কাস্টমসের মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেটের সহকারী কমিশনার আতীকুজ্জামানের ‘ ৫০কোটি টাকার সম্পদ সাম্রাজ্য’
আলাদিনের আশ্চর্য চেরাগ ঘষলেই মিলত গুপ্তধন। তবে বাস্তব জীবনে কোনো চেরাগ ছাড়াই সরকারি চাকরির একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে থেকে বিপুল সম্পদের মালিক হওয়ার অভিযোগ উঠেছে কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট, ঢাকার প্রমোটি সহকারী কমিশনার মোহাম্মদ আতীকুজ্জামানের বিরুদ্ধে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, একজন সহকারী রাজস্ব কর্মকর্তা থেকে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে সহকারী কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান। অভিযোগ রয়েছে, চাকরি জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে দায়িত্বের অপব্যবহার এবং দুর্নীতির মাধ্যমে তিনি ও তাঁর পরিবারের নামে বিপুল পরিমাণ স্থাবর সম্পত্তি গড়ে তুলেছেন।
সরকারি বেতন স্কেল অনুযায়ী একজন সহকারী কমিশনারের বৈধ মাসিক আয় সাধারণত ১ থেকে ১.৫ লাখ টাকার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকার কথা। কিন্তু অনুসন্ধানে উঠে এসেছে, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর ও তাঁর পরিবারের নামে প্রায় ৪৪০ শতাংশ বা ৪.৪ একর জমি এবং একাধিক ফ্ল্যাট ও স্থাপনার মালিকানার তথ্য, যার বর্তমান বাজারমূল্য আনুমানিক ২৫ থেকে ৩৫ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে।
১৯৭৩ সালের ১ এপ্রিল জন্মগ্রহণকারী মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার কলাপাড়া এলাকার বাসিন্দা। তাঁর এবং স্ত্রী মোছা. আশরাফুন্নাহারের নামে রাজধানী ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন স্থানে বিপুল পরিমাণ সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে।
তথ্যানুসারে, বসুন্ধরা আবাসিক এলাকায় ভাটারা মৌজায় ৩৭ শতাংশ জমিসহ একটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট, বনশ্রী প্রকল্পের প্লট নং-ই/১১-তে ৯১ শতাংশ জমির অংশীদারিত্বসহ একটি ১১০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট এবং রামপুরার উলন রোডে ৬০ শতাংশ জমির অংশীদারিত্বসহ আরও একটি ১৩০০ বর্গফুটের ফ্ল্যাট রয়েছে।
এছাড়া মোহাম্মদপুরের রামচন্দ্রপুর মৌজায় যথাক্রমে ১১১ ও ৫০ শতাংশ জমির অংশীদারিত্বসহ দুটি পৃথক ফ্ল্যাট, খিলগাঁওয়ের উত্তর মেরাদিয়ায় সাড়ে ৩ শতাংশ জমির ওপর একটি বাড়ি, যাত্রাবাড়ীর মাতুয়াইলে ৫.৫ শতাংশ জমির ওপর ১১টি টিনশেড ঘর এবং সাভারের বারোকাকোর এলাকায় ৮ শতাংশ জমির একটি মূল্যবান প্রকল্পভূমির মালিকানার তথ্য পাওয়া গেছে।রাজধানীর বাইরে শেরপুর জেলার নকলা উপজেলার কলাপাড়া মৌজায় ২৭৭ শতাংশ ও সাড়ে ৩ শতাংশ জমি, বাজারদী এলাকায় সাড়ে ৭ শতাংশ এবং কায়দা মৌজায় ৪০ শতাংশ জমির মালিকানা রয়েছে বলে জানা গেছে। এছাড়া ময়মনসিংহের মুক্তাগাছায় ১১২ শতাংশ কৃষি ও অকৃষি জমির তথ্যও পাওয়া গেছে।
বর্তমানে মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান কাস্টমস মূল্যায়ন ও অভ্যন্তরীণ নিরীক্ষা কমিশনারেট, ঢাকায় কর্মরত। এই দপ্তরের দায়িত্বের মধ্যে রয়েছে আমদানিকৃত পণ্যের শুল্ক মূল্য নির্ধারণ, আন্ডার-ইনভয়েসিং প্রতিরোধ এবং আমদানিকারকদের অডিট কার্যক্রম পরিচালনা।
সংশ্লিষ্ট মহলের মতে, এ ধরনের পদে থেকে পণ্যের মূল্যায়ন, অডিট রিপোর্ট এবং শুল্ক-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তে প্রভাব বিস্তারের সুযোগ থাকে। অভিযোগকারীদের দাবি, এই সুযোগের অপব্যবহারের মাধ্যমেই বিপুল সম্পদ অর্জন করা হয়েছে।
অনুসন্ধানে আরও দেখা গেছে, কিছু সম্পত্তি স্ত্রী মোছা. আশরাফুন্নাহারের নামে নিবন্ধিত। তবে তাঁর স্বাধীন ও উল্লেখযোগ্য আয়ের কোনো সুস্পষ্ট তথ্য না থাকলে এসব সম্পদের উৎস ও মালিকানা নিয়ে প্রশ্ন উঠতে পারে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, প্রত্যন্ত অঞ্চলে কৃষি ও অকৃষি জমি ক্রয়ের মাধ্যমে অনেক সময় অবৈধ অর্থ বৈধ করার চেষ্টা করা হয়। যদিও এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তদন্ত ছাড়া সম্ভব নয়।অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান অসুস্থতার কথা উল্লেখ করে পরে কথা বলার আশ্বাস দেন। তিনি জানান, তিনি দীর্ঘদিন ধরে ক্যানসারে আক্রান্ত এবং তাঁর সকল সম্পদের তথ্য আয়কর নথিতে উল্লেখ করা হয়েছে।
জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একাধিক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, অভিযোগে উল্লিখিত সম্পদের তথ্য সত্য হলে তা দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) আইন, ২০০৪-এর ২৬ ও ২৭ ধারার আওতায় তদন্তযোগ্য বিষয় হতে পারে।
এছাড়া সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯ অনুযায়ী সম্পদের বিবরণ দাখিল এবং স্থাবর সম্পত্তি ক্রয়ের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় অনুমতি গ্রহণের বিষয়গুলোও যাচাই করা প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ অবস্থায় মোহাম্মদ আতীকুজ্জামান ও তাঁর পরিবারের সম্পদের উৎস, আয়কর নথি, সম্পত্তির দলিল এবং আর্থিক লেনদেন যাচাইয়ে দুদকের মাধ্যমে একটি স্বাধীন ও উচ্চপর্যায়ের তদন্ত কমিটি গঠনের দাবি উঠেছে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















