সংবাদ শিরোনাম ::
ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট, এনআইডি জালিয়াতি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে বাবুল কর্মকর্তার হোয়াটসঅ্যাপে মেসেজ দিয়েও আটকানো যায়নি অবৈধ সিগারেটের চালান মাদক অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মিজানের বিরুদ্ধে অনিয়ম ও ঘুষের অভিযোগ আদ্-দ্বীনের শিক্ষা কার্যক্রম অন্য হাসপাতালে চালাতে হবে দুবাইয়ে যেভাবে গ্রেফতার হলেন বেনজীর, সংসদে জানালেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী গাকৃবিতে বহিরাগত প্রো-ভিসি নিয়োগ প্রত্যাখ্যানের দাবিতে শিক্ষক সমিতির মানববন্ধন নওগাঁয় সম্পত্তি লিখে না দেওয়ায় বৃদ্ধ মাকে নির্যাতন দুই ছেলে গ্রেফতার গোপালগঞ্জে জেলা আইন-শৃঙ্খলা কমিটির মাসিক সভা অনুষ্ঠিত  মুকসুদপুরে শহিদুলের হত্যাকারীদের ফাঁসির দাবিতে মানববন্ধন  সারিকালিনগর (বালুরচর) গ্রামের বন্যা-দুর্ভোগ: ৩.২৫ কিমি আইডিভূক্ত রাস্তা পাকাকরণের দাবি
৫ম পর্বের ১ম পর্ব

বাংলা টিভির সামাদুল হককে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

বাংলা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হককে ঘিরে শেয়ার হস্তান্তর, অর্থ লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, ভাড়া বকেয়া, প্রতারণা এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা মহলে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন আদালত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাখিলকৃত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ মে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয় থেকে স্মারক নং ০০.০১.০০০০.৫০৫.০১.১৪০.২৩ জারি করা হয়। ওই নোটিশে বাংলা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনাবেচার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য গ্রহণের জন্য সৈয়দ সামাদুল হককে হাজির হতে বলা হয়। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাঁকে ৭ জুন ২০২৩ তারিখে দুদকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এরপর ২০২৪ সালে দুদকের বিশেষ তদন্ত শাখা ই/আর নং-৩৬/২০২৪ এর আওতায় সৈয়দ সামাদুল হকের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। নথি অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে বিশেষ তদন্ত শাখা বিষয়টি আমলে নেয় এবং পরবর্তীতে ৬ মে ২০২৪ তারিখে দুদকের উপপরিচালক মো. জাকারিয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সৈয়দ সামাদুল হকের সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের জন্য দুই সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। সেখানে তাঁর ঠিকানা হিসেবে তল্লাবাগ, সোবহানবাগ, ঢাকার দুটি ঠিকানা উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে বাংলা টিভির মালিকানা ও শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সামনে আসে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একাধিক আবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, বাংলা টিভি লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তর কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হক তাঁর মালিকানাধীন ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার কয়েকজন পরিচালকের কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে আরও ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয় এবং এর বিপরীতে কয়েক কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন না পাওয়ার কারণে লেনদেন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে বাংলা টিভির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহলের কিছু সদস্য অভিযোগ করেছেন যে, শেয়ার বিক্রির নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। এসব অভিযোগে কয়েকজন ব্যবসায়ীর নামও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ সামাদুল হকের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নথিতে পাওয়া যায়নি।

শুধু শেয়ার বিতর্ক নয়, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় বাংলা টিভির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত একটি ভবন নিয়েও বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়। একটি লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ভবনটির মালিকের সঙ্গে ভাড়াটিয়া হিসেবে সৈয়দ সামাদুল হকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভবন ছাড়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ভাড়া বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ বকেয়া রয়েছে এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় ও উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আরও দেখা যায়, উত্তরা পশ্চিম থানায় তার বিরুদ্ধে ২টি মামলা রয়েছে। উত্তরা পশ্চিম থানার মামলা নম্ব-১৪ তারিখ-14/11/2025 ইংম ধারা- 302/149/34 পেনাল কোড অপরটির মামলা নং-27, তারিখ-20/08/2025 ইং, ধারা-147/148/149/323/307/309/324/326/114/34 পেনাল কোড।

অন্যদিকে, সৈয়দ সামাদুল হক নিজেও দুদকের কাছে জমা দেওয়া এক লিখিত আবেদনে দাবি করেন যে, তিনি একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এবং দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯৯ সালে লন্ডনে বাংলা ভাষার স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘বাংলা টিভি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুদককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে দুদকের কাছে আবেদন করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা টিভিকে কেন্দ্র করে যে বিরোধগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে শেয়ার মালিকানা, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ এবং বিভিন্ন পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগ। এসব অভিযোগের অনেকগুলো বর্তমানে অনুসন্ধান বা বিচারাধীন হওয়ায় কোনো পক্ষকে দায়ী বা নির্দোষ বলার সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আলোচিত বিষয়গুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন হলে প্রকৃত তথ্য উদঘাটিত হবে এবং দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া নথিপত্রে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং অনুসন্ধানের তথ্যই বেশি পাওয়া গেছে; চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত খুব কম ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান।

সৈয়দ সামাদুল হক, বাংলা টিভির বর্তমান ও সাবেক পরিচালকবৃন্দ, অভিযোগকারী ব্যবসায়ীরা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর বক্তব্য ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ পেলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। বর্তমানে বিষয়গুলো অভিযোগ ও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে বলেই নথিপত্রে প্রতীয়মান হয়।
এদিকে দিনাজপুর-৩ আসনের বিএনপি নেতা, শিল্পপতি ও সমাজসেবক আলহাজ হাফিজুর রহমান সরকারও বাংলা টিভির শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ১৮ বছর আগে বাংলা টিভির শেয়ার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তাঁর নামে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শেয়ার হস্তান্তর বিলম্বের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা কারণ দেখানো হয়েছে। তারা দাবি করেন, বিনিয়োগকৃত অর্থও এখন পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হয়নি।

বাংলা টিভির এক কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, দাবি করেন যে হাফিজুর রহমান সরকারের নামে এখনো কোনো শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। তবে এই বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থান হলো—একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ প্রচার করছে। অতীতে দুদকে জমা দেওয়া লিখিত বক্তব্যেও তিনি অনুরূপ দাবি করেছিলেন।

সংশ্লিষ্ট শেয়ার হস্তান্তর চুক্তি, অর্থ লেনদেনের নথি, কোম্পানির রেজিস্টার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা ছাড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য এবং প্রামাণ্য নথিপত্র সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাংলা টিভি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়েরের তথ্য প্রকাশ করে। দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জানান, অনুসন্ধানে সৈয়দ সামাদুল হকের নামে ৪ কোটি ৫ লাখ ২১ হাজার ৭৫৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, অপরাধলব্ধ অর্থের মধ্যে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪ টাকা প্রকৃত অস্তিত্ব ছাড়াই বিভিন্ন উপায়ে রূপান্তরিত ও বৈধ হিসেবে প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে সংস্থাটি মনে করছে।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সৈয়দ সামাদুল হকের মোট সম্পদের পরিমাণ ১১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৭১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে বৈধ উৎস থেকে অর্জিত আয়ের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৭ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ টাকা। ফলে তাঁর ঘোষিত আয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে প্রায়

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

ভুয়া আন্তর্জাতিক ড্রাইভিং পারমিট, এনআইডি জালিয়াতি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছে বাবুল

৫ম পর্বের ১ম পর্ব

বাংলা টিভির সামাদুল হককে ঘিরে একের পর এক অভিযোগ

আপডেট সময় ০৫:২১:২৯ অপরাহ্ন, রবিবার, ১৪ জুন ২০২৬

বাংলা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হককে ঘিরে শেয়ার হস্তান্তর, অর্থ লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, ভাড়া বকেয়া, প্রতারণা এবং অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে নানা মহলে আলোচনা চলছে। বিভিন্ন আদালত, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষের দাখিলকৃত নথিপত্র পর্যালোচনায় দেখা যায়, তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, যদিও এসব অভিযোগের অনেকগুলোরই চূড়ান্ত বিচারিক নিষ্পত্তি এখনো হয়নি।

দুদকের নথি অনুযায়ী, ২০২৩ সালের ২৮ মে দুর্নীতি দমন কমিশনের প্রধান কার্যালয় থেকে স্মারক নং ০০.০১.০০০০.৫০৫.০১.১৪০.২৩ জারি করা হয়। ওই নোটিশে বাংলা টিভির ব্যবস্থাপনা পরিচালকসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে প্রতিষ্ঠানটির শেয়ার কেনাবেচার নামে বিপুল পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এবং অর্থ পাচারের অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য গ্রহণের জন্য সৈয়দ সামাদুল হককে হাজির হতে বলা হয়। অভিযোগের সুষ্ঠু অনুসন্ধানের স্বার্থে তাঁকে ৭ জুন ২০২৩ তারিখে দুদকের কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে বক্তব্য প্রদানের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল।

এরপর ২০২৪ সালে দুদকের বিশেষ তদন্ত শাখা ই/আর নং-৩৬/২০২৪ এর আওতায় সৈয়দ সামাদুল হকের দাখিলকৃত সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের উদ্যোগ নেয়। নথি অনুযায়ী, ২৯ এপ্রিল ২০২৪ তারিখে বিশেষ তদন্ত শাখা বিষয়টি আমলে নেয় এবং পরবর্তীতে ৬ মে ২০২৪ তারিখে দুদকের উপপরিচালক মো. জাকারিয়া স্বাক্ষরিত এক চিঠিতে সৈয়দ সামাদুল হকের সম্পদ বিবরণী যাচাইয়ের জন্য দুই সদস্যবিশিষ্ট অনুসন্ধান টিম গঠন করা হয়। সেখানে তাঁর ঠিকানা হিসেবে তল্লাবাগ, সোবহানবাগ, ঢাকার দুটি ঠিকানা উল্লেখ করা হয়।

অন্যদিকে বাংলা টিভির মালিকানা ও শেয়ার হস্তান্তর নিয়ে নতুন করে বিতর্ক সামনে আসে। তথ্য ও সম্প্রচার মন্ত্রণালয়ে জমা দেওয়া একাধিক আবেদনে দাবি করা হয়েছে যে, বাংলা টিভি লিমিটেডের শেয়ার হস্তান্তর কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে অনুমোদনের অপেক্ষায় রয়েছে। আবেদনপত্রে উল্লেখ করা হয়, প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হক তাঁর মালিকানাধীন ৩৭ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার কয়েকজন পরিচালকের কাছে হস্তান্তর করেন। পরবর্তীতে আরও ৬২ দশমিক ৫ শতাংশ শেয়ার হস্তান্তরের বিষয়ে আলোচনা হয় এবং এর বিপরীতে কয়েক কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়। তবে পরবর্তী সময়ে শেয়ার হস্তান্তরের অনুমোদন না পাওয়ার কারণে লেনদেন নিয়ে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে বলে আবেদনে উল্লেখ করা হয়।

এদিকে বাংলা টিভির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ী মহলের কিছু সদস্য অভিযোগ করেছেন যে, শেয়ার বিক্রির নামে বিপুল অঙ্কের অর্থ গ্রহণ করা হলেও পরবর্তীতে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। এসব অভিযোগে কয়েকজন ব্যবসায়ীর নামও উঠে এসেছে। তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে সৈয়দ সামাদুল হকের আনুষ্ঠানিক প্রতিক্রিয়া নথিতে পাওয়া যায়নি।

শুধু শেয়ার বিতর্ক নয়, রাজধানীর সিদ্ধেশ্বরী এলাকায় বাংলা টিভির কার্যালয় হিসেবে ব্যবহৃত একটি ভবন নিয়েও বিরোধের তথ্য পাওয়া যায়। একটি লিখিত অভিযোগে দাবি করা হয়েছে, ভবনটির মালিকের সঙ্গে ভাড়াটিয়া হিসেবে সৈয়দ সামাদুল হকের চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও ভবন ছাড়াকে কেন্দ্র করে বিরোধ সৃষ্টি হয়। অভিযোগকারীরা দাবি করেন, ভাড়া বাবদ বিপুল অঙ্কের অর্থ বকেয়া রয়েছে এবং বিষয়টি আদালত পর্যন্ত গড়িয়েছে। তবে এ অভিযোগের বিষয়ে আদালতের পূর্ণাঙ্গ রায় ও উভয় পক্ষের বক্তব্য যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

আরও দেখা যায়, উত্তরা পশ্চিম থানায় তার বিরুদ্ধে ২টি মামলা রয়েছে। উত্তরা পশ্চিম থানার মামলা নম্ব-১৪ তারিখ-14/11/2025 ইংম ধারা- 302/149/34 পেনাল কোড অপরটির মামলা নং-27, তারিখ-20/08/2025 ইং, ধারা-147/148/149/323/307/309/324/326/114/34 পেনাল কোড।

অন্যদিকে, সৈয়দ সামাদুল হক নিজেও দুদকের কাছে জমা দেওয়া এক লিখিত আবেদনে দাবি করেন যে, তিনি একজন ব্রিটিশ-বাংলাদেশি উদ্যোক্তা এবং দীর্ঘদিন ধরে গণমাধ্যম ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তিনি উল্লেখ করেন, ১৯৯৯ সালে লন্ডনে বাংলা ভাষার স্যাটেলাইট টেলিভিশন ‘বাংলা টিভি’ প্রতিষ্ঠা করেন এবং পরবর্তীতে বাংলাদেশে সম্প্রচার কার্যক্রম শুরু করেন। তাঁর দাবি, একটি স্বার্থান্বেষী মহল মিথ্যা তথ্য দিয়ে দুদককে বিভ্রান্ত করার চেষ্টা করছে। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ থেকে অব্যাহতি চেয়ে দুদকের কাছে আবেদন করেন।

বিশ্লেষকদের মতে, বাংলা টিভিকে কেন্দ্র করে যে বিরোধগুলো সামনে এসেছে, সেগুলোর মধ্যে রয়েছে শেয়ার মালিকানা, আর্থিক লেনদেন, সম্পদ বিবরণী, ভাড়া সংক্রান্ত বিরোধ এবং বিভিন্ন পক্ষের পারস্পরিক অভিযোগ। এসব অভিযোগের অনেকগুলো বর্তমানে অনুসন্ধান বা বিচারাধীন হওয়ায় কোনো পক্ষকে দায়ী বা নির্দোষ বলার সুযোগ নেই।

সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, আলোচিত বিষয়গুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত সম্পন্ন হলে প্রকৃত তথ্য উদঘাটিত হবে এবং দীর্ঘদিনের বিতর্কের অবসান ঘটতে পারে। তবে এখন পর্যন্ত পাওয়া নথিপত্রে অভিযোগ, পাল্টা অভিযোগ এবং অনুসন্ধানের তথ্যই বেশি পাওয়া গেছে; চূড়ান্ত বিচারিক সিদ্ধান্ত খুব কম ক্ষেত্রেই দৃশ্যমান।

সৈয়দ সামাদুল হক, বাংলা টিভির বর্তমান ও সাবেক পরিচালকবৃন্দ, অভিযোগকারী ব্যবসায়ীরা এবং সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলোর বক্তব্য ও আদালতের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত প্রকাশ পেলে বিষয়টি সম্পর্কে আরও সুস্পষ্ট চিত্র পাওয়া যাবে। বর্তমানে বিষয়গুলো অভিযোগ ও তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে বলেই নথিপত্রে প্রতীয়মান হয়।
এদিকে দিনাজপুর-৩ আসনের বিএনপি নেতা, শিল্পপতি ও সমাজসেবক আলহাজ হাফিজুর রহমান সরকারও বাংলা টিভির শেয়ার হস্তান্তর সংক্রান্ত বিষয়ে অভিযোগ উত্থাপন করেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, প্রায় ১৮ বছর আগে বাংলা টিভির শেয়ার ক্রয়ের উদ্দেশ্যে তিনি উল্লেখযোগ্য অঙ্কের অর্থ বিনিয়োগ করেছিলেন। তবে দীর্ঘ সময় অতিবাহিত হলেও তাঁর নামে শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি বলে অভিযোগ করা হয়েছে।

অভিযোগকারী পক্ষের ভাষ্য অনুযায়ী, শেয়ার হস্তান্তর বিলম্বের বিষয়ে বিভিন্ন সময়ে নানা কারণ দেখানো হয়েছে। তারা দাবি করেন, বিনিয়োগকৃত অর্থও এখন পর্যন্ত ফেরত দেওয়া হয়নি।

বাংলা টিভির এক কর্মকর্তা, যিনি নাম প্রকাশ না করার শর্তে কথা বলেন, দাবি করেন যে হাফিজুর রহমান সরকারের নামে এখনো কোনো শেয়ার হস্তান্তর সম্পন্ন হয়নি। তবে এই বক্তব্যের স্বাধীন যাচাই করা সম্ভব হয়নি।

অন্যদিকে, সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময় যে অভিযোগ উত্থাপিত হয়েছে, সেগুলোর বিষয়ে তাঁর অবস্থান হলো—একটি স্বার্থান্বেষী মহল তাঁর বিরুদ্ধে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অভিযোগ প্রচার করছে। অতীতে দুদকে জমা দেওয়া লিখিত বক্তব্যেও তিনি অনুরূপ দাবি করেছিলেন।

সংশ্লিষ্ট শেয়ার হস্তান্তর চুক্তি, অর্থ লেনদেনের নথি, কোম্পানির রেজিস্টার এবং নিয়ন্ত্রক সংস্থার অনুমোদন সংক্রান্ত কাগজপত্র পর্যালোচনা ছাড়া অভিযোগগুলোর সত্যতা সম্পর্কে নিশ্চিত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়। বিষয়টি নিয়ে সংশ্লিষ্ট সকল পক্ষের বক্তব্য এবং প্রামাণ্য নথিপত্র সংগ্রহের চেষ্টা অব্যাহত রয়েছে।

এদিকে ২০২৫ সালের ১৪ ডিসেম্বর দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বাংলা টিভি লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সৈয়দ সামাদুল হকের বিরুদ্ধে জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদ অর্জন ও মানিলন্ডারিংয়ের অভিযোগে মামলা দায়েরের তথ্য প্রকাশ করে। দুদকের মহাপরিচালক মো. আক্তার হোসেন নিয়মিত মিডিয়া ব্রিফিংয়ে জানান, অনুসন্ধানে সৈয়দ সামাদুল হকের নামে ৪ কোটি ৫ লাখ ২১ হাজার ৭৫৬ টাকার জ্ঞাত আয়বহির্ভূত সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে। এ অভিযোগে তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন আইন, ২০০৪-এর ২৭(১) ধারায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

দুদকের অভিযোগ অনুযায়ী, অপরাধলব্ধ অর্থের মধ্যে ৩ কোটি ৫৩ লাখ ৫৯ হাজার ৪৪ টাকা প্রকৃত অস্তিত্ব ছাড়াই বিভিন্ন উপায়ে রূপান্তরিত ও বৈধ হিসেবে প্রদর্শনের চেষ্টা করা হয়েছে বলে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে। এ ঘটনায় মানিলন্ডারিং প্রতিরোধ আইন, ২০১২-এর ৪(২) ও ৪(৩) ধারায় শাস্তিযোগ্য অপরাধ সংঘটিত হয়েছে বলে সংস্থাটি মনে করছে।

দুদকের অনুসন্ধান প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়, সৈয়দ সামাদুল হকের মোট সম্পদের পরিমাণ ১১ কোটি ৪১ লাখ ৬৬ হাজার ৭৭১ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর বিপরীতে বৈধ উৎস থেকে অর্জিত আয়ের পরিমাণ পাওয়া গেছে ৭ কোটি ৩৪ লাখ ১০ হাজার ৯০৮ টাকা। ফলে তাঁর ঘোষিত আয় ও অর্জিত সম্পদের মধ্যে প্রায়