গণপূর্ত অধিদপ্তরের নাম বাংলাদেশের দুর্নীতির ইতিহাসে নতুন নয়। তবে কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের প্রাক্তন নির্বাহী প্রকৌশলী মোঃ জাহিদুল ইসলামকে ঘিরে ওঠা অভিযোগগুলো এই দুর্নীতির চিত্রকে আরও স্পষ্ট ও গভীর করে তুলেছে। সীমিত বেতনের একজন সরকারি প্রকৌশলী কীভাবে অল্প কয়েক বছরের ব্যবধানে শত কোটি টাকার সম্পদের মালিক হয়ে ওঠেন—এই প্রশ্ন এখন কুষ্টিয়া ছাড়িয়ে প্রশাসনের উচ্চপর্যায় পর্যন্ত আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্যে জানা যায়, কুষ্টিয়ায় কর্মরত অবস্থায় মোঃ জাহিদুল ইসলাম একাধিক গুরুত্বপূর্ণ উন্নয়ন প্রকল্পের দায়িত্বে ছিলেন। এই দায়িত্বকে কেন্দ্র করেই গড়ে ওঠে অভিযোগের দীর্ঘ তালিকা—টেন্ডার কারসাজি, সিন্ডিকেট তৈরি, সর্বনিম্ন দরদাতাকে বঞ্চিত করা, একই প্রকল্পে বারবার কাজ দেখিয়ে অর্থ আত্মসাৎ এবং রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে প্রশাসনিক নীরবতা নিশ্চিত করা। অভিযোগকারীদের মতে, এসব অনিয়ম কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়; বরং এটি ছিল একটি ধারাবাহিক ও পরিকল্পিত দুর্নীতির কাঠামো।
সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগ উঠেছে কুষ্টিয়া মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল স্থাপন প্রকল্পকে কেন্দ্র করে। এই প্রকল্পে মোঃ জাহিদুল ইসলামের ভূমিকা ছিল মুখ্য। অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের বিভিন্ন দরপত্রে সরকারি বিধি লঙ্ঘন করে পছন্দের ঠিকাদারদের কাজ দেওয়া হয়। সর্বনিম্ন দরদাতা হওয়া সত্ত্বেও একাধিক প্রতিষ্ঠানকে ইচ্ছাকৃতভাবে বাদ দেওয়া হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দরপত্র নিষ্পত্তিতে অকারণে তিন থেকে চার মাস পর্যন্ত সময় নেওয়া হতো এবং কমিশন ছাড়া কোনো ফাইল অগ্রসর হতো না।
এই প্রকল্পে একাডেমিক ভবনের লিফট, হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার, আইসিইউ ও সিসিইউ ভবনের লিফটসহ গুরুত্বপূর্ণ কাজগুলো বারবার বেশি দামে নির্দিষ্ট কিছু ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ। সুপারস্টার ইঞ্জিনিয়ারিং, ক্রিয়েটিভ ইঞ্জিনিয়ারিংসহ কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের নাম বারবার উঠে এসেছে, যাদের সিন্ডিকেটভুক্ত বলে দাবি করেছেন বঞ্চিত ঠিকাদাররা। এর ফলে সরকারকে কোটি কোটি টাকা অতিরিক্ত ব্যয় করতে হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য অনুযায়ী, মোঃ জাহিদুল ইসলাম রাজনৈতিক প্রভাবকে নিজের জন্য একটি সুরক্ষাকবচ হিসেবে ব্যবহার করেছেন। ক্ষমতাসীন দলের প্রভাবশালী নেতা মাহবুব উল আলম হানিফের ঘনিষ্ঠতার কথা উল্লেখ করে তারা দাবি করেন, এই ছত্রছায়ার কারণেই তার বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগগুলো দীর্ঘদিন গুরুত্ব পায়নি। স্থানীয় উপজেলা চেয়ারম্যান আতাউর রহমান আতা-কে সঙ্গে নিয়ে টেন্ডার বণ্টনের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে তোলা হয়, যার বাইরে থাকা ঠিকাদারদের জন্য কাজ পাওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।
মেডিকেল কলেজ প্রকল্পের বাইরে অন্যান্য আনুষঙ্গিক কাজেও একই ধরনের অনিয়মের অভিযোগ পাওয়া গেছে। সড়ক, ড্রেন, পুকুর খননসহ বিভিন্ন ছোট-বড় প্রকল্পে সর্বনিম্ন দরদাতাকে বাদ দিয়ে বেশি দামে কাজ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। মেসার্স শামীম এন্টারপ্রাইজ নামের একটি প্রতিষ্ঠান সর্বনিম্ন দরদাতা হয়েও একাধিকবার কাজ পায়নি বলে জানিয়েছে। তাদের পরিবর্তে গ্যালাক্সি অ্যাসোসিয়েটস নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে কাজ দেওয়া হয়, যাদের হাতে তখনই প্রায় ৫০ কোটি টাকার প্রকল্প চলমান ছিল।
একই অনিয়মের ধারা কুষ্টিয়ার নতুন সার্কিট হাউস ও মডেল মসজিদ নির্মাণ প্রকল্পেও বজায় ছিল বলে অভিযোগ। অভিযোগকারীরা জানান, একই ঠিকাদার গোষ্ঠীকে বারবার কাজ দেওয়ার মাধ্যমে একটি নির্দিষ্ট চক্রকে লাভবান করা হয়েছে। এসব বিষয়ে গণপূর্ত অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ ও জেলা প্রশাসনের কাছে লিখিত অভিযোগ জমা দেওয়া হলেও কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
সবচেয়ে বিস্ময়কর ও উদ্বেগজনক অভিযোগ উঠেছে তথাকথিত ‘ওভারল্যাপিং টেন্ডার’-এর মাধ্যমে সরকারি অর্থ লোপাটের বিষয়ে। অনুসন্ধানে জানা যায়, কুষ্টিয়া গণপূর্ত বিভাগের একটি ৪০ বছর পুরনো উপ-বিভাগীয় প্রকৌশলীর সরকারি বাসভবনের কাঠামো পরিবর্তনের নামে একাধিকবার দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই ভবনে একই অর্থবছরের মধ্যে বারবার মেরামতের নামে নতুন টেন্ডার ডেকে অর্থ উত্তোলন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
ডিসি অফিসের বাউন্ডারী ওয়াল নির্মাণেও একই ধরনের অভিযোগ পাওয়া গেছে। একই অর্থবছরে একাধিকবার নির্মাণ বা সংস্কারের নামে টেন্ডার আহ্বান করে টাকা তোলা হয় বলে অভিযোগ। সদর হাসপাতাল, জজ কোর্ট, ডিসি অফিসসহ জেলার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনায় একই প্রকল্পে বারবার কাজ দেখিয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করা হয়েছে বলে অভিযোগকারীদের দাবি। তারা বলছেন, এটি একটি সুপরিকল্পিত পদ্ধতি, যা দীর্ঘদিন ধরে চলেছে।
এই দুর্নীতির সঙ্গে সঙ্গে মোঃ জাহিদুল ইসলামের সম্পদের বিষয়টিও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অনুসন্ধানে জানা যায়, খুলনার জোড়াকল বাজার এলাকায় তার মালিকানাধীন একটি বহুতল ভবন রয়েছে। এছাড়া তার নামে ও পরিবারের সদস্যদের নামে বিভিন্ন জায়গায় জমি ও অন্যান্য সম্পদের তথ্য পাওয়া গেছে বলে অভিযোগ। একজন নির্বাহী প্রকৌশলীর বৈধ আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
স্থানীয় সচেতন নাগরিক ও ঠিকাদারদের মতে, মোঃ জাহিদুল ইসলামের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে কথা বলার সাহস অনেকেরই ছিল না। রাজনৈতিক প্রভাব, প্রশাসনিক যোগাযোগ ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের কারণে একটি নীরবতার সংস্কৃতি তৈরি হয়েছিল। ফলে অভিযোগ থাকলেও তা কার্যকর তদন্তে রূপ নেয়নি।
এ বিষয়ে মোঃ জাহিদুল ইসলামের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগে কোনো মন্তব্য করতে অস্বীকৃতি জানান। তার এই নীরবতা অভিযোগগুলোকে আরও জোরালো করেছে বলে মনে করছেন অনেকেই।
দুর্নীতি দমন কমিশন ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকেও এখন পর্যন্ত কোনো স্পষ্ট অবস্থান জানা যায়নি। ফলে জনমনে প্রশ্ন উঠেছে—একজন সরকারি প্রকৌশলীর বিরুদ্ধে এত গুরুতর অভিযোগ ওঠার পরও কেন প্রশাসন নিশ্চুপ থাকে? এই নীরবতা কি কেবল ব্যক্তিগত ব্যর্থতা, নাকি প্রাতিষ্ঠানিক দুর্বলতার প্রতিফলন?
জনস্বার্থে এখন সবচেয়ে বড় দাবি হলো নিরপেক্ষ ও স্বচ্ছ তদন্ত। মোঃ জাহিদুল ইসলামের সম্পদের প্রকৃত উৎস কী, তার দায়িত্বে থাকা প্রকল্পগুলোতে কীভাবে বারবার একই অনিয়ম ঘটেছে এবং এর পেছনে কারা কারা জড়িত—এই প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজে বের করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কুষ্টিয়ার এই ঘটনা শুধু একটি জেলার গল্প নয়; এটি দেশের উন্নয়ন ব্যবস্থার স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতার একটি বড় পরীক্ষা।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























