নিয়োগেও ঘুরেফিরে তারাই জায়গা পেয়েছেন।

আগেও ছিলেন এক গ্রামের ১৫০ জন

বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের পুরো মেয়াদে পাসপোর্ট অফিসে জনবল সরবরাহ করেছে ‘কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড’। ওই সময়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যানারে কাজ করেছেন ২৫০ জন। তাদের মধ্যে ১৫০ জনের বাড়ি ছিল কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামে। সেই ১৫০ জনের মধ্য থেকে নতুন করে ১১২ জন নিয়োগ পেয়েছেন। আওয়ামী লীগের সময়ে ওই নিয়োগের নেপথ্যে ছিলেন তৎকালীন এডিজি রফিকুল ইসলাম।

তার সুপারিশে সে সময়ে সুইপার (পরিচ্ছন্নতাকর্মী) পদে নিয়োগ পাওয়া ২৮ জন এবারও অন্যান্য পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা হলেন মো. শরিফ মিয়া, মো. জাফর ফকির, মো. শরিফুল ইসলাম, মালা জমাদ্দার, সুরেশ ত্রিপুরা, মো. কামরুজ্জামান, উমার চরন পাল, আহম্মেদ শরিফ, মো. আব্দুল হান্নান ভূঁইয়া, মো. আবু হানিফ, মো. ইমরান খান, শ্রী সজল হরিজন, মো. মোস্তাফিজুর রহমান, বাভূরুল ইসলাম, মো. শহিদুল ইসলাম, উসমান গনি, মো. সেলিম চৌধুরী, মো. খাদেমুল ইসলাম সাগর, মো. বাবুল মিয়া, মো. জুবায়ের হোসেন, নূর মোহাম্মাদ শেখ সাদী, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. আব্দুল মান্নান, মো. এমদাদ হোসেন, মো. মহসিন, মো. সালাহ উদ্দিন, মো. নুর ইসলাম ও মো. আল আমিন।

আওয়ামী লীগ আমলে এমএলএসএস পদে থাকা ৩০ জনও নতুন করে বিভিন্ন পদে নিয়োগ পেয়েছেন। তারা হলেন মো. মাহাবুবুর রহমান, মো. ইউনুচ আলী, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. আ. কাদির, মো. বদর উদ্দিন প্রামানিক, মো. আতিকুর রহমান, মো. শফিকুল ইসলাম রতন, মো. শহিদউল্লাহ, মো. কাউছার আহম্মেদ, শাহনাজ আক্তার রুনা, মাহামুদা আল হুসনা, মো. হাবিবুর রহমান, মো. শাহাবুদ্দিন, মো. আবুল বাশার খন্দকার, মো. সাদ্দাম হোসেন, মো. আলী আকবর টুটন, মো. আবু তাহের, মো. বিল্লাল হোসেন, মো. সরফরাজ খান প্রিন্স, মো. আমিনুল ইসলাম, মো. আবুল কালাম আজাদ, মো. হাফিজুর রহমান, মো. মারুফুল ইসলাম, মো. আনোয়ার হোসেন, মো. জাহিদুল হক, মনি রানী, মো. মিজানুর রহমান, মো. আফজাল আহম্মেদ, মো. সাইফুল ইসলাম ও সাখাওয়াত।

আগে নৈশপ্রহরী হিসেবে কর্মরত থাকা ৩০ জনও নতুন নিয়োগে জায়গা পেয়েছেন। তারা হলেন মো. সাজ্জাদ হোসেন, মো. শাহ জালাল, মো. লিংকন মিয়া, মো. আজিজুল ইসলাম, মো. ওসমান গনি, মো. সাখাওয়াত হোসেন, মো. শাহজাহান ভূঁইয়া, মো. আবু রাসেল, মো. খায়রুল খান, মো. মাসুদুর রহমান, ফয়সাল আহম্মেদ, মো. মজিবুর রহমান, মো. জিয়াউর রহমান, মো. শহিদ মিয়া, হিমেল রানা, মো. আফজাল হোসেন, এমদাদুল হক, মো. নজরুল ইসলাম, রুবেল মিয়া, মো. শফিকুল ইসলাম, তোফাজ্জাল হোসেন, মো. রফিকুল ইসলাম, সজিব খন্দকার, মো. শরিফুল ইসলাম, মো. আব্দুর রহমান, মো. মোশারফ হোসেন, মো. আক্তার হোসেন, মো. শফিকুল ইসলাম, মো. রিফাত আহম্মেদ ও রমেশ চন্দ্র হালদার। আগে ডেসপ্যাচ রাইডার পদে থাকা শাহিন মিয়াও নতুন করে নিয়োগ পেয়েছেন।

এক গ্রাম থেকে নিয়োগ যেভাবে হয়

আকবপুর গ্রাম থেকে গণনিয়োগের নেপথ্যে ছিলেন তাড়াইল উপজেলার ১নং তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাহেদ ভূঞা। তার ছোট ভাই রফিকুল ইসলাম ছিলেন পাসপোর্ট অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি)। আওয়ামী লীগ আমলে আবু জাহেদের সরবরাহ করা ১৫০ জনের সুপারিশকারী হিসেবে প্রয়াত এডিজি রফিকুল ইসলামের নাম লেখা রয়েছে।

পাসপোর্ট অফিসের একটি সূত্রের দাবি, আকবপুর থেকে আওয়ামী লীগ আমলে নিয়োগ পাওয়া ১৫০ জনের মধ্যে অন্তত ১২০ জন এখন কোটিপতি। অন্যদিকে নিজ এলাকা থেকে বিপুলসংখ্যক মানুষকে চাকরি দেওয়ার সুবাদে বারবার তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান নির্বাচিত হয়েছেন আবু জাহেদ ভূঞা।

ছবি : এশিয়া পোস্ট গ্রাফিকস

সূত্র জানায়, কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. জয়নাল আবেদিন খানও এডিজি রফিকুলের অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ ছিলেন। জয়নাল আবেদিন নানা সময়ে মৎস্যজীবী লীগ ও শ্রমিক লীগের বিভিন্ন পদে ছিলেন।

চুক্তির মেয়াদ বৃদ্ধি

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের সঙ্গে কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেডের চুক্তির মেয়াদ শেষ হয় গত বছরের ১৪ মে। এরপর দেড় মাস মেয়াদ বৃদ্ধি করা হয়, যা শেষ হয় ৩০ জুন। সুরক্ষা সেবা বিভাগ সাময়িকভাবে মেয়াদ বাড়ালেও এরপর আর নবায়ন করা হয়নি।

১ জুলাই ২০২৫ তারিখে অধিদপ্তর কান্ট্রি সিকিউরিটিকে লিখিতভাবে জানায়, এখন থেকে আর জনবল সরবরাহ করতে হবে না এবং সেদিন থেকে আর কোনো বেতনও দেওয়া হবে না।সে সময় কর্মরত ছিলেন ডেসপ্যাচ রাইডার ১১ জন, অফিস সহায়ক ৪৬ জন, নৈশপ্রহরী ৯১ জন, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ৫৬ জনসহ আরও ১০ থেকে ১৫ জন।

ঘুষের বৈধতা দিয়ে বিনা বেতনে চাকরি

চিঠি দেওয়া হলেও বাস্তবে কান্ট্রি সিকিউরিটির জনবল বিদায় করেনি অধিদপ্তর। চুক্তি শেষ হওয়া সত্ত্বেও ১১ জন ডেসপ্যাচ রাইডার, ৪৬ জন অফিস সহায়ক, ৯১ জন নৈশপ্রহরী ও ৫৬ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ আরও ১০ থেকে ১৫ জনকে অবৈধভাবে আগের কর্মস্থলেই রাখা হয়।

এই সময় সরকারি তহবিল থেকে তাদের বেতন দেওয়ার কোনো সুযোগ ছিল না। ফলে বেতনের বিকল্প হিসেবে প্রত্যেককে দৈনিক পাঁচটি করে দালালদের ফাইল সুপারিশের অঘোষিত অনুমতি দেওয়া হয়। ছয় মাস ধরে প্রতিটি কর্মী দৈনিক পাঁচটি করে অবৈধ ফাইল অনুমোদন দিয়ে নিজেদের পকেট ভারী করেন। নতুন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে চুক্তি হয় গত জানুয়ারিতে।

সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়ের সুপারিশ

আওয়ামী লীগের পুরো মেয়াদে জনবল সরবরাহ ‘কান্ট্রি সিকিউরিটি সার্ভিসেস লিমিটেড’-এর নামে হলেও বাস্তবে এর নিয়ন্ত্রণ ছিল প্রভাবশালীদের হাতে। ওই সময়ের নিয়োগ নথিতে প্রতিটি জনবলের পাশে সুপারিশকারীর নাম স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। কান্ট্রি সিকিউরিটির মাধ্যমে নিয়োগে সাবেক এডিজি রফিকুল ছাড়াও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কার্যালয়সহ গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সুপারিশ ছিল। সেই তালিকা  হাতে এসেছে।

তালিকা অনুযায়ী, মো. আব্দুল হাই সরকারকে এমএলএসএস পদে নিয়োগের জন্য প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে সুপারিশ করা হয়। একই পদে মো. মঞ্জুর মোর্শেদের জন্য সুপারিশ করেন তৎকালীন রেলমন্ত্রী মুজিবুল হক। মোসা. তানজিলার জন্য সুপারিশ করেন তৎকালীন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। মো. জাকির হোসেন ও আ. আওয়াল নামের দুজনের জন্য সুপারিশ আসে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে। মো. জিয়ারুল ইসলামকে এমএলএসএস পদে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পিএস মনির।

মো. বিপ্লব হোসেনের নিয়োগের সুপারিশ করেন তৎকালীন স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু। নৈশপ্রহরী হিসেবে মো. মিজানুর রহমানের নিয়োগে সুপারিশ করেন বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী ফারুক খান। মাহবুব হোসেনকে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ দিতে সুপারিশ করেন তৎকালীন নৌমন্ত্রী শাজাহান খান। অর্থ মন্ত্রণালয়ের জয়নাল আবেদীনের সুপারিশে সুইপার পদে নিয়োগ পান মো. মাসুদ। অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক মাসুদ রেজওয়ানের সুপারিশে এমএলএসএস পদে নিয়োগ পান মো. সোহরাব হোসেন, মো. আবু কাওছার ও মো. শরিফুল ইসলাম।

সুপারিশের তালিকায় অধিদপ্তরের কর্মকর্তারাও

মন্ত্রী ও ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের পাশাপাশি সুপারিশের তালিকায় রয়েছেন খোদ পাসপোর্ট অধিদপ্তরের এডিজি, পরিচালক, উপপরিচালক ও সহকারী পরিচালকরাও। এডিজি আবু আসাদের সুপারিশে এমএলএসএস পদে আফসানা খাতুন, মো. হামিদুর রহমান ও মো. ওদিদুর রহমান; সুইপার পদে মো. আরিফুল ইসলাম লাভলু ও শ্রী পলাশ কুমার শীল; ডেসপ্যাচ রাইডার পদে হাফিজুর রহমান ও মো. হুমায়ুন কবির এবং নৈশপ্রহরী পদে মো. নাজমুল হাসান হৃদয়, মো. সাইফুল ইসলাম রুবেল, মো. ছলেমান ও মো. কবির হোসেন নিয়োগ পান।

সাবেক এডিজি ফজলুল হকের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. আবু বক্কর সিদ্দিক ওয়াজিদ, মো. নুরুন্নবী ও মো. জসিম উদ্দিন হাওলাদার; এমএলএসএস পদে হাবিবা আক্তার এবং সুইপার পদে রাজেশ লাল দাস নিয়োগ পান। আরেক অবসরপ্রাপ্ত এডিজি সিরাজ উদ্দিনের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. শহিদুল ইসলাম, মো. জাহিদুল ইসলাম ও মো. শামসুল আলম; এমএলএসএস পদে মো. মিজানুর রহমান; ডেসপ্যাচ রাইডার পদে নাজমুল হক এবং সুইপার পদে মো. আসলাম উদ্দিন নিয়োগ পান।

সদ্য সাবেক এডিজি সেলিনা বানুর সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ পান মো. লাবিবুল হাসান সুমন। সাবেক এডিজি মো. শাহজাহান আলীর সুপারিশে সুইপার পদে নিয়োগ পান মো. ইসমাইল ভূঁইয়া। পরিচালক শিহাব উদ্দিনের সুপারিশে এমএলএসএস পদে নিয়োগ পান মো. শরিফুল ইসলাম ও শ্রী দিলীপ কুমার। পরিচালক এ.কে. সরকারের সুপারিশে একই পদে মো. আকতার হোসেন সিকদার এবং পরিচালক রজি খন্দকারের সুপারিশে সুইপার পদে নিয়োগ পান লুৎফা। উপপরিচালক সাইদুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. ইকবাল হোসেন, মো. সাইফুল ইসলাম, মো. নাঈমুর রহমান ও মো. মাহফুজুর রহমান এবং এমএলএসএস পদে মো. বাদল আলী নিয়োগ পান। উপপরিচালক শাহ মো. ওয়ালিউল্লাহর সুপারিশে সুইপার পদে দুলাল বাসফোর ও অনিল বাসফোর এবং উপপরিচালক বিপুল কুমারের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. সুমন মোল্লা নিয়োগ পান।

উপপরিচালক নাদিরার সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. ইমরান হোসাইন; উপপরিচালক জাহাঙ্গীরের সুপারিশে সুইপার পদে মো. শাহ জাহান আলী; উপপরিচালক রুহুল আমিনের সুপারিশে সুইপার মো. আক্তার হোসেন; উপপরিচালক আজিজুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী বিপ্লব কুমার দে; উপপরিচালক নজরুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী মো. মাসুদ করিম; উপপরিচালক মোতালেব হোসেনের সুপারিশে নৈশপ্রহরী মো. আরিফ হোসেন; উপপরিচালক মাজহারুল ইসলামের সুপারিশে এমএলএসএস পদে মো. আসাদুজ্জামান এবং সিস্টেম অ্যানালিস্ট নজরুল ইসলামের সুপারিশে সুইপার পদে শিবা দাস নিয়োগ পান।

সহকারী পরিচালক আতিকুল ইসলামের সুপারিশে এমএলএসএস পদে মো. ইকবাল মাসুদ; সহকারী পরিচালক মাসুদ রানার সুপারিশে একই পদে মো. আবু জাফর; সহকারী পরিচালক শাহজাহানের সুপারিশে ডেসপ্যাচ রাইডার পদে শ্রী রঞ্জন কুমার বিশ্বাস ও নৈশপ্রহরী মেহেদী হাসান নিয়োগ পান।

সহকারী পরিচালক আজিজুল ইসলামের সুপারিশে নৈশপ্রহরী মো. মাসুদ রানা ও সুমন লস্কর; এমএলএসএস পদে মো. মশিউর রহমান এবং ডেসপ্যাচ রাইডার পদে রিফাত মোল্লা নিয়োগ পান। সহকারী পরিচালক মোজাম্মেল হকের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে মো. আনোয়ার হোসেন এবং হিসাবরক্ষক তরিকুলের সুপারিশে নৈশপ্রহরী পদে নিয়োগ পান আজাহারুল ইসলাম।

পাসপোর্ট অধিদপ্তর ও অভিযুক্তদের বক্তব্য

এসব বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তরের আনুষ্ঠানিক বক্তব্য জানতে চাইলে প্রতিষ্ঠানের জনসংযোগ বিভাগ থেকে লিখিত আবেদন করতে বলা হয়। আবেদনের পর লিখিত উত্তর দেয় অধিদপ্তর। সেখানে বলা হয়েছে, ‘আউটসোর্সিং পদ্ধতিতে জনবল নিয়োগের বিষয়ে সরকারের সুনির্দিষ্ট বিধান রয়েছে। সেই আলোকে সরকার কর্তৃক মনোনীত এবং নিবন্ধিত আউটসোর্সিং জনবল সরবরাহকারী প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে জনবল নিয়োগ দেওয়া হয়ে থাকে। গত ৭ জানুয়ারি অধিদপ্তরের চাহিদার ভিত্তিতে সরকার নির্ধারিত আউটসোর্সিং কোম্পানি ১৮৫ জন জনবল সরবরাহ করে।’

লিখিত উত্তরে বলা হয়েছে, ‘কিশোরগঞ্জের তাড়াইল উপজেলার আকবপুর গ্রামের ১১২ জনকে নিয়োগ দেওয়ার হয়েছে মর্মে যে প্রশ্ন করা হয়েছে তা সঠিক নয়। প্রশ্নে উল্লেখিত সাবেক এডিজি রফিকুল ইসলামের রেফারেন্সে কোনো কর্মচারী নিয়োগ হয়েছে কি না সে বিষয়ে কোনো তথ্য অধিদপ্তরের নিকট নেই।’

এডিজি আবু আসাদের সুপারিশে নিয়োগের বিষয়ে পাসপোর্ট অধিদপ্তর জানায়, এডিজি আবু আসাদের বিষয়ে যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে তা সত্য নয়। তার রেফারেন্সে বা সুপারিশে কোনো আউটসোর্সিং জনবলের কর্মচারী নিয়োগ পেয়েছে এমন কোনো তথ্য অধিদপ্তরের নিকট নেই।

পাসপোর্ট অধিদপ্তরের তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) রফিকুল ইসলাম ২০১৭ সালে মারা যান। তালজাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আবু জাহেদ ভূঞার সঙ্গে  যোগাযোগ হয়। তিনি বলেন, প্রয়াত এডিজি রফিকুল ইসলাম সম্পর্কে তার ছোট ভাই। যখন তিনি দায়িত্বে ছিলেন, গ্রামের যোগ্যতাসম্পন্ন ব্যক্তি তার কাছে গেলে চাকরি দিতেন। তবে এ জন্য কারও কাছ থেকে এক টাকাও নেননি।