সংবাদ শিরোনাম ::
চীনের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক থাকবে, তেমনি অন্য দেশের সঙ্গেও থাকবে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে জাপানি প্রতিনিধি দলের সাক্ষাৎ ফরিদপুরে শাশুড়ির সঙ্গে অনৈতিক সম্পর্কের অভিযোগে জামাই আটক পাংশায় ঝালমুড়ি খাওয়ানোর লোভ দেখিয়ে  শিশু ধ’র্ষনের অভিযোগে বৃদ্ধ গ্রেপ্তার মির্জাপুরে বিদ্যুৎ এর দাবিতো পল্লী বিদ্যুৎ অফিস ঘেরাও ও স্মারকলিপি প্রদান চাঁপাইনবাবগঞ্জ শিবগঞ্জে দুস্থদের মাঝে সেলাই মেশিন, সেমি ডিপ, নলকূপ, আলমারি ও ল্যাপটপ বিতরণ ২৫ কোটি বৃক্ষরোপণ কর্মসূচির অংশ হিসেবে কালুখালীতে বৃক্ষরোপণ কার্যক্রমের উদ্বোধন উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ৫ হাজার সশস্ত্র আনসার মোতায়েন ব্যাংকের টাকা লেনদেন নিয়ে নতুন নির্দেশনা, সার্কুলার জারি সালদা সীমান্তে চোরাই মোটরসাইকেল জব্দ

ঢাকার গুলিস্তানে সিলগালা ভেঙে পার্কিংয়ে সহস্রাধিক অবৈধ দোকান

ঢাকার গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া মার্কেট-২–এর বেজমেন্টে সিলগালা করা অবস্থাতেই কার পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে সহস্রাধিক অবৈধ দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। একইসঙ্গে মার্কেটের ভেতরের বিভিন্ন তলা, ফাঁকা স্থান, সিঁড়ির নিচে, লিফটের সামনে এবং বরাদ্দহীন দোকানেও দখল-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেজমেন্ট, ব্লকভিত্তিক অবৈধ দোকান এবং বরাদ্দহীন দখল মিলিয়ে পুরো মার্কেটজুড়ে অবৈধ দোকানের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। অথচ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে প্রকাশ্যে এই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কার্যকর কোনো দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মার্কেটের তিনটি ভবনের বেজমেন্টে প্রবেশমুখ সিলগালা থাকা সত্ত্বেও ভেতরে সিঁড়ির নিচ দিয়ে মালপত্র ঢুকিয়ে গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে রাতের আঁধারে দোকান নির্মাণ করা হয়। জাকের প্লাজাতে (ব্লক–সি) নির্মাণকাজ শেষ হয়ে ইতোমধ্যে কিছু দোকান চালু হয়েছে। সিটি প্লাজা (ব্লক–এ) ও নগর প্লাজাতে (ব্লক–বি) আরও কয়েকশ দোকানের ফিনিশিং চলছে। অনেক দোকানে শাটার বসানো, টাইলস লাগানো এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ নেওয়া শেষ হয়েছে।

বেজমেন্টের ভেতরে প্রবেশ করলে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা মূল নকশার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। সরু করিডর কেটে একের পর এক ছোট দোকান বসানো হয়েছে। কোথাও গাড়ি ওঠানামার র‌্যাম্প সংকুচিত হয়ে গেছে, কোথাও বায়ু চলাচলের পথ বন্ধ। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো চিহ্ন নেই। জরুরি বহির্গমন পথ পর্যন্ত দখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কাঠামোতে অগ্নিকাণ্ড বা ধসের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

অবৈধ দখল শুধু বেজমেন্টে সীমাবদ্ধ নয়—পুরো মার্কেটজুড়ে তা বিস্তৃত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই মাসে করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা সিটি প্লাজা (ব্লক–এ), নগর প্লাজা (ব্লক–বি) ও জাকের প্লাজা (ব্লক–সি) সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।

করপোরেশনের নকশা অনুযায়ী, ব্লক–এ’তে ১৭৬টি, ব্লক–বি’তে ১৭৬টি এবং ব্লক–সি’তে ১৭৯টি দোকান থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই বরাদ্দের বাইরে মার্কেটের অভ্যন্তরে পরিকল্পনাবহির্ভূতভাবে আরও অন্তত ২১০টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, মার্কেট সমিতির কিছু প্রভাবশালী নেতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগসাজশে সিঁড়ির নিচে, লিফটের সামনে, টয়লেট ভেঙে এবং ফাঁকা জায়গা দখল করে এসব দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। শুধু নির্মাণই নয়, এসব দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিক্রিও করা হয়েছে।

বিস্তারিত হিসাবে দেখা যায়, ব্লক–এ–এর নিচতলায় ৪১টি, দ্বিতীয়তলায় ২২টি, তৃতীয়তলায় ৮টি, চতুর্থতলায় ২টি এবং পঞ্চমতলায় ১৬টি অবৈধ দোকান রয়েছে। ব্লক–বি–এর নিচতলায় ৪০টি, দ্বিতীয়তলায় ১২টি, তৃতীয়তলায় ২টি, চতুর্থতলায় ৩টি এবং পঞ্চমতলায় ২টি দোকান পাওয়া গেছে। ব্লক–সি–এর নিচতলায় ৩৩টি এবং দ্বিতীয়তলায় ১৭টি অবৈধ দোকান শনাক্ত করা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, পরিকল্পনাবহির্ভূত দখল ধাপে ধাপে প্রতিটি তলায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং সময়ের সঙ্গে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, মার্কেটের ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টমতলা পর্যন্ত মোট ৬৪৮টি দোকান নির্মাণ করা হলেও এখনও সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কিন্তু বাস্তবে এসব দোকানের তালা ভেঙে দখল নেওয়া হয়েছে এবং গুদাম বা দোকান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো সরকারি রসিদ ছাড়াই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব তলায় বহু দোকানের সামনে তালা ভাঙার চিহ্ন রয়েছে এবং কিছু দোকানে পণ্য মজুত করে রাখা হয়েছে। এতে মূল মালিক প্রতিষ্ঠান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাইরে একটি সমান্তরাল বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, যেখানে কোনো ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর নেই।

টাইমলাইন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৭ নভেম্বর সিটি মার্কেটের নিচতলার একটি টয়লেট ভেঙে নতুন করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। এরপর ২৩ ডিসেম্বর অবৈধ নির্মাণ শুরু হলে ডিএসসিসির ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান চালাতে গেলে তাদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ২৪ ডিসেম্বর তিনটি ভবনের বেজমেন্ট সিলগালা করা হয়। কিন্তু সেই সিলগালা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সিঁড়ির নিচ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে রাতে শ্রমিক দিয়ে নির্মাণকাজ চালানো হয় এবং গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তা পূর্ণতা পায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনে বাইরে থেকে যাতে বোঝা না যায়, সেজন্য নির্মাণাধীন অংশ আড়াল করে রাখা হতো। একজন দোকান মালিক বলেন, ‘রাতভর কাজ চলত। ভোরের দিকে ঢেকে রাখা হতো।’ ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোবাশ্বের হাসান বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি সেখানে সিলগালা অবস্থায় অবৈধ দোকান নির্মাণ চলছে। এসবের ছবি ও ভিডিও আদালতে পেশ করা হবে।’

নগর ভবন ও মার্কেট সমিতি সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এই মার্কেটের বেজমেন্টসহ অবৈধ ৯১১টি দোকান উচ্ছেদ করেন। পরে আদালতের নির্দেশে পুনর্বাসনের বিষয় সামনে আসে। কিন্তু আইনি জটিলতা, তদারকির ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে দখলদাররা আবার সংগঠিত হয়।

২০২০ সালের উচ্ছেদের পর দেলু–ফিরোজ চক্র ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ওমর বিন আবদাল আজিজ তামিম, দোকান মালিক সমবায় সমিতির সহসভাপতি শাহ আলম চৌধুরী, জাকের মার্কেট সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শ্রমিক লীগের সহসভাপতি সহিদুর রহমান, মেয়র তাপসের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নাছিরুল হাসান সজীব, করপোরেশনের অঞ্চল-৪–এর তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা মিয়া জুনায়েদ আমিন, কর কর্মকর্তা আনিসুর রহমান এবং বাজার সুপারভাইজার হাবীবুর রহমানের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট করে পুনরায় অবৈধ দোকান নির্মাণ করে।

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও স্থানীয় নেতারা সরে গেলেও দেলু–ফিরোজ চক্র সক্রিয় থাকে। এবার নির্মাণ ব্যয়ের বড় অংশ বহন করেন ফিরোজ আহমেদ। তার সঙ্গে ছিলেন ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মো. মামুন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ মুকিতুল আহসান রঞ্জু, স্থানীয় ইউনিট জামায়াতের সভাপতি আলী হাসান সুমন, কাউন্সিলর মামুনের কর্মী মো. হানিফ বাচ্চু, তাজুল ইসলাম, মো. হানিফ, মালেক, সিদ্দিক, আউব নবী, ডালিম প্রমুখ। তাদের বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর দোকান বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে অঞ্চল–৪–এর বাজার সুপারভাইজার হাবীবুর রহমানকে অঞ্চল–৩–এ বৈদ্যুতিক লাইনম্যান পদে বদলি করা হয়। তবে ২৭ নভেম্বর তাকে আবার অঞ্চল–৪–এ ফিরিয়ে আনা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ফিরে এসে তিনি আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সালের অক্টোবর ও ডিসেম্বরে কয়েক দফা চেষ্টা হলেও তখন পুরোপুরি নির্মাণ শুরু করতে পারেনি চক্রটি। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে তারা সংগঠিতভাবে কাজ শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বড় আকারে নির্মাণ সম্পন্ন করে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নির্মিত দোকানগুলো গড়ে ৭ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো লিখিত নথি ছাড়াই নগদ অর্থ নেওয়ার পর দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বৈধতা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।

একজন ক্রেতা বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে পরে কাগজপত্র ঠিক হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি নিয়ে দোকান নিয়েছি।’

মার্কেটের সামনে ফুটপাতজুড়ে প্রায় ৪৫০টি দোকান বসানো হয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকেই দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সাবেক কাউন্সিলর মামুন বলেন, ‘আমি এর সঙ্গে জড়িত না।’ ফিরোজ আহমেদও কোনো দায় নিতে অস্বীকার করেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, ‘বর্তমানে এই মার্কেটসংক্রান্ত তিনটি মামলা উচ্চ আদালতে রিভিউ পর্যায়ে রয়েছে।’

সব মিলিয়ে উচ্ছেদের পর সিলগালা করা জায়গায় আবারও অবৈধ দোকান গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে ফুলবাড়িয়া মার্কেট-২–এ দখল বাণিজ্যের পুরোনো চক্র নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিষ্ক্রিয়তা, নজরদারির ঘাটতি এবং চলমান আইনি জটিলতার সুযোগেই এই দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

চীনের সঙ্গে যেমন সম্পর্ক থাকবে, তেমনি অন্য দেশের সঙ্গেও থাকবে

ঢাকার গুলিস্তানে সিলগালা ভেঙে পার্কিংয়ে সহস্রাধিক অবৈধ দোকান

আপডেট সময় ০৮:৪৩:০৪ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ৩০ জুন ২০২৬

ঢাকার গুলিস্তানের ফুলবাড়িয়া মার্কেট-২–এর বেজমেন্টে সিলগালা করা অবস্থাতেই কার পার্কিংয়ের জায়গা দখল করে সহস্রাধিক অবৈধ দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। একইসঙ্গে মার্কেটের ভেতরের বিভিন্ন তলা, ফাঁকা স্থান, সিঁড়ির নিচে, লিফটের সামনে এবং বরাদ্দহীন দোকানেও দখল-বাণিজ্যের বিস্তার ঘটেছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, বেজমেন্ট, ব্লকভিত্তিক অবৈধ দোকান এবং বরাদ্দহীন দখল মিলিয়ে পুরো মার্কেটজুড়ে অবৈধ দোকানের সংখ্যা হাজার ছাড়িয়েছে। অথচ মাত্র দুই মাসের ব্যবধানে প্রকাশ্যে এই নির্মাণকাজ সম্পন্ন হলেও দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের (ডিএসসিসি) কার্যকর কোনো দৃশ্যমান হস্তক্ষেপ নেই।

সরেজমিনে দেখা গেছে, মার্কেটের তিনটি ভবনের বেজমেন্টে প্রবেশমুখ সিলগালা থাকা সত্ত্বেও ভেতরে সিঁড়ির নিচ দিয়ে মালপত্র ঢুকিয়ে গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারিতে রাতের আঁধারে দোকান নির্মাণ করা হয়। জাকের প্লাজাতে (ব্লক–সি) নির্মাণকাজ শেষ হয়ে ইতোমধ্যে কিছু দোকান চালু হয়েছে। সিটি প্লাজা (ব্লক–এ) ও নগর প্লাজাতে (ব্লক–বি) আরও কয়েকশ দোকানের ফিনিশিং চলছে। অনেক দোকানে শাটার বসানো, টাইলস লাগানো এবং বৈদ্যুতিক সংযোগ নেওয়া শেষ হয়েছে।

বেজমেন্টের ভেতরে প্রবেশ করলে যে দৃশ্য দেখা যায়, তা মূল নকশার সঙ্গে সম্পূর্ণ সাংঘর্ষিক। সরু করিডর কেটে একের পর এক ছোট দোকান বসানো হয়েছে। কোথাও গাড়ি ওঠানামার র‌্যাম্প সংকুচিত হয়ে গেছে, কোথাও বায়ু চলাচলের পথ বন্ধ। অগ্নিনিরাপত্তা ব্যবস্থার কোনো চিহ্ন নেই। জরুরি বহির্গমন পথ পর্যন্ত দখল হয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, এ ধরনের কাঠামোতে অগ্নিকাণ্ড বা ধসের মতো দুর্ঘটনা ঘটলে হতাহতের ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।

অবৈধ দখল শুধু বেজমেন্টে সীমাবদ্ধ নয়—পুরো মার্কেটজুড়ে তা বিস্তৃত। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, গত জুলাই মাসে করপোরেশনের রাজস্ব বিভাগের কর্মকর্তারা সিটি প্লাজা (ব্লক–এ), নগর প্লাজা (ব্লক–বি) ও জাকের প্লাজা (ব্লক–সি) সরেজমিনে পরিদর্শন করেন।

করপোরেশনের নকশা অনুযায়ী, ব্লক–এ’তে ১৭৬টি, ব্লক–বি’তে ১৭৬টি এবং ব্লক–সি’তে ১৭৯টি দোকান থাকার কথা। কিন্তু বাস্তবে এই বরাদ্দের বাইরে মার্কেটের অভ্যন্তরে পরিকল্পনাবহির্ভূতভাবে আরও অন্তত ২১০টি দোকান নির্মাণ করা হয়েছে।

সূত্র বলছে, মার্কেট সমিতির কিছু প্রভাবশালী নেতা এবং স্থানীয় রাজনৈতিক ব্যক্তিদের যোগসাজশে সিঁড়ির নিচে, লিফটের সামনে, টয়লেট ভেঙে এবং ফাঁকা জায়গা দখল করে এসব দোকান গড়ে তোলা হয়েছে। শুধু নির্মাণই নয়, এসব দোকান ভাড়া দেওয়া হয়েছে এবং অনেক ক্ষেত্রে বিক্রিও করা হয়েছে।

বিস্তারিত হিসাবে দেখা যায়, ব্লক–এ–এর নিচতলায় ৪১টি, দ্বিতীয়তলায় ২২টি, তৃতীয়তলায় ৮টি, চতুর্থতলায় ২টি এবং পঞ্চমতলায় ১৬টি অবৈধ দোকান রয়েছে। ব্লক–বি–এর নিচতলায় ৪০টি, দ্বিতীয়তলায় ১২টি, তৃতীয়তলায় ২টি, চতুর্থতলায় ৩টি এবং পঞ্চমতলায় ২টি দোকান পাওয়া গেছে। ব্লক–সি–এর নিচতলায় ৩৩টি এবং দ্বিতীয়তলায় ১৭টি অবৈধ দোকান শনাক্ত করা হয়েছে। এই সংখ্যাগুলো দেখায়, পরিকল্পনাবহির্ভূত দখল ধাপে ধাপে প্রতিটি তলায় ছড়িয়ে পড়েছে এবং সময়ের সঙ্গে তা প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে।

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন সূত্রে জানা যায়, মার্কেটের ৬ষ্ঠ থেকে অষ্টমতলা পর্যন্ত মোট ৬৪৮টি দোকান নির্মাণ করা হলেও এখনও সেগুলো আনুষ্ঠানিকভাবে বরাদ্দ দেওয়া হয়নি। কিন্তু বাস্তবে এসব দোকানের তালা ভেঙে দখল নেওয়া হয়েছে এবং গুদাম বা দোকান হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে কোনো সরকারি রসিদ ছাড়াই ভাড়া আদায় করা হচ্ছে।

সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব তলায় বহু দোকানের সামনে তালা ভাঙার চিহ্ন রয়েছে এবং কিছু দোকানে পণ্য মজুত করে রাখা হয়েছে। এতে মূল মালিক প্রতিষ্ঠান ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের বাইরে একটি সমান্তরাল বাণিজ্যিক কাঠামো গড়ে উঠেছে, যেখানে কোনো ধরনের সরকারি নিয়ন্ত্রণ কার্যকর নেই।

টাইমলাইন বিশ্লেষণে দেখা যায়, গত ২৭ নভেম্বর সিটি মার্কেটের নিচতলার একটি টয়লেট ভেঙে নতুন করে দোকান নির্মাণের অভিযোগ ওঠে। এরপর ২৩ ডিসেম্বর অবৈধ নির্মাণ শুরু হলে ডিএসসিসির ম্যাজিস্ট্রেটরা অভিযান চালাতে গেলে তাদের ওপর হামলার অভিযোগ ওঠে। ২৪ ডিসেম্বর তিনটি ভবনের বেজমেন্ট সিলগালা করা হয়। কিন্তু সেই সিলগালা কার্যত অকার্যকর হয়ে পড়ে। পরবর্তী সময়ে সিঁড়ির নিচ দিয়ে ভেতরে প্রবেশ করে রাতে শ্রমিক দিয়ে নির্মাণকাজ চালানো হয় এবং গত জানুয়ারি ও ফেব্রুয়ারি মাসে তা পূর্ণতা পায়।

স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, দিনে বাইরে থেকে যাতে বোঝা না যায়, সেজন্য নির্মাণাধীন অংশ আড়াল করে রাখা হতো। একজন দোকান মালিক বলেন, ‘রাতভর কাজ চলত। ভোরের দিকে ঢেকে রাখা হতো।’ ডিএসসিসির প্রধান সম্পত্তি কর্মকর্তা মোবাশ্বের হাসান বলেন, ‘আমরা খবর পেয়েছি সেখানে সিলগালা অবস্থায় অবৈধ দোকান নির্মাণ চলছে। এসবের ছবি ও ভিডিও আদালতে পেশ করা হবে।’

নগর ভবন ও মার্কেট সমিতি সূত্রে জানা যায়, ২০২০ সালে দায়িত্ব নেওয়ার পর তৎকালীন মেয়র ব্যারিস্টার ফজলে নূর তাপস এই মার্কেটের বেজমেন্টসহ অবৈধ ৯১১টি দোকান উচ্ছেদ করেন। পরে আদালতের নির্দেশে পুনর্বাসনের বিষয় সামনে আসে। কিন্তু আইনি জটিলতা, তদারকির ঘাটতি এবং প্রশাসনিক দুর্বলতার সুযোগে দখলদাররা আবার সংগঠিত হয়।

২০২০ সালের উচ্ছেদের পর দেলু–ফিরোজ চক্র ডিএসসিসির ২৭ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ওমর বিন আবদাল আজিজ তামিম, দোকান মালিক সমবায় সমিতির সহসভাপতি শাহ আলম চৌধুরী, জাকের মার্কেট সমিতির সাবেক সাধারণ সম্পাদক ফিরোজ আহমেদ, বঙ্গবন্ধু শ্রমিক লীগের সহসভাপতি সহিদুর রহমান, মেয়র তাপসের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা নাছিরুল হাসান সজীব, করপোরেশনের অঞ্চল-৪–এর তৎকালীন রাজস্ব কর্মকর্তা মিয়া জুনায়েদ আমিন, কর কর্মকর্তা আনিসুর রহমান এবং বাজার সুপারভাইজার হাবীবুর রহমানের সমন্বয়ে সিন্ডিকেট করে পুনরায় অবৈধ দোকান নির্মাণ করে।

জুলাই অভ্যুত্থানের মধ্য দিয়ে দেশে রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর বর্তমানে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের কাউন্সিলর ও স্থানীয় নেতারা সরে গেলেও দেলু–ফিরোজ চক্র সক্রিয় থাকে। এবার নির্মাণ ব্যয়ের বড় অংশ বহন করেন ফিরোজ আহমেদ। তার সঙ্গে ছিলেন ৩৪ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক কাউন্সিলর ও বিএনপি নেতা মো. মামুন, ঢাকা মহানগর দক্ষিণ যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক সৈয়দ মুকিতুল আহসান রঞ্জু, স্থানীয় ইউনিট জামায়াতের সভাপতি আলী হাসান সুমন, কাউন্সিলর মামুনের কর্মী মো. হানিফ বাচ্চু, তাজুল ইসলাম, মো. হানিফ, মালেক, সিদ্দিক, আউব নবী, ডালিম প্রমুখ। তাদের বিরুদ্ধে ৫ আগস্টের পর দোকান বরাদ্দে অনিয়মের অভিযোগ উঠলে অঞ্চল–৪–এর বাজার সুপারভাইজার হাবীবুর রহমানকে অঞ্চল–৩–এ বৈদ্যুতিক লাইনম্যান পদে বদলি করা হয়। তবে ২৭ নভেম্বর তাকে আবার অঞ্চল–৪–এ ফিরিয়ে আনা হয়। সংশ্লিষ্টদের অভিযোগ, ফিরে এসে তিনি আবার সিন্ডিকেটের সঙ্গে যুক্ত হয়েছেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর, ২০২৫ সালের অক্টোবর ও ডিসেম্বরে কয়েক দফা চেষ্টা হলেও তখন পুরোপুরি নির্মাণ শুরু করতে পারেনি চক্রটি। তবে ২০২৫ সালের ডিসেম্বরের শেষ সপ্তাহ থেকে তারা সংগঠিতভাবে কাজ শুরু করে এবং অল্প সময়ের মধ্যে বড় আকারে নির্মাণ সম্পন্ন করে।

সংশ্লিষ্টদের তথ্য অনুযায়ী, নতুন নির্মিত দোকানগুলো গড়ে ৭ থেকে ২০ লাখ টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। অনেক ক্ষেত্রে ২০ লাখ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে। কোনো লিখিত নথি ছাড়াই নগদ অর্থ নেওয়ার পর দোকান বুঝিয়ে দেওয়া হচ্ছে এবং ভবিষ্যতে বৈধতা দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হচ্ছে।

একজন ক্রেতা বলেন, ‘আমাদের বলা হয়েছে পরে কাগজপত্র ঠিক হয়ে যাবে। তাই ঝুঁকি নিয়ে দোকান নিয়েছি।’

মার্কেটের সামনে ফুটপাতজুড়ে প্রায় ৪৫০টি দোকান বসানো হয়েছে। প্রতিটি দোকান থেকে প্রতিদিন ৩০০ থেকে ৪০০ টাকা করে চাঁদা তোলা হচ্ছে। এতে প্রতিদিন লক্ষাধিক টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট অনেকেই দায় এড়ানোর চেষ্টা করেছেন। সাবেক কাউন্সিলর মামুন বলেন, ‘আমি এর সঙ্গে জড়িত না।’ ফিরোজ আহমেদও কোনো দায় নিতে অস্বীকার করেছেন। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের আইন কর্মকর্তা রুহুল আমিন বলেন, ‘বর্তমানে এই মার্কেটসংক্রান্ত তিনটি মামলা উচ্চ আদালতে রিভিউ পর্যায়ে রয়েছে।’

সব মিলিয়ে উচ্ছেদের পর সিলগালা করা জায়গায় আবারও অবৈধ দোকান গড়ে ওঠার মধ্য দিয়ে ফুলবাড়িয়া মার্কেট-২–এ দখল বাণিজ্যের পুরোনো চক্র নতুন করে সক্রিয় হয়ে উঠেছে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের নিষ্ক্রিয়তা, নজরদারির ঘাটতি এবং চলমান আইনি জটিলতার সুযোগেই এই দখল প্রক্রিয়া অব্যাহত রয়েছে।