সংবাদ শিরোনাম ::
প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী বরগুনায় অনুষ্ঠিত হলো ‘পার্টনার ফিল্ড স্কুল কংগ্রেস-২০২৬ বৃক্ষরোপণ করে বাসযোগ্য পৃথিবী গড়ার আহ্বান ডা. জুবাইদা রহমানের বনবিভাগের মালি বাউন্ডারি শহিদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ ভুয়া সনদে চাকরি করে সম্পদের পাহাড় গড়েছেন সাব-রেজিস্ট্রার বেলাল ফুলবাড়ী স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে পাঁচ মাসে ৩৬৫ শিশুর জনগ্রহণ, নরমাল ৩৪৭ এবং সিজার ১৮টি আর্জেন্টিনার ৬৮ বছরের পুরনো রেকর্ড ভাঙলেন মেসি আদ-দ্বীন গল্প-কাহিনী লিখেছে, তাদের জবাবে সন্তুষ্ট নই : স্বাস্থ্যমন্ত্রী চাঁপাইনবাবগঞ্জে মাদক সংক্রান্ত সালিশের সংঘর্ষে বল্লমের আঘাতে নিহত ১, আহত প্রায় ১০ চাঁপাইনবাবগঞ্জে ২০০ গ্রাম গাঁজাসহ মাদক ব্যবসায়ী গ্রেফতার

বনবিভাগের মালি বাউন্ডারি শহিদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

এক সময় বন বিভাগের নার্সারিতে দৈনিক পাঁচ কেজি গমের বিনিময়ে কাজ করতেন তিনি। বন বিভাগের একজন সাধারণ মালি থেকে এখন তিনি শত শত একর বনভূমি দখলের অভিযোগে আলোচিত প্রভাবশালী ব্যক্তি। স্থানীয়দের কাছে তার পরিচয় “বাউন্ডারি শহীদ”। পুরো নাম শহীদুল ইসলাম শহীদ। অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহের ভালুকা রেঞ্জে বনভূমি দখলের প্রায় প্রতিটি বড় ঘটনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার নাম।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, শিল্পপতি, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলের হয়ে বনভূমি দখল, বাউন্ডারি নির্মাণ এবং দখলকৃত জমি বিক্রির মাধ্যমে কয়েক দশকে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন শহীদ। ভালুকা রেঞ্জের সংরক্ষিত বনভূমিতে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তার বড় অংশের দখল প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই শহীদুল ইসলাম।

বন বিভাগের মালি থেকে ‘দখল সাম্রাজ্যের’ নিয়ন্ত্রক

জন্মসূত্রে গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম পরে ভালুকার হবিরবাড়ি মৌজায় এসে বসতি গড়েন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শুরুতে তিনি বন বিভাগের নার্সারিতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দৈনিক মজুরি হিসেবে পেতেন পাঁচ কেজি গম।

সেই শহীদই এখন কোটি কোটি টাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান, খামার, জমি ও বিলাসবহুল গাড়ির মালিক। ভালুকা রেঞ্জসংলগ্ন এলাকায় তার রয়েছে আলিশান বাড়ি, একাধিক কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। সিডস্টোর বাজার এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন সুপ্তি সোয়েটার ও সুপ্তি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং যদিও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। সীডস্টোরের পূর্ব পাশে প্রায় ১ হাজার একর বনভূমি দখল করে গ্রীণ অরণ্য পার্ক বানিয়েছেন তিনি। এছাড়া সুপ্তি ওয়েল লিমিটেড, হাজী এন্টারপ্রাইজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে। স্থানীয়দের দাবি, ঢাকাতেও রয়েছে তার একাধিক বাড়ি ও বিপুল সম্পদ।

কীভাবে হলেন ‘বাউন্ডারি শহীদ’

স্থানীয়দের ভাষ্য, বনভূমি দখলের ক্ষেত্রে শহীদের প্রধান কাজ ছিল প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জমি ম্যানেজ করে দেওয়া। যখনই কোনো বনভূমি দখল করে বাউন্ডারি নির্মাণের প্রয়োজন হতো, তখনই প্রথম ডাক পড়ত তার। আবার অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেই লোকজন নিয়ে বনভূমি দখল করে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দখল দক্ষতা থেকেই স্থানীয়দের মুখে মুখে তার নাম হয়ে যায় বাউন্ডারি শহীদ।

বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, নব্বইয়ের দশকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বনভূমি দখলের মাধ্যমে তার উত্থান শুরু হয়। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাব, সন্ত্রাসী বাহিনী ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পুরো এলাকায় এক ধরনের অঘোষিত আধিপত্য গড়ে তোলেন তিনি।

প্রভাবশালীদের বন দখলের ‘মাঠ ব্যবস্থাপক’

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, ভালুকা রেঞ্জে যেসব প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসায়ী বনভূমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তাদের অনেকের জমি দখল ও সীমানা নির্ধারণের পেছনে কাজ করেছেন শহীদ।

স্থানীয় সূত্র বলছে, শহীদের এক ডাকে কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে যেত। বনভূমি দখলের সময় মাঠে নেতৃত্ব দিতেন তার সহযোগীরা। কেউ বাধা দিলে হামলা, ভয়ভীতি ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এক বন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন

দিনে যদি কোনো বনকর্মী শহীদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, রাতে তার ওপর হামলা হয়। অনেককে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এ কারণেই অনেকে তার নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পান।

বন বিভাগের নথিতেও ‘রহস্যজনক ভুল’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহীদের বিরুদ্ধে একাধিক বন মামলা থাকলেও বেশিরভাগ মামলাতেই রহস্যজনক ভুল রয়েছে। কোথাও নাম ভুল, কোথাও বাবার নাম ভুল, আবার কোথাও ঠিকানা বা দাগ নম্বরে ভুল করা হয়েছে।

বন বিভাগের পুরোনো নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩-৯৪ সালে প্রথম বন মামলার আসামি হন শহীদ। পরে আরও কয়েকটি মামলা হয়। তবে মামলার কাগজপত্রে শহীদুল ইসলাম এর জায়গায় এস. ইসলাম, বাবার নামের ভুল বানান কিংবা ঠিকানাগত ত্রুটির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি আইনি সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশের কারণেই এসব ভুল ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে।

শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় শহীদ ও তার দুই ছেলে

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে ভালুকা থানার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় ছিল শহীদের নাম। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখল ও অস্ত্র সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৮ সালে কোরবানির ঈদের দিন আকবর মেম্বার হত্যা মামলার প্রধান আসামিও করা হয়েছিল তাকে। থানায় গ্রেফতার হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলা থেকে বেরিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শহীদের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ভালুকা মডেল থানায় চাঁদাবাজি, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চুরি ও অবৈধ অনুপ্রবেশসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া অস্ত্র আইনের একটি মামলাও রয়েছে। নরায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ ভালুকা মডেল থানায় ও নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানা মিলে ১২টি মামলা রয়েছে।

তার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুনের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। পুলিশে তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ ভালুকা মডেল থানা, ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানা, গাজীপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও গাজীপুর সদর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

মামলাগুলোতে দাঙ্গা, মারধর, গুরুতর জখম, হত্যা চেষ্টা, পথরোধ, অবৈধ আটক, সরকারি কাজে বাধা, নারীর শ্লীলতাহানি, চুরি, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অনধিকার প্রবেশ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি মামলায় অভিন্ন উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটন ও সহযোগিতার ধারাও যুক্ত রয়েছে।

তার অপর ছেলে মাহমুদুল হাসান মুরাদেরও রয়েছে একাধিক মামলা। তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ ভালুকা মডেল থানায় মামলাগুলোতে হত্যা চেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, গুরুতর জখম, চুরি, ভাঙচুর, অনধিকার প্রবেশ, পথরোধ, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে চারটি মামলা রয়েছে

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি সব সময় প্রভাবশালী

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থানও বলেছেন শহীদ। একসময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও স্থানীয় প্রভাবশালী এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বর্তমানে তিনি ভালুকা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুনও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় বিএনপির একাংশ অভিযোগ করছে, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে এখনো বিভিন্ন দখল, চাঁদাবাজি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা।

বন হারাচ্ছে ভালুকা

ময়মনসিংহ বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ী বিটের আওতাধীন ৯টি মৌজায় মোট বনভূমির পরিমাণ ৭ হাজার ১৭ একর। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৪৪ জন ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪ হাজার ৭৯৮ একর বনভূমি জবরদখল করে রেখেছেন বলে বন বিভাগের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বনভূমির জমির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দখলচক্রও শক্তিশালী হয়েছে। আর সেই দখলচক্রের অন্যতম প্রধান নাম “বাউন্ডারি শহীদ।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শহিদুল ইসলাম ওরফে বাউন্ডারি শহীদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলে তার ভাতিজা পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে নিজেকে একটি মিডিয়া হাউসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দেন এবং বিষয়টি বসে সমাধান (সেটেল) করার প্রস্তাব দেন।

একই অভিযোগের বিষয়ে শহীদের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া অনলাইন মাধ্যমেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে শহীদের আরেক ছেলে মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগের বিষয়টি তাকে অবহিত করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি তার বাবার সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন বলে জানান। পরে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

বন বিভাগের বক্তব্য

ভালুকা রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার সাদিকুজ্জামান বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর সংরক্ষিত বনভূমিতে নতুন করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ হতে দেখিনি। বর্তমানে যেসব স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই অনেক আগে নির্মিত হয়েছে।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম বলেন, বাউন্ডারি শহিদ ও জঙ্গল মনির দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল ও ধ্বংসের অভিযোগে আলোচিত। তাদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বন বিভাগের জনবল সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া বনভূমি দখল প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একাধিক বন কর্মকর্তা ও কর্মচারী হামলা, মারধর এবং লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন।

পুলিশের বক্তব্য

ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, শহীদুল ইসলাম ও তার দুই ছেলে স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে তারা সাধারণত এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান এবং পরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে আসেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল। এছাড়া যৌথবাহিনীর অভিযানের আশঙ্কায় তারা দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন বলেও জানা যায়। তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে—এমন তথ্যও বিভিন্ন সূত্রে শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করবে।

 

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

প্রশাসনিক কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে: প্রধানমন্ত্রী

বনবিভাগের মালি বাউন্ডারি শহিদের বিরুদ্ধে অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ

আপডেট সময় ০৪:১৯:৫৯ অপরাহ্ন, বুধবার, ১০ জুন ২০২৬

এক সময় বন বিভাগের নার্সারিতে দৈনিক পাঁচ কেজি গমের বিনিময়ে কাজ করতেন তিনি। বন বিভাগের একজন সাধারণ মালি থেকে এখন তিনি শত শত একর বনভূমি দখলের অভিযোগে আলোচিত প্রভাবশালী ব্যক্তি। স্থানীয়দের কাছে তার পরিচয় “বাউন্ডারি শহীদ”। পুরো নাম শহীদুল ইসলাম শহীদ। অভিযোগ রয়েছে, ময়মনসিংহের ভালুকা রেঞ্জে বনভূমি দখলের প্রায় প্রতিটি বড় ঘটনার সঙ্গেই জড়িয়ে আছে তার নাম।

বন বিভাগ ও স্থানীয় সূত্র বলছে, শিল্পপতি, রাজনৈতিক ব্যক্তি ও প্রভাবশালী মহলের হয়ে বনভূমি দখল, বাউন্ডারি নির্মাণ এবং দখলকৃত জমি বিক্রির মাধ্যমে কয়েক দশকে হাজার কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়েছেন শহীদ। ভালুকা রেঞ্জের সংরক্ষিত বনভূমিতে যেসব শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে, তার বড় অংশের দখল প্রক্রিয়ায় মাঠপর্যায়ে নেতৃত্ব দিয়েছেন এই শহীদুল ইসলাম।

বন বিভাগের মালি থেকে ‘দখল সাম্রাজ্যের’ নিয়ন্ত্রক

জন্মসূত্রে গফরগাঁওয়ের বাসিন্দা শহীদুল ইসলাম পরে ভালুকার হবিরবাড়ি মৌজায় এসে বসতি গড়েন। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, জীবনের শুরুতে তিনি বন বিভাগের নার্সারিতে অস্থায়ী শ্রমিক হিসেবে কাজ করতেন। দৈনিক মজুরি হিসেবে পেতেন পাঁচ কেজি গম।

সেই শহীদই এখন কোটি কোটি টাকার শিল্পপ্রতিষ্ঠান, খামার, জমি ও বিলাসবহুল গাড়ির মালিক। ভালুকা রেঞ্জসংলগ্ন এলাকায় তার রয়েছে আলিশান বাড়ি, একাধিক কারখানা ও বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। সিডস্টোর বাজার এলাকায় প্রায় ২০ বিঘা জমির ওপর গড়ে তুলেছেন সুপ্তি সোয়েটার ও সুপ্তি প্রিন্টিং অ্যান্ড প্যাকেজিং যদিও বর্তমানে বন্ধ রয়েছে। সীডস্টোরের পূর্ব পাশে প্রায় ১ হাজার একর বনভূমি দখল করে গ্রীণ অরণ্য পার্ক বানিয়েছেন তিনি। এছাড়া সুপ্তি ওয়েল লিমিটেড, হাজী এন্টারপ্রাইজসহ একাধিক প্রতিষ্ঠানের মালিকানা রয়েছে তার ও পরিবারের সদস্যদের নামে। স্থানীয়দের দাবি, ঢাকাতেও রয়েছে তার একাধিক বাড়ি ও বিপুল সম্পদ।

কীভাবে হলেন ‘বাউন্ডারি শহীদ’

স্থানীয়দের ভাষ্য, বনভূমি দখলের ক্ষেত্রে শহীদের প্রধান কাজ ছিল প্রভাবশালী ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে জমি ম্যানেজ করে দেওয়া। যখনই কোনো বনভূমি দখল করে বাউন্ডারি নির্মাণের প্রয়োজন হতো, তখনই প্রথম ডাক পড়ত তার। আবার অনেক ক্ষেত্রে তিনি নিজেই লোকজন নিয়ে বনভূমি দখল করে দিতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এই দখল দক্ষতা থেকেই স্থানীয়দের মুখে মুখে তার নাম হয়ে যায় বাউন্ডারি শহীদ।

বন বিভাগের একটি সূত্র জানায়, নব্বইয়ের দশকে বিএনপি ক্ষমতায় আসার পর থেকেই বনভূমি দখলের মাধ্যমে তার উত্থান শুরু হয়। ধীরে ধীরে রাজনৈতিক প্রভাব, সন্ত্রাসী বাহিনী ও প্রশাসনিক যোগাযোগ ব্যবহার করে পুরো এলাকায় এক ধরনের অঘোষিত আধিপত্য গড়ে তোলেন তিনি।

প্রভাবশালীদের বন দখলের ‘মাঠ ব্যবস্থাপক’

বন বিভাগের কর্মকর্তাদের দাবি, ভালুকা রেঞ্জে যেসব প্রভাবশালী শিল্পগোষ্ঠী ও ব্যবসায়ী বনভূমি দখল করে শিল্পপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন, তাদের অনেকের জমি দখল ও সীমানা নির্ধারণের পেছনে কাজ করেছেন শহীদ।

স্থানীয় সূত্র বলছে, শহীদের এক ডাকে কয়েকশ মানুষ জড়ো হয়ে যেত। বনভূমি দখলের সময় মাঠে নেতৃত্ব দিতেন তার সহযোগীরা। কেউ বাধা দিলে হামলা, ভয়ভীতি ও অস্ত্র প্রদর্শনের ঘটনাও ঘটেছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

এক বন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন

দিনে যদি কোনো বনকর্মী শহীদের বিরুদ্ধে কথা বলেন, রাতে তার ওপর হামলা হয়। অনেককে অস্ত্র দেখিয়ে ভয় দেখানোর ঘটনাও ঘটেছে। এ কারণেই অনেকে তার নাম উচ্চারণ করতেও ভয় পান।

বন বিভাগের নথিতেও ‘রহস্যজনক ভুল’

অনুসন্ধানে জানা গেছে, শহীদের বিরুদ্ধে একাধিক বন মামলা থাকলেও বেশিরভাগ মামলাতেই রহস্যজনক ভুল রয়েছে। কোথাও নাম ভুল, কোথাও বাবার নাম ভুল, আবার কোথাও ঠিকানা বা দাগ নম্বরে ভুল করা হয়েছে।

বন বিভাগের পুরোনো নথি অনুযায়ী, ১৯৯৩-৯৪ সালে প্রথম বন মামলার আসামি হন শহীদ। পরে আরও কয়েকটি মামলা হয়। তবে মামলার কাগজপত্রে শহীদুল ইসলাম এর জায়গায় এস. ইসলাম, বাবার নামের ভুল বানান কিংবা ঠিকানাগত ত্রুটির কারণে অনেক ক্ষেত্রেই তিনি আইনি সুবিধা পেয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, বন বিভাগের একাংশের সঙ্গে যোগসাজশের কারণেই এসব ভুল ইচ্ছাকৃতভাবে করা হয়েছে।

শীর্ষ সন্ত্রাসীর তালিকায় শহীদ ও তার দুই ছেলে

স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, ২০০০ সালে ভালুকা থানার শীর্ষ সন্ত্রাসীদের তালিকায় ছিল শহীদের নাম। তার বিরুদ্ধে হত্যা, চাঁদাবাজি, দখল ও অস্ত্র সংক্রান্ত একাধিক অভিযোগ রয়েছে। ১৯৯৮ সালে কোরবানির ঈদের দিন আকবর মেম্বার হত্যা মামলার প্রধান আসামিও করা হয়েছিল তাকে। থানায় গ্রেফতার হলেও পরবর্তীতে রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে মামলা থেকে বেরিয়ে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

শহীদের বিরুদ্ধে ময়মনসিংহের ভালুকা মডেল থানায় চাঁদাবাজি, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন, চুরি ও অবৈধ অনুপ্রবেশসহ একাধিক মামলা রয়েছে। এছাড়া অস্ত্র আইনের একটি মামলাও রয়েছে। নরায়ণগঞ্জের ফতুল্লা থানায় প্রতারণা, বিশ্বাসভঙ্গ ও চাঁদাবাজির অভিযোগে আরেকটি মামলা দায়ের করা হয়েছিল। তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ ভালুকা মডেল থানায় ও নারায়ণগঞ্জ ফতুল্লা থানা মিলে ১২টি মামলা রয়েছে।

তার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুনের বিরুদ্ধেও রয়েছে একাধিক মামলা। পুলিশে তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ ভালুকা মডেল থানা, ঢাকার উত্তরা পশ্চিম থানা, গাজীপুর মহানগর ম্যাজিস্ট্রেট আদালত ও গাজীপুর সদর থানায় একাধিক মামলা রয়েছে।

মামলাগুলোতে দাঙ্গা, মারধর, গুরুতর জখম, হত্যা চেষ্টা, পথরোধ, অবৈধ আটক, সরকারি কাজে বাধা, নারীর শ্লীলতাহানি, চুরি, অগ্নিসংযোগ, ভাঙচুর, অনধিকার প্রবেশ এবং ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ আনা হয়েছে। এছাড়া কয়েকটি মামলায় অভিন্ন উদ্দেশ্যে সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটন ও সহযোগিতার ধারাও যুক্ত রয়েছে।

তার অপর ছেলে মাহমুদুল হাসান মুরাদেরও রয়েছে একাধিক মামলা। তার বিরুদ্ধে ময়মনসিংহ ভালুকা মডেল থানায় মামলাগুলোতে হত্যা চেষ্টা, অগ্নিসংযোগ, গুরুতর জখম, চুরি, ভাঙচুর, অনধিকার প্রবেশ, পথরোধ, মারধর, ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং সংঘবদ্ধভাবে অপরাধ সংঘটনের অভিযোগে চারটি মামলা রয়েছে

আওয়ামী লীগ থেকে বিএনপি সব সময় প্রভাবশালী

স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাকর্মীদের দাবি, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে নিজের অবস্থানও বলেছেন শহীদ। একসময় বিএনপির রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও আওয়ামী লীগ সরকারের সময়েও স্থানীয় প্রভাবশালী এমপি-মন্ত্রীদের সঙ্গে তার ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল। বর্তমানে তিনি ভালুকা উপজেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক। তার ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুনও কেন্দ্রীয় স্বেচ্ছাসেবক দলের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। স্থানীয় বিএনপির একাংশ অভিযোগ করছে, দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে এখনো বিভিন্ন দখল, চাঁদাবাজি ও ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ করছেন তারা।

বন হারাচ্ছে ভালুকা

ময়মনসিংহ বন বিভাগের সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, ভালুকা রেঞ্জের হবিরবাড়ী বিটের আওতাধীন ৯টি মৌজায় মোট বনভূমির পরিমাণ ৭ হাজার ১৭ একর। এর মধ্যে ২ হাজার ৩৪৪ জন ব্যক্তি ও বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান প্রায় ৪ হাজার ৭৯৮ একর বনভূমি জবরদখল করে রেখেছেন বলে বন বিভাগের নথিতে উল্লেখ রয়েছে।

স্থানীয়দের ভাষ্য, বনভূমির জমির দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দখলচক্রও শক্তিশালী হয়েছে। আর সেই দখলচক্রের অন্যতম প্রধান নাম “বাউন্ডারি শহীদ।

অভিযুক্তদের বক্তব্য

অভিযোগের বিষয়ে বক্তব্য জানতে শহিদুল ইসলাম ওরফে বাউন্ডারি শহীদের মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি। পরে তার হোয়াটসঅ্যাপ নম্বরে ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলে তার ভাতিজা পরিচয়ে এক ব্যক্তি ফোন করে নিজেকে একটি মিডিয়া হাউসের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে পরিচয় দেন এবং বিষয়টি বসে সমাধান (সেটেল) করার প্রস্তাব দেন।

একই অভিযোগের বিষয়ে শহীদের ছেলে মোস্তাফিজুর রহমান মামুনের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার ব্যবহৃত মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়া যায়। এছাড়া অনলাইন মাধ্যমেও তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

এদিকে শহীদের আরেক ছেলে মুরাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে অভিযোগের বিষয়টি তাকে অবহিত করা হয়। সাংবাদিক পরিচয় পাওয়ার পর তিনি তার বাবার সঙ্গে কথা বলে এ বিষয়ে বক্তব্য দেবেন বলে জানান। পরে ব্যস্ততার কথা বলে তিনি ফোন সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

বন বিভাগের বক্তব্য

ভালুকা রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার সাদিকুজ্জামান বলেন, আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর সংরক্ষিত বনভূমিতে নতুন করে কোনো স্থাপনা নির্মাণ হতে দেখিনি। বর্তমানে যেসব স্থাপনা রয়েছে, সেগুলোর অধিকাংশই অনেক আগে নির্মিত হয়েছে।

ময়মনসিংহ বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা কাজী মো. নুরুল করিম বলেন, বাউন্ডারি শহিদ ও জঙ্গল মনির দীর্ঘদিন ধরে বনভূমি দখল ও ধ্বংসের অভিযোগে আলোচিত। তাদের বিরুদ্ধে অর্ধশতাধিক মামলা রয়েছে। তবে স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী হওয়ায় তাদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণে নানা প্রতিবন্ধকতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে।

তিনি আরও বলেন, বন বিভাগের জনবল সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় নজরদারি ও আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণও অনেক ক্ষেত্রে কঠিন হয়ে পড়ে। এছাড়া বনভূমি দখল প্রতিরোধে দায়িত্ব পালন করতে গিয়ে একাধিক বন কর্মকর্তা ও কর্মচারী হামলা, মারধর এবং লাঞ্ছনার শিকার হয়েছেন।

পুলিশের বক্তব্য

ভালুকা মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মো. জাহিদুল ইসলাম বলেন, শহীদুল ইসলাম ও তার দুই ছেলে স্থানীয়ভাবে বেশ প্রভাবশালী হিসেবে পরিচিত। তাদের বিরুদ্ধে কোনো মামলা হলে তারা সাধারণত এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে চলে যান এবং পরে আদালত থেকে জামিন নিয়ে এলাকায় ফিরে আসেন। অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়েও তাদের বিরুদ্ধে একাধিক অভিযোগ জমা পড়েছিল। এছাড়া যৌথবাহিনীর অভিযানের আশঙ্কায় তারা দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন বলেও জানা যায়। তাদের কাছে অবৈধ অস্ত্র রয়েছে—এমন তথ্যও বিভিন্ন সূত্রে শোনা যাচ্ছে। এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট তথ্য-প্রমাণ পাওয়া গেলে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী প্রয়োজনীয় অভিযান পরিচালনা করবে।