সংবাদ শিরোনাম ::
অ্যাভিয়েশন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ব্রিটিশ সরকারের ১৫ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম নিষিদ্ধ করলো আমিরাত বিরোধীদলীয় নেতার সঙ্গে পাকিস্তানের হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ বর্তমান সংসদের কোনো সদস্য ঋণখেলাপি নন: স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে চীনের রাষ্ট্রদূতের সৌজন্য সাক্ষাৎ নীলফামারীতে পার্টনার কংগ্রেস অনুষ্ঠিত, সম্মাননা দেয়া হলো তিনটি স্কুলকে আত্রাইয়ে ৫০ জাতের দেশীয় ফলের প্রদর্শনী নিয়ে ব্যতিক্রমী ফল উৎসব অনুষ্ঠিত নি’হ’ত নন্দিনীর বাড়িতে প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশে ছুটে গেলেন ত্রাণমন্ত্রী ঝালকাঠি পৌর প্রশাসক ফুটবল টুর্নামেন্টের উদ্বোধনী খেলায় ৯নং ওয়ার্ডের জয় কালিহাতীতে মাদ্রাসাছাত্রীকে ধর্ষণচেষ্টা, অভিযুক্ত গ্রেপ্তার
সিসিকের ‘অঘোষিত সম্রাট’ হানিফুর রহমান

সেলসম্যান থেকে শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার গল্প

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ, গুঞ্জন ও বিতর্ক রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আদালত কিংবা সরকারের কোনো প্রকাশ্য চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তবুও সিসিকের অভ্যন্তরে নিয়োগ বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হানিফুর রহমান এখনো সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে কর্মরত এবং নগর ভবনের প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
স্থানীয় সূত্র ও সিসিকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান হানিফুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সময় তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। একই উপজেলার হওয়ায় মেয়রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রশাসনিক ও কনজারভেন্সি—দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন তিনি।
সিসিকের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, মাস্টাররোল ও দৈনিকভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। সেখানে নিয়োগপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশল, স্বাস্থ্য ও লাইসেন্স শাখায় চাকরি পেতে বড় অঙ্কের লেনদেন হতো বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মচারী। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, কনজারভেন্সি শাখার শ্রমিকদের বেতন থেকেও নিয়মিত টাকা কেটে রাখা হতো। নগরীর হাসপাতাল, ক্লিনিক, রেস্তোরাঁ ও মার্কেটের বর্জ্য অপসারণের নামে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে হানিফুর রহমানের পরিবারের নামে গড়ে ওঠা একটি বড় ডেইরি ফার্ম নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগেও তার আর্থিক অবস্থা সাধারণ ছিল। বর্তমানে তার পরিবার গরুর খামার, মৎস্য প্রকল্প ও জমিজমার মালিক। যদিও হানিফুর রহমান অতীতে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ডেইরি ফার্মটি তার স্ত্রীর উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
সিসিকের একটি প্লট তার স্ত্রীর নামে বরাদ্দ এবং পরে সেটি সিটি করপোরেশনকে ভাড়া দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অনিয়মের সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি।
২০২৪ সালের পর সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন খান মো. রেজা-উন-নবী এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার।
তবে হানিফুর রহমানকে ঘিরে যেসব গুরুতর অভিযোগ বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য বিচারিক রায় বা দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ ও বাস্তবতার মধ্যকার পার্থক্য নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক তদন্তই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ বলে মনে করছেন সুশাসনকর্মীরা।
সিলেট নগর ভবনের করিডোরে তার নাম উচ্চারণ করা হয় নিচু স্বরে। কেউ তাকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, কেউ আবার “মেয়রের খাস লোক”। তবে নগর ভবনের ভেতরে-বাইরে অধিকাংশ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত “মহারাজা” নামে। দীর্ঘ দুই দশকে সিলেট সিটি করপোরেশনের একজন সাধারণ কর্মচারী থেকে প্রভাবশালী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে ওঠার গল্প এখন নগরজুড়ে আলোচনার বিষয়।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা হানিফুর রহমানের কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল সাধারণভাবে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তিনি সোয়ান ফোম কোম্পানির একজন সেলসম্যান ছিলেন। পরে সিলেট সিটি করপোরেশনে অফিস সহকারী পদে চাকরি পান। সে সময় সিসিকে প্রভাবশালী ছিলেন সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। তার আশীর্বাদেই হানিফুর রহমান নগর ভবনে জায়গা করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিচিত মুখ।
সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর হানিফুর রহমানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি কনজারভেন্সি শাখার দায়িত্বও তার হাতে চলে আসে। এক ব্যক্তির হাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তখন থেকেই নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে।
নগর ভবনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, প্রশাসনিক শাখা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতেন হানিফুর রহমান। চাকরি নিয়োগ থেকে শুরু করে বদলি, পদোন্নতি, এমনকি দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীদের তালিকাও তার অনুমতি ছাড়া হতো না। অভিযোগ রয়েছে, দুই মেয়াদে অন্তত চার শতাধিক লোককে মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার মাধ্যমে। এসব নিয়োগে জনপ্রতি তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নিয়োগ বাণিজ্যের পাশাপাশি মাস্টাররোল কর্মীদের বেতন থেকেও নিয়মিত অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে চার দিনের বেতন বিভিন্ন অজুহাতে কেটে নেওয়া হতো। সেই টাকা কোথায় যেত, তার কোনো হিসাব কর্মীরা জানতেন না।
কনজারভেন্সি শাখাকে ঘিরেও রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। সিসিকের এই শাখায় প্রায় চার শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। কেউ নাইটগার্ড, কেউ ময়লার গাড়ির শ্রমিক, কেউ ডাম্পিং স্টেশনে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রায় প্রত্যেককেই চাকরি পেতে টাকা দিতে হয়েছে।
সিসিকের প্রায় একশটি ময়লার গাড়ির মধ্যে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৬৫টি গাড়ি চলাচল করে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গাড়ি ব্যবহার করে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও রেস্তোরাঁ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ আদায় করা হতো। পাশাপাশি উচ্ছিষ্ট খাবার মাছের খামারিদের কাছে বিক্রির মাধ্যমেও অর্থ আয় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, নিজের প্রভাব বাড়াতে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের চাকরি দিয়েছেন হানিফুর রহমান। একই সঙ্গে নিজের আত্মীয়স্বজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
করোনাকালেও অভিযোগের শেষ ছিল না। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীকে স্থায়ী চাকরি দেওয়ার নামে দেড় লাখ টাকা করে ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে হানিফুর রহমানের বিপুল সম্পদের তথ্য। কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে তার পরিবারের নামে গড়ে উঠেছে বিশাল “আর.এম ডেইরি ফার্ম”। সেখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক গরু, মৎস্য খামার এবং উন্নত জাতের ঘাসের চাষ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ফার্মটি তার স্ত্রীর মালিকানাধীন বলে দাবি করলেও স্থানীয়দের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, সিটি করপোরেশনের চাকরি থেকেই হানিফুর রহমান বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। কয়েক বছর আগেও তার আর্থিক অবস্থা এত শক্তিশালী ছিল না বলে দাবি এলাকাবাসীর।
ফার্মে ব্যবহৃত কিছু লোহার পিলার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সিসিকের বিলবোর্ডের খুঁটি দক্ষিণ সুরমা থেকে সরিয়ে আদমপুরে নেওয়া হয়েছে। যদিও হানিফুর রহমান দাবি করেছেন, তিনি এগুলো চট্টগ্রাম থেকে কিনেছেন।
সিসিকের বাগবাড়ি এলাকায় তার স্ত্রীর নামে বরাদ্দ নেওয়া প্লট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেই প্লট উল্টো সিটি করপোরেশনকেই কসাইখানার জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে হানিফুর রহমানের। যদিও তিনি চৌহাট্টা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। অনেকের মতে, প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপন রাখতেই সাধারণ জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
সিসিকের ২৮ লাখ টাকা মূল্যের ৫৩৫টি পানির মিটার গায়েব হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিতেও ছিলেন হানিফুর রহমান। ওই ঘটনায় কয়েকজন কর্মচারী বরখাস্ত হলেও তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল কখনো প্রকাশ হয়নি।
নগর ভবনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যক্তিগত আলোচনায় হানিফুর রহমানকে “দুর্নীতির মহারাজা” বলে উল্লেখ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি এমন এক বলয় তৈরি করেছেন, যেখানে তার অনুমতি ছাড়া কিছুই হতো না।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হানিফুর রহমান। তার দাবি, তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন। নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। ডেইরি ফার্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি তার স্ত্রীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি প্রকল্প। স্ত্রীর পরিবার থেকেও সম্পদের উৎস রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্লট বরাদ্দের বিষয়েও তিনি দাবি করেন, চাকরিতে যোগদানের আগেই তার স্ত্রী ওই সম্পত্তি পেয়েছেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন সাবেক সেলসম্যান কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন? কীভাবে একটি সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এত প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন যে নগর ভবনের ভেতরে তাকে “অঘোষিত সম্রাট” বলা হয়?
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। নতুন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। এখন নগরবাসীর প্রশ্ন—অতীতের এসব অভিযোগের তদন্ত হবে কি না। প্রশাসনিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
সুশাসনকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক সংস্কার। অন্যথায় একজন হানিফুর রহমানের জায়গায় আরেকজন উঠে আসবে, কিন্তু দুর্নীতির কাঠামো অটুটই থেকে যাবে।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

অ্যাভিয়েশন খাতে বিনিয়োগের আগ্রহ ব্রিটিশ সরকারের

সিসিকের ‘অঘোষিত সম্রাট’ হানিফুর রহমান

সেলসম্যান থেকে শত কোটি টাকার মালিক হওয়ার গল্প

আপডেট সময় ০২:২৫:১৮ অপরাহ্ন, রবিবার, ১০ মে ২০২৬

সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হানিফুর রহমানকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অভিযোগ, গুঞ্জন ও বিতর্ক রয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক), আদালত কিংবা সরকারের কোনো প্রকাশ্য চূড়ান্ত তদন্ত প্রতিবেদন পাওয়া যায়নি। তবুও সিসিকের অভ্যন্তরে নিয়োগ বাণিজ্য, প্রভাব খাটানো এবং অবৈধ সম্পদ অর্জনের অভিযোগ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে আলোচনা চলছে।
সাম্প্রতিক তথ্য অনুযায়ী, হানিফুর রহমান এখনো সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। তিনি প্রশাসনিক কর্মকর্তা পদে কর্মরত এবং নগর ভবনের প্রশাসনিক কার্যক্রমের সঙ্গে যুক্ত আছেন।
স্থানীয় সূত্র ও সিসিকের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর ভাষ্য অনুযায়ী, গত এক দশকে প্রশাসনিক কার্যক্রমে প্রভাবশালী ব্যক্তি হিসেবে পরিচিতি পান হানিফুর রহমান। অভিযোগ রয়েছে, সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরীর সময় তার প্রভাব সবচেয়ে বেশি বৃদ্ধি পায়। একই উপজেলার হওয়ায় মেয়রের ঘনিষ্ঠ হিসেবে প্রশাসনিক ও কনজারভেন্সি—দুটি গুরুত্বপূর্ণ শাখার ওপর প্রভাব বিস্তার করেন তিনি।
সিসিকের ভেতরের একাধিক সূত্রের দাবি, মাস্টাররোল ও দৈনিকভিত্তিক কর্মচারী নিয়োগে দীর্ঘদিন ধরে একটি অঘোষিত সিন্ডিকেট সক্রিয় ছিল। সেখানে নিয়োগপ্রত্যাশীদের কাছ থেকে লাখ লাখ টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। বিশেষ করে প্রকৌশল, স্বাস্থ্য ও লাইসেন্স শাখায় চাকরি পেতে বড় অঙ্কের লেনদেন হতো বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন বর্তমান ও সাবেক কর্মচারী। যদিও এসব অভিযোগের পক্ষে এখন পর্যন্ত কোনো সরকারি তদন্ত প্রতিবেদন প্রকাশ হয়নি।
অভিযোগ রয়েছে, কনজারভেন্সি শাখার শ্রমিকদের বেতন থেকেও নিয়মিত টাকা কেটে রাখা হতো। নগরীর হাসপাতাল, ক্লিনিক, রেস্তোরাঁ ও মার্কেটের বর্জ্য অপসারণের নামে অনানুষ্ঠানিক অর্থ আদায়ের কথাও জানিয়েছেন কয়েকজন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি। তবে এসব অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে হানিফুর রহমানের পরিবারের নামে গড়ে ওঠা একটি বড় ডেইরি ফার্ম নিয়েও এলাকায় আলোচনা রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, কয়েক বছর আগেও তার আর্থিক অবস্থা সাধারণ ছিল। বর্তমানে তার পরিবার গরুর খামার, মৎস্য প্রকল্প ও জমিজমার মালিক। যদিও হানিফুর রহমান অতীতে গণমাধ্যমকে বলেছেন, ডেইরি ফার্মটি তার স্ত্রীর উদ্যোগে পরিচালিত হয়।
সিসিকের একটি প্লট তার স্ত্রীর নামে বরাদ্দ এবং পরে সেটি সিটি করপোরেশনকে ভাড়া দেওয়ার বিষয়েও প্রশ্ন উঠেছিল। তবে এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক অনিয়মের সিদ্ধান্ত এখন পর্যন্ত প্রকাশ হয়নি।
২০২৪ সালের পর সিলেট সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কাঠামোতেও পরিবর্তন এসেছে। বর্তমানে প্রশাসকের দায়িত্বে রয়েছেন খান মো. রেজা-উন-নবী এবং প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ রেজাই রাফিন সরকার।
তবে হানিফুর রহমানকে ঘিরে যেসব গুরুতর অভিযোগ বিভিন্ন সময় আলোচনায় এসেছে, সেগুলোর বিষয়ে এখন পর্যন্ত কোনো প্রকাশ্য বিচারিক রায় বা দাপ্তরিক সিদ্ধান্ত পাওয়া যায়নি। ফলে অভিযোগ ও বাস্তবতার মধ্যকার পার্থক্য নির্ধারণে আনুষ্ঠানিক তদন্তই একমাত্র নির্ভরযোগ্য পথ বলে মনে করছেন সুশাসনকর্মীরা।
সিলেট নগর ভবনের করিডোরে তার নাম উচ্চারণ করা হয় নিচু স্বরে। কেউ তাকে প্রশাসনিক কর্মকর্তা বলেন, কেউ আবার “মেয়রের খাস লোক”। তবে নগর ভবনের ভেতরে-বাইরে অধিকাংশ মানুষের কাছে তিনি পরিচিত “মহারাজা” নামে। দীর্ঘ দুই দশকে সিলেট সিটি করপোরেশনের একজন সাধারণ কর্মচারী থেকে প্রভাবশালী প্রশাসনিক কর্মকর্তা হয়ে ওঠার গল্প এখন নগরজুড়ে আলোচনার বিষয়।
মৌলভীবাজারের কমলগঞ্জ উপজেলার আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামের বাসিন্দা হানিফুর রহমানের কর্মজীবনের শুরু হয়েছিল সাধারণভাবে। স্থানীয়দের ভাষ্য অনুযায়ী, একসময় তিনি সোয়ান ফোম কোম্পানির একজন সেলসম্যান ছিলেন। পরে সিলেট সিটি করপোরেশনে অফিস সহকারী পদে চাকরি পান। সে সময় সিসিকে প্রভাবশালী ছিলেন সাবেক মেয়র বদর উদ্দিন আহমদ কামরান। তার আশীর্বাদেই হানিফুর রহমান নগর ভবনে জায়গা করে নেন বলে অভিযোগ রয়েছে। এরপর ধীরে ধীরে তিনি হয়ে ওঠেন ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতির পরিচিত মুখ।
সাবেক মেয়র আরিফুল হক চৌধুরী দায়িত্ব গ্রহণের পর হানিফুর রহমানের অবস্থান আরও শক্তিশালী হয়ে ওঠে। সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি কনজারভেন্সি শাখার দায়িত্বও তার হাতে চলে আসে। এক ব্যক্তির হাতে দুটি গুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে তখন থেকেই নানা প্রশ্ন উঠতে থাকে।
নগর ভবনের একাধিক কর্মকর্তা-কর্মচারীর অভিযোগ, প্রশাসনিক শাখা পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করতেন হানিফুর রহমান। চাকরি নিয়োগ থেকে শুরু করে বদলি, পদোন্নতি, এমনকি দৈনিক মজুরিভিত্তিক কর্মীদের তালিকাও তার অনুমতি ছাড়া হতো না। অভিযোগ রয়েছে, দুই মেয়াদে অন্তত চার শতাধিক লোককে মাস্টাররোলে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে তার মাধ্যমে। এসব নিয়োগে জনপ্রতি তিন থেকে পাঁচ লাখ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়েছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের।
নিয়োগ বাণিজ্যের পাশাপাশি মাস্টাররোল কর্মীদের বেতন থেকেও নিয়মিত অর্থ কেটে রাখার অভিযোগ রয়েছে। সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রতি মাসে চার দিনের বেতন বিভিন্ন অজুহাতে কেটে নেওয়া হতো। সেই টাকা কোথায় যেত, তার কোনো হিসাব কর্মীরা জানতেন না।
কনজারভেন্সি শাখাকে ঘিরেও রয়েছে অসংখ্য অভিযোগ। সিসিকের এই শাখায় প্রায় চার শতাধিক শ্রমিক কাজ করেন। কেউ নাইটগার্ড, কেউ ময়লার গাড়ির শ্রমিক, কেউ ডাম্পিং স্টেশনে। অভিযোগ রয়েছে, তাদের প্রায় প্রত্যেককেই চাকরি পেতে টাকা দিতে হয়েছে।
সিসিকের প্রায় একশটি ময়লার গাড়ির মধ্যে প্রতিদিন ৬০ থেকে ৬৫টি গাড়ি চলাচল করে। অভিযোগ রয়েছে, এসব গাড়ি ব্যবহার করে হাসপাতাল, ক্লিনিক ও রেস্তোরাঁ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে অর্থ আদায় করা হতো। পাশাপাশি উচ্ছিষ্ট খাবার মাছের খামারিদের কাছে বিক্রির মাধ্যমেও অর্থ আয় করা হতো বলে অভিযোগ রয়েছে।
আরও গুরুতর অভিযোগ হলো, নিজের প্রভাব বাড়াতে বিভিন্ন অপরাধে অভিযুক্ত ব্যক্তিদের চাকরি দিয়েছেন হানিফুর রহমান। একই সঙ্গে নিজের আত্মীয়স্বজনদের গুরুত্বপূর্ণ পদে বসানোর অভিযোগও উঠেছে তার বিরুদ্ধে।
করোনাকালেও অভিযোগের শেষ ছিল না। দীর্ঘদিন দায়িত্ব পালন করা কয়েকজন নিরাপত্তাকর্মীকে স্থায়ী চাকরি দেওয়ার নামে দেড় লাখ টাকা করে ঘুষ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা।
এদিকে অনুসন্ধানে উঠে এসেছে হানিফুর রহমানের বিপুল সম্পদের তথ্য। কমলগঞ্জের আদমপুর ইউনিয়নের জালালপুর গ্রামে তার পরিবারের নামে গড়ে উঠেছে বিশাল “আর.এম ডেইরি ফার্ম”। সেখানে দেশি-বিদেশি মিলিয়ে প্রায় দেড় শতাধিক গরু, মৎস্য খামার এবং উন্নত জাতের ঘাসের চাষ রয়েছে বলে স্থানীয়রা জানিয়েছেন।
ফার্মটি তার স্ত্রীর মালিকানাধীন বলে দাবি করলেও স্থানীয়দের বক্তব্য ভিন্ন। তাদের দাবি, সিটি করপোরেশনের চাকরি থেকেই হানিফুর রহমান বিপুল অর্থের মালিক হয়েছেন। কয়েক বছর আগেও তার আর্থিক অবস্থা এত শক্তিশালী ছিল না বলে দাবি এলাকাবাসীর।
ফার্মে ব্যবহৃত কিছু লোহার পিলার নিয়েও বিতর্ক তৈরি হয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, সিসিকের বিলবোর্ডের খুঁটি দক্ষিণ সুরমা থেকে সরিয়ে আদমপুরে নেওয়া হয়েছে। যদিও হানিফুর রহমান দাবি করেছেন, তিনি এগুলো চট্টগ্রাম থেকে কিনেছেন।
সিসিকের বাগবাড়ি এলাকায় তার স্ত্রীর নামে বরাদ্দ নেওয়া প্লট নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগ রয়েছে, সেই প্লট উল্টো সিটি করপোরেশনকেই কসাইখানার জন্য ভাড়া দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগ রয়েছে, নগরীর বিভিন্ন এলাকায় নামে-বেনামে আরও সম্পদ রয়েছে হানিফুর রহমানের। যদিও তিনি চৌহাট্টা এলাকায় ভাড়া বাসায় বসবাস করেন। অনেকের মতে, প্রকৃত সম্পদের তথ্য গোপন রাখতেই সাধারণ জীবনযাপনের চিত্র তুলে ধরেন তিনি।
সিসিকের ২৮ লাখ টাকা মূল্যের ৫৩৫টি পানির মিটার গায়েব হওয়ার ঘটনায় গঠিত তদন্ত কমিটিতেও ছিলেন হানিফুর রহমান। ওই ঘটনায় কয়েকজন কর্মচারী বরখাস্ত হলেও তদন্তের পূর্ণাঙ্গ ফলাফল কখনো প্রকাশ হয়নি।
নগর ভবনের অনেক কর্মকর্তা-কর্মচারী ব্যক্তিগত আলোচনায় হানিফুর রহমানকে “দুর্নীতির মহারাজা” বলে উল্লেখ করেন। তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, দীর্ঘদিন ধরে প্রশাসনিক ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি এমন এক বলয় তৈরি করেছেন, যেখানে তার অনুমতি ছাড়া কিছুই হতো না।
তবে সব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন হানিফুর রহমান। তার দাবি, তিনি নিয়ম মেনেই দায়িত্ব পালন করেছেন। নিয়োগ বাণিজ্য, স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের অভিযোগও অস্বীকার করেন তিনি। ডেইরি ফার্ম সম্পর্কে তিনি বলেন, এটি তার স্ত্রীর উদ্যোগে গড়ে ওঠা একটি প্রকল্প। স্ত্রীর পরিবার থেকেও সম্পদের উৎস রয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, একটি পক্ষ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তার বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছে। প্লট বরাদ্দের বিষয়েও তিনি দাবি করেন, চাকরিতে যোগদানের আগেই তার স্ত্রী ওই সম্পত্তি পেয়েছেন।
তবে প্রশ্ন থেকেই যায়—একজন সাবেক সেলসম্যান কীভাবে অল্প সময়ের মধ্যে কোটি কোটি টাকার সম্পদের মালিক হলেন? কীভাবে একটি সিটি করপোরেশনের প্রশাসনিক কর্মকর্তা এত প্রভাবশালী হয়ে উঠলেন যে নগর ভবনের ভেতরে তাকে “অঘোষিত সম্রাট” বলা হয়?
সাম্প্রতিক সময়ে সিলেট সিটি করপোরেশনের নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। নতুন মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পেয়েছেন আনোয়ারুজ্জামান চৌধুরী। এখন নগরবাসীর প্রশ্ন—অতীতের এসব অভিযোগের তদন্ত হবে কি না। প্রশাসনিক অনিয়ম, নিয়োগ বাণিজ্য ও সম্পদের উৎস খতিয়ে দেখা হবে কি না, তা নিয়েও আলোচনা চলছে।
সুশাসনকর্মীরা বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা দুর্নীতির নেটওয়ার্ক ভাঙতে হলে শুধু ব্যক্তি পরিবর্তন যথেষ্ট নয়। প্রয়োজন স্বচ্ছ তদন্ত, জবাবদিহি এবং প্রশাসনিক সংস্কার। অন্যথায় একজন হানিফুর রহমানের জায়গায় আরেকজন উঠে আসবে, কিন্তু দুর্নীতির কাঠামো অটুটই থেকে যাবে।