পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিনের নিয়োগকে কেন্দ্র করে প্রশাসনিক অঙ্গন ও বিভিন্ন মহলে আলোচনা-সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা ও সরকারি দায়িত্ব পালনের ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে তাকে গুরুত্বপূর্ণ এ পদে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, অন্যদিকে তার পদোন্নতি ও পদায়নকে ঘিরে একটি কর্মচারী সংগঠন প্রকাশ্যে আপত্তি ও প্রতিবাদ জানিয়েছে। ফলে জ্যেষ্ঠ এই প্রশাসনিক কর্মকর্তাকে কেন্দ্র করে সরকারি প্রশাসন, আমলাতন্ত্র এবং সাম্প্রতিক রাজনৈতিক বাস্তবতার নানা প্রশ্ন নতুন করে আলোচনায় এসেছে।
সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের প্রশাসন ক্যাডারের ১৫তম ব্যাচের কর্মকর্তা। তিনি ১৯৯৫ সালে প্রশাসন ক্যাডারে যোগদান করেন এবং পরবর্তী সময়ে মাঠ প্রশাসন থেকে শুরু করে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় দায়িত্ব পালন করেন। কর্মজীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে তিনি সহকারী কমিশনার, উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। দীর্ঘ সময় মাঠ প্রশাসনে দায়িত্ব পালন করার অভিজ্ঞতা তাকে প্রশাসনিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন স্তরের সঙ্গে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার সুযোগ দিয়েছে বলে সরকারি কর্মকর্তাদের একটি অংশ মনে করে।
প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বিভাগে যুগ্মসচিব ও অতিরিক্ত সচিব হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। পরবর্তীকালে জাতীয় উন্নয়ন প্রশাসন একাডেমির রেক্টর (সচিব) হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। সরকারি চাকরিজীবনে এসব পদে দায়িত্ব পালন তাকে প্রশাসনের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের সঙ্গে সম্পৃক্ত করে। প্রশাসনের বিভিন্ন পর্যায়ে কাজ করার অভিজ্ঞতার কারণে তাকে একজন অভিজ্ঞ কর্মকর্তা হিসেবে বিবেচনা করা হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
২০২৬ সালের ২৯ জানুয়ারি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে তাকে পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। সচিব পদে তার নিয়োগকে সরকারের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা হয়। পানি সম্পদ ব্যবস্থাপনা, নদী শাসন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচ এবং জলসম্পদ সংরক্ষণসহ দেশের গুরুত্বপূর্ণ খাতগুলোর নীতিগত ও প্রশাসনিক দায়িত্ব এ মন্ত্রণালয়ের ওপর বর্তায়। ফলে সচিব হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের মাধ্যমে ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিন দেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশাসনিক খাতের নেতৃত্বে আসেন।
তবে তার পদোন্নতি ও গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে নিয়োগের বিষয়টি সর্বমহলে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য হয়নি। ২০২৫ সালের জুলাই মাসে বৈষম্যবিরোধী কর্মচারী ঐক্য ফোরাম নামে একটি সংগঠন তার এবং একই ব্যাচের কর্মকর্তা সিরাজুল নূর চৌধুরীর পদোন্নতির বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে প্রতিবাদ জানায়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে গণমাধ্যমে পাঠানো এক বিবৃতিতে অভিযোগ করা হয় যে, উভয় কর্মকর্তা অতীত সরকারের সুবিধাভোগী ছিলেন এবং তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন করা উচিত হবে না।
সংগঠনটির বিবৃতিতে আরও বিভিন্ন গুরুতর অভিযোগ উত্থাপন করা হয়। সেখানে বলা হয়, সংশ্লিষ্ট দুই কর্মকর্তা ছাত্রজীবনে ছাত্রলীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং পরবর্তী সময়ে সরকারি চাকরিতে দায়িত্ব পালনকালে রাজনৈতিকভাবে সুবিধাভোগী হিসেবে কাজ করেছেন। একইসঙ্গে তাদের বিরুদ্ধে অর্থপাচার, মানিলন্ডারিং এবং বিতর্কিত আর্থিক কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগও উত্থাপন করা হয়। তবে সংগঠনটির বিবৃতিতে উল্লিখিত এসব অভিযোগের পক্ষে কোনো বিচারিক রায়, সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন বা আদালত কর্তৃক প্রমাণিত নথির উল্লেখ করা হয়নি।
বিবৃতিতে আরও দাবি করা হয় যে, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা অতীত সরকারের প্রভাবশালী ব্যক্তিদের ঘনিষ্ঠ ছিলেন এবং প্রশাসনে তাদের অবস্থান ব্যবহার করে বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছেন। সংগঠনটির ভাষ্যমতে, এ ধরনের কর্মকর্তাদের গুরুত্বপূর্ণ পদে পদায়ন প্রশাসনিক সংস্কার এবং জবাবদিহিতার প্রত্যাশার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। তারা সরকারের কাছে এ ধরনের নিয়োগ পুনর্বিবেচনার আহ্বান জানায়।
প্রতিবাদী সংগঠনটির বিবৃতিতে ব্যবহৃত ভাষা ছিল অত্যন্ত কঠোর। সেখানে কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে নানা রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অভিযোগ আনা হয় এবং দাবি করা হয় যে, তাদের পদোন্নতি প্রশাসনে বিতর্কের জন্ম দিতে পারে। সংগঠনটির নেতারা বলেন, প্রশাসনে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হলে নিয়োগ ও পদোন্নতির ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অতীত ভূমিকা গভীরভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।
তবে প্রশাসনের একাধিক পর্যবেক্ষক মনে করেন, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগ উত্থাপিত হওয়া এবং সেই অভিযোগ আইনগতভাবে প্রমাণিত হওয়া এক বিষয় নয়। তাদের মতে, সরকারি কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে বিভিন্ন সময়ে নানা ধরনের অভিযোগ ওঠে, কিন্তু সেসব অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ের জন্য নিরপেক্ষ তদন্ত এবং আইনগত প্রক্রিয়া অনুসরণ করা প্রয়োজন। অভিযোগ উত্থাপনের ভিত্তিতে কাউকে দোষী সাব্যস্ত করা আইনের শাসনের নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিনকে ঘিরে আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো তার দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা। প্রশাসনের বিভিন্ন স্তরে কাজ করার ফলে তিনি সরকারি সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন, উন্নয়ন প্রকল্প পরিচালনা এবং মাঠ প্রশাসনের বাস্তবতা সম্পর্কে প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তার সমর্থকদের মতে, এ ধরনের অভিজ্ঞতা একজন সচিবের জন্য গুরুত্বপূর্ণ সম্পদ। তারা মনে করেন, দীর্ঘ কর্মজীবনে বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালন করাই তার পদোন্নতির অন্যতম ভিত্তি।
অন্যদিকে সমালোচকদের একটি অংশ মনে করে, কেবল প্রশাসনিক অভিজ্ঞতা নয়, কর্মকর্তাদের অতীত কর্মকাণ্ড সম্পর্কেও জনমনে আস্থা থাকা প্রয়োজন। তাদের মতে, উচ্চপদে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা এবং জনবিশ্বাস অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। ফলে কোনো কর্মকর্তাকে ঘিরে বিতর্ক তৈরি হলে সেটি প্রশাসনের ভাবমূর্তির ওপরও প্রভাব ফেলতে পারে।
বাংলাদেশের প্রশাসনিক কাঠামোয় সচিব পদ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রণালয়ের প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে সচিব নীতিনির্ধারণ, বাজেট ব্যবস্থাপনা, প্রকল্প বাস্তবায়ন এবং সরকারি সিদ্ধান্ত কার্যকরে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ফলে এ ধরনের পদে নিয়োগকে ঘিরে জনস্বার্থ সংশ্লিষ্ট আলোচনা হওয়া অস্বাভাবিক নয়। বিশেষ করে রাজনৈতিক পরিবর্তন, প্রশাসনিক সংস্কার কিংবা জবাবদিহিতা নিয়ে জাতীয় পর্যায়ে আলোচনা চলমান থাকলে সচিব পর্যায়ের নিয়োগ আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করে।
ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিনের ক্ষেত্রে সেটিই ঘটেছে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। একদিকে তার দীর্ঘ কর্মজীবন এবং সরকারি প্রশাসনে বিভিন্ন দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা রয়েছে, অন্যদিকে তার পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য আপত্তি এবং রাজনৈতিকভাবে সংবেদনশীল অভিযোগও সামনে এসেছে। ফলে তার নাম প্রশাসনিক আলোচনার একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হয়ে ওঠে।
এদিকে সংশ্লিষ্ট মহলের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকলে সেগুলো যাচাইয়ের দায়িত্ব সংশ্লিষ্ট তদন্ত সংস্থা ও রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের। অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ রয়েছে। আবার অভিযোগ প্রমাণিত না হলে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার অধিকার ও সুনাম রক্ষার বিষয়টিও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণে দায়িত্বশীল মহল অভিযোগ ও প্রমাণের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য বজায় রাখার ওপর গুরুত্বারোপ করে থাকে।
পানি সম্পদ মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব গ্রহণের পর ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিনের সামনে দেশের জলসম্পদ ব্যবস্থাপনা সংক্রান্ত বহু গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ রয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব, নদীভাঙন, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, সেচব্যবস্থা উন্নয়ন এবং পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনায় আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারসহ বিভিন্ন বিষয়ে কার্যকর প্রশাসনিক নেতৃত্ব প্রয়োজন। ফলে তার দায়িত্ব পালনের সক্ষমতা ও কর্মদক্ষতা ভবিষ্যতে মূল্যায়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র হয়ে উঠবে।
সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ দেখিয়েছে যে, বাংলাদেশে উচ্চপদস্থ আমলাদের নিয়োগ ও পদোন্নতি কেবল প্রশাসনিক বিষয় হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকে না; অনেক সময় তা রাজনৈতিক, সামাজিক এবং জনমতের আলোচনার অংশ হয়ে ওঠে। ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিনকে ঘিরে সৃষ্টি হওয়া বিতর্কও সেই বৃহত্তর বাস্তবতার একটি উদাহরণ। তার সমর্থকরা অভিজ্ঞতা ও প্রশাসনিক যোগ্যতার কথা তুলে ধরছেন, আর সমালোচকরা অতীত ভূমিকা ও উত্থাপিত অভিযোগগুলোর বিষয়ে প্রশ্ন তুলছেন।
ফলে ড. এ কে এম শাহাবুদ্দিনকে ঘিরে বর্তমান আলোচনা মূলত দুটি সমান্তরাল বাস্তবতাকে সামনে নিয়ে এসেছে। একদিকে তিনি দীর্ঘ প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা, যিনি দেশের গুরুত্বপূর্ণ একটি মন্ত্রণালয়ের সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। অন্যদিকে তার পদোন্নতি ও পদায়ন নিয়ে একটি সংগঠন প্রকাশ্যে আপত্তি জানিয়েছে এবং বিভিন্ন অভিযোগ উত্থাপন করেছে, যেগুলোর সত্যতা স্বাধীনভাবে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি জনসমক্ষে স্পষ্ট নয়। এই দুই বাস্তবতার মধ্যেই তাকে ঘিরে জনআলোচনা, বিতর্ক এবং প্রশাসনিক মূল্যায়ন অব্যাহত রয়েছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















