ঢাকা ০৫:০৬ অপরাহ্ন, শনিবার, ২৫ এপ্রিল ২০২৬, ১২ বৈশাখ ১৪৩৩ বঙ্গাব্দ
সংবাদ শিরোনাম ::
৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা লালপুরে প্রাথমিক বিদ্যালয় গোল্ডকাপ ফুটবল টুর্নামেন্ট ২০২৬ এর উদ্বোধন বাংলাদেশি কর্মী নিয়োগে ‘তুরাপ’ প্রকল্প থেকে সরে দাঁড়িয়েছে মালয়েশিয়া মেয়ের স্বামীর সঙ্গে শাশুড়ী ওমরায় যেতে পারবেন? রামপালে ভুয়া ফেসবুক আইডি খুলে অপপ্রচার: সংবাদ সম্মেলনে প্রতিবাদ ৯৯৯-এ ফোন, ঘরের দরজা ভেঙে শ্রমিকের মরদেহ উদ্ধার ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান আবারও প্রমাণ করেছে, রাষ্ট্রের প্রকৃত মালিক জনগণ’ জামায়াত এমপির ওপর হামলা, গ্রেপ্তার ৯ যুদ্ধের ডামাডোল পেরিয়ে হজে যাচ্ছেন ৩০ হাজার ইরানি ট্রান্সফর্মার চুরি করতে গিয়ে প্রাণ গেল যুবকের
একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ

বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে ফের নিয়োগের তোড়জোড়

একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ, কোটি টাকার অর্থ আত্মসাতের অডিট প্রতিবেদন, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তাধীন মামলা এবং সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষককে ফের স্বপদে পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। গত ১৭ ডিসেম্বর শিক্ষা বোর্ডের আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন বোর্ডের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তে অনেকটা হতবাক হয়েছেন বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, স্থানীয় এলাকাবাসী ও পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি। তারা বলছেন, অভিযুক্ত শিক্ষক ফের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলে স্থানীয়রা তাকে মেনে নেবে না। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম মো. আজিজুল হক। তিনি কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা হাজী মোহাম্মদ সাঁচি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক। সংশ্লিষ্ট নথি ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক গত ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক আজিজুল হককে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার দাবি জানানো হয়। আবেদনে বলা হয়, আজিজুল হক ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট সাত দিনের চিকিৎসা ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে তিনি আর বিদ্যালয়ে যোগদান করেননি। অতিরিক্ত ২৫ দিনের ছুটির আবেদন করলেও দাখিল করা চিকিৎসা সনদে অসংগতি পাওয়া যায় এবং ওই ছুটি তৎকালীন সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুমোদন দেননি। এরপর থেকে তিনি বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বিদ্যালয়ে যোগদানের জন্য তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও কোনো লিখিত জবাব না পাওয়ায় আইনি নোটিশ পাঠানো হয় এবং রামু থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত অ্যাডহক কমিটির সভার সিদ্ধান্তে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাময়িক বরখাস্ত থাকা সত্ত্বেও আজিজুল হক নিজেকে ‘বর্তমান প্রধান শিক্ষক’ পরিচয় দিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের ইএমআইএস ব্যবস্থার পাসওয়ার্ড পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, যা শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিধিবহির্ভূত। পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি পেশাগত নিরীক্ষা ফার্মের মাধ্যমে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের অডিট করানো হয়। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক বিভিন্ন খাতে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯০২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই প্রতিবেদন পরিচালনা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং অডিট আপত্তির বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়। তবে নোটিশ গ্রহণ করলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। অডিট আপত্তির ব্যাখ্যা না দেওয়ায় পরিচালনা কমিটি তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাদী হয়ে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্তাধীন রয়েছে। আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলায় নিবন্ধনধারী হলেও সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) পদে সাজেদা বেগম নামে এক শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মূল প্যাটার্নে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্তির চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) তদন্ত করে সাজেদা বেগমের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বাতিল করে এবং সনদ ব্যবহারকে ফৌজদারি অপরাধ ঘোষণা করে। নথি অনুযায়ী, এ অনিয়মে সরকারের আনুমানিক ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এতসব অভিযোগ, অডিটে প্রমাণিত অর্থ আত্মসাৎ, দুদকের মামলা ও পরিচালনা কমিটির স্থায়ী বরখাস্তের আবেদনের পরও আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন বোর্ডের মাধ্যমে তাকে ফের পদায়নের সিদ্ধান্ত দেওয়ায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, এলাকাবাসী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. আব্দুল মজিদ ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য প্রকৌশলী সোহেল শাহরিয়ার বলেন, আজিজুল হক ২০১০ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন। প্রথম দুই বছর স্বচ্ছভাবে সবকিছু করেছেন। ২০১২ সাল থেকে ধীরে ধীরে অনিয়ম শুরু করেন। স্থানীয় এমপি ওনার বাল্যবন্ধু হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিয়মনীতি অমান্য করতে শুরু করেন। কোনো কিছুরই বিল-ভাউচার রাখতেন না। রেজিস্ট্রেশন বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে রশিদ ছাড়াই বোর্ড নির্ধারিত ফির তিন চারগুণ নিতেন। কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস করত না। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর স্থানীয়রা যখন হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, তখন তিনি এক রাতে স্কুলের সব কাগজপত্র, নথি, দলিল নিয়ে পালিয়ে যান। এরপর কয়েকবার নোটিশ ও মৌখিকভাবে স্কুলে আসতে বললেও আসেননি। স্কুল পরিচালনা কমিটি তাকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করে পরবর্তী সময়ে বোর্ডে স্থায়ী বরখাস্তের আবেদন করে। কিন্তু বোর্ড আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন কমিটিতে তাকে ফের পদায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আরও বলেন, আজিজুল হককে বোর্ড তার বক্তব্য জানাতে বললে তিনি বলেন, তার বেতনভাতা বন্ধ এবং তাকে স্কুলে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এটা সম্পূর্ণ ঢাহা মিথ্যা কথা। বোর্ড তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো ব্যবস্থা তো দূরে থাক আলোচনাই না করে তার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। এখন তিনি স্কুলে ফের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলে স্থানীয়রা তাকে মেনে নেবে না। এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মাবুদ বলেন, আমি চলতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পাই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমি আজিজুল হককে স্কুলে পাইনি। শুনেছি তিনি ২০২৪ সাল থেকেই অনুপস্থিত। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের নথিপত্র গায়েব, অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মসহ বেশকিছু অভিযোগ পাই। বিনা অনুমতিতে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে অনুপস্থিত থাকায় চলতি বছরের ৭ আগস্ট বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি আরও বলেন, অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে অডিট করতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিএ ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা প্রতিবেদনে আজিজুল হক ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৮ বছরে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯০২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে উল্লেখ করেন। আমরা এ অডিট আপত্তির বিষয়ে তার মতামত জানতে চেয়ে তিন দফা নোটিশ দিয়েছি। তিনি নোটিশ গ্রহণ করলেও কোনো জবাব দেননি। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগেও তিনি অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন সব মিলিয়ে তাকে স্থায়ী বরখাস্ত করতে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছি। তবে শিক্ষা বোর্ড তাকে স্থায়ী বরখাস্ত না করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মো. আবুল কাসেম বলেন, আমাদের শিক্ষা বোর্ডে আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন নামে একটি বোর্ড আছে, এখানে অনিষ্পত্তিকৃত বিষয়গুলো মীমাংসা হয়। আমি এ বোর্ডের একজন সদস্য। জোয়ারিয়ানালা স্কুলের বিষয়ে বিস্তারিত জানি না। উনাকে (আজিজুল হক) আগের পদে বহাল করার জন্য উনি আবেদন করেছেন। এ রকম নিষ্পত্তির বিষয়ে দুটি পক্ষ লাগে, বাদী ও বিবাদী। এখানে মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্র আছে, জোর করে যাদের পদত্যাগ করানো হয়েছে বা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বা যাদের জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে রাখা হয়েছে, তাদের অনতিবিলম্বে আগের পদে পুনর্বহাল করার জন্য। এর আগে আরেকটি চিঠিতে এ ধরনের যারা আছেন, তাদের বেতনভাতা ই-এফটির মাধ্যমে সচল রাখার জন্য বলেছে। উনার অনেক বিষয় ছিল, আমি সব বলতে পারছি না। তবে উনাকে আগের পদে পুনর্বহালের একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। চেয়ারে বসার পর উনার বিরুদ্ধে থাকা অনিয়মের বিচার হতে পারে। বিচারে দোষী হলে তিনি চেয়ার ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবেন। এ বিষয় জানতে অভিযুক্ত আজিজুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে জানান। তিনি বলেন, যে অডিটটি করা হয়েছে সরকারিভাবে তার অনুমোদন নেই। তারা টাকার বিনিময়ে বাইরে থেকে লোক এনে একটি ফরম্যাট তৈরি করেছেন। চিঠি দেওয়ার পরও উপস্থিত না হওয়ায় বিষয়ে তিনি বলেন, একবার চিঠি পেয়েছি। তবে নিরাপত্তা ইস্যুতে যাওয়া হয়নি। সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা গায়ের জোরে অনুপস্থিত দেখিয়ে বরখাস্ত করেছে। বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সবাই জানেন। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির বর্তমান সভাপতি ও রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে রাব্বানী বলেন, আমি বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি জানি না। নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি। বিস্তারিত জানার পর মন্তব্য করতে পারব। অন্যদিকে, এ বিষয়ে কথা বলতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদের দপ্তরে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি সভায় আছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।

Tag :

আপনার মতামত লিখুন

Your email address will not be published. Required fields are marked *

আপনার ইমেইল ও অন্যান্য তথ্য সঞ্চয় করে রাখুন

আপলোডকারীর তথ্য

জনপ্রিয় সংবাদ

৩ টন সমপরিমাণ যৌন উত্তেজক ওষুধ জব্দ, এআই দিয়ে কণ্ঠ নকল করে প্রতারণা

একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ

বরখাস্ত প্রধান শিক্ষককে ফের নিয়োগের তোড়জোড়

আপডেট সময় ০৪:৪৩:৪৮ অপরাহ্ন, শনিবার, ৩ জানুয়ারী ২০২৬

একাধিক দুর্নীতির অভিযোগ, কোটি টাকার অর্থ আত্মসাতের অডিট প্রতিবেদন, দুর্নীতি দমন কমিশনে (দুদক) তদন্তাধীন মামলা এবং সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষককে ফের স্বপদে পদায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে চট্টগ্রাম মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক শিক্ষা বোর্ড। গত ১৭ ডিসেম্বর শিক্ষা বোর্ডের আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন বোর্ডের সভায় এ সিদ্ধান্ত হয়। এ সিদ্ধান্তে অনেকটা হতবাক হয়েছেন বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী, স্থানীয় এলাকাবাসী ও পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি। তারা বলছেন, অভিযুক্ত শিক্ষক ফের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলে স্থানীয়রা তাকে মেনে নেবে না। অভিযুক্ত শিক্ষকের নাম মো. আজিজুল হক। তিনি কক্সবাজারের রামু উপজেলার জোয়ারিয়ানালা হাজী মোহাম্মদ সাঁচি উচ্চ বিদ্যালয়ের সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক। সংশ্লিষ্ট নথি ও বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির আবেদনে দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আব্দুল মালেক গত ১৬ নভেম্বর চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান বরাবর লিখিত আবেদন করেন। আবেদনে সাময়িক বরখাস্তকৃত প্রধান শিক্ষক আজিজুল হককে স্থায়ীভাবে বরখাস্ত করার দাবি জানানো হয়। আবেদনে বলা হয়, আজিজুল হক ২০২৪ সালের ১৮ আগস্ট সাত দিনের চিকিৎসা ছুটি নিয়ে কর্মস্থল ত্যাগ করেন। তবে নির্ধারিত সময় শেষে তিনি আর বিদ্যালয়ে যোগদান করেননি। অতিরিক্ত ২৫ দিনের ছুটির আবেদন করলেও দাখিল করা চিকিৎসা সনদে অসংগতি পাওয়া যায় এবং ওই ছুটি তৎকালীন সভাপতি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা অনুমোদন দেননি। এরপর থেকে তিনি বিনা অনুমতিতে কর্মস্থলে অনুপস্থিত থাকেন। পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাকে বিদ্যালয়ে যোগদানের জন্য তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও কোনো লিখিত জবাব না পাওয়ায় আইনি নোটিশ পাঠানো হয় এবং রামু থানায় সাধারণ ডায়েরিও করা হয়। শেষ পর্যন্ত চলতি বছরের ৭ আগস্ট অনুষ্ঠিত অ্যাডহক কমিটির সভার সিদ্ধান্তে তাকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। আবেদনে উল্লেখ করা হয়, সাময়িক বরখাস্ত থাকা সত্ত্বেও আজিজুল হক নিজেকে ‘বর্তমান প্রধান শিক্ষক’ পরিচয় দিয়ে শিক্ষা প্রশাসনের ইএমআইএস ব্যবস্থার পাসওয়ার্ড পাওয়ার জন্য আবেদন করেন, যা শৃঙ্খলাভঙ্গ ও বিধিবহির্ভূত। পরিচালনা কমিটির সিদ্ধান্ত অনুযায়ী একটি পেশাগত নিরীক্ষা ফার্মের মাধ্যমে ২০১৬ সালের জানুয়ারি থেকে ২০২৪ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বিদ্যালয়ের আয়-ব্যয়ের অডিট করানো হয়। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়, প্রধান শিক্ষক আজিজুল হক বিভিন্ন খাতে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯০২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন। এই প্রতিবেদন পরিচালনা কমিটির সভায় সর্বসম্মতিক্রমে গৃহীত হয় এবং অডিট আপত্তির বিষয়ে লিখিত ব্যাখ্যা দিতে অভিযুক্ত প্রধান শিক্ষককে তিন দফা নোটিশ দেওয়া হয়। তবে নোটিশ গ্রহণ করলেও তিনি কোনো জবাব দেননি। অডিট আপত্তির ব্যাখ্যা না দেওয়ায় পরিচালনা কমিটি তার বিরুদ্ধে মামলা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সভাপতি বাদী হয়ে কক্সবাজার জেলা ও দায়রা জজ আদালতে ১৯৪৭ সালের দুর্নীতি প্রতিরোধ আইনের ৫(২) ধারায় একটি মামলা করেন। মামলাটি বর্তমানে দুর্নীতি দমন কমিশনে তদন্তাধীন রয়েছে। আবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, বাংলায় নিবন্ধনধারী হলেও সহকারী শিক্ষক (সামাজিক বিজ্ঞান) পদে সাজেদা বেগম নামে এক শিক্ষককে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মূল প্যাটার্নে নিয়োগ দেখিয়ে এমপিওভুক্তির চেষ্টা করা হয়। এ ঘটনায় জাতীয় শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) তদন্ত করে সাজেদা বেগমের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ বাতিল করে এবং সনদ ব্যবহারকে ফৌজদারি অপরাধ ঘোষণা করে। নথি অনুযায়ী, এ অনিয়মে সরকারের আনুমানিক ৩৫ লাখ টাকা ক্ষতি হয়েছে। এতসব অভিযোগ, অডিটে প্রমাণিত অর্থ আত্মসাৎ, দুদকের মামলা ও পরিচালনা কমিটির স্থায়ী বরখাস্তের আবেদনের পরও আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন বোর্ডের মাধ্যমে তাকে ফের পদায়নের সিদ্ধান্ত দেওয়ায় স্থানীয় শিক্ষানুরাগী, এলাকাবাসী ও প্রাক্তন শিক্ষার্থীরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিদ্যালয়ের সাবেক শিক্ষার্থী ডা. আব্দুল মজিদ ও বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠাতা পরিবারের সদস্য প্রকৌশলী সোহেল শাহরিয়ার বলেন, আজিজুল হক ২০১০ সালে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেছেন। প্রথম দুই বছর স্বচ্ছভাবে সবকিছু করেছেন। ২০১২ সাল থেকে ধীরে ধীরে অনিয়ম শুরু করেন। স্থানীয় এমপি ওনার বাল্যবন্ধু হওয়ায় ক্ষমতার অপব্যবহার করে তিনি নিয়মনীতি অমান্য করতে শুরু করেন। কোনো কিছুরই বিল-ভাউচার রাখতেন না। রেজিস্ট্রেশন বা বিভিন্ন ক্ষেত্রে রশিদ ছাড়াই বোর্ড নির্ধারিত ফির তিন চারগুণ নিতেন। কেউ কোনো প্রতিবাদ করতে সাহস করত না। ২০২৪-এর ৫ আগস্টের পর স্থানীয়রা যখন হিসাব নিয়ে আলোচনা শুরু করেন, তখন তিনি এক রাতে স্কুলের সব কাগজপত্র, নথি, দলিল নিয়ে পালিয়ে যান। এরপর কয়েকবার নোটিশ ও মৌখিকভাবে স্কুলে আসতে বললেও আসেননি। স্কুল পরিচালনা কমিটি তাকে প্রথমে সাময়িক বরখাস্ত করে পরবর্তী সময়ে বোর্ডে স্থায়ী বরখাস্তের আবেদন করে। কিন্তু বোর্ড আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন কমিটিতে তাকে ফের পদায়নের সিদ্ধান্ত নেয়। তারা আরও বলেন, আজিজুল হককে বোর্ড তার বক্তব্য জানাতে বললে তিনি বলেন, তার বেতনভাতা বন্ধ এবং তাকে স্কুলে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। অথচ এটা সম্পূর্ণ ঢাহা মিথ্যা কথা। বোর্ড তার বিরুদ্ধে আনীত অভিযোগের কোনো ব্যবস্থা তো দূরে থাক আলোচনাই না করে তার পক্ষে সিদ্ধান্ত দেয়। এখন তিনি স্কুলে ফের প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগদান করলে স্থানীয়রা তাকে মেনে নেবে না। এ বিষয়ে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির তৎকালীন সভাপতি অ্যাডভোকেট আবদুল মাবুদ বলেন, আমি চলতি বছর ২০ ফেব্রুয়ারি অ্যাডহক কমিটির সভাপতি হিসেবে নিয়োগ পাই। দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে আমি আজিজুল হককে স্কুলে পাইনি। শুনেছি তিনি ২০২৪ সাল থেকেই অনুপস্থিত। পরবর্তী সময়ে তার বিরুদ্ধে বিদ্যালয়ের নথিপত্র গায়েব, অর্থ আত্মসাৎ, শিক্ষক নিয়োগে অনিয়মসহ বেশকিছু অভিযোগ পাই। বিনা অনুমতিতে ২০২৪ সালের ২৯ সেপ্টেম্বর থেকে অনুপস্থিত থাকায় চলতি বছরের ৭ আগস্ট বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়। তিনি আরও বলেন, অর্থ আত্মসাতের বিষয়ে অডিট করতে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির সর্বসম্মতিক্রমে একটি সিএ ফার্ম নিয়োগ দেওয়া হয়। তারা প্রতিবেদনে আজিজুল হক ২০১৬ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত ৮ বছরে ১ কোটি ৩৬ লাখ ৭৯ হাজার ৯০২ টাকা আত্মসাৎ করেছেন বলে উল্লেখ করেন। আমরা এ অডিট আপত্তির বিষয়ে তার মতামত জানতে চেয়ে তিন দফা নোটিশ দিয়েছি। তিনি নোটিশ গ্রহণ করলেও কোনো জবাব দেননি। এ ছাড়া বিদ্যালয়ে শিক্ষক নিয়োগেও তিনি অনিয়মের আশ্রয় নিয়েছেন সব মিলিয়ে তাকে স্থায়ী বরখাস্ত করতে শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানকে চিঠি দিয়েছি। তবে শিক্ষা বোর্ড তাকে স্থায়ী বরখাস্ত না করে দায়িত্ব বুঝিয়ে দিতে নির্দেশ দিয়েছে। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের বিদ্যালয় পরিদর্শক অধ্যাপক মো. আবুল কাসেম বলেন, আমাদের শিক্ষা বোর্ডে আপিল অ্যান্ড আর্বিটেশন নামে একটি বোর্ড আছে, এখানে অনিষ্পত্তিকৃত বিষয়গুলো মীমাংসা হয়। আমি এ বোর্ডের একজন সদস্য। জোয়ারিয়ানালা স্কুলের বিষয়ে বিস্তারিত জানি না। উনাকে (আজিজুল হক) আগের পদে বহাল করার জন্য উনি আবেদন করেছেন। এ রকম নিষ্পত্তির বিষয়ে দুটি পক্ষ লাগে, বাদী ও বিবাদী। এখানে মন্ত্রণালয়ের একটি পরিপত্র আছে, জোর করে যাদের পদত্যাগ করানো হয়েছে বা পদত্যাগে বাধ্য করা হয়েছে বা যাদের জোরপূর্বক প্রতিষ্ঠান থেকে দূরে রাখা হয়েছে, তাদের অনতিবিলম্বে আগের পদে পুনর্বহাল করার জন্য। এর আগে আরেকটি চিঠিতে এ ধরনের যারা আছেন, তাদের বেতনভাতা ই-এফটির মাধ্যমে সচল রাখার জন্য বলেছে। উনার অনেক বিষয় ছিল, আমি সব বলতে পারছি না। তবে উনাকে আগের পদে পুনর্বহালের একটি সিদ্ধান্ত হয়েছে। চেয়ারে বসার পর উনার বিরুদ্ধে থাকা অনিয়মের বিচার হতে পারে। বিচারে দোষী হলে তিনি চেয়ার ছেড়ে চলে যেতে বাধ্য হবেন। এ বিষয় জানতে অভিযুক্ত আজিজুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি সব অভিযোগ মিথ্যা ও বানোয়াট বলে জানান। তিনি বলেন, যে অডিটটি করা হয়েছে সরকারিভাবে তার অনুমোদন নেই। তারা টাকার বিনিময়ে বাইরে থেকে লোক এনে একটি ফরম্যাট তৈরি করেছেন। চিঠি দেওয়ার পরও উপস্থিত না হওয়ায় বিষয়ে তিনি বলেন, একবার চিঠি পেয়েছি। তবে নিরাপত্তা ইস্যুতে যাওয়া হয়নি। সাময়িক বরখাস্তের বিষয়ে তিনি বলেন, তারা গায়ের জোরে অনুপস্থিত দেখিয়ে বরখাস্ত করেছে। বিষয়টি শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যানসহ সবাই জানেন। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটির বর্তমান সভাপতি ও রামু উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. ফজলে রাব্বানী বলেন, আমি বিষয়টি নিয়ে পুরোপুরি জানি না। নির্বাচনী কাজে ব্যস্ত থাকায় বিস্তারিত জানা সম্ভব হয়নি। বিস্তারিত জানার পর মন্তব্য করতে পারব। অন্যদিকে, এ বিষয়ে কথা বলতে চট্টগ্রাম শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ইলিয়াছ উদ্দিন আহাম্মদের দপ্তরে গেলে তাকে পাওয়া যায়নি। পরবর্তী সময়ে মোবাইল ফোনে কল দিলে তিনি সভায় আছেন জানিয়ে সংযোগ বিচ্ছিন্ন করেন।