চট্টগ্রামের রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান কর্ণফুলী গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন কোম্পানি লিমিটেডে (কেজিডিসিএল) সাম্প্রতিক সময়ে দেওয়া একাধিক পদোন্নতিকে কেন্দ্র করে গুরুতর অনিয়ম ও স্বচ্ছতাহীনতার অভিযোগ উঠেছে। এর মধ্যে সবচেয়ে বেশি আলোচনায় এসেছেন মো. ফারুক আহমদ, যিনি সম্প্রতি উপব্যবস্থাপক পদে পদোন্নতি পেয়েছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্র ও অভিযোগকারীদের দাবি, তার বিরুদ্ধে হত্যা মামলাসহ একাধিক গুরুতর ফৌজদারি অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও তা গোপন রেখে তাকে পদোন্নতি দেওয়া হয়েছে, যা সরকারি চাকরি বিধি ও প্রশাসনিক নীতিমালার পরিপন্থী।
সূত্রগুলো বলছে, মো. ফারুক আহমদ আগে কেজিডিসিএলের সহকারী ব্যবস্থাপক (সাধারণ) পদে কর্মরত ছিলেন। সাম্প্রতিক পদোন্নতিতে তিনি উপব্যবস্থাপক হিসেবে দায়িত্ব পান। কিন্তু এই পদোন্নতির আগে তার বিরুদ্ধে চলমান মামলা, রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা এবং অতীতের বিতর্কিত কর্মকাণ্ড যথাযথভাবে যাচাই করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে এবং সংশ্লিষ্ট মহলে তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।
অভিযোগ অনুযায়ী, মো. ফারুক আহমদের বিরুদ্ধে চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া থানায় দায়ের করা একটি হত্যা মামলায় তিনি আসামি। মামলাটি এখনও বিচারাধীন এবং তিনি এ মামলায় জামিন নেননি বলেও সংশ্লিষ্টদের দাবি। সাধারণত, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে কর্মরত কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে এমন গুরুতর ফৌজদারি মামলা থাকলে তা চাকরিজীবনে বড় ধরনের প্রতিবন্ধকতা হিসেবে বিবেচিত হয়। অনেক ক্ষেত্রে সাময়িক বরখাস্ত, বিভাগীয় তদন্ত বা পদোন্নতি স্থগিত রাখার বিধান থাকলেও এই ক্ষেত্রে তা অনুসরণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
আরও অভিযোগ রয়েছে, ২০২৪ সালের জুলাই ও আগস্ট মাসে বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন চলাকালে চট্টগ্রামের বিভিন্ন এলাকায় সংঘটিত সহিংস ঘটনার পর দায়ের হওয়া একাধিক মামলার সঙ্গে মো. ফারুক আহমদের নাম জড়িত। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব মামলার তথ্য গোপন রেখেই তার পদোন্নতির প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হয়। পদোন্নতি বোর্ড বা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে এই তথ্যগুলো উপস্থাপন করা হয়নি, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীরা মনে করছেন।
মো. ফারুক আহমদের বিরুদ্ধে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার অভিযোগও উঠেছে, যা সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা, ১৯৭৯-এর সরাসরি লঙ্ঘন বলে দাবি করা হচ্ছে। অভিযোগ অনুযায়ী, তিনি সরকারি চাকরিতে থাকা অবস্থায় চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া উপজেলার আওয়ামী লীগের শ্রমবিষয়ক সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। বিধিমালায় স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে, কোনো সরকারি কর্মচারী রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত থাকতে পারবেন না কিংবা রাজনৈতিক পদে দায়িত্ব পালন করতে পারবেন না। কিন্তু মো. ফারুক আহমদ এই বিধি লঙ্ঘন করলেও তা গোপন রাখা হয় এবং তার বিরুদ্ধে কোনো দৃশ্যমান ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার বিষয়টি শুধু চাকরির আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং পদোন্নতির ক্ষেত্রে পক্ষপাতিত্ব ও প্রভাব বিস্তারের অভিযোগও সামনে এসেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাব ব্যবহার করে তিনি অতীতে বিভিন্ন সুবিধা পেয়েছেন এবং সর্বশেষ পদোন্নতিও সেই ধারাবাহিকতার অংশ।
সবচেয়ে বিতর্কিত অভিযোগগুলোর একটি হলো চাকরিতে প্রবেশের সময় বয়সসীমা অতিক্রম করার বিষয়টি। সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের বরাত দিয়ে দাবি করা হচ্ছে, মো. ফারুক আহমদের জন্মতারিখ অনুযায়ী তিনি চাকরিতে যোগদানের সময় নির্ধারিত বয়সসীমার বেশি বয়সী ছিলেন। অভিযোগ অনুযায়ী, এই বাধা অতিক্রম করতে তিনি তার পিতার নামে দাখিল করা মুক্তিযোদ্ধা সনদের সুবিধা নেন। পরবর্তীতে মুক্তিযোদ্ধা বিষয়ক মন্ত্রণালয় যাচাই-বাছাই করে ওই সনদটিকে ভুয়া হিসেবে চিহ্নিত করে এবং তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে।
তবে অভিযোগকারীদের মতে, সেই সময় সুপারিশ থাকা সত্ত্বেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। বরং বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যায় এবং মো. ফারুক আহমদ স্বাভাবিকভাবেই চাকরি চালিয়ে যেতে থাকেন। এখন আবার সেই পুরোনো অভিযোগ নতুন করে সামনে আসায় প্রশ্ন উঠেছে, কীভাবে একজন কর্মকর্তা এতগুলো গুরুতর অভিযোগ সত্ত্বেও শুধু চাকরিতে বহাল থাকেননি, বরং পদোন্নতিও পেয়েছেন।
কেজিডিসিএলের অভ্যন্তরীণ কয়েকজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, পদোন্নতির ক্ষেত্রে সাধারণত কর্মীর সার্ভিস রেকর্ড, বার্ষিক গোপনীয় প্রতিবেদন (এসিআর), শৃঙ্খলাজনিত নথি এবং মামলা-মোকদ্দমার তথ্য বিবেচনায় নেওয়ার কথা। কিন্তু মো. ফারুক আহমদের ক্ষেত্রে এসব বিষয় যথাযথভাবে যাচাই করা হয়েছে কি না, তা নিয়ে তারা সন্দেহ প্রকাশ করেন। তাদের মতে, যদি সত্যিই হত্যা মামলা ও অন্যান্য গুরুতর অভিযোগ থেকে থাকে, তাহলে তা উপেক্ষা করে পদোন্নতি দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এদিকে প্রতিষ্ঠানটির বাইরে সুশাসন ও স্বচ্ছতা নিয়ে কাজ করা কয়েকটি সংগঠনও বিষয়টি নজরে নিয়েছে। তাদের দাবি, রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানে এ ধরনের অনিয়ম শুধু একটি ব্যক্তির পদোন্নতির প্রশ্ন নয়, বরং এটি পুরো ব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। তারা মনে করেন, রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক দুর্বলতা এবং জবাবদিহির অভাবের কারণেই এমন ঘটনা বারবার ঘটছে।
অভিযোগের বিষয়ে মো. ফারুক আহমদের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন রিসিভ করেননি। ক্ষুদে বার্তা পাঠানো হলেও তার কোনো জবাব পাওয়া যায়নি। ফলে এসব অভিযোগের বিষয়ে তার সরাসরি বক্তব্য এই প্রতিবেদনে অন্তর্ভুক্ত করা সম্ভব হয়নি।
কেজিডিসিএলের দায়িত্বশীল এক কর্মকর্তা বলেন, পদোন্নতি একটি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সম্পন্ন হয় এবং এতে একাধিক স্তরের অনুমোদন থাকে। তবে নির্দিষ্ট কোনো কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, লিখিত অভিযোগ পেলে তা খতিয়ে দেখা হবে। তিনি আরও জানান, কোনো কর্মীর বিরুদ্ধে আদালতে মামলা চলমান থাকলে তা বিভাগীয়ভাবে বিবেচনায় নেওয়ার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু বাস্তবে কীভাবে তা প্রয়োগ হয়, সে বিষয়ে তিনি বিস্তারিত মন্তব্য করতে রাজি হননি।
আইন বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি বা রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠানের কোনো কর্মচারীর বিরুদ্ধে হত্যা মতো গুরুতর অপরাধের মামলা থাকলে তা চাকরির শর্তাবলীর সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হতে পারে। এমন পরিস্থিতিতে পদোন্নতি দেওয়া হলে তা আইনি চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকেও জবাবদিহির আওতায় আসতে হতে পারে।
সাবেক একজন আমলা জানান, সরকারি কর্মচারী (আচরণ) বিধিমালা ও শৃঙ্খলা বিধি অনুযায়ী, মামলা-মোকদ্দমা, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা এবং ভুয়া সনদের মতো অভিযোগ থাকলে বিভাগীয় তদন্ত হওয়া উচিত। তদন্ত শেষ না হওয়া পর্যন্ত পদোন্নতি স্থগিত রাখাই প্রচলিত রীতি। তিনি মনে করেন, এই ক্ষেত্রে সেই রীতি মানা হয়নি বলেই এত প্রশ্ন উঠছে।
এদিকে স্থানীয় রাজনৈতিক ও সামাজিক অঙ্গনেও বিষয়টি আলোচনার জন্ম দিয়েছে। অনেকেই বলছেন, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সময় সংঘটিত সহিংসতার মামলাগুলো এখনও সংবেদনশীল ইস্যু। সেই সময়ের ঘটনায় অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে রাষ্ট্র যদি কঠোর অবস্থান না নেয়, তাহলে ভবিষ্যতে আন্দোলন ও গণতান্ত্রিক প্রতিবাদ দমন নিয়ে নেতিবাচক বার্তা যাবে।
সব মিলিয়ে মো. ফারুক আহমদকে কেন্দ্র করে ওঠা অভিযোগগুলো কেবল ব্যক্তিগত অনিয়মের প্রশ্ন নয়, বরং কেজিডিসিএলের পদোন্নতি প্রক্রিয়া, অভ্যন্তরীণ নজরদারি এবং প্রশাসনিক জবাবদিহির বিষয়টিকেও সামনে এনেছে। অভিযোগগুলোর সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ তদন্ত না হলে প্রতিষ্ঠানটির ভাবমূর্তি আরও ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে বলে আশঙ্কা প্রকাশ করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় ও দুর্নীতি দমন কমিশনের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন বলে মনে করছেন অনেকে। তাদের মতে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে অভিযোগের সত্যতা যাচাই করা হলে প্রকৃত চিত্র বেরিয়ে আসবে এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। অন্যথায়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানে এমন বিতর্কিত পদোন্নতি ভবিষ্যতে আরও অনিয়মকে উৎসাহিত করতে পারে।
সংবাদ শিরোনাম ::
কেজিডিসিএলে স্বৈারাচারের দোসর ফারুক আহমদের পদোন্নতি
-
নিজস্ব প্রতিবেদক - আপডেট সময় ১২:০৯:৩৮ অপরাহ্ন, বুধবার, ৭ জানুয়ারী ২০২৬
- ৫৯৬ বার পড়া হয়েছে
Tag :
জনপ্রিয় সংবাদ





















