এক যুগ ধরে একই কর্মস্থলে অবস্থান করে খুলনা গণপূর্ত বিভাগে একটি অদৃশ্য কিন্তু শক্তিশালী সিন্ডিকেট গড়ে ওঠার অভিযোগ উঠেছে। এই সিন্ডিকেটের কেন্দ্রে রয়েছেন আওয়ামী ঘরানার প্রভাবশালী ঠিকাদার শওকত এবং গণপূর্ত বিভাগের ডিপ্লোমা প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম। অভিযোগ অনুযায়ী, এই দুই ব্যক্তির নেতৃত্বেই খুলনার গুরুত্বপূর্ণ সরকারি স্থাপনা, বিশেষ করে খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ একাধিক উন্নয়ন প্রকল্পে বছরের পর বছর ধরে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, অথচ বাস্তবে উন্নয়নের কোনো দৃশ্যমান চিহ্ন নেই।
দক্ষিণাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসার শেষ আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিচিত খুলনা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বর্তমান অবস্থা তারই প্রমাণ। চারটি ব্লকের ভেতরের অবকাঠামো, ওয়াশরুম, ড্রেনেজ ও পয়োনিষ্কাশন ব্যবস্থা দীর্ঘদিন ধরে চরম বেহাল অবস্থায় রয়েছে। রোগীর স্বজনরা অভিযোগ করেন, বর্ষা মৌসুমে হাসপাতালের ভেতরে নোংরা পানি জমে থাকে, দুর্গন্ধে ওয়ার্ডে থাকা দায় হয়ে পড়ে। অথচ কাগজে-কলমে হাসপাতাল উন্নয়নের নামে প্রতি বছর গণপূর্ত বিভাগের বার্ষিক উন্নয়ন পরিকল্পনা, স্বাস্থ্য খাতের বিশেষ বরাদ্দ এবং বিশ্বব্যাংকের অনুদান থেকে কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ দেখানো হয়েছে।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, টেন্ডার শিডিউল ও প্রকল্প নথিতে একই ধরনের কাজ বারবার দেখানো হয়েছে। কখনো ওয়াশরুম সংস্কার, কখনো ড্রেনেজ উন্নয়ন, কখনো পয়োনিষ্কাশন মেরামতের নামে একই কাজ ঘুরিয়ে-ফিরিয়ে উপস্থাপন করা হয়েছে। বাস্তবে অনেক ক্ষেত্রে কাজ না করেই ভুয়া বিল সাবমিট করা হয়েছে বলে অভিযোগ। মেজারমেন্ট বুক এন্ট্রি ছাড়াই বিল উত্তোলন, কাজের পরিমাণের সঙ্গে বিলের অংকের অসঙ্গতি এবং নকশার বাইরে কাজ দেখিয়ে টাকা নেওয়ার পদ্ধতি দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে। এই পুরো প্রক্রিয়ার নেপথ্য পরিকল্পনাকারী ও বাস্তব নিয়ন্ত্রক হিসেবে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের নাম বারবার উঠে এসেছে।
স্থানীয় ঠিকাদারদের ভাষ্য অনুযায়ী, গণপূর্ত বিভাগের কোনো বড় কাজ পেতে হলে শওকত–সাইফুল সিন্ডিকেটের বাইরে যাওয়ার সুযোগ নেই। আওয়ামী ঘরানার ঠিকাদার শওকত দীর্ঘদিন ধরে খুলনার গণপূর্ত সংশ্লিষ্ট কাজের বড় অংশ নিয়ন্ত্রণ করছেন। অভিযোগ রয়েছে, টেন্ডার ম্যানেজ করা থেকে শুরু করে এস্টিমেট বাড়ানো, কাজের অনুমোদন ও বিল ছাড়—সবকিছুই এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পরিচালিত হয়। যারা সিন্ডিকেটের নিয়ম মেনে চলেন না, তারা নানাভাবে হয়রানির শিকার হন কিংবা ভবিষ্যৎ কাজ থেকে বঞ্চিত হন।
এই সিন্ডিকেট টিকে থাকার পেছনে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রেখেছে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলামের দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে অবস্থান। গণপূর্ত বিভাগের নীতিমালা অনুযায়ী নির্দিষ্ট সময় পর পর প্রকৌশলীদের বদলি হওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে সাইফুল ইসলাম প্রায় এক যুগ ধরে খুলনায় কর্মরত। মাঝেমধ্যে তাকে অন্য জেলায় বা ঢাকায় বদলির আদেশ দেওয়া হলেও রহস্যজনকভাবে অল্প সময়ের মধ্যেই সেই আদেশ বাতিল হয়ে তিনি আবার খুলনায় ফিরে আসেন।
প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, নভেম্বর ২০২০ সালে তাকে বাগেরহাটে বদলি করা হলেও মাত্র দুই মাসের মধ্যেই রাজনৈতিক তদবিরে তিনি আবার খুলনায় প্রত্যাবর্তন করেন। পরবর্তীতে ১০ জুলাই ২০২৫ তাকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-১ এ বদলি করা হয়। একই বছরের ২২ অক্টোবর তাকে ঢাকার রক্ষণাবেক্ষণ বিভাগে সংযুক্ত করা হলেও ৯ নভেম্বর ২০২৫ আবারও তাকে খুলনায় ফিরিয়ে আনা হয়। চার মাসের মধ্যে দুই দফা বদলি বাতিল ও পুনর্বহাল প্রশাসনিক স্বচ্ছতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলেছে। অভিযোগ রয়েছে, এই বদলি বাতিল ও পুনর্বহালের পেছনে ৩০ লাখ টাকার বেশি তদবির খরচ হয়েছে, যা তিনি নিজেই ঘনিষ্ঠ মহলে স্বীকার করেছেন বলে দাবি করা হয়েছে।
এই দীর্ঘদিনের ক্ষমতাকেন্দ্রিক অবস্থানের ফল হিসেবে সাইফুল ইসলামের সম্পদের পরিমাণও বিস্ময়কর। অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, পটুয়াখালীর বাউফলে তার নামে একটি দৃষ্টিনন্দন ভবন রয়েছে, গ্রামের বাড়িতে রয়েছে প্রায় ১৫ বিঘা জমি, বরিশালে রয়েছে একটি বহুতল ভবন, খুলনার নিরালা আবাসিক এলাকায় ফ্ল্যাট এবং ঢাকায় রয়েছে একাধিক বিলাসবহুল ফ্ল্যাট। সংশ্লিষ্টদের মতে, একজন ডিপ্লোমা প্রকৌশলীর সরকারি বেতনের সঙ্গে এই সম্পদের কোনো সামঞ্জস্য নেই।
বিশ্বব্যাংক অর্থায়িত প্রকল্পেও এই সিন্ডিকেটের অনিয়মের অভিযোগ উঠে এসেছে। ‘কোভিড-১৯ জরুরি প্রতিক্রিয়া প্রকল্প’-এর আওতায় বাস্তবায়িত ইজিপি-৯১৭৩৪০ ও ইজিপি-৯২৪৯২৪ নম্বর প্রকল্প পরিদর্শন করে এফএপিএডি অডিট টিম ৪৪ লাখ ১০ হাজার ৫১ টাকা আত্মসাতের লিখিত আপত্তি তোলে। ১৮ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে অডিট কর্মকর্তা কৈলেশ চন্দ্র দাসের স্বাক্ষরিত নথিতে কাজের পরিমাণ ও বিলের অংকের মধ্যে গুরুতর অসঙ্গতির কথা উল্লেখ করা হয়। অডিট আপত্তিতে বলা হয়, বাস্তবে কাজ না করেই বা আংশিক কাজ করে পুরো বিল উত্তোলন করা হয়েছে।
সিন্ডিকেটের কার্যক্রমের প্রমাণ হিসেবে ঠিকাদারদের বক্তব্যও সামনে এসেছে। এস এন বিল্ডার্সের স্বত্বাধিকারী অভিযোগ করেন, নকশাবহির্ভূত ও অস্বাভাবিক এস্টিমেট নিয়ে প্রশ্ন তুললে প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম তাকে এসব বিষয়ে ঘাঁটাঘাঁটি না করতে বলেন। তিনি যতটুকু কাজ দেখিয়েছেন, ঠিকাদার ততটুকুই করেছেন বলেও স্বীকারোক্তি দেন। এই বক্তব্য সিন্ডিকেটভিত্তিক কাজের একটি স্পষ্ট ইঙ্গিত দেয়।
বর্তমানে খুলনা গণপূর্ত বিভাগ-১ এর আওতায় একটি ১৭ তলা ক্যানসার চিকিৎসা কেন্দ্রসহ ২২টি প্যাকেজে প্রায় ১৩৫ কোটি টাকার প্রকল্প বাস্তবায়নাধীন। এই বিশাল প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের সুপারভিশনের দায়িত্বেও রয়েছেন প্রকৌশলী সাইফুল ইসলাম। অভিযোগ রয়েছে, কাজ শেষ না করেই অগ্রিম বিল পরিশোধ, নিম্নমানের নির্মাণসামগ্রী ব্যবহার এবং দরজার কাঠে বার্মাটিক থাকা সত্ত্বেও অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। একাধিক ঠিকাদারের ভাষায়, এই প্রকৌশলীর হাতে প্রকল্প নিরাপদ নয়।
সব মিলিয়ে খুলনা গণপূর্তে শওকত–সাইফুল সিন্ডিকেট শুধু একটি দপ্তরের অনিয়ম নয়, বরং এটি রাষ্ট্রীয় উন্নয়ন ব্যবস্থার গভীরে গেঁথে থাকা দুর্নীতির প্রতিচ্ছবি। কোটি কোটি টাকা ব্যয়ে হাসপাতাল ও স্বাস্থ্য প্রকল্প বাস্তবায়নের দাবি থাকলেও বাস্তবে সাধারণ মানুষ পাচ্ছে অব্যবস্থাপনা ও ভোগান্তি। সংশ্লিষ্ট মহলের প্রশ্ন, এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে আদৌ কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না, নাকি সবকিছু আগের মতোই অদৃশ্য ছাতার নিচে ঢাকা পড়ে থাকবে।
নিজস্ব প্রতিবেদক 

























