দেশের স্বাস্থ্যখাতের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠান কেন্দ্রীয় চিকিৎসা সরঞ্জামাগার (সিএমএসডি) ঘিরে উঠেছে বিস্তর অনিয়ম, দুর্নীতি ও প্রশাসনিক অনিয়ন্ত্রনের অভিযোগ। প্রতিষ্ঠানটির উপ-পরিচালক ডাঃ তৌহিদ আহমেদের (দাপ্তরিক কোড: ১০৯৬৩০) বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ক্ষমতার অপব্যবহার, আর্থিক অনিয়ম, বিধিবহির্ভূত ক্রয় এবং দায়িত্বে অবহেলা যা ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মহলে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে পরিণত হয়েছে।
সূত্রে জানা যায়, ডাঃ তৌহিদ আহমেদ সিলেট এমএজি ওসমানী মেডিকেল কলেজের ৩০তম ব্যাচের শিক্ষার্থী এবং ছাত্রজীবনে নিষিদ্ধ ছাত্রলীগের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পরবর্তীতে তিনি কেন্দ্রীয় পর্যায়ের একটি সচিব কমিটির সঙ্গেও দীর্ঘদিন সম্পৃক্ত ছিলেন। অভিযোগ রয়েছে, এই প্রভাববলয় ব্যবহার করেই তিনি সিএমএসডিতে দীর্ঘ পাঁচ বছর ধরে একই প্রতিষ্ঠানে থেকে প্রশাসনিকভাবে শক্ত অবস্থান তৈরি করেন এবং জ্যেষ্ঠতা উপেক্ষা করে সহকারী পরিচালক (এডি) পদ থেকে সরাসরি উপ-পরিচালক পদে বিধি বহির্ভূতভাবে পদায়ন লাভ করেন।
সূত্রমতে, সিএমএসডিতে দায়িত্ব পালনকালে তিনি নিয়ম-নীতি উপেক্ষা করে বিভিন্ন আর্থিক অনিয়মে জড়িয়ে পড়েন। অভিযোগ রয়েছে, একাধিক ক্ষেত্রে মামলা দায়ের না করেই সংশ্লিষ্ট খাতের অর্থ উত্তোলন করে তা আত্মসাৎ করা হয়েছে। একই সঙ্গে প্রকৃত ক্রয় কার্যক্রম সম্পন্ন না করেই ভাউচার বিল প্রদর্শনের মাধ্যমে সরকারি অর্থ উত্তোলনের অভিযোগও উত্থাপিত হয়েছে। এতে করে দীর্ঘ সময় ধরে তিনি বিপুল পরিমাণ অর্থ নিজের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সুবিধা ভোগ করেছেন বলে অনুসন্ধানে জানা যায়।
বিশেষ করে করোনা মহামারির সময়কার ক্রয় কার্যক্রম নিয়ে সবচেয়ে বেশি প্রশ্ন উঠেছে। সূত্রমতে, এন-৯৫ মাস্ক, রেমডেসিভির ইনজেকশনসহ বিভিন্ন কোভিড-সম্পর্কিত চিকিৎসা সামগ্রী দরপত্রে সম্ভাব্য মূল্য নির্ধারণ না করে অতিরিক্ত পরিমাণে ও উচ্চমূল্যে ক্রয় করা হয়। অধিকাংশ ক্রয়ই সরাসরি ক্রয় পদ্ধতি (ডিপিএম) অনুসরণ করে সম্পন্ন হয়েছে, যা স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার পরিপন্থী বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। অনুসন্ধানে আরো জানা যায়, বর্তমানে এসব সামগ্রীর বড় অংশ ওয়েস্টেজ হিসেবে অল্প মূল্যে বিক্রি করে দেওয়া হয়েছে, আর কিছু মালামাল পুড়িয়ে বা ধ্বংস করা হয়েছে, ফলে সরকারের কোটি কোটি টাকার আর্থিক ক্ষতি হয়েছে।
এছাড়া, বিপুল পরিমাণ ব্যক্তিগত সুরক্ষা সামগ্রী (পিপিই) দীর্ঘদিন ধরে অব্যবহৃত অবস্থায় পড়ে থেকে নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আনুমানিক ১২ লাখ পিপিই, যার বাজারমূল্য কয়েক কোটি টাকা, যথাযথ সংরক্ষণ ও ব্যবস্থাপনার অভাবে পচে নষ্ট হয়ে পড়ে আছে বলে জানা যায়। এসব সামগ্রীর তদারকি তার নিয়ন্ত্রণে থাকলেও কার্যকর কোনো পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।
তথ্য সূত্রে, দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রেও রয়েছে গুরুতর অবহেলার চিত্র। ডাঃ তৌহিদ আহমেদ একজন টেবিল টেনিস খেলোয়াড় হওয়ায় প্রায়ই অফিস সময়ে কাজ বন্ধ রেখে খেলাধুলায় ব্যস্ত থাকেন। অফিস চলাকালীন সময়ে টেবিল টেনিস ও ব্যাডমিন্টন খেলায় অংশ নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে, যা সহকর্মী ও সংশ্লিষ্টদের মধ্যে বিরূপ প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছে।
বিদেশ সফরের ক্ষেত্রেও একাধিক প্রশ্ন উঠেছে। প্রযুক্তিগত কর্মকর্তা না হওয়া সত্ত্বেও তিনি প্রতিবছর সরকারি অর্থে জাপান, জার্মানি সহ বিভিন্ন দেশে সফর করেছেন বলে প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে। বিভিন্ন কমিটির সদস্য হিসেবে থেকে প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ টাকা আর্থিক সুবিধা গ্রহণের অভিযোগও রয়েছে তার বিরুদ্ধে।
অন্যদিকে, সরকারি সম্পদের ব্যবহার নিয়েও গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে। অপারেশন প্ল্যানের গাড়ি, জ্বালানি ও গ্যাস রাজস্ব খাত থেকে ব্যয় দেখানো হলেও তা বিধি বহির্ভূতভাবে ব্যবহৃত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের অন্তর্ভুক্ত দুটি গাড়ি ব্যক্তিগতভাবে ব্যবহার করার অভিযোগও উঠেছে, যার কোনো বৈধ অনুমোদন নেই বলে দাবি করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে আরো জানা যায় যে, ক্রয় কার্যক্রম পরিচালনার পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট মালামালের সার্ভে বা মূল্যায়ন কমিটিতেও তিনি যুক্ত রয়েছেন, যা স্বার্থের সংঘাত সৃষ্টি করেছে। মাঠ পর্যায়ের কমিটির সভাপতির দায়িত্ব পালন করায় একই সঙ্গে দুই দিকেই প্রভাব বিস্তারের সুযোগ তৈরি হয়েছে বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
এছাড়া ২০২৪ সালের ৮ আগস্ট ছাত্রদের এক আন্দোলনে তাকে প্রকাশ্যে দুর্নীতিবাজ হিসেবে আখ্যা দেওয়া হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনেও একাধিক অভিযোগ বিচারাধীন রয়েছে বলেও জানা যায়।
সংশ্লিষ্ট সূত্র অনুযায়ী, সিএমএসডিতে দায়িত্ব পালন করলেও সিলেটে অবস্থান করার কারণে প্রতি সপ্তাহে বিমানে যাতায়াত করেন ডাঃ তৌহিদ আহমেদ, যা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। নিজ বাড়ি ফরিদপুরে থাকা সত্ত্বেও তিনি প্রশাসনিক পরিচয়ে ভিন্ন অবস্থান ব্যবহার করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের বিষয়ে ডাঃ তৌহিদ আহমেদের বক্তব্য তাৎক্ষণিকভাবে পাওয়া যায়নি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক কোনো প্রতিক্রিয়া জানানো হয়নি।
স্বাস্থ্যখাত সংশ্লিষ্ট বিশ্লেষকরা বলছেন, একজন চিকিৎসক তৈরি করতে রাষ্ট্রের বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়। সেই চিকিৎসক যদি জনগণের সেবা নিশ্চিত না করে ব্যক্তিগত স্বার্থে লিপ্ত হন, তাহলে তা শুধু নৈতিক বিচ্যুতি নয়, বরং গোটা স্বাস্থ্যব্যবস্থার জন্য হুমকিস্বরূপ।
এমতাবস্থায়, উত্থাপিত অভিযোগগুলোর নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের দাবি বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট মহল।
নিজস্ব প্রতিবেদক 


















