বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি একটি আন্তর্জাতিক সেবামূলক সংস্থা। কিন্তু বিগত আওয়ামী ফ্যাসিস্ট ও লুটেরা সরকারের আমলে প্রতিষ্ঠানটির দায়িত্বে থাকা পরিচালনা বোর্ড ব্যাপকহারে অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তা-কর্মচারীরাও অনেকে এই দুর্নীতির চক্রে যোগ দেন। হাতিয়ে নেয়া হয় কোটি কোটি টাকা। যে কারণে প্রতিষ্ঠানটি কাক্সিক্ষত সেবা দিতে পারেনি। আওয়ামী সরকারের সেই দুর্নীতির ছায়া এখনো প্রতিষ্ঠানটিতে রয়েই গেছে অনেকটা। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে আওয়ামী আমলের এসব দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গিয়ে দফায় দফায় বাধা এবং নাজেহালের শিকার হয়েছেন তখনকার চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মোহাম্মদ আজিজুল ইসলামসহ পরিচালনা বোর্ডের সদস্যরা। পরিচালনা বোর্ডেরই কয়েকজন সদস্য আওয়ামী দুর্নীতিবাজদের পক্ষ থেকে দফায় দফায় বাধা দিয়েছেন। মব সন্ত্রাসের মাধ্যমে চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলামকে নাজেহালও করা হয়েছে একাধিকবার। এতে নেতৃত্ব দিয়েছেন এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা আলম মিতুসহ আরও কয়েকজন এনসিপি নেতা। এদের মধ্যে অন্যতম হলেন, তখনকার স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমের ব্যক্তিগত কর্মকর্তা বহুল আলোচিত মুহাম্মদ তুহিন ফারাবী এবং এনসিপি নেতা মুনতাসির মাহমুদ, যিনি রেড ক্রিসেন্টে উপ-পরিচালক পদে অবৈধভাবে চুক্তিভিত্তিতে নিয়োজিত ছিলেন। এ রকমেরই একটি মব সন্ত্রাস হয়েছে ৮ অক্টোবর। এতে নেতৃত্ব দেন ডা. মিতু, মুনতাসির মাহমুদ, রেড ক্রিসেন্টের কর্মকর্তা জাফর ইমামসহ আরো বেশ কয়েকজন। বহিরাগত এনে চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলামের দপ্তরে হামলা চালানো হয়। পরবর্তীতে পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
সোসাইটির দুর্নীতিবাজ পরিচালক ইমাম জাফর শিকদার, যিনি অতীতে আওয়ামী লীগের বিভিন্ন নেতাদের সাথে হাত মিলিয়ে সোসাইটিতে টেন্ডারবাজি, নিয়োগ বাণিজ্য ও বদলি বাণিজ্য করে এবং যুব ও সহশিক্ষা কার্যক্রম থেকে অবৈধভাবে লাখ লাখ টাকা লোপাটসহ নানা অনিয়ম-দুর্নীতিতে জড়িত ছিলেন, তাকে ওই সময় চট্টগ্রামের কার্যালয়ে বদলি করা হয়েছিল। জাফর ইমামের বদলি ঠেকানোর জন্যই চেয়ারম্যানের দপ্তরে মব সন্ত্রাস চালানো হয় ওই দিন। জানা যায়, রেড ক্রিসেন্টে আওয়ামী আমলের দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাদের বদলি বা শাস্তি ঠেকানো এবং দুর্নীতি জিইয়ে রাখার অপচেষ্টা হিসেবে ডা. মাহমুদা আলম মিতুর নেতৃত্বে এ রকমের আরও বেশ কয়েকবার দফায় দফায় মব সন্ত্রাস চালানো হয়। এমনকি ডা, মিতু নিজে চেয়ারম্যান আজিজুল ইসলামের কক্ষে ঢুকে একাধিকবার সরাসরি চেয়ারম্যানকে নাজেহালও করেন। এর প্রমাণ হিসেবে এ ধরনের অডিও-ভিডিও রেকর্ড কর্তৃপক্ষের হাতে রয়েছে।
ইমাম জাফর শিকদার স্বৈরাচার আওয়ামী লীগ সরকারের সময় আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য আমির হোসেন আমুর ছোট ভাই পরিচয়ে প্রভাব খাটিয়ে নানা অনিয়ম-অপকর্মের মাধ্যমে এই প্রতিষ্ঠানের কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছেন। তার সেইসব দুর্নীতির তদন্ত চলছিল দুর্নীতি দমন কমিশনের পক্ষ থেকে। এ ব্যাপারে দুদক তদন্ত কর্মকর্তাও নিয়োগ করেছে। দুর্নীতির দায়ে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে তাকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম জেমিসন হাসপাতালে শাস্তিমূলক বদলি করা হয়।
ফলশ্রুতিতে এই চক্রটি বেপরোয়া হয়ে উঠে বদলি ঠেকানোর জন্য। সোসাইটির ট্রেজারার, যিনি সিলেটের আরেকজন দুর্নীতিবাজ হিসেবে খ্যাত আওয়ামী সরকারের সিলেটের প্রাক্তন মেয়র বদরুদ্দীন কামরানের ছোট ভাই ও ঘনিষ্ঠজন পরিচয়ে দুর্নীতি করা আমিনুল ইসলামও আওয়ামী চক্রে জড়িত ছিলেন। মোটকথা, বড় ধরনের একটা লুটপাটের চক্র গড়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ আমলে।
বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির ইমাম জাফর শিকদার মানেই দুর্নীতির ইমাম। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ আমলে ক্ষমতার অপব্যবহার, অনিয়ম ও দুর্নীতি ও নারী কেলেংকারী করেও আওয়ামী লীগ নেতা আমির হোসেন আমুর তদবীরে মুক্তি পেয়ে যান। তিনি নানা কৌশলে আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে কাজে লাগিয়ে ১৬ টি বছর রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটিতে মহা লুটপাট করেছেন। হয়েছেন শত কোটি টাকা ও অবৈধ সম্পদের মালিক। বাংলাদেশ রেডক্রিসেন্ট সোসাইটিতে দীর্ঘদিন যাবত বেনামে ঠিকাদারী ব্যবসা করেছেন। তার ঠিকাদারী ২টি ফার্মের নাম প্রগ্রেসিভ ও ফারহান ইঞ্জিনিয়ারিং।
অবৈধভাবে অর্জিত টাকায় তিনি কক্সবাজার, চট্টগ্রাম, ঢাকা ও বরিশালে বেশ কয়েকটি বাড়ী নির্মাণ ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। ঢাকায় তার আলীশান ফ্ল্যাট আছে। ২ খানা গাড়িও ক্রয় করেছেন। গত ডিসেম্বর মাসে তিনি স্বাভাবিক নিয়মে অবসরে গেছেন। যদিও তার বিরুদ্ধে দুদকের তদন্ত চলছিল সেটি ধামাচাপা দিতে সক্ষম হয়েছেন এনসিপি নেত্রী ডা. মাহমুদা মিতুর মাধ্যমেই।
গত বছরের মে মাসে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটির প্রধান কার্যালয়ে অভিযান চালায় দুদক। ভবন নির্মাণ, জনবল নিয়োগ ও অর্থ ব্যবহারে অনিয়মের প্রাথমিক প্রমাণ পায় দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক)।
ওই অভিযানে নেতৃত্ব দেন দুদকের সহকারী পরিচালক মো. আশিকুর রহমান ও উপসহকারী পরিচালক মো. ইসমাইল হোসেন। অভিযানে রেড ক্রিসেন্টের মহাসচিব ও উপমহাসচিবের বক্তব্য নেওয়া হয় এবং নিয়োগ ও ভবন নির্মাণসংক্রান্ত একাধিক নথি সংগ্রহ করা হয়।
দুদকের প্রাথমিক প্রতিবেদনে বলা হয়, রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি ২০০১ সালে বোরাক রিয়েল এস্টেট এবং ২০০৩ সালে মাল্টিপ্ল্যান ডেভেলপমেন্ট লিমিটেডের সঙ্গে দুটি ভবন নির্মাণ চুক্তি করে। এসব চুক্তিতে ডেভেলপারদের (নির্মাতা প্রতিষ্ঠান) সঙ্গে একতরফাভাবে সুবিধাজনক শর্ত রাখা হয়। উদাহরণস্বরূপ, একটি চুক্তিতে ডেভেলপারকে ৭৪ দশমিক ৯৪ শতাংশ শেয়ার দেওয়া হয়, যা দুদকের মতে আর্থিকভাবে ক্ষতিকর ও অস্বাভাবিক। এ ছাড়া বিভিন্ন পদে নিয়োগে স্বজনপ্রীতি, প্রশ্নপত্র ফাঁস এবং প্রয়োজনের অতিরিক্ত জনবল নিয়োগের অভিযোগেরও প্রাথমিক সত্যতা পাওয়া যায়। বিশেষ করে হলি ফ্যামিলি রেড ক্রিসেন্ট মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানে অতিরিক্ত নিয়োগ হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
দুদক বলছে, সংস্থাটি দেশি-বিদেশি অনুদানের অর্থও সঠিকভাবে ব্যয় করেনি। অভিযানকালে কর্মকর্তাদের বক্তব্য ও সংগৃহীত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে কেনাকাটা ও দরপত্র প্রক্রিয়ায় একাধিক অনিয়মের তথ্য উঠে এসেছে।
এরপরে গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে দুর্নীতি দমন কমিশন বিস্তারিতভাবে তদন্ত করার জন্য তদন্ত কর্মকর্তা নিয়োগ করে। প্রধান কার্যালয়ের সহকারী পরিচালক ওয়াহিদ মঞ্জুর সোহাগকে এই তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয়। তিনি প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র চেয়ে ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ রেড ক্রিসেন্টের চেয়ারম্যান বরাবর চিঠি ইস্যু করেন। চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) আজিজুল ইসলাম এ সংক্রান্ত প্রয়োজনীয় রেকর্ডপত্র সরবরাহও করেন। কিন্তু ডা. মাহমুদা মিতুসহ দুর্নীতিবাজ চক্রটি নিজেদের প্রভাব খাটিয়ে দুদকের তদন্ত থামিয়ে দেয়। এতে প্রতিষ্ঠানটি ঘুরে দাঁড়ানোর পরিবর্তে আবারও সংকটে পড়তে থাকে। উল্লেখ্য, আজিজুল ইসলামের নেতৃত্বাধীন ওই কমিটির মেয়াদ শেষ হওয়ার পর গত ডিসেম্বরে নতুন এডহক কমিটি দেয় স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়। পরবর্তী কমিটিরও মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে গত মাসে। বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটির পরিচালনা কার্যক্রমে এক ধরনের অচলাবস্থা তৈরি হয়েছে।
সংবাদ শিরোনাম ::
ডা. মিতুর মব কালচার ও বেপরোয়া অপকর্মে রেড ক্রিসেন্টের ভালো উদ্যোগগুলো যেভাবে ব্যর্থ হয়
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ০২:৪৯:৪৩ অপরাহ্ন, রবিবার, ২৬ এপ্রিল ২০২৬
- ৫০৭ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ




















