বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (সিভিল) পদে দায়িত্ব পালন করছেন মো. শরিফুল ইসলাম। চাকরি জীবনে তার নানা অনিয়ম-দুর্নীতির পর এবার অভিযোগ উঠেছে মুক্তিযুদ্ধের ভুয়া সনদ দিয়ে তিনি চাকরি নিয়েছিলেন বেবিচকে। কক্সবাজার বিমানবন্দর সম্প্রসারণ প্রকল্পের ১৫০ কোটি টাকা আত্মসাতের অভিযোগে দুর্নীতি দমন কমিশনের করা মামলার আসামিও তিনি। তবুও বেবিচকে রয়েছেন বহালে।
বেবিচক সূত্র জানায়, নানা অনিয়ম ও দুর্নীতি থাকার পরও ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর এ প্রকৌশলী কর্মকর্তাকে নির্বাহী প্রকৌশলী থেকে পদোন্নতি দিয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী করা হয়। এ পদোন্নতিতেও তিনি অঢেল অর্থ ঢেলেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সাম্প্রতিক সময়ে ভুয়া সনদে চাকরি নেওয়ার বিষয়টি সামনে এলে তাকে নিয়ে অস্বস্তিতে পড়েন বেবিচকের কর্মকর্তারাই। এর মধ্যে তার বিরুদ্ধে তদন্ত ও অনুসন্ধান শুরু হয়েছে।
জানা যায়, প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদ ব্যবহার করে চাকরি নিয়েছেন, তা জানিয়ে তদন্ত করতে এরই মধ্যে বেবিচক চেয়ারম্যানের দপ্তরে লিখিত আবেদন জমা পড়েছে। একই অভিযোগে বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) অভিযোগ জমা দেওয়া হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে সংস্থাগুলো আলাদা তদন্ত শুরু করেছে।
অবশ্য বেবিচকের সদস্য (প্রশাসন) এস এম লাবলুর রহমান বলেন, ‘প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ আমাদের নজরে এসেছে। বিষয়টি নিয়ে অনুসন্ধান ও তদন্তের সিদ্ধান্ত হয়েছে। প্রতিবেদন পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’
বিভিন্ন নথি থেকে দেখা যায়, প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম ২০০১ সালের ২৪ জানুয়ারি বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষে (বেবিচক) যোগ দেন। ওই সময়ে তিনি তার বাবা মোশারফ হোসেনের নামে ইস্যু করা মুক্তিযোদ্ধা সনদ ব্যবহার করে মুক্তিযোদ্ধা কোটায় চাকরি পান। তার বাড়ি গোপালগঞ্জে। তবে ওই জেলার গেজেটভুক্ত ৬৪০ জন মুক্তিযোদ্ধার তালিকায় শরিফুলের বাবার নাম নেই। এতে সনদের বৈধতা ও সত্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
বেবিচকের একজন কর্মকর্তা বলেন, শরিফুল ইসলাম চাকরি নেওয়ার সময় তার বাবা মোশারফ হোসেনের নামে ১৯৯৯ সালের ২৬ অক্টোবর ইস্যু করা একটি মুক্তিযোদ্ধা সনদ জমা দেন। ওই সনদে তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ও মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্রীয় কমান্ড কাউন্সিলের চেয়ারম্যান আহাদ চৌধুরীর স্বাক্ষর রয়েছে। কিন্তু মুক্তিযোদ্ধা সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সাধারণত এ ধরনের সনদে প্রধানমন্ত্রীর স্বাক্ষর থাকে না।
বেবিচক সূত্র বলছে, শুধু জাল সনদে চাকরিই নয়, কর্মজীবনেও তার বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ রয়েছে। ২০১৭ সালে ১ কোটি ৭০ লাখ টাকা ব্যয়ে তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলীর কার্যালয়ের প্রধান ফটক ও বিশ্রামাগার নির্মাণে আর্থিক অনিয়মের অভিযোগে তার বিরুদ্ধে বিভাগীয় মামলাও হয়েছিল। ওই মামলায় সরকারি অর্থ অপচয়ের সঙ্গে সম্পৃক্ততা পাওয়ায় তাকে সতর্ক করা হয়েছিল। ২০২০ সালে ২০১৫-১৬ ও ২০১৬-১৭ অর্থবছরে সিভিল এভিয়েশনের বিভিন্ন প্রকল্প, মেইনটেনেন্স ও কেনাকাটায় অনিয়মের অভিযোগ দুদকের অনুসন্ধান টিম তাকে তলব করেছিল। ২০২১-২২ অর্থবছরে রাজধানীর কাওলায় বেবিচক কোয়ার্টারের দুটি ভবন রক্ষণাবেক্ষণ কার্যক্রমে আড়াই কোটি টাকায় নয়ছয় করার অভিযোগ ছিল এ প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে। সর্বশেষ কক্সবাজার বিমানবন্দরের উন্নয়নকাজে দুর্নীতির অভিযোগে দুদক তার বিরুদ্ধে মামলা করে। ঠিকাদারদের ফাইল আটকে সুবিধা নেওয়ার অভিযোগ তার চাকরি জীবনে আলোচনার অংশ।
সূত্র জানায়, দুর্নীতির অভিযোগে তার বিরুদ্ধে তদন্ত চলাকালে প্রকৌশলী শরিফুল ইসলাম সম্প্রতি অস্ট্রেলিয়ায় পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেছিলেন। তবে বিমানবন্দর থেকে তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
অভিযোগগুলোর বিষয়ে বক্তব্য নিতে প্রকৌশলী শরিফুল ইসলামের মোবাইল ফোনে একাধিকবার কল দিলেও তিনি তা কেটে দেন। পরে তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ উল্লেখ করে মোবাইল ফোনে এ বিষয়ে তার বক্তব্য চাওয়া হয়। তাতেও তিনি সাড়া দেননি।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















