নোয়াখালীর জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ সাম্প্রতিক সময়ে জেলার প্রশাসনিক অঙ্গনে তীব্র আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। সরকারি প্রায় ৫ কোটি ৫৫ লাখ টাকার নির্মাণ সামগ্রী গোপনে মাত্র ১৯ লাখ টাকায় বিক্রি, ঠিকাদারদের সঙ্গে প্রতারণা, ঘুষ বাণিজ্য, উন্নয়ন প্রকল্পে চরম অব্যবস্থাপনা এবং বিপুল অঙ্কের সরকারি বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার মতো একের পর এক অভিযোগে তার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অভিযোগের মাত্রা ও বিস্তৃতি এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, বিষয়টি এখন কেবল একটি দপ্তরের অনিয়ম নয়, বরং পুরো সরকারি ক্রয় ও নিলাম ব্যবস্থার স্বচ্ছতা নিয়েই জনমনে সন্দেহ তৈরি করেছে।
স্থানীয় সূত্র ও অভিযোগপত্র থেকে জানা যায়, নোয়াখালীতে ড্যানিডা প্রকল্পের আওতায় দীর্ঘদিন ধরে বিভিন্ন উন্নয়নমূলক কাজে ব্যবহারের জন্য বিপুল পরিমাণ পাইপ ও নির্মাণ সামগ্রী মজুদ ছিল। এসব সামগ্রীর আনুমানিক বাজারমূল্য ছিল প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকারও বেশি। নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় সংলগ্ন একটি সরকারি গুদামে এসব মালামাল সংরক্ষিত ছিল বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। নিয়ম অনুযায়ী, এত বড় অঙ্কের সরকারি মালামাল নিলামে বিক্রি করতে হলে ব্যাপক প্রচার, একাধিক জাতীয় ও আঞ্চলিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং প্রতিযোগিতামূলক দরপত্র নিশ্চিত করার কথা। কিন্তু অভিযোগ উঠেছে, সেই নিয়ম-কানুনকে তোয়াক্কা না করেই অত্যন্ত গোপনীয়তার সঙ্গে নিলামের আয়োজন করা হয়।
অভিযোগে বলা হয়, নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম ও তার সঙ্গে যুক্ত কিছু অসাধু কর্মকর্তা পরিকল্পিতভাবে একটি নামমাত্র পত্রিকায় নিলামের বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করেন, যাতে অধিকাংশ ঠিকাদার ও আগ্রহী প্রতিষ্ঠান বিষয়টি জানতে না পারে। ফলে প্রকৃত প্রতিযোগিতা ছাড়াই একটি নির্দিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য নিলামের পথ সুগম করা হয়। এর ফল হিসেবে ২০২৪ সালের ২০ অক্টোবর ‘মেসার্স শাহনাজ’ নামের একটি প্রতিষ্ঠানের কাছে প্রায় ৬ কোটি টাকার সমপরিমাণ মালামাল মাত্র ১৮ লাখ ৮৫ হাজার টাকায় বিক্রি করে দেওয়া হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। এই অস্বাভাবিকভাবে কম মূল্যে বিক্রির ঘটনা জানাজানি হওয়ার পরপরই জেলার ঠিকাদারি মহলে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।
নিলামের পর রাতারাতি গুদাম থেকে প্রায় ১৫ লাখ ২০ হাজার ফুট পাইপসহ অন্যান্য মূল্যবান সামগ্রী সরিয়ে ফেলা হয় বলে অভিযোগে উল্লেখ করা হয়েছে। স্থানীয়রা বলছেন, এত বিপুল পরিমাণ মালামাল সরিয়ে নিতে যে পরিমাণ যানবাহন ও জনবল প্রয়োজন, তা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অজান্তে হওয়া প্রায় অসম্ভব। ফলে পুরো প্রক্রিয়াটিই পূর্বপরিকল্পিত ছিল বলে তারা ধারণা করছেন। বিষয়টি প্রকাশ্যে আসার পর ঠিকাদার সমিতির সদস্যরা একত্রিত হয়ে নির্বাহী প্রকৌশলীর দপ্তরে গিয়ে প্রতিবাদ জানান।
রবিবার দিনভর ঠিকাদাররা নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামকে তার কার্যালয়ে অবরুদ্ধ করে রাখেন বলে জানা যায়। তারা অভিযোগ করেন, এই নিলামের মাধ্যমে শুধু সরকারি কোষাগারের বড় ধরনের ক্ষতিই হয়নি, বরং স্থানীয় ঠিকাদারদেরও পরিকল্পিতভাবে বঞ্চিত করা হয়েছে। অনেক ঠিকাদার দাবি করেন, তারা নিয়মিতভাবে দপ্তরের সঙ্গে কাজ করলেও নিলামের কোনো তথ্য তাদের জানানো হয়নি। এতে স্পষ্ট হয় যে, নিলামটি উন্মুক্ত ও স্বচ্ছ প্রক্রিয়ায় হয়নি।
ঠিকাদারদের ক্ষোভ এতটাই তীব্র ছিল যে, তারা নির্বাহী প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানান। তাদের ভাষায়, এটি কোনো সাধারণ অনিয়ম নয়, বরং রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটপাটের শামিল। একাধিক ঠিকাদার অভিযোগ করেন, এর আগেও বিভিন্ন প্রকল্পে কাজের কার্যাদেশ পেতে তাদের ঘুষ দিতে হয়েছে। যারা ঘুষ দিতে অস্বীকৃতি জানিয়েছেন, তাদের কাজের ফাইল মাসের পর মাস আটকে রাখা হয়েছে।
মেসার্স এস এম এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী মো. দুলাল ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, তার তিন দশকের ঠিকাদারি জীবনে এমন প্রকাশ্য দুর্নীতি তিনি আগে দেখেননি। তিনি জানান, জুলাই আন্দোলনের পর তিনি আশা করেছিলেন প্রশাসনে কিছুটা হলেও শৃঙ্খলা ফিরবে এবং অনিয়ম কমবে। কিন্তু বাস্তবে পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। তার মতে, যদি এই ঘটনায় দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি না হয়, তাহলে ভবিষ্যতে আরও বড় ধরনের দুর্নীতির পথ খুলে যাবে।
অভিযোগ শুধু নিলাম কেলেঙ্কারিতেই সীমাবদ্ধ নয়। নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে আরও গুরুতর অভিযোগ রয়েছে যে, তার অব্যবস্থাপনা ও অনিয়মের কারণে প্রায় ৯০ কোটি টাকার সরকারি বরাদ্দ সময়মতো খরচ না হওয়ায় ফেরত চলে গেছে। উন্নয়ন প্রকল্পে এমন বিপুল অঙ্কের বরাদ্দ ফেরত যাওয়া মানে হলো, সংশ্লিষ্ট এলাকার মানুষ কাঙ্ক্ষিত সেবা ও সুবিধা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও অবকাঠামো উন্নয়নের মতো গুরুত্বপূর্ণ খাতে এই বরাদ্দ ব্যবহৃত হওয়ার কথা ছিল বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে।
স্থানীয় সচেতন মহল বলছেন, একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর দায়িত্ব শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, বরং সরকারি সম্পদের সঠিক ব্যবহার নিশ্চিত করা। সেখানে যদি তিনি নিজেই দুর্নীতির সঙ্গে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে পুরো ব্যবস্থাই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে। তারা আরও বলেন, সরকারি দপ্তরে এ ধরনের দুর্নীতি চলতে থাকলে সাধারণ মানুষের আস্থা মারাত্মকভাবে ক্ষুণ্ন হবে।
এই ঘটনার পরদিন সোমবার সকাল ৯টা থেকে বিকেল ৫টা পর্যন্ত নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামকে তার কার্যালয়ে পাওয়া যায়নি। এতে করে গুঞ্জন আরও জোরালো হয় যে, তিনি আত্মগোপনে রয়েছেন। স্থানীয় ঠিকাদারদের একটি অংশ দাবি করেন, চাপের মুখে পড়ে তিনি পলাতক হয়েছেন। তবে এ বিষয়ে দপ্তরের ভেতরে ও বাইরে নানা ধরনের কথা শোনা গেলেও সুনির্দিষ্ট কোনো তথ্য তখন পাওয়া যায়নি।
অভিযোগের বিষয়ে প্রতিক্রিয়া জানতে চাইলে নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলাম মুঠোফোনে দাবি করেন, নিলাম প্রক্রিয়া ঢাকায় বসেই সম্পন্ন হয়েছে এবং এতে তার কোনো প্রত্যক্ষ ভূমিকা নেই। তিনি বলেন, তিনি পলাতক নন, বরং সাইট পরিদর্শনে ছিলেন। তার ভাষ্য অনুযায়ী, একটি মহল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে তাকে হেয় করার চেষ্টা করছে। তবে তার এই বক্তব্যে ঠিকাদাররা সন্তুষ্ট নন। তাদের প্রশ্ন, যদি নিলাম ঢাকায় হয়ে থাকে, তাহলে স্থানীয়ভাবে গোপনে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ ও রাতারাতি মালামাল সরানোর বিষয়টি কীভাবে ঘটল।
এদিকে ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর সাধারণ মানুষের মধ্যেও তীব্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই এই নিলাম কেলেঙ্কারিকে রাষ্ট্রীয় সম্পদ লুটের উদাহরণ হিসেবে উল্লেখ করছেন। কেউ কেউ দাবি করছেন, শুধু একজন কর্মকর্তাকে দায়ী করলেই হবে না, এর সঙ্গে জড়িত সবাইকে আইনের আওতায় আনতে হবে। তারা মনে করেন, প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের মাধ্যমে এ ধরনের দুর্নীতি সংঘটিত হয় এবং এককভাবে একজন কর্মকর্তার পক্ষে এত বড় অনিয়ম করা সম্ভব নয়।
সুশাসন ও দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলোর প্রতিনিধিরাও বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখছেন। তাদের মতে, নিলাম প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হলে ভবিষ্যতে সরকারি সম্পদের অপব্যবহার আরও বাড়বে। তারা দ্রুত স্বাধীন ও নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নিলামের পুরো প্রক্রিয়া, দরপত্র আহ্বান, বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ এবং মালামাল হস্তান্তরের সব নথি জনসম্মুখে প্রকাশ করার আহ্বান জানানো হয়েছে।
প্রশাসনিক সূত্রগুলো বলছে, বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এসেছে এবং প্রাথমিকভাবে কিছু তথ্য সংগ্রহ করা হচ্ছে। তবে এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে তদন্ত কমিটি গঠনের ঘোষণা আসেনি। এ অবস্থায় স্থানীয়রা আশঙ্কা করছেন, যথাযথ তদন্ত না হলে বিষয়টি ধামাচাপা পড়ে যেতে পারে। অতীত অভিজ্ঞতা থেকে তারা বলছেন, অনেক সময় আলোচিত দুর্নীতির অভিযোগ শুরুতে বড় হৈচৈ তৈরি করলেও শেষ পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো শাস্তি দেখা যায় না।
নোয়াখালীর মতো একটি উন্নয়নবঞ্চিত এলাকায় জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। নিরাপদ পানি, স্যানিটেশন ও অবকাঠামো উন্নয়নের ওপর মানুষের জীবনযাত্রার মান অনেকটাই নির্ভর করে। সেখানে যদি দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন, তাহলে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে সাধারণ মানুষের ওপর। এই কারণেই মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগকে অনেকেই শুধু ব্যক্তিগত অনিয়ম নয়, বরং জনস্বার্থের বিরুদ্ধে অপরাধ হিসেবে দেখছেন।
ঠিকাদাররা আরও অভিযোগ করেছেন, দপ্তরে একটি ভয়ভীতির পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। কেউ মুখ খুললেই তাকে কাজ থেকে বঞ্চিত করা হয় বা নানাভাবে হয়রানি করা হয়। ফলে অনেকেই প্রকাশ্যে অভিযোগ করতে সাহস পান না। এই নিলাম কেলেঙ্কারির ঘটনা প্রকাশ্যে আসায় তারা কিছুটা হলেও আশাবাদী যে, এবার হয়তো সত্য উদঘাটিত হবে।
সব মিলিয়ে নোয়াখালীতে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী মো. সাইফুল ইসলামের বিরুদ্ধে ওঠা দুর্নীতির অভিযোগ এখন জেলার অন্যতম আলোচিত বিষয়। সরকারি প্রায় সাড়ে পাঁচ কোটি টাকার মালামাল নামমাত্র মূল্যে বিক্রি, উন্নয়ন বরাদ্দের অপচয় এবং ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতাকে নতুন করে প্রশ্নের মুখে দাঁড় করিয়েছে। এখন দেখার বিষয়, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এই অভিযোগের কতটা গভীরে গিয়ে তদন্ত করে এবং দোষীদের বিরুদ্ধে কী ধরনের ব্যবস্থা নেয়। সাধারণ মানুষ ও ঠিকাদাররা অপেক্ষা করছেন, এই ঘটনায় আদৌ কোনো দৃষ্টান্তমূলক বিচার হবে কি না, নাকি এটি আর দশটি দুর্নীতির অভিযোগের মতোই সময়ের স্রোতে হারিয়ে যাবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 




















