২০০৪ সালে বন অধিদপ্তরে ফরেস্টার হিসেবে যোগদানের পর থেকেই মো. ইসমাইল হোসেনের কর্মজীবন দেশপ্রেম বা দায়িত্বের পরিবর্তে ব্যক্তিগত লিপ্সা আর লালসা চরিতার্থ করার এক অন্তহীন মিছিলে পরিণত হয়েছে। সুন্দরবন পশ্চিম বন বিভাগে তার প্রথম কর্মস্থল থেকেই তিনি রাষ্ট্রীয় সম্পদ রক্ষার বদলে ধ্বংসের নীল নকশা তৈরি করেন যেখানে কাঠ চোর, অবৈধ জেলে, বাউয়ালী এবং মৌয়ালীদের সাথে এক শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তুলে সুন্দরবনের মূল্যবান কাঠ পাচার এবং অভয়ারণ্য এলাকায় নিষিদ্ধ মৎস্য ও বন্যপ্রাণী শিকারের মতো ন্যক্কারজনক কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে অবৈধ অর্থের পাহাড় গড়া শুরু করেন।
এই অবৈধ টাকার দাপটে তিনি অতি দ্রুত নারীলোভী ও কন্যা রাশির এক বিলাসপ্রিয় চরিত্রে রূপান্তরিত হন যেখানে অর্থের বিনিময়ে নারীদের আকৃষ্ট করা তার নেশায় পরিণত হয় এবং নিজের ছাত্র জীবনে করা প্রথম স্ত্রী ও তিন সন্তানকে অবলীলায় বিসর্জন দিয়ে মংলা এলাকার এক প্রবাসীর স্ত্রীকে এক সন্তানসহ ভাগিয়ে নিয়ে রিক্তা বেগম নামে ওই মহিলাকে বিবাহ করেন। রাজনৈতিক প্রভাব আর অর্থের জোরে বদলি নীতিমালাকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে তিনি চট্টগ্রাম উত্তর বন বিভাগের নারায়ণহাট রেঞ্জে নারায়ণহাট বিট পোস্টিং বাগিয়ে নেন এবং সেখানেও বনভূমি ও বনাঞ্চল উজাড়ের মাধ্যমে কোটি কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়ার পাশাপাশি স্থানীয় এক মহিলার সাথে অবৈধভাবে মেলামেশা করার সময় হাতেনাতে ধরা পড়ার মতো চরম লজ্জাজনক পরিস্থিতির জন্ম দেন।
সেই কেলেঙ্কারি ধামাচাপা দিতে কর্তৃপক্ষ তাকে তড়িঘড়ি করে বান্দরবান পাল্পউড বাগান বিভাগে বদলি করলেও তার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি বরং সেখানে অবৈধ জোত পারমিট জালিয়াতির মাধ্যমে আয়ের নতুন পথ খুলে তিনি মৌমিতা মারমা নামে এক পাহাড়ি মেয়ের সাথে মাসিক চুক্তিতে বান্দরবানে আলাদা বাসা ভাড়া নিয়ে নিয়মিত রাত কাটানোর মতো অনৈতিকতায় লিপ্ত হন। ক্ষমতার অপব্যবহারে পারদর্শী ইসমাইল এরপর দক্ষিণ বন বিভাগের পদুয়া রেঞ্জের লোভনীয় বড়দুয়ারা বিট কাম চেক স্টেশনে পদায়ন নিশ্চিত করেন এবং সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে মূল্যবান কাঠ পাচারের একটি বিশাল সিন্ডিকেট গড়ে তোলেন যাতে কাজী আলাউদ্দিন, ফরেস্ট রেঞ্জার (অব.), মাহবুব আলম, ফরেস্টার (অব.), মিলন কান্তি দে এবং শাহাদাৎ হোসেনসহ আটজন জড়িত ছিলেন। এই চক্রের বিরুদ্ধে তৎকালীন শহর রেঞ্জ কর্মকর্তা মরহুম ওমর ফারুক বাদী হয়ে তাদের অনৈতিক কার্যকলাপ ও জ্ঞাত আয় বহির্ভূত অবৈধ সম্পদের বিবরণ দিয়ে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বরাবর অভিযোগ দাখিল করেন যা তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর দুদক বর্তমানে তাদের আয়ের হিসাব চেয়ে বন অধিদপ্তরসহ বিভিন্ন দপ্তরে পত্র পাঠিয়েছে এবং মামলা শুরুর প্রক্রিয়া চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে।
এতো কিছুর পরও অদৃশ্য শক্তির ইশারায় তিনি মার্দশা রেঞ্জের কর্মকর্তা হয়ে সেখানেও জমি ও গাছ বিক্রির মহোৎসবে মাতেন এবং এক পানের দোকানী নারীকে বিয়ের প্রলোভন দেখিয়ে নিয়মিত স্বামী-স্ত্রীর মতো রাত কাটানোর পর ওই নারী বিয়ের চাপ দিলে তাকে ফেলে রেখে প্রতারণা করে ঢাকা অঞ্চলে পালিয়ে আসেন। ঢাকায় এসে সিএফ-কে ম্যানেজ করে তিনি টাঙ্গাইল বন বিভাগের দোখলা রেঞ্জে পোস্টিং নেন এবং তৎকালীন ডিএফও সাজ্জাদ হোসেনকে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে রেঞ্জ কর্মকর্তার চেয়ার দখল করে রেস্ট হাউজে নিয়মিত গারো মেয়েদের ভোগের অভয়ারণ্য গড়ে তোলেন যা নিয়ে একাধিক জাতীয় পত্রিকায় নিউজ প্রকাশিত হলেও রহস্যজনকভাবে কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। এমনকি টাঙ্গাইলের মধুপুরের হাগুড়াকুড়ি গ্রামের মোছাঃ নেবুজা বেগম নামে এক নারীকে বিয়ের প্রলোভনে নিজ বাড়িতে জোরপূর্বক শারীরিক সম্পর্ক স্থাপনের অভিযোগে ওই নারী ডিএফও সাজ্জাদ হোসেন বরাবর লিখিত আবেদন করলে ইসমাইল স্থানীয় প্রভাবশালী ব্যক্তিদের দিয়ে দোখলা রেঞ্জের চুনিয়া কটেজে আপোষ মিমাংসার নামে ওই নারীকে মারধর ও জোরপূর্বক কাগজে স্বাক্ষর নিয়ে ঘটনা ধামাচাপা দেন। পরবর্তীতে ডিএফও সাজ্জাদ হোসেন ইসমাইলের নিকট থেকে বিপুল অঙ্কের টাকা নিয়ে এবং আওয়ামী রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে ঘটনাটি ধামাচাপা দেওয়ার উদ্দেশ্যে সিএফ-কে ম্যানেজ করে কোনো প্রকার অনুমতি ছাড়াই তাকে রাতারাতি ময়মনসিংহ বন বিভাগে অনিয়মিত বদলি করে দেন।
এই দুর্নীতিবাজ ও নারী খেকো কর্মকর্তা এতো অপরাধের পরও শাস্তি না পেয়ে উল্টো বন বিভাগ থেকে পুরস্কার হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে বর্তমানে ডেপুটি রেঞ্জার হয়ে ময়মনসিংহের উথুরা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে দাপট দেখাচ্ছেন যেখানে উথুরা সদর বিট, এনায়েতপুর ও আঙ্গর গড়া মোট তিনটি বিটের দায়িত্ব তিনি একাই কুক্ষিগত করে রেখেছেন। অতি সম্প্রতি তিনি উথুরা রেঞ্জ অফিসকে তার অপকর্মের আস্তানা বানিয়ে ময়মনসিংহ জেলার ফুলবাড়িয়া থানার কাহালগাঁও গ্রামে এক স্বামী পরিত্যক্তা নারীকে তার আগের ঘরের সন্তানসহ সপ্তম বিবাহ করেছেন এবং প্রতিদিন রাতের আঁধারে রেঞ্জ অফিস থেকে বের হয়ে ওই স্ত্রীর বাপের বাড়িতে রাত কাটিয়ে ভোরে ফিরে আসেন। ইতিপূর্বে ময়মনসিংহ, বাগেরহাট, ফকিরহাট, চট্টগ্রাম, গাজীপুর এবং মংলার বানিয়া শান্তাসহ বিভিন্ন স্থানে আরও ছয়টি বিবাহ করা এই কর্মকর্তা বর্তমানে ক্ষমতার চরম অপব্যবহার করে বনের মূল্যবান গাছ ও বনভূমি দিনদুপুরে বিক্রি করে তার সাত স্ত্রীর আলিশান জীবনযাপন ও ঢাকা শহরের বিলাসবহুল ফ্ল্যাটের খরচ যোগাচ্ছেন যা বন বিভাগের প্রশাসনের জন্য এক চরম কলঙ্কজনক অধ্যায়। এতদ্বসংক্রান্তে টাঙ্গাইল বন বিভাগে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক পদস্থ কর্মকর্তা আক্ষেপ করে বলেন, এই অবস্থায় বন অধিদপ্তরের ভাবমূর্তি রক্ষা ও রাষ্ট্রীয় সম্পদ সংরক্ষণে ইসমাইল হোসেনের বিরুদ্ধে অবিলম্বে কঠোর বিভাগীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা সময়ের দাবি।
বন অধিদপ্তরের উচিত তার বিরুদ্ধে ওঠা প্রতিটি অভিযোগের সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্তের জন্য উচ্চপর্যায়ের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা এবং তদন্ত চলাকালীন তাকে সাময়িক বরখাস্ত করে ক্ষমতার প্রভাব থেকে দূরে রাখা। বিশেষ করে দুদকের তদন্তাধীন সম্পদের হিসাব এবং টাঙ্গাইল ও ময়মনসিংহে তার নারী নির্যাতনের যে গুরুতর অভিযোগ রয়েছে, তার ভিত্তিতে ফৌজদারি মামলা দায়ের করা প্রয়োজন। একজন ব্যক্তির ব্যক্তিগত লালসা ও সীমাহীন দুর্নীতির দায় পুরো বন বিভাগ নিতে পারে না। তাই উথুরা রেঞ্জসহ তার পূর্ববর্তী সকল কর্মস্থলের আর্থিক ও প্রশাসনিক অনিয়ম খতিয়ে দেখে তাকে চাকরি থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি প্রদানসহ অর্জিত অবৈধ সম্পদ বাজেয়াপ্ত করার প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। অন্যথায়, বন রক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত সৎ কর্মকর্তাদের মনোবল ভেঙে পড়বে এবং রাষ্ট্রীয় বনভূমি ধ্বংসের এই মহোৎসব চিরতরে বন্ধ করা অসম্ভব হয়ে পড়বে। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ কি এখন ইসমাইলের মতো ‘দুর্নীতির মহীরুহ’কে উপড়ে ফেলবেন, নাকি পূর্বের কর্মকর্তাদের মতো অর্থের বিনিময়ে তাকে মদদ দেওয়া অব্যাহত রাখবেন এখন সেটাই দেখার বিষয়।
নিজস্ব প্রতিবেদক 



















